ধর্মান্ধতার রাজনীতি যখন সারা দেশে মানুষের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তোলার চেষ্টা করছে, তখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখার অক্লান্ত প্রচেষ্টা করছে বাড়ির পুজো থেকে বারোয়ারীর আয়োজন। হোক সে হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ উৎসব কিন্তু জাত-ধর্ম আবার কী! হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে মেতে ওঠেন দুর্গাপুজোর আয়োজনে।
প্রায় আড়াইশো বছর আগে উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর পুরাতন পল্লীর মন্ডল পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল পরিবারের সদস্য রাধাকান্ত মন্ডলের হাত ধরে। প্রথমবার পুজোর প্রতিমার কাঠামো তৈরি করেছিলেন মহম্মদ শফিক। তিনি নিজে ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলে কী হবে? দুর্গা পুজো বা উৎসবের তো কোনো আলাদা ধর্ম হয় না! কোনো আলাদা জাতও সেখানে বিষয় নয়। আসল কথা প্রত্যেকের অংশগ্রহণ। তখন সেই ভাবনাকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন মন্ডল পরিবারের সদস্যরা। আর তাতেই উদ্বুদ্ধ হয়ে মহম্মদ শফিক তৈরি করেন দেবী দুর্গার কাঠামো।ইসলামপুর পুরাতন পল্লীর মন্ডল পরিবারের দুর্গাপুজোতে অটুট রয়েছে সাবেকিয়ানা। জাঁকজমক পুজোতে উপস্থিত থাকেন হিন্দু, মুসলিম, বাঙালি, অবাঙালি সকল সম্প্রদায়ের মানুষজন। একচালাতেই বানানো হয় সপরিবার দুর্গার প্রতিমা। চার দিনের দুর্গা পুজোর কাজে হাত বাড়ান মুসলিম থেকে অবাঙালি ভাই-বোনেরাও।

সম্প্রীতির আরেকটি চিত্র দেখা যায় রঘুনাথগঞ্জের জোতকমল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কোদা খাকি দুর্গাপুজোয়। এই বাড়িতে রীতি মেনে আজও মুসলিম পরিবারের দেওয়া ভোগ সবার প্রথমে দেবীকে উৎসর্গ করা হয়। তারপর অন্যরা ভোগ উৎসর্গ করেন। শুধু মাত্র ভোগ নয়, রীতি মেনে আজও মুসলিম পরিবার থেকে দেবীকে সিদূর, শাখা ও সাদা লাল পাড় শাড়ি দেওয়া হয়। কোদার চাল থেকে এই পুজোর ভোগ হয় বলে এ বাড়ির পুজো ‘কোদা খাকি দুর্গা’ নামে পরিচিত। আজও দেবীর ভোগে অন্যতম কোদার ভোগ থাকে। প্রতিবছর বাংলাদেশ-কলকাতা বা বর্ধমান থেকে কেউ-না-কেউ কোদার চাল পাঠিয়ে দেন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে। পুজোয় চারটে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। একচালার মূর্তি। সাড়ে পাঁচশো বছর পেরিয়ে যাওয়া পুজোর কটা দিন সব সম্প্রদায়ের মানুষ মেতে ওঠেন আনন্দে।

শ্রীরামপুরের চাতরায় ভট্টাচার্যদের বাড়ি রাজা রামমোহন রায়ের মাতুলালয়। উত্তর ২৪ পরগণার আমডাঙার আদাহাটার জমিদার ছিলেন এই ভট্টাচার্যরা। ধর্মে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও জমিদারবাড়ির পুজোয় তাঁরাই নিয়ে আসতেন পুজোর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। জমিদারি ঘুচেছে বহুকাল আগে। তাই জমিদারির রমরমা এখন আর নেই। চাতরার ভট্টাচার্যদের বাড়ির দুর্গাপুজোতে নেই সেই আগেকার জৌলুস। তবুও রয়ে গেছে সেই ফেলে আসা সাবেকিয়ানা। তাই আমডাঙা থেকে আজও সেই সময়কার মুসলমান প্রজাদের বংশধরেরা পুজোর সামগ্রী নিয়ে যান শ্রীরামপুরের চাতরায় ভট্টাচার্যদের বাড়িতে। তখন গ্রামের মুসলমান প্রজারাই জমিদারদের বাড়ির পুজোর খরচ বহন করতেন। এর পরে আদাহাটার জমিদারদের বংশধরেরা যখন থেকে চাতরায় বসবাস শুরু করেন, তাদের বাড়ির পুজোও রীতি মেনে চলতে থাকে। পাশাপাশি মুসলমান প্রজাদের বংশধরেরাও তাঁদের কর্তব্য পালন করে চলেন। চারশো বছরের প্রাচীন পুজোয় যে রীতি পালিত হচ্ছে সেটা বাদ দিলেও হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রিতি যে আজও বজায় রয়েছে তা আজকের সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে ভীষণ প্রাসঙ্গিক। কালের গ্রাসে মানুষ সবই হারায়। রয়ে যায় ইতিহাস, সাবেক ঐতিহ্য। তার চেয়েও বড় কথা ধর্মীয় সম্প্রীতিহারিয়ে যায় নি।

ভিন্ন দুই ধর্মের সম্প্রীতির আরেকটি উজ্জ্বল ছবির দেখা মেলে চাচল রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমার বিসর্জনের দিন সন্ধ্যায়। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে পুরনো চাচোলের রাজবাড়িতে দুর্গা পুজো হয়ে আসছে অষ্টধাতুর তইরি চন্ডীরূপী মূর্তিতে। এর সঙ্গে বিকল্প হিসাবে দেবী দুর্গার আর একটি মাটির মূর্তিও তৈরি করা হয়। পুজোর অন্যান্য রীতির সঙ্গে দশমীর দিন দেবীদুর্গাকে বিসর্জন দেওয়া হয়চাচোল মহকুমার পাহাড়পুর এলাকার মহানন্দা নদীর পশ্চিমপাড়ে সতীঘাট নামে জলাশয়ে।ওইদিন যখন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকেন, ঠিক সেই সময় লণ্ঠনের আলোয় গোটা জলাশয়টিকে আলোকিত করে তোলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। যতক্ষণ পর্যন্ত ওই সম্প্রদায়ের পুরুষ- মহিলাদের লন্ঠনের আলোয় গোটাপুকুর আলোকিত না হচ্ছে, ততক্ষণ দেবী দুর্গা বিসর্জিত হবে না।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বাস্তব ছবিকে রীতিমতো চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় সাঁইথিয়ার বলাইচণ্ডী গ্রাম।বেশ কিছুকাল ওই গ্রামে বাস করছে প্রায় ১১০টি মুসলমান পরিবারের কিন্তু নেই একটি ঘরও হিন্দু। গ্রামটি যে জমিদারের অধীনে ছিল তিনি ওই গ্রামে দেবী দুর্গার শিলামূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেই দেবী প্রতিমা আগলে রেখেছেন ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীরাই। বার্ষিক উৎসবের পাশাপাশি নিত্যপুজো গ্রামের মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরাই করে আসছেন। গোটা উপমহাদেশ জুড়ে যখন ধর্মীয় ভেদাভেদে আমরা আতঙ্কিত, তার মধ্যেও কিছু মানুষযে এমন এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে নিজেদের আবদ্ধ করেছেন, সেটাই আশার কথা।
কভারের ছবি চয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়