জীবনের এক একেকটা বাঁকে গল্প মিলে যায় জীবনের সঙ্গে। সত্যি হয়ে ওঠে গানের বাণী। কালীপুজোর ঝোঁকে ঠিক এমনটাই ঘটলো। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া একটা রামপ্রসাদী গান একসময় লোকের মুখে মুখে ফিরতো— ‘এবার কালী তোমায় খাবো’। উত্তম-সুচিত্রার ‘সপ্তপদী’ গানটিকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিল। সেসব আমার জন্মের আগের কথা। ভঙ্গ বঙ্গে শ্যামাসঙ্গীত, রামপ্রসাদ, ধনঞ্জয় সবই এখন ধূসর স্মৃতি। বছরে একদিন কালীপুজোর সকালে মাইকবাহিত হয়ে ভেসে আসেন পান্নালাল। কিন্তু বাংলার ভক্তিরসের গানের এই গূঢ় সংকেত আচমকা চোখের সামনে এমন জ্যান্ত হয়ে উঠবে তা কে জানতো!
ক’বছর আগে আমাদের পাড়ার মোড়ে রাতারাতি একটা কালীমন্দির চালু করে দিয়েছিল ভজন-পূজন-সাধন তিন ভাই। সে মন্দির আড়ে বহরে বাড়তে বাড়তে কালক্রমে একটা বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। ক’দিন আগে সকালে দেখলাম, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় চলছে সেই মন্দির ভাঙার কাজ। দেবী মূর্তি তো বটেই, একপাশে খানিকটা দেওয়াল ছাড়া গোটা মন্দিরটা যেন রাতারাতি উধাও। যেন খবরের কাগজের অব্যর্থ হেডিং —কালের করাল গ্রাসে উধাও কালি। গোটা কর্মকাণ্ডের তদারক করছে ভজন আর পূজন। মন্দিরের জায়গায় শোভা পাচ্ছে একটা হোর্ডিং, সেখানে নির্মীয়মান ফ্ল্যাট বুক করার উদাত্ত আহ্বান। ভক্তিতে নয়, স্রেফ মাল কামানোর লোভে দেবীকে খেয়ে ফেললো ভক্তরা। ‘এবার কালী তোমায় খাবো’ গানটার যাকে বলে একেবারে গ্রাফিক ডেসক্রিপশন।
অনেকে বলেন বাংলায় কালীপুজোর প্রচলনের ব্যাপারে ডাকাতদের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। আঠারো শতক থেকে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠতে থাকে ডাকাত কালীর মন্দির। পরবর্তী সময়ে বহু গল্প, উপন্যাসে বারবার সেইসব মন্দির এসেছে। এই ধারাবাহিকতা মেনে পরবর্তীকালে বিভিন্ন কেলাব, ব্যায়াম সমিতি, পাড়ায় পাড়ায় গড়ে তুললেন কালী মন্দির। পরে অবশ্য তার সঙ্গে শনিও যুক্ত হয়েছেন। বিভিন্ন পাড়ার মোড়ের নাম হয়ে গেল কালীতলা মোড় বা মন্দির মোড়। একই ঘটনা ঘটেছিল আমাদের পাড়াতেও। অটো, বাস, রিকশচালকরা পুরসভার দেওয়া নামটা চিনতে পারতেন না, কালীতলা মোড় বললেই তারা একপায়ে খাড়া। আড়ে বহরে বেড়েছে শহর, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কালী মন্দির। সবই জাগ্রত, সবই রমরমা ব্যবসা।

বাংলায় আত্মভোলা সাধক, কানে জবা ফুল গোঁজা ঝাঁকড়া চুল ডাকাত, সর্বস্বত্যাগী নির্ভীক বিপ্লবী, সবাই কালীর আরাধনা করেছেন। তাদের আরাধনায় ছিল শুধুই ভক্তি, মায়ের চরণে সবটুকুই নিবেদন করেছিলেন তারা। বিপ্লবীদের কালীপুজো লিবারেশন থিয়োলজির এক রকমফের। কালীভক্তদের মিছিলে বাঙালি, বিহারী, ইংরেজ, চিনে, ফিরিঙ্গি সবাই আছেন। মায়ের কাছে সবাই সারেন্ডার করেছিলেন। কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি গেয়েছিলেন— ‘আমি ভজন-সাধন জানিনে মা জেতেতে ফিরিঙ্গি, তুই আমায় দয়া করবি কিনা বল?’ ভক্তদের কাছে দেবী ধরা দিয়েছেন নানাভাবে। নিশীথে পূজিতা দেবীকে সাধক ভবা পাগলা তার ‘প্রভাতে উঠিয়া কহো কালী কালী, চিত্ত শুদ্ধ হবে জগতে’ গানে ডেকে নিয়েছেন সকালবেলাতেই। বিচিত্র সব নামে বহু কালী মন্দির এখনও নানা ধরণের মানুষের কালী সাধনার সাক্ষী হয়ে জেগে আছে। মা মোটেই কারও একার নয়।
একালের কালী সাধকদের অধিকাংশের কাছে অবশ্য নগদটাই আসল। তাই বছর কয়েক আগে একটা নিয়মিত আয়ের আশায় যারা পাড়ায় পাড়ায় মন্দির গড়ে তুলেছিলেন এখন তারাই আবার আরও বেশি লাভের আশায় তা ভাঙছেন। এ ভাঙাগড়ার খেলায় ভয়-ভক্তি কিছুই নেই। সেকালের হাতে লাঠিধারীদের থেকে একালের কোমরে মেশিনগোঁজারা চেহারা, চরিত্র ও বিত্তবাসনায় একেবারে আলাদা। সংকটকাল ও যুদ্ধক্ষেত্রে দেবীর আশীর্বাদ সবাই প্রার্থনা করেন। কালী মন্দিরে তাই সবসময় ভিড়। দেবীর কোপের আশঙ্কায় সবাই তাকে তুষ্ট করতে চান।
চিরকাল দেখে এসেছি যারা শক্তিমান এবং যারা শক্তি চান সবাই কালীর আরাধনা করেন। কিন্তু ক্ষমতার করিডোরে আজকের বিচরণকারীদের নিয়ম আলাদা। প্রয়োজন মিটলে তাদের ভক্তি শেষ। টাকার গন্ধে তাদের চিত্ত চঞ্চল। পাড়ার মোড়ের কালী মন্দির ভাঙা থেকে শুরু করে অন্যের জমি দখল করার জন্য সেখানে রাতারাতি কালী মন্দির বসিয়ে দেওয়া, কোন কিছুতেই তাদের আপত্তি নেই। নির্মাণ শিল্পে ভাঙাগড়া সবই রাতারাতি। পরিবেশ ধ্বংস, স্থাপত্য নষ্ট, ঐতিহ্য মুছে যাওয়া কোন কিছুই দমাতে পারেনা তাদের। তাদের বিশ্বাস শুধু নগদ বিদায়ে। খাঁড়া, মুণ্ডমালা, কাটা হাতের ঘাগড়া কোন কিছুই এই নব্য ভাগ্যান্বেষীদের বিত্ত বাসনার দৌড়ের সামনে দাঁড়াতে পারেনা।
ভয়-ভক্তি-ভালোবাসা এই তিনের কোন একটা মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত করতে পারে। সত্যি বলতে কী ভক্তি আর ভালোবাসা ইদানিং বেশ কম। তবে ভয়ে এখনও কিছু কাজ হয়, বিশেষ করে ঠাকুর-দেবতার। দেখা যাচ্ছে তারও জোর কমছে। ভক্তরাই ভিটেছাড়া করছে মা’কে। এখন রক্ষকরাই ভক্ষক। টাকা বানানোর নেশায় মা’কে খেয়ে ফেলছেন ভক্ষকরা। নতুন সময়ে রামপ্রসাদের গান এক অন্য তাৎপর্য পেয়েছে। সেখানে নেই শক্তিসাধনার তত্ত্বের কোন গূঢ় সংকেত। অনুপস্থিত ভক্তের দেবীকে আপন করে নেওয়ার আহ্লাদ।
খোদ মানুষই যেন এখন বলির মোষ বা পাঁঠা! হাড়িকাঠে গোজা তার মাথাটি যেন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বলিদানে রেকর্ড করা দৈত্যাকৃতি কামারটির দিকে। বলি আর মোষ আসতেই মনে পড়ে গেল, দীনেন্দ্র কুমার রায়ের ‘পল্লীবৈচিত্র’ বইটিতে বর্ণিত গ্রামের কালীপুজোর কথা। হাড়িকাঠের খিলে আটকানো মোষটির দিকে তাকিয়ে “একজন লোক স্থলিতস্বরে বলিল, “কৈ রে! লঙ্কা বাটা কৈ? আঁচ না দিলে মজা হবে কেন?” মজা দেখিবার জন্য একজন লোক খানিক লঙ্কা বাটা লইয়া আসিল। দুই-তিনজন সহচর মহা উৎসাহে সেই লঙ্কা বাটা মৃত্যুমুখ কবলিত মহিষের নাকে মুখে গুঁজিয়া দিল। লঙ্কার ঝাল নাসারন্ধ্রে প্রবিষ্ট হইলে মহিষ প্রবল যন্ত্রণায় কিরূপ ছটফট করে, তাহা দেখিয়া আমোদ লাভ করার উদ্দেশ্যেই এই উপায় অবলম্বিত হয়। লঙ্কা বাটার ঝাল নাকেমুখে প্রবেশ করিবামাত্র মহিষটা ভয়ঙ্কর গর্জন করিয়া উঠিল; নিকটে যে সকল লোক দাঁড়াইয়াছিল, এই বিকট গর্জন শুনিয়া তাহারা দশ হাত পিছাইয়া গেল। যে চারিজন লোক পশ্চাতে ঝুঁকিয়া পড়িয়া মহিষের পা-বাঁধা দড়ি চারিগাছি টানিতেছিল, মহিষের পদের আস্ফালনে আর তাহারা সামলাইতে পারিল না, সটান মাটিতে পড়িয়া গেল! তৎক্ষণাৎ দু’জনের হাত হইতে দড়ি সরিয়া পড়িল; সেই মুহূর্তেই কামার সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া খাঁড়াখানি মাথার ওপর উদ্যত করিল, কিন্তু সে আর মহিষের স্কন্ধে আঘাত করিবার অবসর পাইল না! পা একটু আলগা পাইয়াই মহিষ উপরের দিকে এমন একটি প্রবল ঝিঁকে মারিল যে, হাড়িকাঠ দুই হাত মাটি ভেদ করিয়া উঠিয়া পড়িল; মহিষটাও সঙ্গে সঙ্গে চারি পায়ে ভর দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, এবং সিং নীচু করিয়া লেজ তুলিয়া হাড়িকাঠটা গলায় ঝুলাইয়া লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে একদিকে ছুটিয়া চলিল। আর কাহার সাধ্য তাহাকে ধরে!”
মাগো, এমন সাহস আমাদের কবে হবে?