বাঁচতে হলে প্রকৃতির সৃষ্টিকে অবলুপ্ত না করে সেটাকে টিকিয়ে রাখা মানুষের কর্তব্য। এই কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হলে সমূহ বিপদ। এই কথাটি বুঝেছিলেন ‘লুক হফম্যান’ খেতাব জয়ী ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। একজন ইকোলজিস্ট হিসেবে কলকাতার সভ্যতাকে কীভাবে বাঁচানো যায় সেই ভাবনাতেই তিনি ব্রতী ছিলেন বরাবর। আর বাঁচানোর পথটিই জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন। কী সেই পথ? কলকাতা তথা গোটা বিশ্বকে নিয়ে আধুনিক পরিবেশ চিন্তার বার্তা। বিশ্বজুড়ে জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিমণ্ডল ও আর্থিক উপকারিতার গুরুত্ব কতটা, তা নিয়েই ধ্রুবজ্যোতিবাবু কলকাতার নাগরিকদের আগাম সতর্ক করতে চেয়ে ছিলেন। নগর সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে কলকাতার জলাভূমি ও পতিতভূমিকে রক্ষা করতে হবে। যা মানুষের কাছে অমূল্য সম্পদ। এই জলাভূমি ও পতিতভূমিকে ঠিকভাবে লালন বা রক্ষা করতে পারলে কলকাতা নগরের মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধি অটুট থাকবে। আর এটাকে ধ্বংস করলে জবাই হবে ডিমপাড়া সোনার হাঁস। বর্তমানে যেভাবে কলকাতা জুড়ে জলাভূমি ও পতিতভূমি ভরাট করে প্রমোটাররা রাতারাতি অট্টালিকা নির্মাণ করছে, তাতে নগর কলকাতার সভ্যতা টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।

মনে রাখতে হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নগর সংলগ্ন জলাভূমি কলকাতাতে। যার সিংহভাগ পূর্ব কলকাতায়। এর আয়তন সাড়ে বারো হাজার হেক্টর। যেখানে বর্তমান সভ্যতার আড়ালে কিছু অর্থলোলুপ ধ্বংসকারী মানুষ কলকাতার মতো নগর সভ্যতাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। জলাভূমিকে নষ্ট করে রাতারাতি অট্টালিকা নির্মাণ করে ওই সমস্ত জায়গাতে নগরায়ণের ছোঁয়া এই সবুজের বুকে চাপিয়ে দিচ্ছে তারা। হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করতে গিয়ে সভ্যতাকেই ধ্বংস করে ফেলতে চাইছে। এখানেই কপালে চিন্তার ভাঁজ গবেষকদের।

লুক হফম্যান এই সমস্যাটাই বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, কলকাতাকে মানবশরীর ধরলে কিডনির রেচন পদার্থগুলো বাইরে বের করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার যেমন দরকার, ঠিক একইভাবে দরকার কলকাতার বর্জ্যগুলো নিকাশি ব্যবস্থার মাধ্যমে পতিত জলাভূমিতে ফেলা। এই জন্য প্রকৃতিই সৃষ্টি করছে ওই সমস্ত জলাভূমি ও পতিতভূমিগুলোকে। যাতে সবুজ বজায় রেখে কলকাতার পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখা যায়। ধ্রুবজ্যোতিবাবু গবেষণায় দেখিয়েছেন, জলাভূমির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান। সেখানে আর্থিক উন্নয়ণ, আর সামাজিক কল্যাণ অন্যভাবেও গড়ে তোলা যায়। যা সকলে এড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি বিশ্বের দরবারে কলকাতার মতো জলাভূমির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। উল্লেখ করেছেন পূর্ব কলকাতায় ২৫ হাজার পরিবারের বসবাস। এঁদের প্রয়োজনেই দরকার পরিবেশ ভাবনা। এজন্য জলাভূমিকে না ভরাট করে মাছ চাষ এবং পতিত জমিতে সবজি চাষ করা যেতেই পারে। তাতে উভয় জায়গারই নিজস্বতা বজায় থাকবে। সেই সঙ্গে নগর কলকাতার বর্জ্য জলও শোধিত ও নিষ্কাশিত হবে। এর ফলে কৃষক ও জেলে উভয়েই আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। সবকিছুই তাতে বজায় থাকবে।
প্রসঙ্গত, লুক হফম্যান অর্থাৎ ধ্রুবজ্যোতিবাবু চেয়েছিলেন কলকাতাকে বাঁচাতে, কিন্তু বতর্মান চিত্র পুরোপুরি বিপরীতে হাঁটছে। চিন্তিত আজকের গবেষকরা। লুক হফম্যানের চিন্তাধারার তোয়াক্কা না করেই আজকের প্রমোটাররা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করছে। কিন্তু এই তিলোত্তমা নগরী আস্তে আস্তে নীরবে ধ্বংসের দিকে হাঁটছে।

লুক হফম্যান যেটা করে গেছেন তাহল, তাঁর দীর্ঘ গবেষণায় ও একক প্রচেষ্টায় কলকাতার জলাভূমি ও পতিতভূমিকে সংরক্ষিত অঞ্চল বলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত রামসর সংগঠনের বিচারে বিশ্বের এক অগ্রগণ্য জলাভূমি হিসাবে পূর্ব কলকাতা স্থান পেয়েছে। যার ফলে এই সমস্ত জলাভূমি ও পতিতভূমিকে অটুট রেখে কাজ করতে হবে। যাতে তার সামান্যতম নিজস্বতা ক্ষুণ্ণ না হয়। তবেই অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্বের মিলনের এক চর্চা ক্ষেত্র গড়ে উঠবে নগর কলকাতায়। আর এই কথা না শুনলে খেসারত দিতে হবে নগর কলকাতার মানুষকে।

উল্লেখ্য, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথন উল্লেখ করে বলেছেন লুক হফম্যানের কলকাতার জলাভূমি নিয়ে যে গবেষণা তা হল ‘কল্যাণমুখী পরিবেশবিদ্যা’। অর্থাৎ ওয়েলফেয়ার ইকোলজি। ত্রাতার ভূমিকায় লুক হফম্যান অর্থাৎ আমাদের ঘরের মানুষ ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। চিরকাল মানুষ মনে রাখবেন তাঁকে। জলাভূমি ও পতিতভূমি নিয়ে ধ্রুবজ্যোতির মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারপতি উমেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ঐতিহাসিক রায়ে বলেছেন পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ও পতিতভূমিকে কেনাবেচা করা যাবে না। তার বাস্তুতন্ত্র অক্ষুন্ন রাখতে হবে। এই বেনজির রায়ের পরই গঠন হল ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি। এই অথরিটি দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যেভাবে দিনের দিন জলাভূমি ধ্বংস করছে তা উদ্বেগের। বাঁচতে হলে প্রকৃতির সৃষ্টিকে অবলুপ্ত না করে সেটাকেই টিকিয়ে রাখা মানুষের কর্তব্য। আর তা নাহলে নগর সভ্যতা অচিরেই ধ্বংস হবে। এমনটাই আশংকা গবেষকদের।