ইডি বা ডিরেক্টরেট অফ ইনফোর্সমেন্ট অর্থাৎ প্রবর্তন নির্দেশালয় আর সিবিআই বা সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন অর্থাৎ কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা — এদের সাম্প্রতিক কালের কাজকর্মের গতি-প্রকৃতি দেখে সাধারণভাবে প্রশ্ন উঠেছে যে এরা কি নিছক দুর্নীতির তদন্তকারী সংস্থা নাকি একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ার? দেখা যাচ্ছে গত চার বছরে এই দুটি তদন্ত যংস্থা যতগুলি মামলা করেছে তার ৯৫ শতাংশই কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি এক নির্বাচনী সমাবেশে দাঁড়িয়ে বিরোধী কংগ্রেস দলকে উদ্দেশ্য করেই হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, তাঁর কাছে প্রায় সকলেরই দুর্নীতির হিসেব-নিকেশ রয়েছে যা তিনি খুব শীঘ্রই সবার সামনে হাজির করবেন। এর পরই দেখা গেল দুই তদন্তকারী সংস্থা অর্থাৎ ইডি এবং সিবিআই বিভিন্ন রাজ্যের একাধিক নেতা-মন্ত্রীর বাড়ি এবং দপ্তরে হানা দিয়েছে। লক্ষ্যণীয়, যে সেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা দুটি তৎপর হয়ে উঠল, সে সব রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় ছিল না এবং সেই নেতা-মন্ত্রীরাও কেউই বিজেপি দলের ছিল না। পরবর্তীতে ওই তল্লাশি অভিযান ক্রমেই সংখ্যায় আরও বেড়ে গিয়েছে।
সম্প্রতি অসমের ১৫টি বিজেপি বিরোধী দলের ফোরাম অভিযোগ করেছে, কেন্দ্রে মোদী সরকারের শাসনকালে ইডি বা সিবিআই যতগুলি মামলা করেছে সেখানে একজনও বিজেপি নেতার নাম নাম নেই। ফোরাম অভিযোগে একথাও জানায়, যখন কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় ছিল তখন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা দুটি এমন অনেক মামলা করেছিল যেখানে কংগ্রেস ও তার সহযোগী দলগুলির নেতাদের নাম ছিল। উল্লেখ্য, ইডি ও সিবিআই হল দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত তদন্তকারী সংস্থা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রে ২০১৪ সালে মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এই তদন্তকারী সংস্থাগুলির কাজকর্মের গতি প্রকৃতি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে কেন্দ্রের শাসক দল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে এদের কাজ-কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ, প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই যে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, ঠিক সেই সব রাজ্যেই ইডি ও সিবিআই হানা দিচ্ছে, শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তদন্তের জন্য ডেকে পাঠাচ্ছে অথবা তাদের বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে কেন্দ্রের শাসক দল তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করার জন্যই তদন্তকারী সংস্থা দুটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে আর সংস্থা দুটিও সেই নির্দেশ মতোই কাজ করে চলেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ থেকে ২০২৩ এই চার বছরে গেরুয়া বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মোট ১২৯টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে সব থেকে বেশি মামলা হয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে; ৩৪টি, কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে হয়েছে ২৪টি মামলা আর ১১টি মামলা হয়েছে এনসিপি’র নেতাদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে এই সময়ে ইডি বা সিবিআই কোনো একজন বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেছে এমন কোনো খবর নেই। বরং এই হিসাব থেকে এটাই উঠে আসছে যে এই চার বছরে ইডি ও সিবিআই মোট যতগুলি মামলা করেছে তার ৯৫ শতাংশই বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে এই তদন্তকারী সংস্থা দুটি এই সময়ের আগে পর্যন্ত যে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল সেগুলিকেও এখনও ঝুলিয়ে রেখে দিয়েছে। সেই সব মামলাগুলি নিয়ে ফের তদন্ত করা বা কোনও ধরণের অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আমরা দেখেছি এই চার বছরের মধ্যে সোনিয়া গান্ধি, রাহুল গান্ধি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ফারুক আবদুল্লাহ সহ অন্তত ৫৬জন বিজেপি বিরোধী নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ, তাঁদের বাড়িতে হানা, গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা দুটির এই ধরণের কাজ-কারবার থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে তারা কেন্দ্রের শাসক দলের নির্দেশ মেনেই চলে আর বিজেপির ক্ষেত্রে প্রমাণ হয় যে তারা প্রতিশোধের রাজনীতিতেই অভ্যস্ত। অথচ কেন্দ্রে ইউপিএ শাসন আমলের হিসাব বলছে যে ১০ বছরে সিবিআই ও ইডি রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মোট যে ২৬টি মামলা করেছিল, তাব মধ্যে ১৪টি মামলা ছিল বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে আর বাকিগুলি ছিল কংগ্রেস ও তার সহযোগী নেতাদের বিরুদ্ধে।
বিগত কয়েক বছরে সিবিআই ও ইডি হানায় এবং তদন্তের পর অনেক নেতাই তো বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, তা নিয়ে হইচই তো কম হয়নি। কিন্তু তারপর? সারদার মালিক ছাড়া আর একজনও কি জেলে আছেন? নেই। কারণ, সিবিআই কিংবা ইডি আদালতে এমন কোনও চার্জশিট কিংবা প্রমাণ জমা দিতে পারেনি যাতে আদালত সন্তুষ্ট হতে পারে, বরং এমনই প্রমাণ যা থেকে প্রায় সব নেতাই কোনো না কোনোভাবে জামিন পেয়েছেন। জামিন তো হবেই কারণ, বিচারাধীন অবস্থায় কাউকেই অনন্তকাল জেলে আটকে রাখা যাবে না। তার মানে অভিযোগ, তদন্ত, গ্রেপ্তার নিয়ে বিপুল হইচই তারপর সব ঠান্ডা। রাজ্য পুলিস কিংবা সিআইডির তদন্তে পক্ষপাত হতে পারে বলে রামপুরহাট থেকে হাঁসখালির মতো বহু ঘটনার তদন্তভার আদালতের মাধ্যমে সিবিআইকেই দেওয়া হয়েছিল। কি হল সেইসব তদন্তের? সারদা, রোজভ্যালি মামলারই বা আপডেট কি? ভোট এল, গেল, মামলাগুলিও দরকচা মেরে গেল। রাজনৈতিক দলগুলির আওয়াজও কেমন যেন মিলিয়ে গেল। অথচ তার আগে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত বা জেরা করে আদালতে চার্জশিট পেশ সবই আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে ফেলেছি, খবর কাগজের পাতা থেকে পড়ে ফেলেছি। ইডি, সিবিআইয়ের তদন্তের কাজ কি সংবাদমাধ্যমকে সব কিছু জানিয়ে, মিডিয়া ট্রায়াল করে? কোনও কিছু প্রমাণ হওয়ার আগেই যদি ইডি, সিবিআই-এর প্রত্যেকটি গতবিধি ‘ব্রিফিং’ হয়, তাহলে তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছাড়া আর কি বলা যায়?