বাংলাদেশ সীমান্ত। গঙ্গারামপুরের নন্দনপুর। এখানেও শিউলি ও কাশফুলের সকালে মা আসছেন বেলতলায়। আজ মহা ষষ্ঠী। মা প্রথমে ছেলেমেয়েদের নিয়ে পা রাখবেন বেলতলায়। পুরোহিতেরা শিউলিভরা সকালেই মাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে ঘরে তুলেছেন। প্রাচীন ঐতিহ্য ও রীতিপ্রথা মেনে তাই ভৌমিক বাড়ির ৫৫১ বছরের পুজোয় যাতে কোনও খামতি না থাকে এজন্য সতর্ক বাড়ির কর্তারা।
প্রসঙ্গত, এই সীমান্তবর্তী এলাকায় বেশ কিছু প্রাচীন দুর্গা পুজো আছে। প্রাচীন আচারপ্রথা এই সমস্ত পারিবারিক পুজোয় আজও অটুট। তবে দুটি প্রাচীন পুজো আজও মানুষের মনে দাগ কেটে রয়েছে। একটি ৫৫১ বছরের, আর একটি ২৪৯ বছরের। এই পারিবারিক প্রাচীন পুজোকে ঘিরে দু-দেশের মানুষের এ যেন সম্প্রীতির মেলবন্ধন।পারিবারিক সদস্যরা ছাড়াও এলাকার মানুষ অপেক্ষায় থাকেন এই পুজো দুটির জন্য।

নন্দনপুরের ঠেঙ্গাপাড়ার ভৌমিক বাড়ির ৫৫১ বছরের পুজো
উল্লেখ করতেই হয়, দুটি পারিবারিক পুজোই হল দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর এলাকার। প্রথমটি হল গঙ্গারামপুর বিধানসভার নন্দনপুরের ঠেঙ্গাপাড়ার ভৌমিক বাড়ির ৫৫১ বছরের পুজো। এই প্রাচীন পুজোর এক রোমহর্ষক কাহিনি যা আজও ভৌমিক বাড়িতে ইতিহাস হয়ে আছে। কী সেই ইতিহাস? তা হল ভৌমিকদের আদি নিবাস হল বাংলাদেশ। যা ১৯৭১ সালের আগে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। ঢাকা জেলার বরংগাইলের ভৌমিক বাড়ি আজও রয়ে গেছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশিরা আছে। বর্তমানে ঠেঙ্গাপাড়ায় ভৌমিকদের সমীরণ ভৌমিক ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা স্বপ্নাদেশে পাওয়া মা দুর্গাকে আজও আবাহনে ব্যস্ত। পারিবারিক এই পুজোকে কেন্দ্র এলাকার মানুষও এই উৎসবে সামিল হন। জাত-ধর্ম ভুলে এই পুজোয় সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ হন। এমনকি মেলা বসে। নবমীর ভোগ-প্রসাদে অংশ নেন পারিবারিক সদস্যদের সঙ্গে এলাকার মানুষও।
উল্লেখ্য, বাড়ির মন্দিরেই মায়ের আরাধনা। নিয়মনিষ্ঠা মেনে শুরু হয়েছে পুজোর আরাধনা।

ঐতিহ্যবাহী গঙ্গারামপুরের জোয়াদ্দার বাড়ির প্রাচীন পুজো
আর একটি প্রাচীন পুজোর উল্লেখ করতেই হয়। তা হল ২৪৯ বছরের ঐতিহ্যবাহী গঙ্গারামপুরের জোয়াদ্দার বাড়ির প্রাচীন পুজো। এই পুজোর আকর্ষণ আজও হৃদয় টানে সকলের। আনন্দে মেতে ওঠেন গঙ্গারামপুরবাসীরা। শুভ মহা ষষ্ঠীর দিন থেকেই জোয়াদ্দারদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশিদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। হিলি সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় দু-দেশের মানুষের মিলিত বন্ধনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যবসায়িক এলাকা হওয়ায় এখানকার বনেদী বাড়ির প্রাচীন পুজো জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। গঙ্গারামপুর পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের এই পারিবারিক পুজোয় শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করতে আসেন এলাকার অসংখ্য মানুষ। বিদ্যুৎ কুমার জোয়ারদ্দার ও অশোক কুমার জোয়ারদ্দার জানান, মায়ের আরাধনা হরিনাথ জোয়ারদ্দার, প্রাণনাথ জোয়ারদ্দার ও বিনোদবিহারী জোয়ারদ্দার — এই তিন পুরুষ ধরে চলে আসছে। প্রাচীন আচার-প্রথা আজও অটুট। দীর্ঘদিনের এই বনেদী বাড়ির পুজোর সূচনা হয় অবিভক্ত বাংলাদেশের পাবনা জেলার শাহজাদপুর গ্রামে। মূলত তাঁরা জমিদার বংশ না হলেও সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে আজও তাঁরা উজ্জ্বল।

প্রসঙ্গত, এই দুর্গা পুজো কোনও স্বপ্নাদেশ পাওয়া নয়। পূর্বপুরুষের বিশ্বাস-ভক্তি ও হৃদয়ের একান্ত টানেই জোয়ারদ্দার বাড়িতে দেবীর শুভ আগমন। প্রাচীন প্রথা মেনে এই জাগ্রত দেবী জন্মাষ্টমীর ঝিঙা ষষ্ঠীতে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। উল্লেখ্য, পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। ভক্তদের কাছে আকর্ষণীয় হল এই দুর্গাদেবীর সঙ্গে থাকে না মহিষ। কেবল তাই নয় দশমীর পরের দিন একই আসনে পূজা হয় রক্ষাকালীর। এই পুজো নিয়ম ও রীতি মেনে আজও চলে আসছে। অষ্টমী ও নবমী এই দু-দিন দেওয়া হয় অন্নভোগ। এই ভোগ সকলকে বিতরণ করা হয়। দশমীতে মিষ্টিমুখ সকলের জন্য।