নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের ভূমিপুত্র কবি সাহিত্যিক নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মোৎসবের অনুষ্ঠানে তাঁর শহরে ‘দ্বিজেন্দ্রলাল রায়’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হলো। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনকালে (১৮৬৩-১৯১৩ খ্রি.) যে বিপুল সাহিত্য-সম্পদ রচনা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন, তা রীতিমতো বিস্মিত করে। ২০২৪ সালে রাজ্যজুড়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ১৬২তম জন্মদিবস পালিত হলো। তাঁর জন্মভূমি কৃষ্ণনগরে ফি-বছর এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করা হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। শহরের একাধিক সংগঠন বিভিন্ন জায়গায় এদিন দ্বিজেন্দ্র জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল। কৃষ্ণনগর পৌরসভার দ্বিজেন্দ্র সভাকক্ষে ৪ শ্রাবণ, ১৪৩১ (২০ জুলাই, ২০২৪) সন্ধ্যায় ‘সেন্ট্রাল ক্লাব’ ও ‘তারকনাথ সরকার মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর পরিচালনায় দ্বিজেন্দ্র জন্মোৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে লেখক সম্পদনারায়ণ ধরের ‘দ্বিজেন্দ্রলাল রায়’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায়। এই গ্রন্থের প্রকাশক গেটওয়ে পাবলিশিং হাউস (হাবড়া, উত্তর চব্বিশ পরগনা)। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন দীপাঞ্জন দে ও সৌরভ ধর। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ১৬২তম জন্মদিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে বইটির আবরণ উন্মোচন করেন ‘মুদ্রা’ পত্রিকার সম্পাদক শৈবাল সরকার। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী আকাশ দত্ত।

দ্বিজেন্দ্র জন্মোৎসবের এই অনুষ্ঠানে ‘উন্মেষ’ সংস্থার পক্ষ থেকে বাচ্চার মায়েরা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানে দলগত নৃত্য পরিবেশন করেন। এদিন শহরের একাধিক বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী দ্বিজেন্দ্রগীতি পরিবেশন করেন। প্রদ্যুৎ হালদার, তপলব্ধা ভট্টাচার্য, দিলীপ বিশ্বাস, সুস্মিতা দত্ত, স্বপন সরকার প্রমুখের কণ্ঠে দ্বিজেন্দ্রগীতি শোনা যায়।দ্বিজেন্দ্র জন্মোৎসবের এই অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ইতিপূর্বে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মদিন উপলক্ষে যে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে স্থানাধিকারী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার প্রদান।

গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় লেখক সম্পদনারায়ণ ধর এদিন প্রয়াত সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, “২০১২-২০১৩ সালে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মসার্ধশতবর্ষের সময় তাঁকে নিয়ে লেখার দায়িত্ব সুধীর চক্রবর্তীর কাছ থেকেই তিনি প্রথম পেয়েছিলেন। তাই এই গ্রন্থ নির্মাণের ভাবনা-চিন্তার প্রাথমিক পর্যায়ে সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তী ছিলেন প্রধান প্রেরণা। আর ২০২৪ সালে এই গ্রন্থটির পরিবর্ধিত সংস্করণ নতুন কলেবরে আত্মপ্রকাশের জন্য বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন দীপাঞ্জন দে”।

লেখক সম্পদনারায়ণ ধরের জন্ম ১৯৪৬ সালে, অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে। তাঁর বর্তমান নিবাস নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। তিনি কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বি.এ. (অনার্স) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. ও এল.এল.বি. ডিগ্রী অর্জন করেন। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ছাত্র ও আজীবন সদস্য। পেশাগত পরিচয় অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। তিনি একজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবেও পরিচিত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লেখেন। বর্তমানে একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত। কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘মুক্তধারা’-র অন্যতম আহ্বায়ক তিনি। ‘দ্বিজেন্দ্রলাল রায়’ গ্রন্থটি তাঁর চতুর্থ গ্রন্থ। ইতিপূর্বে তাঁর তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে— ‘শহীদ বসন্তকুমার বিশ্বাস ও দিল্লী-লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা’ (প্রকাশক: কালীনগর কো-অপারেটিভ কলোনী এন্ড ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেড, ২০১১), ‘জন্ম সার্ধশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়’ (প্রকাশক: নদিয়া জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ, জুলাই ২০১৩) এবং রামকৃষ্ণ দে ও দীপাঞ্জন দে-র সঙ্গে যৌথ সম্পাদনায় ‘অশোককুমার ভাদুড়ী : স্মরণে-মননে’ (প্রকাশক: মুক্তধারা, ২০২৩)।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মসার্ধশতবর্ষের সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে পুস্তিকাকারে গ্রন্থটি প্রকাশ পেয়েছিল। তখন গ্রন্থ প্রকাশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল ‘নদিয়া জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ’। আর নদিয়া জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের তৎকালীন চেয়ারম্যান অর্চনা ঘোষ সরকার সেখানে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই বছর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ১৬২তম জন্মদিবসে লেখক সম্পদনারায়ণ ধর নতুন মোড়কে স্বতন্ত্রভাবে ‘দ্বিজেন্দ্রলাল রায়’ গ্রন্থটি পাঠকদের উপহার দিলেন। গ্রন্থটিতে দ্বিজেন্দ্রলাল সমগ্র জীবন সহজ ভাষায় সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দুটি পরিশিষ্ট অংশ যুক্ত। প্রকাশক গ্রন্থটির মুদ্রিত মূল্য রেখেছেন ১২৫ টাকা। গ্রন্থ প্রকাশের দিন আগ্রহীরা একশো টাকায় বইটি সংগ্রহ করেন। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তীকে।
লেখক: আঞ্চলিক ইতিহাসকার, নদিয়া।