মিল্টন বিশ্বাস
আজ ১ আগস্ট (২০২০) পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই ঈদ উদযাপনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে নিজের পশুত্বকে বলি দেয়ার দৃষ্টান্ত নবী ইব্রাহিমের সময় থেকে আজ অবধি মহিমান্বিত। তবে ত্যাগের মহিমায় নিজেকে উৎসর্গ করার এই দিনটি এবার ব্যতিক্রম। গত কয়েক বছর যাবৎ আমরা দেখেছি এই ঈদের সময় দেশের একটি বড় অংশ বন্যায় প্লাবিত হয়। এতে আনন্দ মাটি করে দিয়ে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় মানুষকে। এবারও দেশের বিস্তৃত অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গ্রামের মানুষ যত্ন করে লালন-পালন করা গবাদি পশু বিক্রি করতে পারেনি কোরবানির হাটে। কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে তাও এবার নেই। কারণ বন্যার আগে মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ এর মহামারির ছোবল আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। মারণব্যাধির কবলে পড়ে বাংলাদেশে তিন হাজারের বেশি মৃত্যু এবং কয়েক লাখ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার বাস্তবতা জীবনকে অন্য রকম করে পরিচালিত করছে। এজন্য ঈদের উৎসবের চেয়ে মানুষের বেঁচে থাকা, সুস্থ থাকা বড় হয়ে উঠেছে।
২.
এবারের ঈদ ১ আগস্টে অর্থাৎ শোকের মাসের সূচনা দিনে উদযাপিত হচ্ছে। জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের এবারের মাসটি আলাদাভাবে পালিত হওয়ার কথা ছিল। কারণ ‘মুজিববর্ষে’র উৎসবে সারা বিশ্বের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে অদৃশ্য জীবাণুর কাছে আমরা হেরে গেলাম। কিন্তু মানুষ দমে যাবার পাত্র নয়। এজন্য ভিন্ন মাত্রায়- অনলাইন ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় উৎসব ও উদযাপন চলছে এবং আরো কিছু দিন লকডাউনে থাকলেও তা পরিস্থিতি সামলে পরিচালনা সম্ভব হবে।
মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্যোগে সরকারকে সহযোগিতা না করে কিছু মানুষ লোভের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর নজরদারিতে স্বাভাবিক হচ্ছে অনেক কিছুই। কয়েকদিন আগে জঙ্গিবাদী হামলার সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী সতর্ক করেছে সকলকে। এজন্য মানুষের মনে ভয়ও আছে। কারণ ২০১৬ সালে শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে জঙ্গিগোষ্ঠী হামলা করেছিল। মহামারিতে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী ব্যস্ত থাকায় অপরাধীরা সুযোগ পেতে পারে। এজন্য আমাদের সতর্ক থাকা বেশি দরকার।
জুলাই মাসজুড়ে একটানা বৃষ্টির কারণে সড়ক পথের নানা দুর্ভোগের কথা সকলের আগে থেকেই জানা। বন্যার তোড়ে অনেক এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাছাড়া ঈদকে সামনে রেখে ছিনতাইকারীদের অপতৎপরতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। সব মিলিয়ে যে আতঙ্ক-আশঙ্কা আছে তা দূর হওয়ায় ঈদের দিনের অনাবিল আনন্দ-উৎসবের একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলা যায়।প্রতিবছরই আমরা দেখে থাকি, নির্বিঘ্ন ঈদ উদযাপনের কৃতিত্ব প্রথমে সাধারণ মানুষের, তারপর সরকারের। মানুষের ধৈর্য ও সরকারের সহায়তায় একটি সুন্দর ঈদ অনুষ্ঠিত হয়েছে অতীতে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্বাস্থ্য সচেতন হতে বলেছেন। ৩১ জুলাই বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সড়কে যানজট ও ভিড় স্বাস্থ্যবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।

৩.
এবার মহামারি ও বন্যা থাকলেও এর আগে ঈদের বাস্তবতা ছিল অন্যরকম। বর্তমান সরকারের শত প্রচেষ্টা এবং আন্তরিকতা সত্ত্বেও ঈদের সময় দেখা যেত- ‘অজ্ঞান পার্টি, থুতু পার্টি, ধাক্কা পার্টির সীমাহীন দৌরাত্ম্য, সক্রিয় পকেটমার, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী।’ঈদ আনন্দ উদযাপনের জন্য এ পরিস্থিতি মানুষ মুখবুঁজে সহ্য করলেও প্রত্যেকেই ভেতরে ভেতরে প্রবলভাবে আতঙ্কিত আর ক্রমাগত মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ঈদের সময় মানসিক যাতনা ও আর্থিক ক্ষতির একটি সাধারণ চিত্র ছিল। জাল টাকার অবাধ চলাচল ছিল কোরবাণির গরুর হাটে। মানুষ অবাক হয় যেত প্রতারণার অভিনবত্বে। আসল টাকা জাল টাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হতো, ওইটির পরিবর্তে নকল টাকা ধরিয়ে দিত প্রতারক চক্র। আর তা ঘটত মানুষের অন্যমনস্কতার সুযোগে। জাল টাকার প্রতারণা যেমন তেমনি ঈদের মার্কেটে পণ্য দ্রব্যের উচ্চমূল্য হাকা এবং ‘ঈদ ‘ঈদ’ বলে অতিরিক্ত টাকা বাগিয়ে নেবার প্রবণতা সর্বত্রই অসহনীয় হয়রানির দৃষ্টান্ত ছিল। এর উপর ছিল চৌদ্দ ঘাটের ষোল রকমের চাঁদাবাজি। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হতো, ‘পুলিশের চাঁদাবাজি’শিরোনামের খবর। সেখানে বলা হয়, ‘সুযোগসন্ধানীদের সরকারি সম্পত্তি দখল করে অবৈধ দোকান নির্মাণ, কাঁচাবাজার বাসানো, ফুটপাত দখল করে হকারদের দোকানপাট বসানো- এসব অনেক দিন ধরেই চলে এসেছে। পুলিশের কাজ হচ্ছে এসব অবৈধ উদ্যোগ প্রতিহত করা। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ কাজে পুলিশের এক শ্রেণির সদস্য নিয়মিত সহযোগিতা করে। বিনিময়ে মাসোহারা বা চাঁদা আদায় করে।’এই চাঁদার অঙ্ক মাসে অর্ধশত কোটি টাকার বেশি। বেদখলকৃত জমি উদ্ধার না করে অবৈধ স্থাপনাকে স্বীকৃত দিচ্ছে পুলিশ এবং তা চাঁদার বিনিময়ে। আর চলাচলের জায়গায় দোকানপাটের কারণে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনি সেখানে চুরি, ছিনতাইয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। রাজধানীর চিত্র এটি। ঈদের উপলক্ষ থাকলেই বা কি, না থাকলেই বা কি? এ ধরনের কাজ স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য হচ্ছে দেশের সর্বত্রই।