শান্তিনিকেতনের আশ্রমে ব্রহ্মবিদ্যালয়ের গৃহনির্মাণ ও তৎসংক্রান্ত খরচের জন্য মহর্ষির দান ৫,০০০ টাকায় একটি একতলা গৃহের নির্মাণ-কাজ শুরু হয়। ৭-পৌষ-১৩০৫ (২১-ডিসেম্বর-১৮৯৯) সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রহ্মবিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কিন্তু তার আগেই যক্ষ্মা রোগে বলেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। ব্রহ্মবিদ্যালয়ের উদ্বোধন হলেও বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়নি। বলেন্দ্রনাথের অকাল মৃত্যুর তিন-বৎসর পর রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসম্পূ্র্ণ কাজ সম্পূ্র্ণ করতে ৭-পৌষ-১৩০৮ (২২-ডিসেম্বর-১৯০১) রবিবার, প্রস্তাবিত ব্রহ্মবিদ্যালয় গৃহটির আশ্রয়ে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গৌরগোবিন্দ গুপ্ত, অশোককুমার গুপ্ত, সুধীন্দ্রচন্দ্র নান— এই-পাঁচজন আশ্রমিক ছাত্র এবং তিন-জন শিক্ষক-রেবাচাঁদ, জগদানন্দ রায় ও শিবধন বিদ্যার্ণব-কে নিয়ে সূচিত হয়েছিল ব্রহ্মচর্যাশ্রমের। মহর্ষির ‘আশ্রম’ আর বলেন্দ্রনাথের ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’ উভয় পরিকল্পনার মিলনে রবীন্দ্রনাথ গড়েছিলেন ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’। এটি ভাবের দিক থেকে হল আশ্রম, আর রূপের দিক থেকে হল বিদ্যালয়।
এই বিদ্যালয়-আশ্রমে অর্থাৎ ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রমে’ একে একে যোগ দেন অনেক শিক্ষক-তত্ত্বাবধায়ক-আচার্য। রবীন্দ্রনাথ নানা সূত্রে তাঁদের ‘সংগ্রহ’ করে আনেন। শুধু শিক্ষকতার গণ্ডিতেই তাঁদের আবদ্ধ না রেখে নানান বিষয়ে তাঁদের কাছ থেকে লেখা আদায় করে নিজ-সম্পাদিত পত্রিকাগুলিতে প্রকাশ করেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলিতে লিখেছেন এমন কুড়িজন শিক্ষকের ২৩০-টি রচনার সন্ধান পাই আমরা। ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সেই শিক্ষকেরা হলেন৫—অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়, অজিতকুমার চক্রবর্তী, কালিদাস বসু, কালীমোহন ঘোষ, ক্ষিতিমোহন সেন, জগদানন্দ রায়, জ্ঞানেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্য়ায়, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, নেপালচন্দ্র রায়, বিধুশেখর শাস্ত্রী [শর্ম্মা/ভট্টাচার্য], ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, মোহিতচন্দ্র সেন, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শরৎকুমার রায়, শিবধন বিদ্যার্ণব, সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, সতীশচন্দ্র রায়, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, সুবোধচন্দ্র মজুমদার।
জ. শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ছাত্র, পরবর্তীকালে সেখানকার শিক্ষক:
শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম যুগের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই আশ্রমের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, শিক্ষা লাভ করে আশ্রমিকের শান্তি-নিকেতন ছেড়ে চলে যান নি। সেখানেই শিক্ষান্তে শিক্ষাদানকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। আর সেই কাজে যিনি সম্পূর্ণ সহায়তা করেছিলেন, তিনি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের চারজন ছাত্রের সন্ধান পাই আমরা যাঁরা পরবর্তীকালে আশ্রম-বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখনী ধারণ করেছিলেন সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথের তত্ত্ববোধিনীপত্রিকা-র জন্য। এঁরা হলেন— গৌরগোপাল ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, নারায়ণ কাশীনাথ দেবল, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার।
ঝ. শান্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ছাত্র-লেখক:
‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’- ছাত্রদের কাছে অধ্যয়নই তপস্যা স্বরূপ। শুধু পুঁথি পড়া নয়, মৌলিক লেখাও তাদের কাছ থেকে কাম্য। মৌলিক লেখা লিখতে উৎসাহিত করা, তা ছাপার হরফে প্রকাশ করা হলে ছাত্রদের উৎসাহ বহুগুণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। মুখ্যত সেই উদ্দেশ্যেই ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ছাত্রদের উৎসাহিত করা হত নানান বিষয়ে মৌলিক রচনা সৃজনে। রবীন্দ্রনাথসহ তৎকালীন ব্রহ্মবিদ্যালয়ের আচার্যেরা উৎসাহিত করতেন তৎকালীন ছাত্রদের, যাতে তারা কিছু না কিছু বিষয়ে নিজেদের ভাবনা প্রকাশ ও বিনিময় করতে সক্ষম হয়। ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ছাত্রদের দ্বারা প্রকাশিত, হাতে লেখা ও ছাপা আঠেরোটি ক্ষণস্থায়ী পত্রিকার সন্ধান পাওয়া যায়, সেগুলি হ’ল– শান্তি, প্রভাত, বাগান, আশ্রম, কুটির, বীথিকা, শিশু, আবর্জ্জনা, শয়ান, মধ্যাহ্ন, নিশীথ, গোগৃহ, গবেষণা, উষা, Culture, সন্ধ্যা, আশ্রম সংবাদ ও অরুণ । এই পত্রিকাগুলির পাতা ছাত্রদের রচনায় পূ্র্ণ হত। ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ছাত্রদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে উৎসাহ দেওয়া হত। পৌষ-১৩১৮ সংখ্যা বাগান-এ ‘বিজ্ঞাপন’ দেওয়া হয়- “বাগান-এ ‘Nature study’ (প্রাকৃতিক প্রবন্ধ)-এর জন্য শ্রদ্ধেয় প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ মহাশয় দুইটি পুরস্কার দিতে স্বীকৃত হইয়াছেন।” -মাঘ সংখ্যায় জানা যায়, ‘পিপীলিকার কথা’ ও ‘টিকটিকি’ প্রবন্ধের জন্য যথাক্রমে প্রদ্যোৎকুমার সেনগুপ্ত ও বিভূতিভূষণ গুপ্ত (বড়ো) প্রথম ও দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।৬ ছাত্রদের মৌলিক রচনা সৃজনে উৎসাহিত করতে প্রশান্তচন্দ্র যেমন পুরস্কার চালু করেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথও তত্ত্ববোধিনীপত্রিকার মত ধর্মীয় মুখপত্রের সঙ্গে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মেলবন্ধন ঘটান। গুরুগম্ভীর প্রবন্ধের পাশাপাশি ছাত্রদের অকিঞ্চিৎকর রচনাও স্থান পেতে থাকে তত্ত্ববোধিনীর পাতায়।
তত্ত্ববোধিনীপত্রিকার সম্পাদক হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ আদি-ব্রাহ্মসমাজের সদস্যদের কাছে ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’-এর সংবাদ ‘আশ্রমকথা’ পৌঁছে দিতে যেমন চেয়েছিলেন, তেমনি ভবিষ্যতের লেখক তৈরী করতে, ছাত্রদের উৎসাহ বৃদ্ধি করতে, তাদের লেখা তত্ত্ববোধিনীর পৃষ্ঠায় স্থান দিয়ে তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে তুলতে চেয়েছিলেন। তত্ত্ববোধিনীপত্রিকায় পৌষ-১৮৩৩-শক সংখ্যায় গুরুদেব-‘সম্পাদক’ ঘোষণা করেন—“এই মাস হইতে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয়ের সংবাদ ও সেখানকার ছাত্রগণের রচনা-প্রকাশের জন্য আমরা ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’ নাম দিয়া তত্ত্ববোধিনীপত্রিকার একটি স্বতন্ত্র বিভাগ রক্ষা করিব।” ৭
এই বিভাগে রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনা পর্বের চার-বছরে ১৯-জন ছাত্র-লেখকের ৫০-টি রচনা প্রকাশিত হয়। ছাত্ররা মূলত ‘প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ’, ‘আশ্রমকথা’, ‘আশ্রম সংবাদ’-বিভাগের সংক্ষিপ্ত রচনাগুলির লেখক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উক্ত চার বছরের তত্ত্ববোধিনীতে বিশ্বসংবাদ, নানাকথা, বৈজ্ঞানিকবার্তা, আলোচনা, সাময়িকপ্রসঙ্গ, সংক্ষিপ্ত রচনা এবং ছাত্রদের লেখা তিনটি বিভাগ মিলিয়ে মোট ৩৭-জন লেখকের ১২৩-টি সংক্ষিপ্ত-রচনা প্রকাশিত হয়, যার সিংহভাগ ব্রহ্মচর্যাশ্রম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা রচিত।
রবীন্দ্রনাথ তত্ত্ববোধিনীপত্রিকার সম্পাদনা-ভার ত্যাগ করলে ১৮৩৭ শক (১৩২২ বঙ্গাব্দ) থেকে ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’ বিভাগ তুলে দেওয়া হয়। তত্ত্ববোধিনীপত্রিকায় আশ্রমকথা ও আশ্রম সংবাদ বিভাগে ছাত্রদের-দ্বারা রচিত ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সূচনা পর্বের ইতিহাস বিধৃত রয়েছে। স্বনামে যে সমস্ত ছাত্রেরা লিখেছিলেন, তাঁরা হলেন— উপেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য, কামিনীকুমার চন্দ, গৌরগোপাল ঘোষ, চণ্ডীচরণ সিংহ, ত্রিগুণানন্দ রায়, দীনেন্দ্রকুমার দত্ত, নারায়ণ কাশীনাথ দেবল, প্রদ্যোৎ, প্রবোধ [গঙ্গোপাধ্যায়], বংশু [পি. কে. সেন], মুকুল [চন্দ্র দে], যতীন্দ্রমোহন বাগচী, লব, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, সুজিতকুমার চক্রবর্তী, সুহৃৎকুমার মুখোপাধ্যায়, সোমেন্দ্রচন্দ্র দেববর্ম্মা [দেবশর্ম্মন], সুধাকান্ত রায়চৌধুরী, সুধীরঞ্জন দাস।
ঞ. জমিদার-সম্পাদকের কর্মচারী-নায়ের সুহৃদ:
যে; যে-বিষয়ে পারদর্শী, অনেক সময় সে-বিষয়ে কাজ করতে না পেরে রুটি-রুজির কারণে অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয় অনেক গুণী মানুষই। সে-রকম দুজন গুণী মানুষের সন্ধান পাই আমরা, যাঁরা জমিদার-রবীন্দ্রনাথের সেরেস্তার সাধারণ কর্মচারী এবং নায়েব ছিলেন। সেই কর্মচারী জগদানন্দ রায় এবং কালিগ্রাম পরগণার নায়েব শৈলেশচন্দ্র মজুমদার এর গুণগ্রাহীতার পরিচয় পেয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁদের যথাযোগ্য সম্মানে প্রতিষ্ঠা করেন।
জগদানন্দ রায় শিলাইদহের জমিদারী সেরেস্তায় কাজ করতেন। তাঁর সাংসারিক অভাব মোচনের জন্য রবীন্দ্রনাথই তাঁকে ওই পদে নিযু্ক্ত করেন– “কিন্তু তাঁকে এই অযোগ্য আসনে বন্দী করে রাখতে আমার মনে বেদনা দিতে লাগল। আমি তাঁকে শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনার কাজে আমন্ত্রণ করলুম। যদিও এই কার্যে আয়ের পরিমাণ অল্প ছিল তবুও আনন্দের পরিমাণ তাঁর পক্ষে ছিল প্রচুর। তার কারণ শিক্ষাদানে তাঁর স্বভাবের ছিল অকৃত্রিম তৃপ্তি। ছাত্রদের কাছে সর্বতোভাবে আত্মদানে তাঁর একটুও কৃপণতা ছিল না। সুগভীর করুণা ছিল বালকদের প্রতি। শাস্তি উপলক্ষেও তাদের প্রতি লেশমাত্র নির্মমতা তিনি সহ্য করতে পারতেন না।“ ৮
রবীন্দ্রনাথও জগদানন্দ রায়ের “গল্পচ্ছলে সরস করে বিজ্ঞানের কথা বলার আশ্চর্য ক্ষমতা”র উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত ‘সাধনা’ ব্যতীত চারটি সাময়িকপত্রেই জগদানন্দ বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন ৩১-টি।
শৈলেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের কনিষ্ঠ-ভ্রাতা। ঠাকুর-পরিবারের জমিদারিভুক্ত কালিগ্রাম পরগণার তৎকালীন নায়েব এর দায়িত্ব পালন করতেন শৈলেশচন্দ্র। পরবর্তীতে রবীন্দ্র-স্নেহধন্য শৈলেশচন্দ্র ‘মজুমদার লাইব্রেরী’র অন্যতম কর্ণধার হিসাবে রবীন্দ্রনাথের অনেক গ্রন্থ এবং বঙ্গদর্শন–নবপর্যায় এর প্রকাশক এবং সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমে কর্মচারী, পরে প্রকাশক এবং সহকর্মী শৈলেশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ভারতী পত্রিকায় ‘বানুরে বুদ্ধি’ এবং ‘প্রবাদ প্রসঙ্গ’ শীর্ষক দুটি প্রবন্ধের রচয়িতা। ব্যতিক্রমী এই মানুষদ্বয়— জগদানন্দ রায়, শৈলেশচন্দ্র মজুমদার।
ট. মহিলা কবি-লেখিকা:
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থায় মহিলা কবি-লেখিকার সংখ্যা রবীন্দ্রনাথের সাময়িকপত্র-সম্পাদনকালে যেমন অপ্রতুল ছিল, বর্তমানেও পুরুষ লেখকদের তুলনায় মহিলা লেখিকাদের সংখ্যা কম। সামগ্রিক বিচারে রবীন্দ্র-সম্পাদিত পাঁচটি সাময়িকপত্রে প্রকাশিতনামা লেখক-লেখিকার সংখ্যা- ২৩৬। এই ২৩৬-জনের মধ্যে মাত্র দশজন মহিলা। এই দশজনের ৬ জন প্রত্যক্ষত ঠাকুরবাড়ির সদস্যা। সম্পাদকের কন্যাদ্বয়-অতসীলতা (মীরা) ও মাধুরীলতা (বেলা)। জ্যেষ্ঠা সহোদরা-স্বর্ণকুমারী দেবী। দুই ভাগিনেয়ী-হিরন্ময়ী ও সরলাদেবী। এবং ভ্রাতুষ্পুত্রবধূ-হেমলতাদেবী (দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী)। প্রত্যক্ষত ঠাকুরবাড়ির সদস্যা না হলেও প্রিয়ম্বদাদেবী সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। ভ্রাতৃজামাতা এবং বন্ধু আশুতোষ চৌধুরী ও প্রমথ চৌধুরীর ভাগিনেয়ী এবং লেখিকা প্রসন্নময়ীদেবীর কন্যা প্রিয়ম্বদা। শরৎকুমারীদেবী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বন্ধু অক্ষয়কুমার চৌধুরীর পত্নী। রবীন্দ্রনাথ এঁকে ‘লাহোরিণী’ বলতেন। অর্থাৎ দশজনের আটজন সম্পাদক-ঘনিষ্ঠ। দুই জনের পরিচয় অজ্ঞাত। দশজন মহিলা কবি-লেখিকার মোট রচনা সংখ্যা -৯৩। এঁরা হলেন ৯— অতসীলতা দেবী (মীরা) [ঠাকুর/গঙ্গোপাধ্য়ায়], নির্ঝরিণী ঘোষ, প্রিয়ম্বদা দেবী, মাধুরীলতা দেবী (বেলা) [ঠাকুর/চক্রবর্তী], শরৎকুমারী দেবী [চৌধুরানী], সরলা দেবী, স্বর্ণকুমারী দেবী, সুরমাসুন্দরী বসু, হিরন্ময়ী দেবী, হেমলতা দেবী ।
ঠ. মুসলমান লেখক:
ভারতীয় সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে সেকাল-একালে বিশেষ ফারাক লক্ষিত হয় না। বর্তমানে শিক্ষার হার কিছুটা উন্নত হলেও, রবীন্দ্রনাথের সাময়িকপত্র-সম্পাদনা-কালে (১৮৯৪-১৯১৫) ভারতীয় তথা বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে তেমন শিক্ষার আলো পৌঁছয় নি তা উপলব্ধি করা যায় একটি মাত্র পরিসংখ্যানে। রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত পাঁচটি বাংলা সাময়িকপত্রে প্রকাশিতনামা সর্বমোট লেখক সংখ্যা- ২৩৬। এই ২৩৬-জনের মধ্যে মুসলমান-লেখক মাত্র পাঁচ-জন। অনুপাতের অঙ্কে- ২৩৬ = ২৩১ : ৫- সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে সংখ্যালঘু মুসলমান লেখকের এই অনুপাত অত্যাশ্চর্যজনক। এই পাঁচজন মুসলিম লেখক রবীন্দ্র-সম্পাদনায় মাত্র ছয়টি রচনা লেখেন। পাঁচটি সাময়িকপত্রে প্রকাশিত সামগ্রিক রচনা সংখ্যার বিচারে সেই অনুপাত আরও বেশী হতাশাজনক- ১৮০১ = ১৭৯৫ : ৬ অর্থাৎ ১৮০১-টি প্রকাশিত রচনার ১৭৯৫-টির লেখকেরা সংখ্যাগুরু-সম্প্রদায়ের। মাত্র ৬-টি রচনা সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত লেখকদের। এই পাঁচজন অবশ্য উল্লেখ্য মানুষেরা হলেন— কেরামতুল্লা মুন্সী, মিঃ রসুল (আব্দুল রসুল), মোহাম্মদ হেদায়েতউল্লা, মৌলবী মহম্মদ ইমাদুদ্দিন, মৌলবী সিরাজুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত সাধনা, ভারতী এবং তত্ত্ববোধিনীপত্রিকা-য় রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত কালসীমায় কোনও মুসলমান-লেখকের রচনা প্রকাশিত হয় নি। (চলবে)
লেখক, শুভাশিস মণ্ডল, সহ শিক্ষক (বাংলা), কসবা চিত্তরঞ্জন হাই স্কুল, কসবা, কলকাতা।