১৮২২ সালে কলকাতায় আসেন ফ্রান্সেস সুজেনা আরচার। সকলের কাছে ফ্যানি পার্কস নামেই তিনি বহুল পরিচিতি পান। তাঁর স্বামী চার্লস পার্কস ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন ‘রাইটার’ অর্থাৎ কেরানি। প্রবাস জীবনের স্মৃতি হিসেবে মিসেস ফ্যানি তাঁর বেড়ানোর গল্প ডায়েরির পাতায় লিখে রাখতেন। ১৮২২ থেকে ১৮৪৬ — টানা ২৪ বছর এদেশে কাটিয়ে তিনি দেশে ফিরে যান, সঙ্গে করে নিয়ে যান তাঁর ২৪ বছরের ভারত–অভিজ্ঞতার দৈনন্দিন নির্যাস। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি তাঁর ডায়েরির পাতা ভর্তি করে ছিলেন। এখানে দুর্গাপুজো নিয়ে তাঁর বর্ণনার একটা অংশ তুলে ধরলাম।

ফ্যানি পার্কস
তিনি লিখছেন, ‘…সেদিন দুর্গাপূজা দেখতে গিয়াছিলাম একজন ধনিক বাঙালীবাবুর বাড়ি। ‘দুর্গা’ নামে হিন্দুদের যে দেবী আছেন তাঁরই ‘অনারে’ এই উৎসব হয়। বাবুর চারমহলা বাড়ি, মধ্যিখানে বিরাট উঠোন। সেই উঠোনের এক পাশে উঁচু মঞ্চের উপর দেবী দুর্গার সিংহাসন পাতা। সিংহাসনের উপর দুর্গার মাটির প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত। মঞ্চের দু’ধারে সিঁড়িতে ব্রাহ্মণেরা উপবিষ্ট, পূজার অনুষ্ঠানাদির ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত। প্রতিমার ডান হাত দিয়ে তিনি এক ভীষণাকৃতি অসুরকে বর্শাবিদ্ধ করেছেন, বাম হাতে একটি বিষাক্ত সাপের লেজসহ অসুরের ঝুঁটি ধরেছেন, সাপটি অসুরের বক্ষস্থল দংশন করছে। বাকি আটটি হাত ডাইনে-বামে প্রসারিত, প্রত্যেক হাতে একটি করে মরণাস্ত্র। তাঁর দক্ষিণ হাঁটুর কাছে একটি সিংহ এবং বাম হাঁটুর কাছে অসুর। সিংহ দেবীকে বাহন করেছে মনে হয়। …পূজামণ্ডপের পাশের একটি বড়ো ঘরে নানারকমের উপাদেয় সব খাদ্যদ্রব্য প্রচুর পরিমাণে সাজানো ছিল। সবই ইয়োরোপীয় অতিথিদের জন্য বিদেশী পরিবেশক ‘মেসার্স গান্টার অ্যান্ড হুপার’ সরবরাহ করেছিলেন। খাদ্যের সঙ্গে বরফ ও ফরাসী মদ্যও ছিল প্রচুর। মণ্ডপের অন্যদিকে বড়ো একটি হলঘরে সুন্দরী সব পশ্চিমা বাইজিদের নাচগান হচ্ছিল এবং ইয়োরোপীয় ও এদেশি ভদ্রলোকেরা সোফায় হেলান দিয়ে, চেয়ারে বসে সুরা-সহযোগে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। বাইরেও বহু সাধারণ লোকের ভিড় হয়েছিল বাইজিদের গান শোনার জন্য। গানের হিন্দুস্থানী সুর মণ্ডপে সমাগত লোকজনদের মাতিয়ে তুলেছিল আনন্দে। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলতে থাকে। পাঁচদিন পরে ষষ্ঠির দিন দেবী জেগে ওঠেন এবং সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিনে মহাসমারোহে তাঁর পূজা হয়। নবমীর দিন বলিদান হয় এবং এক কোপে মুণ্ডচ্ছেদ করতে না পারলে বলি নাকি সার্থক হয় না।’ সবশেষে তিনি লেখেন— ‘…আর ধনিক বাঙালীবাবুরা পূজার সময় যে পরিমাণ অর্থব্যয় করেন তার হিসেব নেই।’

ফ্যানি পার্কস-এর এই লেখাটি নির্দিধায় যে কোনও পূজাসংখ্যায় স্থান পেতেই পারে। সে যাক, পূজা সংখ্যার শুরুটা কবে? মতবিরোধ থাকলেও থাকতে পারে। তবে ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পূজা সংখ্যা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তা থেকে জানা যায় — কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত সংস্কার সভা’ তাদের তৎকালীন বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সুলভ সমাচার’-এর একটি সংস্করণ ‘ছুটির সুলভ’ নামে প্রকাশ করেছিল ১২৮০ বঙ্গাব্দের পুজোর সময়। প্রায় ১৫০ বছর আগে। অবশ্য পুজো সংখ্যা বলে এতে কোনও উল্লেখ ছিল না, কারণ সম্পাদক কেশবচন্দ্র সেন ছিলেন ব্রাহ্ম — স্বভাবতই পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস ছিলেন না তিনি। ‘ছুটির সুলভ’ প্রকাশিত হয়েছিল ১২৮০ বঙ্গাব্দের ১০ আশ্বিন বৃহস্পতিবার। দাম ধার্য হয়েছিল এক পয়সা।
পুজো সংখ্যা হিসাবে বেরোলেও এই সংখ্যাটিতে পুজো সাহিত্য তেমনভাবে ছিল না। বরং ওই বছরই কার্তিক মাসে মনোমোহন বসু সম্পাদিত ‘মধ্যস্থ’ পত্রিকার ২ কার্তিক সংখ্যায় দুর্গোৎসব নিয়ে বিবরণ, ‘দুর্গাবন্দনা’ নামে কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল, আর ৯ কার্তিক সংখ্যাটিতে ছিল ‘দুর্গোৎসব’ নামে এক দীর্ঘ কবিতা আর উৎসবের মনরম বর্ণনা। ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’-এও দেখা যেত পুজোর পদ্য। তবে বটতলা থেকে প্রকাশিত হতো ছোটো ছোট মজাদার বই। লেখা থাকতো ‘দুর্গাপূজার রংতামাসা, পড় দিয়ে একটি পয়সা।’

বিগত বঙ্গাব্দের বিশ-এর দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পুজো সংখ্যা প্রকাশ শুরু করে। ১৩১৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে ‘যমুনা’ পত্রিকার প্রথম শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৩২০ বঙ্গাব্দে মাসিক ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকা তাদের কার্তিক সংখ্যাটি বড়ো আকারে শারদীয়া সংখ্যারূপে প্রকাশ করে। লেখকরা ছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, বিপিনবিহারী গুপ্ত, নিরুপমা দেবী, হরিসাধন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। ১৩২২ সনে চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত ‘নারায়ণ’ পত্রিকার প্রথম শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয়। আনন্দবাজার পত্রিকা দু-পাতার প্রথম শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে কাগজের সঙ্গে ১৩২৯ সনে। ১৩২৯ সালে মাসিক ‘বঙ্গবানী’ পত্রিকার পুজো সংখ্যায় শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পটি প্রকাশিত হয়। ১৩৩২ সনে মাসিক বসুমতী পত্রিকার আলাদা শারদীয় সংখ্যা পাঠক সমাজে বিপুল আলোড়ন তুলেছিল। লেখক তালিকায় ছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, অনুপমা দেবী, দেবেন্দ্রকুমার বসু, নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রমুখ। ১৩৩৩ সনে ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা ‘ভারতী’-র পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত হয় পূজা সংখ্যা দাম এক টাকা। এই সংখ্যায় শরৎচন্দ্রের ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘ষোড়শী’ রচনা করেছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। ১৩৩৩ সনে আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম পৃথক ৫৪ পৃষ্ঠার শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে। দাম ছিল দু-আনা। ১৩৩৫ থেক ১৩৪২ পর্যন্ত আনন্দবাজার বেশ বড়ো করে পূজা সংখ্যা প্রকাশ করে দাম ছিল আট আনা। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রথম উপন্যাস ছাপা হয় ১৩৪৬ সনে। লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। উপন্যাসের নাম ‘শহরতলী’। ১৩৩৪ সনে বসুমতী পুজো সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ প্রথম ‘পরিত্রাণ’ নামে পূর্ণাঙ্গ নাটক রচনা করেন। ‘দেশ’ পত্রিকা তাদের প্রথম পুজোসংখ্যা প্রকাশ করে ১৩৪১ সনে। এটি অবশ্য সাধারণ সংখ্যার বর্ধিত রূপ ছিল। ১৩৫৬ সনে দেশ পত্রিকার পুজোসংখ্যায় প্রথম উপন্যাস ছাপা হয় সুবোধ ঘোষের ‘ত্রিযামা’। ১৩৬৭ সালে দেব সাহিত্যকুটির থেকে মাসিক পত্রিকা নবকল্লোল-এর আত্মপ্রকাশ ওই বছরই প্রথম শারদীয়া নবকল্লোল প্রকাশ পায়। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পত্রিকা ‘উদ্বোধন’-এর প্রথম প্রকাশ ১৩০৪ বঙ্গাব্দ। প্রথম বছর থেকেই এই পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ছোটোদের প্রথম পুজো সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩২৫ বঙ্গাব্দে, নাম ছিল ‘পার্বনী’। রবীন্দ্রনাথ ‘পার্বণী’ নামের শারদীয় বার্ষিকীতেই প্রথম পূজার লেখা দেন। ‘পার্বণী’ হলো প্রথম বাংলা পুজা বার্ষিকী। ‘পার্বণী’ সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ছোট জামাই নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ‘পার্বণী’র প্রথম পূজাবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথ ‘শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে’ গানটি ‘শরতের গান’ নাম দিয়ে লিখেছিলেন। আর লিখেছিলেন ‘ইচ্ছাপূরণ’ গল্প ও ‘ঠাকুর্দ্দার ছুটি’ কবিতা।

১৯৩৫ সালে ‘আনন্দবাজার’ ও ‘দেশ’ পত্রিকার পক্ষ থেকে পূজা সংখ্যায় লেখা দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ‘একশ টাকা বায়না’ দেওয়া হয়। ঘটনাটির উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৫ সালের ২৯শে আগস্ট শান্তিনিকেতন থেকে প্রবাসী ও মডার্ন রিভিউ পত্রিকাদ্বয়ের সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখেন —
“এখানকার বন্যাপীড়িতদের সাহায্যার্থে অর্থসংগ্রহ-চেষ্টায় ছিলুম। ব্যক্তিগতভাবে আমারও দুঃসময়। কিছু দিতে পারছিলুম না বলে মন নিতান্ত ক্ষুব্ধ ছিল। এমন সময় ‘দেশ’ ও ‘আনন্দবাজার’-এর দুই সম্পাদক পূজার সংখ্যার দুটি কবিতার জন্য একশ টাকা বায়না দিয়ে যান, সেই টাকাটা বন্যার তহবিলে গিয়েছে। আগেকার মতো অনায়াসে লেখবার ক্ষমতা এখন নেই। সেজন্য ‘বিস্ময়’ কবিতাটি দিয়ে ওদের ঋণশোধ করব বলে স্থির করেছি। ক্লান্ত কলম নতুন লেখায় প্রবৃত্ত হতে অসম্মত।……”
আগে পূজায় তেমন জাঁকজমক হতো না, তাই ছুটিরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। দুর্গাপূজায় প্রথম ছুটির উল্লেখ পাওয়া যায় ১৭৮৭ সালে। কলকাতার পূজার বাজারকে গ্রামের মানুষদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১৯২৭ সালে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ে (ই. বি. রেলওয়ে) কর্তৃপক্ষ পূজার আগে ‘পূজাবাজার স্পেশাল’ নামে তিন কামরার একটি ট্রেন প্রায় মাসখানেক ধরে বিভিন্ন স্টেশনে চালিয়েছিল। গ্রামের মানুষদের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্য নিয়ে মোট ১৬টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ওই ট্রেনে পসরা সাজিয়ে যোগ দিয়েছিল।