হুগলি ও হাওড়াতে মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করল প্রশাসন। গত প্রায় দু-সপ্তাহ ধরে দামোদর উপত্যকা ও নিম্ন দামোদর এলাকায় গভীর নিম্নচাপের বৃষ্টির ফলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হুগলি, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার প্রশাসনকে সতর্ক করল নবান্ন। প্রতিটি জেলাস্তরে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। প্রত্যেক বন্যা অধ্যূষিত এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলেছে প্রশাসনিক কর্তা-ব্যক্তিরা।
প্রসঙ্গত, নবান্নে মুখ্যসচিব ইতিমধ্যে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সাত জেলার প্রশাসনিক কর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরকে তৈরি থাকতে বলা হয়েছে। এব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রশাসনিক কর্তাদের। নবান্ন ও প্রতিটি ব্লকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ঝাড়খণ্ডে গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টির জল মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার হয়ে ডিভিসি-তে জমা হচ্ছে। ডিভিসি অতিরিক্ত জল ছাড়ায় নিম্ন দামোদর এলাকায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সূত্রের খবর, ডিভিসি ইতিমধ্যে ১ লক্ষ কিউসেক জল ছেড়েছে। সেই জলে দামোদর, মুণ্ডেশ্বরী ও শাখা নদীগুলোর জল বাড়তে শুরু করেছে। বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে হুগলির আরামবাগ ও খানাকুলের বিস্তীর্ণ এলাকা। হাওড়ার আমতা ও উদয়নারায়ণপুরে বন্যার জলে ডুবতে পারে। একইভাবে পূর্ব মেদিনীপুর ও পূর্ব বর্ধমান জেলার বেশ কিছু এলাকা বন্যার জলে প্লাবিত হতে পারে।
এদিকে জেলার প্রশাসনিক কর্তারা বন্যা অধ্যূষিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ত্রান সামগ্রী মজুত করেছে। তাছাড়া বন্যা বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের উদ্ধারকারী দলকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে ডিভিসি সব মিলিয়ে এখনো পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৩০ হাজার কিউসেক জল ছেড়েছে। জারি করা হয়েছে হলুদ সতর্কতা। জল ছাড়ার পরিমাণ মাইথন থেকে ৫৫ হাজার কিউসেক এবং পাঞ্চেত থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক। আজ সকালে মাইথন জলাধার থেকে ৪৫ হাজার কিউসেক এবং পাঞ্চেত জলাধার থেকে ৫৫ হাজার কিউসেক জল ছাড়ার পরই ডিভিসি কর্তৃপক্ষ মোট ১ লাখ কিউসেক জল ছাড়ে। ফলে নিম্ন দামোদর এলাকায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, প্রথম দফাতেই ১ লক্ষ কিউসেক জল ছাড়ল। পর্যায়ক্রমে না ছেড়ে প্রতি বছর ঠিক একই কায়দায় জল ছাড়ার কায়দা ধরে রেখেছে ডিভিসি। এটাকে মেনে নিতে পারছেন না মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এটাকে ‘ম্যানমেড বন্যা’ বলেই মনে করছেন । ‘ম্যান-মেড বন্যা’, এই শব্দবন্ধনটিরও ২১ বছর পূর্ণ হল। বাম আমল কিম্বা তৃণমূল-জমানা, শাসক বদলালেও, ফিরে আসে ‘ম্যান-মেড বন্যা’র তত্ত্ব। এখন থেকে দু’দশক আগে ২০০০ সালে এই বাংলায় যখন প্রবল বন্যা হয়েছিল, তখনই প্রথম ‘ম্যান-মেড বন্যা’র তত্ত্বটি নামিয়েছিলেন মমতা। সেদিন তাঁর আক্রমণের তির ছিল রাজ্যের শাসক বাম সরকারের বিরুদ্ধে। কখনও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, কখনও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারকে কটাক্ষ করেছেন এই শব্দে। তাঁর তত্ত্ব, প্রকৃতি নয়, সরকারের গাফিলতির কারণে এই বন্যা। সরকারকে দায়ী করে বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ‘ম্যান-মেড’ বন্যা। আসলে মমতা বলতে চেয়েছিলেন সরকার যথা সময়ে মেজার নেয়নি, তাই এই বন্যা।
প্রসঙ্গত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালের জুলাইতে জলে ভেসেছিল হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর। তখনও ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে বন্যা পরিস্থিতিকে ‘ম্যান-মেড’ বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। বাম আমলেও তাঁর এই শব্দবন্ধনের জন্য কটাক্ষ ও রসিকতা শুরু হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এবারও সরকারি ভাবে মমতা সেই অভিযোগ করলেন। আঙুল তুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দিকে। এবারও ডিভিসি বিপুল পরিমাণ জল ছাড়াতেই হাওড়া, হুগলি, দুই বর্ধমান, দুই মেদিনীপুর বীরভূমে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন তাঁর আক্রমণের তির দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন বা ডিভিসি। এ যেন ‘ডোবানো ভাসানো কর্পোরেশন’। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ডিভিসি বিপুল পরিমাণ জল ছাড়ার কারণেই বছরের পর বছর ম্যান-মেড বন্যা হচ্ছে রাজ্যে।
উল্লেখ্য, ২০১৫, ২০১৭, ২০১৯ সালের পর এবছরও গুরুতর বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে রাজ্যে। এর আগেও এইরকম পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগকে মান্যতা দিয়েছে ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রীর দফতর (পিএমও) থেকে টুইট করে প্রায় স্বীকার করেও নেওয়া হয়েছিল, জল ছাড়ার জন্যই দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলে ভাসছে। ডিভিসি অভূতপূর্ব পরিমাণে জল ছাড়ায় ম্যান-মেড বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাজ্যের কয়েকটি জেলায়। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী মোট ২ লক্ষ কিউসেক জল ছেড়েছে ডিভিসি। তার জেরে সাতটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। যদিও ডিভিসি কর্তৃপক্ষ বলছে অগ্রিম জানিয়েই জল ছাড়া হয়েছে। এই চাপানউতোর নতুন নয়। এই পরস্পর বিরোধী কথা রাজ্যবাসীকে শুনতে হয়েছে বার বার।

আসল ব্যামোটা হলো প্রতিবারই বন্যা হলে ওঠে জলাধার সংস্কারের দাবি। এবারও তার ব্যতিক্রম হবেনা। বাঁধগুলির উপযুক্ত সংস্কার, পলি তোলা, আধুনিকীকরণ। অথচ একাধিকবার কেন্দ্রীয় সরকার ও ডিভিসিকে বললেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। ডিভিসি-র ড্যামগুলির জলধারণ ক্ষমতা ১.২ লাখ কিউসেক বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে এখনও কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ডিভিসি-র পুরনো পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাইথনের আধুনিকীকরণের জন্য ঝাড়খণ্ডের বেলপাহাড়িতে ষষ্ঠ ড্যাম তৈরির বিষয়টিও কার্যকর হয়নি। ডিভিসি-র এই অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার জন্য বছরের পর বছর রাজ্যকে বন্যায় ভুগতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণে ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে যে সব বাঁধ রয়েছে, সেগুলিও দীর্ঘ দিনের পুরনো ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার হয়নি। ডিভিসি-র জলাধারগুলিতে পলি জমে বাঁধের ধারণক্ষমতা ভীষণ ভাবে কমে গিয়েছে৷ এই টেকনিক্যাল অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেনি ডিভিসি। তাদের বক্তব্য, জলাধারের পলি পরিষ্কার করতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। অন্যদিকে, নতুন বাঁধ তৈরি করতে খরচ ১০ হাজার কোটি টাকা৷ তা ছাড়া, ড্রেজিং করে পলি রাখার জন্য চাই বিরাট জমি। তা-ও নেই ডিভিসি-র হাতে। তবুও যখনই রাজ্য খুব চেঁচামেচি করে, তখনই ডিভিসি আশ্বাস দেয় তাদের অধীনস্থ জলাধারগুলির ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শীঘ্রই সমীক্ষা শুরু হবে। তারপর সবই সেই ‘গোলেমালে হরিবোল’ হয়ে যায়।
বিপুল ব্যয় জোগাবে কে? এই প্রশ্নই এখন সকলের মুখে। ডিভিসি-র বক্তব্য অনুযায়ী, বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি তাদের হাতে নেই। অন্যদিকে, তারা মেনে নিয়েছে যে বাঁধগুলির জল যে পথে বেরোয়, ডিভিসি-র সেই সেচ খাল এবং জলাধারের সঙ্গে যুক্ত নদীগুলিতেও পলি জমে জল ধারণ ক্ষমতা কমেছে। তারা এই অবস্থায় যতটা সম্ভব জল ধরে রেখেছে। কিন্তু গত কয়েক দিনে বৃষ্টি ছাড়াও সর্বাধিক একদিনে ১ লক্ষ ১৪ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে৷ যুক্তি, বাঁধ থেকে ছাড়া জলের সঙ্গে বৃষ্টির অতিরিক্ত জল যুক্ত হয়েই বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷
কোনও কোনও বিশেষজ্ঞের মতে, ডিভিসি-র লক্ষ্য শিফট হয়েছে। প্রথম দিকে ডিভিসির মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বনসৃজন ও সর্বোপরি ডিভিসি প্রকল্পের আওতাধীন অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষজনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। কিন্তু গত কয়েক দশকে রাষ্ট্রের সমাজকল্যাণ চরিত্র বদলের সঙ্গে ডিভিসি-র চরিত্রেও বদল হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ডিভিসিতে অত্যধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচব্যবস্থায় সংস্থার আগ্রহ কমে গিয়েছে। এর সঙ্গে বিপুল খরচের অজুহাতে সরকারও ডিভিসি-র জলাধারগুলির পলি পরিষ্কারে গা করছে না। কেননা, এই ব্যয় বাজার অর্থনীতির চোখে কোনও ডিভিডেন্ড দেবে না। ফলে ফি বছর বাংলার মানুষ ভাসবেন আর ‘ম্যান-মেড বন্যা’ উক্তিটির বর্ষপূর্তি হবে।