দূরদর্শন তখন এতটা জাঁকিয়ে বসে নি। পাড়ায় যারা রাইস আদমি তাদের ঘরেই একমাত্র টিভি আছে। দূরদর্শনে তখন কমই খেলা দেখানো হতো। বিশেষ বিশেষ খেলা ছাড়া দেখানো হতে না। তবে লিগের খেলা ধারাভাষ্য ছাড়া কিছুই হতো না। তখন বার ক্লাসে। যথেষ্ট বড়ো। ঠোঁটের ওপর হাল্কা গোঁফের রেখা। কিন্তু পাড়ার কিংবা মাঠের লোকেদের কাছে আমরা তখনও বাচ্চা ছেলে। নাক টিপলে দুধ বেরয় গোছের অবস্থা। ফলে মোহনবাগান মাঠে লাইন দিয়েও টিকিট পাই নি। অগত্যা রেম্পাট। গোঁতাগুঁতি, ধাক্কাধাক্কি, মাউন্টেন পুলিসের তাড়া আরো কত কিছু। তবু খেলা দেখতে হবে।
বেশ মনে পড়ে— ১৯৭৮ সালের ৬ই আগস্ট, আজকের দিনে। কলকাতা লীগের বড় ম্যাচে শ্যাম থাপা অসাধারণ ব্যাকভলিতে গোল করলেন। যে গোলের বর্ণনা পরের দিন মতি নন্দী আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছিলেন এইভাবে—
“ডান দিক থেকে সুভাষ শরীরটাকে দোলাতে দোলাতে বল নিয়ে এগোচ্ছে সত্যজিৎকে সঙ্গে নিয়ে। ডাইনে না বাঁয়ে, কোনদিক দিয়ে যে সুভাষ এগিয়ে যাবে সত্যজিৎ বুঝতে পারছে না। সে একবার ডাইনে একবার বামে নিজেকে ঝোঁকাল এবং সেইখানেই সুভাষের কাছে হেরে গেল সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় নষ্ট করে। সুভাষ গোললাইন পর্যন্ত বল এনে নিয়মমাফিক গোলমুখে বল পাঠাল। মাথা সমান নিখুঁত উচ্চতায় যখন বল যাচ্ছে তখন মনোরঞ্জন বলের গমনপথে কপাল এগিয়ে দিল। বল ভালভাবে লাগল না ওর কপালে। ছুঁয়ে গেল মাত্র, তবে একটু বদলাল। এবং সেইটাই সর্বনাশ ডেকে আনল ইস্টবেঙ্গলের। সেই বল পড়ল শিকারের গন্ধে এগিয়ে আসা হাবিবের মাথায়। হাবিব হেড করে এগিয়ে দিল সামনে, গোলের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামকে।
বল আলতো হয়ে মাথার ওপর আসছে, এবং পেছনে গোল। এবার কি করা? বলটা ধরে তারপর শরীরটাকে ঘুরিয়ে গোলে শট নেওয়া? ওতে দু সেকেন্ড সময় নষ্ট হবে। ফুটবলে আদত ব্যাপারই তো সময়ের এবং জায়গার ব্যবহার। তাহলে? পলকের চিন্তা এবং সেই অনুযায়ী কাজ। দেখা গেলো জোয়ারের টানে সাগরের ঢেউ যেভাবে পাকিয়ে ফুঁসে ওঠে এবং ঢেউয়ের মাথায় ঝকমকিয়ে জ্বলে ওঠে হিরের দ্যুতি, সেইভাবে ফুলে উঠলো মেরুন-সবুজ একটা ঢেউ আকাশের দিকে মুখ করে আর তার মাথার উপরে ঠিকরে উঠল একটা পা। এমন নিখুঁত বাইসাইকেল কিক্ শ্যামের কাছ থেকে, আমি কখনো দেখিনি।”
সেদিন কিন্তু এই ম্যাচটাকে ঘিরে বেশ ভালো একটা নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। ঘটনাটা এরকম—
কোন এক জ্যোতিষীর বানীতে তুলকালাম ময়দান। যারা আগে মাঠে নামবে তারাই হারবে। ব্যাশ দুই দলের কর্মকর্তা এবং কোচ বেঁকে বসলেন, তাল দিলেন খেলোয়াড়রাও। কেউ আর আগে মাঠে নামতে চায় না।
কারা মাঠে আগে নামবে তাই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। কেউ রাজি নয় আগে নামতে। পুলিশ কমিশনার, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি থেকে অনেকে এসে অনুরোধ করলেন পি.কে ব্যানার্জিকে। কিন্তু পি.কে-র সাফ কথা, ‘বারবার কেন আমাদের স্যাক্রিফাইস করতে হবে?’। ইস্টবেঙ্গল শিবিরের যুক্তি খেলা মোহনবাগান মাঠে হচ্ছে তাই মোহনবাগানকে আগে নামতে হবে। মোহনবাগানের পাল্টা যুক্তি লিগের ম্যাচে হোম-অ্যাওয়ে বলে কিছু হয় না আর ম্যাচের জায়গা তো আই এফ এ ঠিক করেছে।
সাড়ে চারটে বাজে প্রায়। আকবর একবার টেন্টের দিকে হাঁটা দিল। সবাই তাঁকে থামাল হই হই করে। প্রদীপ চৌধুরী, সুব্রতরা মাঝেমাঝে লাফালাফি করে গা ঘামিয়ে নিচ্ছে। সুব্রত, প্রসূণের কানে কানে কিছু একটা বলল। কিন্তু খেলা কি হবে? সুভাষ ভৌমিক পি.কে-কে বললো, ‘আপনি কিছুতেই ওদের কথা শুনবেন না। সবসময় ওদের জেদই বা থাকবে কেন?’
হঠাৎ প্রসূণ ইস্টবেঙ্গল শিবিরের দিকে দৌড় লাগাল।
—’কোথায় যাচ্ছিস?’
প্রসূনের উত্তর— ‘যাই, সুরজিৎকে ডেকে আনি’।
শেষ পর্যন্ত দুই অধিনায়ক একসাথে মাঠে নামল। তাঁদের পিছনে দুই দলের সমস্ত খেলোয়াড়।
পরের দিন পেপারে লেখা হয়েছিল, ‘সুরজিৎ কি আগে মাঠে পা ফেলেছিল?’
শ্যামের মোহন বাঁশিতে মীমাংসা হয়ে গেল লড়াইয়ের। জ্যোতিষী ফেল। বলেছিল যে দল আগে মাঠে নামবে তাঁরাই হারবে। দুই দল একসাথে মাঠে নেমেছে। কিন্তু ম্যাচ ড্র হয়নি। খেলার শেষে কলকাতার কিছু অঞ্চলের ছবি তুলে ধরেছিল ‘খেলার আসর’ পত্রিকা।
“একটু আগে শ্যামের ভলি যাবতীয় কল্পনার অবসান ঘটিয়েছে। সন্ধে ৭-১৫। গড়িয়াহাটের মোড়ে কিছু যুবক নিভৃতে মাথা নিচু করে বসে আছে। চোয়াল ঝুলে পড়েছে। একটু দূরে লাল হলুদ পতাকা অন্ধকারে বাতাসে দোল খাচ্ছে। মোহনবাগানের পতাকা নিয়ে কয়েকটি যুবক শ্যামের নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে গেল। গড়িয়াহাট বাজারে বরফ না দেওয়া গঙ্গার ইলিশ থরে থরে সাজানো, দাম ২২ টাকা কেজি। ছোট বাগদা চিংড়ি ২৫ টাকা। আজ সন্ধ্যায় সেই কুলিন।
দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ে রোগাপাতলা চেহারার সুশান্ত দাস বড় এক ঠোঙা চকোলেট বোম ফাটিয়ে চলেছে একের পর এক। এক প্রৌড়াকে লক্ষ্য করে একজন বলল, ‘মাসীমা, শ্যাম আমাদের মান রেখেছে’। প্রৌড়ার চটপটে জবাব, ‘রাখে শ্যাম মারে কে?’।
রাসবিহারীর কাছে দেখা গেল চেতলার দিক থেকে তাসা পার্টির সঙ্গে নৃত্যরত একদল কিশোর একদল বালক, কিশোর, যুবকের মিছিল। টালিগঞ্জের দিক থেকে আর একটি মিছিল আসছিল। অচিরেই দুটি মিছিল মিলে গেল।
ঠেলা বোঝাই করে প্যাকিংবাক্স টেনে নিয়ে যাচ্ছিল রাম নারায়ণ দুবে। বাঙ্গাল-ঘটির ব্যাপারটা সে কিছুই বোঝে না। তাই তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া নেই বিশেষ। তাঁকে নিয়ে একজন ছড়া লিখে ফেলেছে,
ইস্টবেঙ্গল বাঙালদের আর মোহনবাগান ঘটির
এই নিয়ে তো লড়াই নিত্য দ্বন্দ্ব খিটির মিটির
রাম নারায়ণ দুবে, কোন দলে সে রবে।
ওয়েলিংটনের মোড়ে একটা ট্যাক্সিতে প্রায় জনা দশেক ছেলে, হাতে ফুলের মালা আর ছোট ছোট সবুজ মেরুন পতাকা। জয়ধ্বনি করতে করতে এগোচ্ছে।
চাঁপাতলা বারোয়ারী সংঘ পথের মাঝখানে নৌকা করেছে প্রিয় ক্লাবের রঙে। বউবাজার ষ্ট্রীটে বিরাট গ্যাস বেলুনের সাথে বাঁধা শ্যাম যেন মহাকাশযাত্রী। হিদারাম ব্যানার্জি লেনের মুখে সারবাঁধা কচু শাকের মধ্যে একটি খোকা ইলিশ দোল খাচ্ছে। ব্যঞ্জনাটা খুবই স্পষ্ট।
রাত বাড়ছে। মাইক্রোফোনে হিন্দি গান বাজছে। প্রতিটি পাড়া থেকে মিছিল বেরোচ্ছে।”
ঋণ স্বীকার মোহনবাগান লাইব্রেরী।