ড. বঙ্গভাষী অবাঙালি লেখক:
রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত পাঁচটি বাংলা সাময়িকপত্রে প্রকাশিতনামা লেখকদের মধ্যে আমরা মাত্র তিন-জন লেখককে খুঁজে পাই, যাঁরা জন্মসূত্রে অবাঙালি কিন্তু বঙ্গভাষা-চর্চাকারী বঙ্গভাষী-লেখক। এই তিন-জনই রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসেন। তরুণ [রাম] ফুকন জন্মসূত্রে অসমীয়া, রবীন্দ্র অনুরাগী। নারায়ণ কাশীনাথ দেবল ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম যুগের ছাত্র। বাবা মারাঠী, মা বর্মী। শান্তিনিকেতন থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে কিছুদিন সেখানেই শিশু-বিভাগে শিক্ষকতা করেন। পরে বিলেতে পড়াশোনা করতে যান। সেখান থেকে তাঁর পাঠানো চিঠি তত্ত্ববোধিনী-তে প্রকাশিত হয়। সখারাম গণেশ দেউস্কর মহারাষ্ট্রীয় সন্তান। আশৈশব বাংলাভাষা চর্চা করে বিশিষ্ট লেখকের মর্যাদা লাভ করেন। ‘সাধনা’য় প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য এঁকে পারিশ্রমিক দেওয়া হ’ত ।
বিশ্বভারতীকে রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের সর্বজাতির, সর্বধর্মের সর্বভাষাভাষীর শিক্ষাচর্চা ও জ্ঞানালোচনার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর সেই স্বপ্ন অসফল হয়নি। জন্মসূত্রে অবাঙালি হলেও এই তিনজন বঙ্গভাষীর বাংলা রচনা প্রকাশ করে বিশ্বসত্তায় বিশ্বাসী বিশ্বকবি বাংলা সাময়িকপত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। অবশ্য উল্লেখ্য এই তিন জন হলেন— তরুণ [রাম] ফুকন, নারায়ণ কাশীনাথ দেবল, সখারাম গণেশ দেউস্কর ।
ঢ. ইংরেজ-লেখক:
রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত পাঁচটি সাময়িকপত্রে যতগুলি রচনা প্রকাশিত হয়েছিল তার একটি বাদে সমস্তই ভারতীয়দের দ্বারা রচিত। ‘ভাণ্ডার’ পত্রিকার (ভাদ্র-আশ্বিন-১৩১২) ১ম বর্ষ, ১ম ভাগ, ৫ম-৬ষ্ঠ সংখ্যায় একটিমাত্র রচনা অভারতীয় ইংরেজ-সাহেব লেখকের। বাংলাভাষায় প্রকাশিত কোনও পত্রিকায় সাহেবের নামে মুদ্রিত রচনা, একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। [ঈ.বি.] ‘হেবেল সাহেবের চিঠি’ শিরোনামায় পত্রাকার-প্রবন্ধ ‘হাতের তাঁত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় । ঈ.বি. হেভেল ছিলেন সরকারী আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সমসাময়িক Industrial India পত্রিকাতেও (Feb. 1905, Supplementary Copy) তিনি তাঁত সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখেছেন। ভাণ্ডার-এর রচনাটি হেভেল সাহেবের নিজের, না Industrial India পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের বঙ্গানুবাদ ভাণ্ডার-এ প্রকাশিত হয়েছিল তার কোনও উল্লেখ প্রবন্ধে নেই। তবে প্রবন্ধটি ‘হেবেল সাহেবের চিঠি’ বলেই উল্লিখিত হয়— ঈ. বি. হেভেল [Ernest Beanfield Havell]
ণ. আত্মপরিচয় অপ্রকাশে ছদ্মনামা লেখক-লেখিকা:
রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত পাঁচটি সাময়িকপত্রেই আমরা লক্ষ্য করি, বেশ কিছু রচনায় লেখকের নাম প্রকাশিত হয়নি। ‘ঠাকুর’ পদবীধারীদের রচনাধিক্য জনিত বিরূপ সমালোচনার কারণে সম্ভবত ‘সাধনা’ পত্রিকার শেষবর্ষে লেখক নাম প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু অন্য চারটি পত্রিকার ক্ষেত্রে সে সমস্যা ছিল না। তবু নামহীন সেই লেখাগুলি তথাকথিত কোনও বিতর্কিত বিষয়ে নয়, বরং অকিঞ্চিৎকর। হয়তো লেখাগুলি তেমন উৎকৃষ্ট মানের নয় বলেই সম্পাদক তাঁদের নাম প্রকাশ করেন নি।
এছাড়াও বঙ্গদর্শন, ভাণ্ডার ও তত্ত্ববোধিনীপত্রিকা-য় প্রকাশিত দশজন লেখকের সাতচল্লিশটি রচনার সন্ধান পাই, যেখানে লেখক-নাম প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু ‘শ্রী’, ‘শ্রী অঃ’, ‘শ্রী পাঠক’, ‘শ্রী ম’, ‘শ্রী স’ ইত্যাদি ছদ্মপরিচয়ে প্রকৃত নাম গোপন রাখা হয়েছে। কিন্তু কেন এই উপায় অবলম্বন, সে বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা বা পাদটীকা সংযোজিত হয়নি। অন্য পাঁচটি নামের ক্ষেত্রে তবুও লেখকদের সম্পর্কে সম্যক ধারণা জন্মায়। যেমন- ‘অধ্যাপক’ সম্ভবত ব্রহ্মবিদ্যালয়ের কোনও শিক্ষক। ‘আশ্রম বালক’, ‘আশ্রমবাসী’, ‘জনৈক আশ্রমবাসী’ সম্পর্কে ধারণা বা অনুমান করে নেওয়া যায়। বিশিষ্ট রবীন্দ্র-গবেষক প্রশান্তকুমার পাল ‘বঙ্গরমণী’ রচিত ভাণ্ডার-এর প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথের লেখা বলে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া জ্যৈষ্ঠ-১৩১২ এবং আষাঢ় ১৩১২-সংখ্যার ভাণ্ডার-এ ‘জলকষ্ট’ এবং ‘অহেতুক জলকষ্ট’ শীর্ষক দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধ দুটি ‘শ্রীমতী কনিষ্ঠা’ এবং ‘শ্রীমতী মধ্যমা’ ছদ্মনামে রচনা করেন সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথ। [দ্র. স্বদেশী সমাজ (১৩৯৩), পৃ. ৬৮-৭০, ৭১-৭৩] অবশিষ্ট রচনাগুলি সংক্ষিপ্ত অথবা উৎকৃষ্ট মানদণ্ডের বিচারে অকিঞ্চিৎকর বলেই লেখক-নাম অপ্রকাশিত ছিল বলে অনুমান করা যায়। আত্মপরিচয় গোপন রাখা, অথবা সম্পাদকের সিদ্ধান্তে স্বনামে অপ্রকাশিত লেখকেরা হলেন— অধ্যাপক, আশ্রমবালক, আশ্রমবাসী, জনৈক আশ্রমবাসী, বঙ্গরমণী, শ্রীঃ, শ্রী অঃ, শ্রী পাঠক, শ্রীর’ম, শ্রী সচ ।
ত. সম্পাদকের অপরিচিত-স্বল্পপরিচিত-স্বতঃপ্রণোদিত রচনা প্রেরক:
সাময়িকপত্রের সম্পাদক যখন সম্পাদনাকর্ম শুরু করেন, তখন তাঁর গোষ্ঠী আয়তন থাকে স্বল্প। সময়ের অনিবার্য অগ্রগতিতে সেই গোষ্ঠীর অর্থাৎ সাময়িকপত্রের লেখক-পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে পারে, যদি সেই সমায়িকপত্রগুলি জনাদর লাভ করে। স্মর্তব্য, সম্পাদক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কার্যকাল সীমায় (নভেম্বর-১৮৯১ – এপ্রিল-১৯১৫) তৎকালীন বঙ্গদেশে শিক্ষিত পড়াশোনা জানা মানুষের সংখ্যা ছিল খুব কম। শহর-মফস্বলের মানুষেরাই ছিলেন মূলত রবীন্দ্র-সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলির গ্রাহক-পাঠক। প্রত্যন্ত গ্রামে, দু-একটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া সাময়িকপত্রের গ্রাহক পাঠকের সংখ্যা প্রায় ছিল না বলা যায়। পাঁচটি সাময়িকপত্রেরই প্রতি সংখ্যার গড় গ্রাহক-সংখ্যা প্রায় ৬০০ থেকে ১০০০ বলে অনুমিত হয়। ফলত, সম্পাদকের পরিচিত মানুষেরা যেমন নিয়মিত লেখা দিয়েছেন, তেমনি বিপুল সংখ্যক অপরিচিত, স্বল্প-পরিচিত গ্রাহক-পাঠক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে লেখা পাঠিয়েছেন সম্পাদকের দপ্তরে। বিশেষত ভাণ্ডার পত্রিকায় পাঠকদের উদ্দেশে দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বদেশী-আন্দোলনের প্রেক্ষিতে নানান ‘প্রশ্ন’-রাখা হ’ত। আহবান করা হ’ত পাঠক-গ্রাহকের ‘উত্তর’। সেই উত্তরদাতাদের সিংহভাগ ছিলেন সম্পাদকের অপরিচিত।
আরও কয়েকজন লেখকের সন্ধান আমরা পাই, যাঁরা প্রথমে রবীন্দ্রনাথের অপরিচিত ছিলেন। পত্র-মারফৎ তাঁদের সঙ্গে আলাপ হয়। পরে সেই আলাপ ঘনিষ্ঠ-অন্তরঙ্গতায় পরিণত হয় এবং তাঁরা আজীবন রবীন্দ্র-স্নেহধন্য হয়ে ওঠেন। যেমন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (কথা সাহিত্যিক)। এছাড়াও মালদহের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট উমেশচন্দ্র বটব্যাল, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের দেশের বাড়ি বাঁকিপুরের বন্ধু অতুলচন্দ্র ঘোষ ওরফে বীরেশ্বর গোস্বামীর সঙ্গে পত্রযোগেই সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথের আলাপ। এঁরা সকলেই রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলিতে লিখেছিলেন।
যে সমস্ত লেখকদের ব্যক্তিপরিচয় আমরা বিভিন্ন গ্রন্থ, সাময়িকপত্র ঘেঁটেও সংগ্রহ করে উঠতে পারিনি, বা বিস্তারিত কোনও তথ্য যোগাড় করা সম্ভব হয়নি, তন্নিষ্ঠ অন্বেষণের পর আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, এই সমস্ত লেখকেরা সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথের তেমন ঘনিষ্ঠ নন। এঁরা সম্পাদকের অপরিচিত, নয় স্বল্প-পরিচিত, অর্থাৎ সম্পাদকের পরিচিত ব্যক্তি মারফত অথবা ডাকযোগে লেখা পাঠিয়েছিলেন বিবেচনার জন্য অথবা সাধারণ গ্রাহক-পাঠক। যাঁরা স্বতোৎসাহিত হয়ে ধারণ করেছিলেন লেখনী, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রেরণ করেছিলেন রচনা।
এখানেই একজন সম্পাদকের সার্থকতা, যিনি আরও অসংখ্য মানুষকে নানা বিষয়ে লেখনী ধারণে বাধ্য করতে পারেন। সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বল্পপরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তিদেরও স্বতোপ্রাণোদিত হয়ে রচনা-প্রেরণে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন তাঁর সম্পাদনা-গুণে। ক্লাসিক-সাহিত্যের মানদণ্ডে হয়তো এই সমস্ত লেখকদের রচনা কালোত্তীর্ণ শিরোপা লাভ করবে না, তবু সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথের সাময়িকপত্রে তাঁদের রচনা স্থান পাওয়ায় তা অকিঞ্চিৎকর বলে দূরে সরিয়ে রাখার সাহসও কোনও গবেষকের হবে না।
একটি, দুটি, বা কয়েকটি লেখা দিয়ে যে সমস্ত লেখকেরা অ-পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে পাঠক মহলে পরিচিত হতে চেয়েছিলেন, তাঁরা হলেন—
অনঙ্গমোহন লাহিড়ী, অন্নদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অম্বিকাচরণ উকিল, অম্বিকাচরণ মজুমদার, অশ্বিনীকুমার দত্ত, ইন্দ্রনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, উমেশচন্দ্র দাশগুপ্ত, কামিনীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীচন্দ্র নাথ, কৃষ্ণচরণ মজুমদার, কুমুদিনীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, কুলচন্দ্র রায়চৌধুরী, কেরামতুল্লা মুন্সী, গিরিজাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, গিরিশচন্দ্র রায়, গোপালকৃষ্ণ, গোপালচন্দ্র লাহিড়ী, গোপালচন্দ্র শাস্ত্রী, জিতেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য, জীবেন্দ্রকুমার দত্ত, জ্ঞানেন্দ্রশশী গুপ্ত, তরুণকুমার রায়, তরুণ [রাম] ফুকন, তারকচন্দ্র রায়, ত্রৈলোক্যনাথ মৌলিক, ত্রিগুণানন্দ রায়, দীনেন্দ্রকুমার দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ধর্ম্মানন্দ মহাভারতী, নরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, নলিনীকান্ত সেন, নলিনীনাথ রায়, নিকুঞ্জবিহারী দত্ত, নিত্যগোপাল মুখোপাধ্যায়, নির্ঝরিণী ঘোষ, পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদ্যোৎ, প্রবোধ [গঙ্গোপাধ্যায় ?], প্রবোধচন্দ্র মজুমদার, প্রসন্নকুমার ভট্টাচার্য, প্রেমবল্লভ গুপ্ত, পৃথৃীশচন্দ্র রায়, প্যারীশঙ্কর দাশগুপ্ত, বরদাকান্ত [চন্দ্র?] তালুকদার, বামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়, বামাচরণ বসু, বিজয়চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিনয়েন্দ্রনাথ সেন, বেণীভূষণ রায়, ব্রজসুন্দর সান্যাল, ব্রজেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য, ব্যোমকেশ মুস্তফী, ভবানীচরণ ঘোষ, ভুবনমোহন চট্টোপাধ্যায়, ভুবনমোহন মৈত্রেয়, ভূতনাথ ভাদুড়ী, মহিমচন্দ্র মহিন্তা, মহেশ্বর ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন চৌধুরী, মন্মথনাথ দে, মন্মথমোহন বসু, মোক্ষদাকুমার বসু, মিঃ রসুল [আবদুল রসুল], মৌলবী মহম্মদ ইমাদুদ্দিন, মৌলবী সিরাজুল ইসলাম, যতীন্দ্রমোহন গুপ্ত, যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যতীন্দ্রভূষণ আচার্য, যদুনাথ চক্রবর্তী, যাত্রামোহন সেন, যোগেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়, যোগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রজনীকান্ত দাস, রমেশচন্দ্র বসু, রসিকমোহন চক্রবর্তী, রাখালচন্দ্র সেন, রাজকৃষ্ণ পাল, রাধাবল্লভ রায়, ললিতচন্দ্র সেন, শরৎচন্দ্র রাহা, শরচ্চন্দ্র শাস্ত্রী, শশধর রায়, শ্রীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীনাথ সেন, সতীশচন্দ্র আচার্য, সুকুমারচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধচন্দ্র রায়, সুরেশচন্দ্র চৌধুরী, সুরমাসুন্দরী বসু, হরচন্দ্র রায়, হেমেন্দ্রলাল কর, হরিহরপ্রসাদ ঘোষ ।
রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত সাময়িকপত্র-পঞ্চে ‘রবি-বলয়’ভুক্ত লেখকদের নানা-বর্গে বর্গীকরণ করতে গিয়ে আমরা লক্ষ্য করেছি, কোনও কোনও লেখকের একাধিক-বর্গে উপস্থিতি। কারণ একাধিক-সূত্রে তাঁরা সম্পাদক-রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগসূত্র রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই একাধিক পরিচয়েই আমরা তাঁদের চিহ্নিত করতে চেয়েছি।
আত্মপরিচয়-এ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘একটিমাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছু নয়, আমি কবি মাত্র।’ ‘কবি’ এখানে ব্যাপক অর্থে সৃষ্টিকর্তা রবীন্দ্রনাথ। কবির কাজ কী? সে কথাও ‘আত্মপরিচয়’-প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন- কবির কাজ বহুমানুষের ‘চিত্তকে উদ্বোধিত করে তোলা’। বহুমানুষের চিত্তকে উদ্বোধিত করতে গিয়ে শুধু কবি নয়, কবি-কর্মীর ভুমিকাও তাঁকে পালন করতে হয়েছে। তাঁর নিজের ভাষায় – “আমাকে এখানে আপনারা বিচার করবেন কবি রূপে নয়, কর্মী রূপে…” (পল্লীপ্রকৃতি / সম্ভাষণ ) রবীন্দ্রনাথের সেই বহুমাত্রিক কর্মজগতের অন্যতম হল সাময়িকপত্রের সম্পাদনা। সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলিকে তিনি শুধু নিজের লেখা প্রকাশের হাতিয়ার করে তোলেন নি, পত্রিকাগুলির আদর্শ-মান অনুযায়ী একটি লেখকগোষ্ঠীও তৈরি করে ফেলেছিলেন। লেখক তৈরির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কর্ম- তৎপরতা কেমন ছিল সে সম্পর্কে জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন – “লেখক তৈরী করবার জন্য তাঁর যে প্রচেষ্টা দেখেছি তা এখনো ভাবলে অবাক হই। কেউ কোনো কাজ করছে জানতে পারলে কবি কী উৎসাহই না দিতেন! … তিনি বলতেন, আলো থেকেই আলো জ্বালানো যায়, জ্ঞান তপস্বীরাই জ্ঞান বিতরণ করতে পারেন।”
তথ্যসূত্র ও উল্লেখপঞ্জিঃ
১। বিস্তারিত তথ্য সংগৃহীত হয়েছে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলা সাময়িকপত্র (১ম ও ২য় খণ্ড) এবং গীতা চট্টোপাধ্যায়ের বাংলা সাময়িক পত্রিকাপঞ্জী (১৯০০-১৯১৪) ১ম খণ্ড গ্রন্থ থেকে।
২। সুবর্ণলেখা – আধুনিক ভারতীয় ভাষা বিভাগের সুবর্ণজয়ন্তী স্মারক গ্রন্থ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৪), গ্রন্থান্তর্গত প্রবন্ধ- আধুনিক ভারতীয় ভাষা বিভাগের প্রথম পঁচিশ বৎসর ১৯১৯ – ১৯৪৪ – যতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায় পৃ. ২৭-১২৮
৩। তদেব
৪। অজিতকুমার চক্রবর্তী: ব্রহ্মবিদ্যালয়, সুধীরঞ্জন দাস: আমাদের শান্তিনিকেতন, গৌতম ভট্টাচার্য: আশ্রমকথা (তত্ত্ববোধিনীপত্রিকায় ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সূচনাপর্ব) প্রভৃতি আরও কয়েকটি গ্রন্থ থেকে তথ্যাদি সংগৃহীত।
৫। দ্র; পূর্বোক্ত গ্রন্থগুলি
৬। প্রশান্তকুমার পাল: রবিজীবনী ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৯৩
৭। তত্ত্ববোধিনীপত্রিকা, পৌষ – ১৮৩৩ সংখ্যা
৮। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্ররচনাবলী – ২৭ খণ্ড / আশ্রমের রূপ ও বিকাশ পৃ. ৩২৪
৯। চিত্রা দেব: ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল, সমীর সেনগুপ্ত: রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন – প্রভৃতি আরও কয়েকটি গ্রন্থ থেকে তথ্যাদি সংগৃহীত।
## এছাড়াও, রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত সাধনা, ভারতী, নবপর্যায় বঙ্গদর্শন, ভাণ্ডার এবং তত্ত্ববোধিনীপত্রিকা গুলি থেকে যাবতীয় তথ্যাদি সংগৃহীত মৎপ্রণীত সম্পাদক রবীন্দ্রনাথের লেখকেরা গ্রন্থ (এবং মুশায়েরা, কলকাতা প্রকাশিত) থেকেও প্রয়োজনীয় অংশ গৃহীত হয়েছে।
## বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য- মৎপ্রণীত, গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত গবেষণা অভিসন্দর্ভ- রবীন্দ্রনাথ-সম্পাদিত-সাময়িকপত্রে সম্পাদক ব্যতীত অন্যান্য লেখক ও তাঁদের রচনা (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় – ২০১২)
লেখক, শুভাশিস মণ্ডল, সহ শিক্ষক (বাংলা), কসবা চিত্তরঞ্জন হাই স্কুল, কসবা, কলকাতা।