মা চন্ডিকার সহায়তায় রামচন্দ্র রাবণ বধ করে জয়ী হয়েছিলেন। শরৎকালে অসময়ে তিনি দুর্গাপূজা করেছিলেন, যা ‘অকালবোধন’ নামেও পরিচিত।
তখন বানরকূল ও অন্যান্যরা মিলে যে বিজয় উৎসব পালন করেছিলেন সেই থেকেই ‘বিজয়া’র সূত্রপাত। অর্থাৎ অশুভ শক্তিকে পরাভূত করে শুভ শক্তির জয়ের উৎসব – মধুরেণ সমাপয়েৎ’। মধু—মিষ্টিমুখ খাওয়া দাওয়া করা ছাড়া কোন আনন্দ উৎসব পূর্ণতা পায় না। পুজোর চারদিন পর নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে উমার বিদায় দুঃখের হলেও ‘আসছে বছর আবার হবে’ এই প্রতীক্ষার জন্যই দুর্গাপুজো এতটা স্পেশাল। স্পেশাল মুহূর্তগুলো সেলিব্রেশন করতে অর্থাৎবিসর্জনের পর বনেদি বাড়ি, পাড়ায় কিম্বা বাঙালির প্রত্যেক ঘরে চলে বিজয়া দশমীর পালা– মিষ্টি মুখ।

আমাদের আমলে বিজয় দশমী মানেই কুচো নিমকি, গজা আর গরম ঘুগনি বাধ্যতামূলক। সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন জিবে গজা, চন্দ্রপুলি, নারকেল নাড়ুর টি আর পি আজও কিছু কম নয়। এই একটা দিন
সুগার, প্রেসার, কোলেস্টেরলের লাল চোখকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একটু বেশি করে রসমুখ করার দিন। তাই রসমালাই, রসমাধুরী, রসকদম্ব, প্রাণহরা, জলভরা আর হাল ফ্যাশনের নানান ধরনের ফিউশন কিংবা চকলেট মিষ্টির আব্দার – সব মেনে নেওয়ার দিন দশমী। আর তার সঙ্গে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির কবিগানে মুখোমুখি কবিয়াল ভোলা ময়রার হাতে আবিষ্কৃত বাঙালির চিরন্তন হাসিমুখে অপরাজেয় প্রতীক রসগোল্লা আজও বাঙালিকে রসে বসে রাখার এক নম্বর প্রেফারেন্স।

কলকাতায় বনেদি বাবুদের মধ্যে মা দুর্গার মর্তে আগমন নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। দশভূজা মা শারদ প্রভাতে সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় পৌঁছে গিয়ে উঠতেন শহরের তৎকালীন অন্যতম ধনী বাবু শিবুকৃষ্ণ দাঁ মহাশয়ের বাড়িতে। খিচুড়ি পোলাও মিষ্টি ইত্যাদি দিয়ে কম করে ৫২ পদের ভোগ দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সেরে মা যেতেন বাবু অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে। দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের পর সোনার গহনা ও নববস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তিনি রওনা দিতেন শোভাবাজার রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। সেই সময় নবকৃষ্ণদেবের বাড়িতে দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বাইনাচ আর ভুরিভোজ। বাইনাচ বন্ধ হয়ে গেলেও, এখনো উৎসবের দিনে নাটঘরে ঝাড়বাতিগুলি আলোর কিরণ ছড়িয়ে জ্বলে ওঠে। বাবুর্চিরা বাবুদের জন্য চপ, কাটলেট, টিপসি পুডিং ইত্যাদি বানাতেন। পুজোর সময় মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে তেমন কোনো বিধি নিষেধ ছিল না কেবল ঠাকুরদালানে অন্নভোগ হতো না। নবমীর দিনে মাকে মাছ দিয়ে ভোগ দেওয়া হতো। দশমীর রাতে ছেলে ও সধবাদের মাছ ভাত খাওয়ার নিয়ম ছিল। আর এবাড়ীর বিশেষত্ব ছিলো নারকেল ছাপা সন্দেশ।

পারস্পরিক কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময় আর কলাপাতা বা বেলপাতায় দুর্গা নাম লিখে নিয়ম মেনে সিদ্ধি মুখে দিয়ে বিজয়া পালন হতো। পরে চলতো মিষ্টি মুখের পালা। বিজয় উৎসবে মিষ্টির ভূমিকা অনস্বীকার্য এ কথা বলাই বাহুল্য। বাড়ির মহিলাদের হাতে তৈরি মিষ্টির চল ছিল সেই সময়। গাছ থেকে নারকেল পাড়িয়ে, নানান ডিজাইনের ছাঁচ পরিষ্কার করে, ভয়সা ঘি কিম্বা ডালডার টিন রেডি করে রাখা হতো। বাড়ির গিন্নিরা নিজের হাতে তৈরি করতেন সুস্বাদু সব মিষ্টি—স্বাদে, গন্ধে যা ছিল এক্কেবারে অতুলনীয়। মালপোয়া, লবঙ্গলতিকা, কমলাপুলি, হরমোনামোহিনী, চিত্তরঞ্জন, গঙ্গাজলি, নারকেল নাড়ু,নারকেল ছাপা সন্দেশ, মুগের লাড্ডু, ছানার মুড়কি, নিখুঁতি-সহ নানান বৈচিত্র্যপূর্ণ মিষ্টি তৈরি হতো বাঙালির হেঁসেলে।

লবঙ্গলতিকা তৈরি করতে প্রথমেই
ময়দা মাখতে হবে। ময়দা মাখার জন্য সাদা তেল, নুন, চিনি স্বাদ মতো, বেকিং পাউডার এবং বেকিং সোডা মিশিয়ে ভালো করে মাখুন। এবার কড়াইতে ঘি বা সাদাতেল গরম হলে তাতে দিন নারকেল কোরা, ক্ষীর (এখন কনডেন্স মিল্ক দেয়) কাজু কিশমিশ মিশিয়ে লাল লাল করে ভেজে নিতে হবে। তৈরি হলো পুর। এবার সিরার জন্য একটা বাটিতে চিনি, এলাচ গুঁড়ো এবং জল দিয়ে একসঙ্গে ফোটান। ফুটে এলে নামিয়ে নিন। তারপর ময়দা মাখাটা লুচির মতো বেলে তাতে পুর ভরুন। ভালো করে ভাঁজ করুন ও মাঝে একটা লবঙ্গ দিয়ে দিন যাতে মোড়ক খুলে না যায়। এবার কড়াইতে আবার একটু ঘি দিয়ে একটু লাল করে লবঙ্গ লতিকা ভেজে নিন। তারপর চিনির সিরায় ডুবিয়ে তুলে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে রসালো পুরে ভরা লবঙ্গ লতিকা। আলতো করে কামড় বসাতেই ক্ষীরের মধুর আস্বাদ ভরিয়ে দেবে মন প্রাণ।

পাথুরিয়াঘাটার ঘোষ বাড়ির বিজয়ার একটি বিশেষ মিষ্টি হল পাতপুলি বা চন্দ্রপুলি। নারকেল মিহি করে বেটে তাতে পরিমাণ অনুযায়ী চার ভাগের এক ভাগ ছানা ও আন্দাজমতো চিনি পাক দিয়ে পাথরের থালায় ঢেলে এলাচগুঁড়ো মেশাতে হবে। পুর হিসেবে থাকবে খোয়া ক্ষীর ও চিনির মিশ্রণ। কড়াইয়ে দিলে সামান্য নাড়তে হবে। প্রায় ৮-১০ ইঞ্চি মাপের কলাপাতা হাতের চেটোয় পেতে মাঝখানে গরম গরম নারকেলের লেচি রেখে স্যাঁকা কলাপাতা চারপাট করে চাপ দিতে হবে। চাপ দিয়ে বড় গোল হলে ভিতরে পুর দিয়ে কলা পাতা কোনাকুনি ভাঁজ করতে হবে। এবারে কলা পাতা অর্ধচন্দ্রাকৃতি করে কেটে নিতে হবে। পরে কলাপাতা সরিয়ে উপরে কাজু বাদামের টুকরো, পেস্তা, কিসমিস দিয়ে সাজাতে হবে। এই মিষ্টির কারুকাজই প্রধান বৈশিষ্ট্য। ধারগুলি বিনুনির মতো পাকিয়ে দিতে হবে।

দশমীর দিন ঘরের মেয়ে উমাকে যেতে হবে অনেকটা দূরে কৈলাসে। তাই শরীরকে সুস্থ রাখা খুব দরকার। সেই জন্য ভাজাভুজি, খিচুড়ির মত ভারী কিংবা আলুর দমের মতো মসলাদার খাবার একেবারেই নয়। পান্তা ভাতে শরীর ঠান্ডা থাকে এজন্যই কলকাতা ও বাংলার বহু বনেদি বাড়ি, পুরনো জমিদার বাড়ি ও রাজবাড়ীর দুর্গাপুজোয় দশমীর ভোগে পান্তা ভাত দেওয়ার প্রথা চলে আসছে। অবশ্য দশমীতে অরন্ধন তার একটি বিশেষ কারণ। ঐদিন রান্না হয় না, উনুনে হাঁড়ি চড়েনা। নবমীর ভোগের পরই তোড়জোর শুরু হয় দশমীর ভোগের। বেশিরভাগ জায়গায় পান্তা ভাতের সঙ্গে দেবীকে দেওয়া হয় গন্ধরাজ লেবু ও মান কচু সেদ্ধ। আবার কোথাও কোথাও আদা শুকনো কাঁচা লঙ্কা, সরষে ফোরণ দিয়ে, সামান্য হলুদ ও জল কম দিয়ে শুকনো শুকনো করে রাঁধা পালং শাক। আবার কেউ কেউ ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে রাধা কচু শাক, শাপলার তরকারি, ইলিশ মাছ ভাজা আর পুঁটি মাছের ঝোল পান্তা ভাতের সঙ্গে মা দুর্গাকে ভোগ হিসেবে দেন। কোন কোন পুরনো বাড়িতে দশমীতে পোস্তর বড়া, গয়না বড়ি ভাজা দিয়ে পান্তা ভাত খেয়ে শ্বশুরবাড়ি রওনা দেন উমা।

সময় পাল্টেছে, পট পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু প্রাচীন এই বনেদি পরিবারের আড়ম্বর কমে গেলেও, উত্তরসূরিরা তাদের ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। আজও তারা পারিবারিক বৈশিষ্ট্য মেনে মাকে ভোগ দেন। বানান সেই পুরাতন পদগুলি।
খুব ভালো লাগল।
ধন্যবাদ।
খুব সুন্দর লেখা,,,,, প্রসঙ্গ পুজোর নবমী দশমীর মিষ্টি মুখ,,,,, সাবেককালের মিষ্টি,,,, চন্দ্রপুলি মিষ্টিটা এখনও বাড়িতে ভালোই হয়,,,,,, আরো একটু দীর্ঘ পড়তে চাইছিলাম,,,, যা পেয়েছি, তাও কম কী?
খুব খুশি হলাম আপনার মতামত পেয়ে। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।