কথায় কথায় সবাই বলেন, বিকেন্দ্রীকরণ না হলে গণতন্ত্র এগোবে না। প্রয়োজন মেটানো যাবেনা মানুষের। একেবারে ঠিক কথা কিন্তু তা হয় কোথায়? দেশে আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক গণতন্ত্রের যে অভাব রয়েছে তা আমরা নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারি। রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ সরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গভীর করে, তার প্রতি আস্থা বাড়ায়। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ স্থানীয় স্তরে সরকারি কর্মসূচিগুলি রূপায়নের কাজে গতি আনে এবং মানুষকে সেই পরিষেবাগুলি পেতে সাহায্য করে। তাতে স্থানীয় স্তরে উন্নয়নের কাজে গতি আসে। উদ্যোগের সুফলগুলি মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে যায়। অন্যদিকে আর্থিক স্তরে গণতন্ত্রের প্রসার ঘটলে একদিকে যেমন রাজস্ব সংগ্রহের কাজ সহজ হয়, অন্যদিকে তা সঠিক খাতে ব্যবহার করার কাজেও গতি আসে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বাড়ে মানুষের।
বলার কথাটা হল, দেশে রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ সফল হলেও আর্থিক এবং প্রশাসনিক স্তরে বিকেন্দ্রীকরণের কাজটা ঠিক ততটা এগোয়নি। এব্যাপারে ডান-বাম সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব সমান। সময় যত এগিয়েছে এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের আর্থিক বৈষম্য ততই বেড়েছে। সেই ফারাক এতটাই বিশাল যে আমাদের এক দেশের বাসিন্দা বলে মনেই হয় না! এতগুলি বছর কেটে গেল এখনও দেশের ১০০ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্রের মধ্যে বাস করছেন। এর প্রধান কারণ, আর্থিক ক্ষমতার বন্টন সর্বত্র সমানভাবে হয়নি। রাজ্য সরকারগুলিকে মোট সরকারি ব্যয়ের ৫০ শতাংশ খরচ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা কর্মচারীদের বেতন এবং বকেয়া ঋণের সুদ মেটাতেই চলে যায়। উন্নয়নের কাজ চালানোর মত অর্থই তো রাজ্য সরকারগুলির হাতে সেভাবে থাকেনা!

আবার দেখুন যা দেওয়া হচ্ছে তাতেও যে সব রাজ্য সমানভাবে উপকৃত হচ্ছে তা নয়। যেমন ধরুন সারের ভর্তুকি বাবদ অর্থ সব রাজ্য পেলেও এতে লাভ বেশি হয় এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলির। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, যেকোন কেন্দ্রীয় উদ্যোগ রূপায়নের গতি সব রাজ্যের সমান নয়। একেকটা রাজ্যে কাজ এগোয় একেক রকম গতিতে। প্রশাসনিক নজরদারিও সব রাজ্যে সমানভাবে হয় না। উদ্যোগ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বৈষম্য থেকে যায়। শিক্ষার কথাই ধরুন, রাজ্যগুলির হাতে এক্ষেত্রে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে থেকে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের ওপর চোখ রাখলে এর অজস্র উদাহরণ আপনি পেয়ে যাবেন। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ আবার অনেক ক্ষেত্রে জটিলতাও তৈরি করে। এব্যাপারটা নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের পরিষেবা দেওয়ার দুটি মূল জায়গা। বারবার এই দুটি ক্ষেত্র নিয়ে বৈষম্যের ছবিটা সামনে আসছে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কিন্তু সেখানে স্বাধিকার চোখে পড়ার মত কম। এই বৈষম্যগুলি দূর না করলে দেশে অর্থনৈতিক বনিয়াদ মজবুত হবে না। পঞ্চায়েতগুলির আর্থিক ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে কেন্দ্রকে। সোজা কথায় অর্থনৈতিক গণতন্ত্রই দেশে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।