পুরাণ মতে, রাজা সুরথই বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজো করেন। তবে তিনি দুর্গাপুজো করেছিলেন চৈত্র মাসে, এখন যা বাসন্তী পুজো নামে খ্যাত। অন্য দিকে, যোগেশচন্দ্র রায়বিদ্যানিধি ও অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতে, শারদীয় দুর্গোৎসব বৈদিক শরৎকালীন যজ্ঞেরই রূপান্তর। অনেকে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণকেই বাংলায় দুর্গাপুজো শুরু করার হোতা মনে করেন। ষোড়শ শতকে তিনি ধূমধাম করে দুর্গাপুজো করেন। অবশ্য এই ধারণার সমর্থনে নানাবিধ পারিপার্শ্বিক প্রমাণও বিদ্যমান। তাঁর গুরু রমেশ শাস্ত্রী যে দুর্গাপূজা পদ্ধতি প্রণয়ণ করেন, আজও কম-বেশি সেটাই অনুসরণ করা হয়।
তবে জীমূতবাহনের (আনুমানিক ১০৮০-১১৫০) দুর্গোৎসবনির্ণয়, বিদ্যাপতির (১৩৭৪-১৪৬০) দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী, শূলপানির (১৩৭৫-১৪৬০) দুর্গোৎসববিবেক, কৃত্তিবাস ওঝার (আনুমানিক ১৩৮১-১৪৬১) রামায়ণ, বাচষ্পতি মিশ্রের (১৪২৫-১৪৮০) ক্রিয়াচিন্তামণি, স্মার্ত রঘুনন্দনের (১৫-১৬শ শতক) তিথিতত্ত্ব ইত্যাদি গ্রন্থে দুর্গাপুজোর বিস্তৃত বিবরণ থাকায় অনুমান করা যায়, দশম বা একাদশ শতকেই বাংলায় দুর্গা পুজো প্রচলিত ছিল। এ ছাড়া রাজা গণেশ পঞ্চদশ শতকে মূর্তি গড়ে দুর্গা পুজো শুরু করেন। সুতরাং, ঐতিহাসিক বিচারে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, তাহেরপুরের কংসনারায়ণের অনেক আগে থেকেই বাংলায় দুর্গা পুজোর চল ছিল।

তাহিরপুর রাজবংশ বাংলাদেশের প্রাচীন রাজবংশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে জায়গাটি রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার একটি পৌরসভা। তবে কালক্রমে ‘তাহিরপুর’ নামটি তাহেরপুর বলে উচ্চারিত হচ্ছে। এই রাজবংশের আদিপুরুষ ছিলেন মৌনভট্ট। আর বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামন্ত রাজা ছিলেন ইতিহাসখ্যাত কংস নারায়ণ রায়ম মনুসংহিতা-র প্রসিদ্ধ টীকাকার কুল্লুক ভট্টের সন্তান। তিনি সুলতানি আমলে চট্টগ্রামে মগ দমনে বীরের ভূমিকা পালন করেন। পাঠান আমলে কিছুদিন ফৌজদারের দায়িত্বও পালন করেন। মোগল আমলে এসে কিছুকাল বাংলা-বিহারের অস্থায়ী দেওয়ান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি ‘রাজা’ উপাধি পান। বাংলা মোগলদের অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলে সম্রাট আকবর রাজা কংস নারায়ণকে সুবেবাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। কিন্তু যথেষ্ট বয়স হওয়ায় তিনি দেওয়ানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তাহেরপুরে ফিরে ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সমসাময়িক বাঙালি সমাজে তিনি চিরভাস্বর হয়ে থাকার মানসে এক মহাযজ্ঞ সাধন করতে আগ্রহী হলেন। এই লক্ষ্যে তাঁর পরগণার শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের দরবারে আহ্বান করে তাঁদের মত চাইলেন। পাঁতি দিতে গিয়ে প্রখ্যাত পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী বললেন, ‘বিশ্বজিৎ, রাজসুয়, অশ্বমেধ ও গোমেধ—এই চারটি মহাযজ্ঞ নামে কথিত। প্রথম দুটি কেবল সার্বভৌম সম্রাটেরা করতে পারেন আর পরের দুটি কলিতে নিষিদ্ধ। তোমার পক্ষে দুর্গোৎসব ভিন্ন অন্য কোনো মহাযজ্ঞ উপযুক্ত নাই। এই যজ্ঞ সকল যুগে সকল জাতীয় লোকেই করতে পারে এবং এক যজ্ঞেই সব যজ্ঞের ফল লাভ হয়।’ সমাগত সব পণ্ডিত রমেশ শান্ত্রীর এই মতে সমর্থন দিলেন।

সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে রাজবাড়ির মূল ফটকের কাছেই স্থাপন করা হল বেদী। সেখানেই আয়োজন হল মহাযজ্ঞের। তাঁর পাশেই তৎকালীন তাহিরপুরের রাজা, রাজা কংস নারায়ণ নির্মাণ করলেন মন্দির। সম্রাট আকবরের আমলে বাংলার ‘বারো ভুঁইয়া’র এক ভুঁইয়া। পাঠান আমলে তিনি ছিলেন ফৌজদারের ভূমিকায়। রাজা কংস নারায়ণই বাংলায় শারদোৎসবকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন সর্বসাধারণ কাছে। এর আগে বাংলায় মহাশক্তির আরাধনা করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু এই প্রথম কোনো রাজবাড়িতে আয়োজন হল দুর্গাপুজোর। সেই পুজো ছিল দেখবার মতই। আয়োজন এবং আড়ম্বরে সামান্য সমান ফাঁক থাকলেও চলবে না।
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজা কংস নারায়ণ সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন করলেন। উৎসবটি হয়েছিল বারনই নদের পূর্ব তীরে রামরামা গ্রামের দুর্গামন্দিরে। আজও বাঙালির সর্বজনীন দুর্গোৎসবে সেই পদ্ধতিই অনুসৃত হচ্ছে। তবে কংস নারায়ণের পরবর্তী চতুর্থ পুরুষ লক্ষ্মী নারায়ণের সময় সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছোট ভাই বাংলার সুবেদার শাহ সুজা বারনই নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত রাজা কংসের প্রাসাদ ধ্বংস করে দিয়ে যান।

পরে অবশ্য লক্ষ্মী নারায়ণ আওরঙ্গজেবের অনুকম্পায় নদীর পশ্চিম তীরে একটি পরগনা লাভ করেন। সেখানেই রাজবাড়ি নির্মাণ করে রাজত্ব করেন। ১৮৬২ সালে রাজা বীরেশ্বর রায়ের স্ত্রী রানী জয় সুন্দরী রাজবাড়ির সঙ্গে একটি দুর্গামন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের নামফলকটি বর্তমানে রাজশাহীতে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

কংস নারায়ণের পরবর্তী চতুর্থ রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ রায়ের আমলে রাজবাড়িতে হামলা করে বাংলার সুবেদার শাহ সুজার সৈন্য দল। তখন দিল্লির মসনদে ঔরঙ্গজেবের শাসন। শাহ সুজার আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায় রাজা কংস নারায়ণের আদি রাজপ্রাসাদ। ১৮৬২তে পরবর্তী রাজা বীরেশ্বর রায়ের স্ত্রী জয় সুন্দরী দেবী পুনরায় নতুন করে নির্মাণ করেন রাজবাড়ি সহ দুর্গা মন্দির। মন্দিরের সঙ্গে নির্মিত হলো নামফলক। বর্তমানে সেটি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সুরক্ষিত। বারনই নদের তীরে অবস্থিত এই রাজপ্রাসাদও এককালে পরিত্যক্ত হয়। রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন শিব শেখরেশ্বর রায়। যদিও তাঁর পিতা শশী শেখরেশ্বর রায়ের সময় থেকেই রাজ পরিবারের লোকেরা কলকাতায় তৈরী করেন তাঁদের নতুন ঠিকানা। একসময় তাঁরাও তাহিরপুর রাজবাড়ীতে যাতায়াত বন্ধ করে দেন। এই তাহিরপুরই আজ লোকমুখে তাহেরপুর। ১৯৬৭তে রাজবাড়িটি তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজে পরিণত হয়। অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার অন্তর্গত বাগমারা উপজেলায় অবস্থিত তাহেরপুর। এখনও আছে এই দুর্গামন্দির। স্থানীয় সংসদ এনামুল হকের উদ্যোগে প্রায় ২২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হয় মন্দির পুনঃনির্মাণের কাজ। এই মন্দিরেই সূচনা হয়েছিল বাঙালির সেরা দুর্গোৎসব। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির সংস্কৃতি ও ইতিহাস। যে ইতিহাস কখনো পুরনো হওয়ার নয়!
তথ্য সূত্র : দেবোত্তম চক্রবর্তী, মা যা ছিলেন, মা যাহা হইলেন, বঙ্গভিটা
ধন্যবাদ আপনাকে।