কোন বড় শত্রু নয়, সামান্য ভাইরাস নাস্তানাবুদ করে দিল পৃথিবীকে। আমরা দেখলাম মানুষের দুরাবস্থা, বিশেষ করে গরীব মানুষদের। যারা কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে বাড়ি ফিরতে গিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি-শিক্ষা-সংস্কৃতির ভিতটা যে এখনও খুব পোক্ত নয়, অদৃশ্য ভাইরাসও তা ধরে ফেলেছে। না ধরার কোন কারণও নেই, পাশ দিয়ে চলেছে মৃত্যুর মিছিল, তবুও রাস্তায় মাস্কবিহীন মানুষ! আমরা ভুলে গেলাম করোনা ভাইরাসের সঙ্গে একা লড়াই করা কঠিন, কোন সাহস বা বীরত্ব তাকে কাবু করতে পারেনা।

আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আমাদের বাঁচাতে পারতো, তবুও আমাদের অনেকেই এটা ভাল, ওটা খারাপ, টিকা নেওয়ার পরেও কোভিড হয়েছে জাতীয় দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলে প্রতিষেধক টিকা নিলাম না! কোভিড দেখিয়ে দিল এমন সঙ্কট মোকাবিলা করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলি হয়েছে তাদের প্রতি মানুষের কোন আস্থা নেই, আর তারাও সঙ্কটের সময় চলে সরকার বা দলের অনুশাসন মেনে। কখনও বা প্রবল হয়ে ওঠে আমরাই শেষ কথা জাতীয় অহংবোধ। জেনেটিক রোগ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে বুঝতেই পারলাম না জাঁকিয়ে বসেছে জুনোটিক ব্যাধি! মানুষের লোভ নষ্ট করেছে প্রাণীকুলের খাদ্যশৃঙ্খল। পশুপাখির রোগ আসছে মানুষের শরীরে। নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনলাম আমরা!
চুল্লিতে শব ছুঁড়ে ফেলা, রাস্তা দিয়ে লাশ টেনে নিয়ে যাওয়া, গঙ্গা দিয়ে লাশ ভেসে যাওয়া সবই আমাদের পোশাকি পারিপাট্যকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। এর মধ্যেই আমরা মেতেছি উৎসবে, আড়ম্বর ও বাগাড়ম্বর কোনটাই বন্ধ হয়নি। অতিমারি নিয়ন্ত্রণকেও আমরা বানিয়ে তুলেছি দলবাজির আখড়া। পুজো-ভোট-প্রচার সবকিছুর স্বপক্ষেই নিজের মত করে যুক্তি হাজির করেছি। প্রাণপণ সাফাই দিতে চেষ্টা করলেও এটা প্রবল হয়ে উঠছে যে আমাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দুর্বল, স্বচ্ছ পানীয় জল, শৌচালয়, জলদূষণ নিয়ন্ত্রণ সবকিছুতেই ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বের দাপুটে রাষ্ট্রনায়কেরা। বেড়েছে অনাহার ও অপুস্টি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এসবের সঙ্গে কোভিডের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু পরিকাঠামোর দুর্বলতা যে কোন সঙ্কট মোকাবিলার কাজ কঠিন করে দেয়। এটাও এখন পরিস্কার যে কোন চলতি উন্নয়ন প্রক্রিয়াতে অতিমারি থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মত সমস্যার সমাধান করা যাবেনা। অথচ দুনিয়াদারির দেখভাল করার যারা দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন তারা ব্যাপারটা বুঝতেই পারলেন না।

এত বিপর্যয়ের পরেও মানুষের মেধা একবছরের মধ্যে কোভিড মোকাবিলার ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পেরেছে। কিন্তু আমরা ‘জয় মানুষের জয়’ তো বলতে পারছি না। কারণ তা নিয়েও শুরু হয়েছে দেশে দেশে ঝগড়া আর ফার্মা মেজরদের মুনাফাবাজি। এই সঙ্কটও আমাদের মানুষকে মানুষ বলে ভাবতে শেখালো না! কোভিড-১৯ সভ্যতার মুখের সামনে একটা আয়না ধরে আমাদের অবস্থাটা একবার দেখিয়ে দিল। এই দুঃসময়েও আশার কথা একটাই — দুঃখ, আশা আর প্রার্থনা মানুষকে অনেকটা এক সারিতে এনেছে।