আপামর বাঙালীর কাছে অন্যতম প্রধান দুর্গাপূজা তথা শারদীয় দুর্গোৎসব। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আরাধনাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সনাতন হিন্দু সমাজের প্রাণের এ দুর্গোৎসব। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচ দিন যথাক্রমে ‘দুর্গাষষ্ঠী’, ‘মহাসপ্তমী’, ‘মহাষ্টমী’, ‘মহানবমী’ ও ‘বিজয়াদশমী’ নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষকে বলা হয় ‘দেবীপক্ষ’। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া। মহালয়ার দিন তর্পণ করে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করা হয়। ভোরে মহালয়ার ঘট স্থাপন, বিশেষ পূজা আর মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খের ধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন জানানো হয় মহালয়ার পুণ্য তিথিতে।
দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হলো কোজাগরী পূর্ণিমা। দেবী লক্ষ্মীর পূজা-অর্চনা করা হয়। কোনো কোনো স্থানে পনেরো দিন ধরেও শারদীয় দুর্গাপূজার চল রয়েছে। বিশেষ করে কলকাতার বনেদী বাড়িতে। এ বছর মলো মাস হওয়ায় তা বন্ধ।
সাধারণত মহালয়ার ছয় দিন পরই হয় দেবী দুর্গার বোধন। সেভাবেই পূজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় মহালয়া। তার ৩৫ দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মহাষষ্ঠী। অর্থাৎ এ বছর দেবীর বোধন হবে আগামী ২২ অক্টোবর। পঞ্জিকামতে, মহালয়ার প্রায় একমাস পর দুর্গাপূজার কারণ হলো দুটি অমাবস্যাই এবার একইমাসে পড়েছে। আর সেজন্যই এবার দুর্গাপূজা প্রায় একমাস পিছিয়ে আশ্বিনের জায়গায় কার্তিক মাসে তথা হেমন্তকালে হবে।
শাস্ত্রমতে, একই মাসে দুটি অমাবস্যা থাকলে তাকে মলোমাস বলে। দুটি অমাবস্যা থাকায় ১৪২৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস হলো মলোমাস। মলোমাসে কোনো পূজা অনুষ্ঠিত হয় না। শুধু পূজাই নয়, কোনো শুভ অনুষ্ঠানও মলোমাসে করা যায় না। স্বাভাবিক নিয়মে পিতৃপক্ষ শেষ হওয়ার পরই দুর্গাপূজা শুরু হতো, কিন্তু এ বছর তা আর হয় নি। কারণ পিতৃপক্ষ শেষ হওয়ার পরই আশ্বিন মাসের অধিকমাস বা মলোমাস শুরু হয়েছে। তাই এ বছর দেবী দুর্গা আসছেন কার্তিক মাসে অর্থাৎ হেমন্তে। ‘শারদীয়’ দুর্গোৎসব হলেও এ বছর তা আক্ষরিক অর্থে হবে ‘হৈমন্তিক’।

তিথি এবং নক্ষত্রের হিসাব সাধারণত চন্দ্রের গতির উপর নির্ভর করে হয়। সূর্য এবং চন্দ্রের দূরত্বের ব্যবধান যখন ০ ডিগ্রি তখন অমাবস্যা। প্রত্যেক ১২ ডিগ্রির ব্যবধানে তিথির পরিবর্তন হয়। মেষ রাশির প্রথম ডিগ্রি থেকে প্রত্যেক ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিটের ব্যবধানে (চন্দ্রের) নক্ষত্রের পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক চন্দ্রমাস ২৯.৫৪ দিনে। চন্দ্রবর্ষ ৩৫৪.৩৬ দিনে। সূর্য প্রত্যেক রাশিতে কমবেশি ৩০ দিন ১০ ঘণ্টা অবস্থান করে। মেষ রাশি থেকে শুরু করে ১২ রাশি ভ্রমণ করে পুনরায় মেষ রাশিতে ফিরতে সময় লাগে ৩৬৫.৫৪ দিন। অর্থাৎ সৌরবর্ষ ৩৬৫.৫৪ দিনে। পৃথিবীর নিজ কক্ষপথে ভ্রমণ করতে সময় লাগে ৩৬৫.৬৯ দিন। অর্থাৎ প্রত্যেক বৎসরের (চন্দ্রবর্ষ এবং সৌরবর্ষ) হিসাবে কম বেশি ১১.১৮ দিনের পার্থক্য হয়। এই পার্থক্য হিসাবে সাধারণত প্রত্যেক ৩২ মাস অন্তর ৩০ দিন বা ১ মাস বৃদ্ধি হয়। এই বৃদ্ধি মাসই অধিক মাস। অধিক মাস মল মাস এবং পুরুষোত্তম মাস নামেও পরিচিত। মলমাসে সাধারণত বিবাহ, অন্নপ্রাশন, গৃহ ক্রয়, গৃহপ্রবেশ, শুভ বস্তু ক্রয়ের মত শুভ কার্য করা হয় না। তবে পুরুষোত্তম মাস ভগবান শ্রী বিষ্ণুর পূজা এবং ধর্মশাস্ত্র পাঠের পক্ষে প্রশস্ত মাস এবং ওই কাজে শুভ ফল পাওয়া যায়।
আবার প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, একই মাসে দুটি অমাবস্যাকেও মলোমাসের অন্যতম কারণ মনে করা হয়। তাই এ বছর মহালয়ার দিন নিয়ম মেনেই পিতৃতর্পণসহ অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালিত হয়েছে। কেবল অন্যান্য বছরের মতো মহালয়া থেকে ৬ দিনের দূরত্বে দুর্গাষষ্ঠী উদযাপিত না হয়ে এ বছর মহালয়া থেকে ৩৫ দিন দূরত্বে দেবী দুর্গার অকালবোধন অনুষ্ঠিত হবে। অনুরূপভাবে পরবর্তীতে আবার ২০৩৯ সালেও এরকম পরিস্থিতি তৈরি হবে। তবে এবারই যে প্রথম এমনটি হচ্ছে তা কিন্তু নয়, এর আগে ১৯৮২ ও ২০০১ সালেও একই কারণে মহালয়া ও দুর্গাপূজা শুরুর ব্যবধান প্রায় একমাস হয়েছিল।
এ বছরের দুর্গাপূজা দুটি প্রধান কারণে অন্যান্য বারের তুলনায় একটু আলাদাভাবে পালিত হচ্ছে। একটি তো এই মহালয়া ও মহাষষ্ঠীর মাঝে দীর্ঘ ব্যবধান, অপরটি হলো করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সৃষ্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য পারিপার্শ্বিক উৎসাহ-উদ্দীপনা, উৎসবমুখর পরিবেশ ইত্যাদি কিছুটা হলেও এবার একটু স্তিমিত। তা সত্ত্বেও দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বানের জন্য অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন সাধারণ মানুষ।