| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইদের চাঁদ : ছোটগল্প লিখছেন জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় / ৫৯৩ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৪ মে, ২০২১

সত্যি বলতে কি আমার বড়ো হয়ে ওঠাটা কোনও নিয়মশৃঙ্খলায় আবদ্ধ ছিল না। গাছ যেমন মাটি ফুঁড়ে তার আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠে। আমিও খানিকটা তাই।

তখন মনে হয় আমি ক্লাস টু কিংবা থ্রিতে পড়ি।

আমি যে গ্রামে থাকতাম সেই গ্রামের বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণ পরিবার হিসেবে আমাদের বেশ সুনাম আছে।

তার ওপর যে তিন ঘর ব্রাহ্মণ এই গ্রামে থাকে, তার মধ্যে আমরা অন্যতম। আমাদের বাড়িতে প্রাচীন গৃহদেবতা আছেন। বাৎসরিক তার উৎসব হয়। উৎসবের দিন গ্রামসুদ্ধ সবাই উপচে পড়ে। তা ছাড়া এই পরিবারটা শিক্ষিত পরিবার। এই পরিবারের একজন এই ব্লকের একমাত্র হাই স্কুলের শিক্ষক। তিনি মনাকাকা।

আমাকেও গ্রামের সকলে চেনে।

তখন আমার তিনটে প্লাস পয়েন্ট, আমি মাতৃপিতৃহারা সন্তান। আমার বাবাও মনামাস্টারের সঙ্গে একই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, গত হয়েছেন। মা-বাবার অবর্তমানে মনাকাকা আমার লিগ্যাল গার্জেন। সবচেয়ে বড়ো কথা আমরা এই গ্রামের বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণ পরিবার। জাতি শ্রেষ্ঠ।

হয়তো খুব দুষ্টু ছিলাম। তাই কাকিমা স্কুলে বেরোবার সময় প্রত্যেক দিন বলতেন, স্কুলে গিয়ে দুষ্টুমি করবে না। ভালোভাবে থাকবে।

সেদিনও সকালে বাড়ি থেকে বেরোবার সময় কাকিমা বললেন, স্কুলে একবারে বাঁদরামো করবি না, প্রত্যেকদিন মানুষটার কাছে মার খাস, ভালো লাগে না।

মাথা দুলিয়ে ছুট্টে চলে গেলাম নদীবাঁধের ওপর। কাঁধে বাজারের থলির মধ্যে স্লেট-পেনসিল, সহজপাঠ, বর্ণপরিচয়, নামতার বই। বাঁধের ওপর দিয়ে যেতে যেতেই রাস্তা থেকে কয়েকটা মাটির ঢেলা তুলে নিয়ে নদীর বুকে ছুড়ে মারলাম।

ডুব করে একটা আওয়াজ হয়ে জলটা কেমন গোল হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো, বেশ লাগতো দেখতে। শিশুমনের খেলা। কিছুতেই সেই সময় কাকিমার কথা মনে থাকতো না। হাতের কাছে মাটির ঢেলা পেলে হাতটা কেমন নিশপিশ করতো।

স্কুলের সামনে খোলা মাঠে এসে দাঁড়াতেই দেখলাম অনাদিমাস্টার স্কুলের বারান্দায় বেত হাতে দাঁড়িয়ে।

বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, এতক্ষণ কোথায় ছিলি?

বোবার শত্রু নেই, মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।

প্রার্থনা করতে হবে না—

সবাই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

অনি—অনাদি মাস্টারের ষাঁড়ের মতো গলায় চমকে তাকালাম।

শুরু কর।

প্রথমে ধনধান্য পুষ্পে ভরা…, তারপর হও ধরোমেতে ধীর, হও করোমেতে বীর…, শেষে জনগণমন অধিনায়ক জয় হে।

গাওয়ার পরেই যে যার ক্লাসে যাওয়ার কথা।

আমাদের ক্লাসরুম সামনের বটতলায়। ওটা ক্লাস টু। দঙ্গল বেঁধে সেদিকে হাঁটা লাগালাম।

অনি। স্যারের ডাকে আবার ফিরে তাকালাম।

একপিরিয়েড হয়ে ছুটি, গিয়ে পাঁচের ঘর পর্যন্ত নামতা পড়ো।

আমি ক্লাসের মনিটর। লিডার।

মনে আনন্দ ধরে না, হইহই করে চলে এলাম বটতলায়।

আমার পাশে বাসু, চিকনা। আমরা সব হরিহর আত্মা।

অনি, পড়াবি না—কাকলি চেঁচিয়ে উঠলো।

তোরা পড় আমি পরে পড়াচ্ছি।

চিকনাকে বললাম, আজ কিসের ছুটি রে?

চাঁড়াল। জানুনি।

দেখলাম পেছন থেকে সবাই হেসে উঠলো।

ওলাওঠা। দিলাম একটা ঘুসি চিকনার পিঠে।

মারলু কেনে?

বেশ করছি, গাল দিলু কেনে, তোকে কইছি কীসের ছুটি।

আজ মুসলমান পাড়ায় পরব আছে।

সামনের দিকে চোখ চলে গেল। কাউকে যেন নিবিড় করে খুঁজতে শুরু করে দিলাম। সেই জন্য আজ আয়েশা আসেনি। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

আয়েশা স্কুলে এলে আমাদের সঙ্গেই বসে, আমাদের সঙ্গেই খেলা করে। বাড়ি থেকে তাল পাটালি চুরি করে নিয়ে এসে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেয়।

কেমন যেন লাগল, নামতা পড়তে ইচ্ছে করলো না। চিকনারা তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে একে একে এক, একে দু-এ দুই, একে তিনে তিন….।

উঠে দাঁড়ালাম।

কুথা যাচ্ছু? চিকনা হাতটা ধরলো।

আসতিছি।

সোজা চলে এলাম স্কুলের পেছনে, আমার প্রিয় বকুল গাছটার তলায়। চারিদিক নিস্তব্ধ। পাখির কিচিরমিচির চারদিক ম ম করছে। কয়েকটা পাকা বকুল ফল কুড়িয়ে গাছের তলায় বসলাম।

প্রায় দিনই আয়েশা আমাকে হাত ধরে এখানে নিয়ে চলে আসতো। কোনওদিন পেয়ারা, কোনওদিন শসা, কোনওদিন পাটালি খাওয়ায়।

একদিন ওকে বলেছিলাম, তুই আমাকে একা দিস কেন, চিকনাদের দিস না কেন?

তোকে দিতে ভালো লাগে।

দুজনে বেশ বকুলগাছের তলায় দাঁড়িয়ে মজা করে খেতাম। কখনও কখনও এক্কা-দোক্কা খেলতাম।

বাড়ি ফেরার পথে, আমরা সকলে দঙ্গল বেঁধে বেরোতাম, আসার পথে বেণীর মোড় বলে একটা বাঁক আছে। সেখান থেকে ডান দিকের মেঠো পথ ধরে আয়েশা চলে যেত ওর বাড়ির দিকে, আমি চলে আসতাম আমার বাড়ির পথে।

সত্যি কথা বলতে কি ওই দিকটা মুসলমান পাড়া।

সেদিন আয়েশা এলো না, আমার পাটালি খাওয়া হলো না।

স্কুল ছুটি হয়ে গেল।

চিকনারা স্কুল ছুটির পর খেলতে গেল। আমার খেলতে যেতে ইচ্ছে করলো না।

একা একা ফিরে আসছি বাড়ির পথে।

বেণীর মোড়ে আসতেই দেখলাম মাঠের ওপর দিয়ে আয়েশা ছুটতে ছুটতে আসছে। তারস্বরে চেঁচাচ্ছে অনি, অনি।

আমি দাঁড়িয়ে পরলাম।

ওকে দেখেই মনটা কেমন ভালো হয়ে গেল।

কাছে আসতেই দেখলাম ও হাঁপাচ্ছে।

তুই স্কুলে গেলি না কেন! আজ এক পিরিয়েডে ছুটি হয়ে গেল। অনাদি মাস্টার পাঁচের ঘর পর্যন্ত নামতা পড়েতে বলেছিল, ভালো লাগলো না। পড়িনি।

আয়। আয়েশা আমার হাতটা শক্ত করে ধরলো।

কোথায়!

আয় না।

দুজনে রাস্তার ডান দিকে পালের ঘরের বাঁশ বাগানে চলে গেলাম। সামনের বিরাট ঝিলটায় থরে থরে শালুক ফুল ফুটে রয়েছে। বকগুলো হাঁটু জলে চোখ বুজে ধ্যান করছে।

জানিস অনি, আজ আমাদের পরব।

পরবটা কি রে?

ইদ রে ইদ।

সেটা কি!

তোদের যেমন দুগ্গাপুজো, আমাদের তেমনি ইদ।

আয়েশা ওর জামায় হাত দিলো।

নতুন জামা পরেছি, নতুন প্যান্ট পরেছি। তোরা দুগ্গাপূজোর সময় পরিস না?

আমি মাথা দোলালাম।

আমাকে দেখতে ভালো লাগছে?

হাসলাম।

আম্মি স্কুলে আসতে দিলো না। বললো স্কুল ছুটি।

এক পিরিয়েড হয়েছে।

কাল চাঁদ উঠতে দেরি করলো যে।

আমি কেমন যেন অবাক হয়ে তাকালাম আয়েশার মুখের দিকে। হাসি হাসি মুখ, চোখ দুটো অসম্ভব সুন্দর লাগছিল, কপালে কুমকুমের টিপ। মাথায় লাল ফিতে দিয়ে টেনে বিনুনি করেছে।

কাল চাঁদ ওঠেনি তো অন্ধকার পক্ষ ছিল!

তুই দেখিসনি। আমরা দেখেছি।

আমি আয়েশার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে।

আয় এদিকে।

আয়েশা আমার হাতটা আবার শক্ত করে ধরলো।

কোথায় যাবি?

আয় না।

আমাকে বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে নিয়ে গেলো।

এখানে বোস।

কেন!

বোস না।

আমি মাটিতে বসে পরলাম।

আয়েশা জামাটা তুলে ধরলো।

ওর লাল ইজের প্যান্টটা দেখতে পেলাম।

জামাটা ধর, বার করি।

আমি জামাটা ধরলাম।

আয়েশা ইজের প্যান্টের গুটিয়ে রাখা ভাঁজ থেকে একটা কাগজের মোড়ক বার করলো।

উঠবি না। এখানে বসবি।

ছুটে চলে গিয়ে একটা শুকনো বড়ো শাল গাছের পাতা তুলে নিয়ে এলো।

কাল রাতে নামাজ পড়ার পর যখন খেলাম, আমার থেকে তোর জন্য তুলে রেখেছিলাম।

পাটালি?

আয়েশা আমার সামনে বসলো।

কাগজের মোড়ক থেকে খেজুর, কিসমিস, আখরোট, কাজুবাদাম বার করে কুড়িয়ে আনা বড়ো শাল পাতায় রাখলো।

খা।

তুই খাবি না।

আমি খেয়েছি। এটা তোর জন্য।

একটু খা।

আমি একটা খেজুর একটু খানি কামড়ে ওর মুখের সামনে তুলে ধরলাম।

আয়েশা ঠোঁট ফাঁক করে মুখে নিলো।

আমি খাই আয়েশা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর চোখে যেন বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা।

জানিস অনি, আম্মি বলছিল তোর বাবা বিরাট বড়ো মাস্টার ছিল, মনা মাস্টারের থেকেও বড়ো। আমার চাচাতো দাদা ওনার কাছে পড়েছে।

কী জানি।

তখন সত্যি আমার আয়েশার কথার দিকে মন নেই, আরাম করে কাজু-কিসমিস খাচ্ছি।

আয়েশা তার মতো বলে চলেছে।

খাওয়া হয়ে যেতে উঠে দাঁড়ালাম। সামনের ঝিলে হাত ধুলাম।

কাল স্কুলে যাবি?

যাবো।

আগে আগে যাবি। তোকে বকুলবাঁশি বানিয়ে দেবো।

আচ্ছা।

আমি এগিয়ে চললাম।

বাঁকের মুখটায় একবার পেছন ফিরে তাকালাম। আয়েশা দাঁড়িয়ে, হাত নাড়ল। আমিও হাত নাড়লাম।

বাড়িতে ঢুকতেই দেখলাম কাকা বারান্দায় বসে।

কাছে ডাকল।

গেলাম।

ঠাস করে গালে একটা রাম থাপ্পড়। কাঁধ থেকে ব্যাগ ছিটকে মাটিতে লুটোপুটি। বেদম প্রহার চললো কিছুক্ষণ। কাকিমা ছুটে এসে কোনওপ্রকারে রক্ষা করলো।

এই বয়সে পাকামো। মানসম্মান মাটিতে মিশিয়ে দেবে। শয়তান ছেলে।

রাগের চোটে কাকিমার হাত থেকে ছিটকে চলে গেলাম পেছনের পুকুর ধারে। হাতে পায়ের থাইতে বেতের দগদগে দাগ। হাত বোলাই আর প্রাণ খুলে কাঁদি। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

কাকা কেন বললো, আমি কাকার মানসম্মান ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছি! কাঁদতে কাঁদতে কাকাকে মনে মনে খুব গালাগাল দিলাম।

আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম, মা, আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চলো না। আর ভালো লাগে না। কেউ আমাকে ভালোবাসে না। সবাই আমাকে মারে, বকে।

জানি না সেদিন মা আমার কথা শুনেছিলেন কিনা।

কাকিমা ভুলিয়ে ভালিয়ে ধরে এনে তেল মাখিয়ে স্নান করালো। দেরেমুশে কাকাকে গাল দিলো। আদর করে ভাত মেখে খাইয়ে দিলো।

খাওয়াতে খাওয়াতেই কাকিমা জিজ্ঞাসা করলো—

আজ স্কুলে কী দুষ্টুমি করেছিলি?

আজ দুষ্টুমি করিনি। তুমি বারণ করেছিলে।

আনাদি মাস্টার বলে গেল যে, কোন মেয়ের প্যান্ট ধরে টেনেছিলি।

না-তো। আমি তো বটতলায় গিয়ে নামতা পড়ছিলাম। ভালো লাগল না। বকুল গাছের তলায় চলে গেলাম। আজ নামতা পড়িনি।

কাকিমা গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো, কিছুটা কাঁদল।

রাতে বারান্দায় শুয়েছি। গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন বারান্দার বাঁশ বেয়ে চালে উঠে আকাশ দেখেছি, চাঁদ উঠেছে কিনা। অনেককক্ষণ বসে থেকে যখন চাঁদ উঠলো না। এসে শুয়ে পড়লাম।

আয়েশা আর তারপর থেকে স্কুলে আসেনি। কেন আসেনি, আমি আজও জানি না।

কয়েক দিন পর খেতে খেতে কাকাকে বলতে শুনেছি, জানো মেয়েটার বিয়ে হলো।

কাকিমা উত্তরে বলেছে, অনি স্বীকার করেছে সে অন্যায় করেনি। তুমি মিছিমিছি ওর গায়ে হাত দিয়েছো।

আমার সামনে আর কথাটা বিশেষ এগোয়নি।

তখন বুঝিনি। কাঁচা বয়স।

আমাদের গ্রামে পিরবাবর থান আছে। সেটা একটা অশ্বত্থ গাছ। আমার বাবা না কি পিরবাবর দেখা পেয়েছিলেন। কাকার মুখ থেকে পিরবাবার সেই গল্পের কথা শুনেছিলাম। আমাকে হাতে ধরে নিয়েও এসেছিলেন। প্রণাম করেছি। সকলে বলতেন পিরবাবা খুব জাগ্রত। মন দিয়ে পিরবাবাকে ডাকলে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়।

তখন গ্রীষ্মকাল সকালে স্কুল হতো। একদিন স্কুল থেকে ফিরে সোজা চলে গেলাম পিরবাবার থানে।

ভরা দুপুর, চারদিক শুনশান। খাঁ খাঁ করছে মাঠঘাট।

গাছের তলায় এসে প্রণাম করলাম। মনে মনে বললাম, পিরবাবা তুমি তো জাগ্রত। বাবা তোমায় দেখেছেন। আগে বলো, কেন তুমি আয়েশার বিয়ে দিয়ে দিলে? আমি এখন কার সঙ্গে খেলব? কে আমাকে পাটালি খাওয়াবে?

তখন ছোটো ছিলাম এর বেশি চাহিদা আমার ছিল না। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেললাম, কেউ কোনও কথা বললো না। ভীষণ রাগ হলো গাছটার ওপর। দু-চারটে মাটির ঢেলা তুলে গাছের গুঁড়িতে ছুড়ে মারলাম।

হঠাৎ কে যেন বলে উঠলো, ওরে পাগল ওর বিয়ে হয়নি।

চারিদিকে তাকাই কাউকে দেখতে পাই না।

কে কথা বলে? চেঁচিয়ে উঠলাম।

তুমি কে? আমার সামনে এসো।

আমার গলা এই ফাঁকা মাঠে রিনিঝিনি হয়ে আমার সামনেই ফিরে এলো।

কেউ এলো না। কথাও বললো না।

অনেকক্ষণ এদিক ওদিক খুঁজলাম, কাউকে পেলাম না।

বিকেলে বাড়ি ফিরে এলাম।

স্কুলে গিয়ে বকুল গাছটার তলায় দাঁড়ালেই আয়েশার কথা মনে পড়ে যেত।

নিজে নিজেই কেঁদে ফেলতাম।

কতদিন বেণীর মোড়ে দাঁড়িয়ে একা একা কেঁদেছি।

মনে মন বলতাম, পিরবাবা বলেছে আয়েশার বিয়ে হয়নি।

বড়ো হলাম। প্রাথমিক স্কুল থেকে হাই স্কুল। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলাম। ভালো রেজাল্ট হলো। মিললো কলকাতা আসার ছাড়পত্র।

কলকাতায় যেদিন আসবো, তার আগের দিন আমার গ্রামের ভালো লাগা জায়গাগুলো একবার করে দেখতে গেলাম। পিরসাহেবের থানেও এসেছিলাম। শেষে সেই বকুল গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তারপর বেণীর মোড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম। মনে হলো আয়েশা যেন আমার নাম ধরে ছুটতে ছুটতে আসছে। ওর সেই হাসিমাখা মুখখানা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।

আবার বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করে উঠলো। শেষে পালেদের বাঁশঝাড়। যে জায়গায় বসে আয়েশা আমাকে কাজুবাদাম, কিসমিস, খেজুর খাইয়েছিল সেই জায়গায় বসলাম। অনেক খুঁজেও সেই শুকনো শালপাতা খুঁজে পেলাম না। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, শাল গাছটাই কাটা হয়ে গেছে।

তখন অনেক কিছু বুঝতে শিখেছি। মনে পড়ে গেল সেদিন আয়েশার কপালে কুমকুমের টিপ, দীঘল চোখে গভীর হাসি।

বার বার কানের কাছে রিনিঝিনি করছে, আমাকে দেখতে ভালো লাগছে অনি?

বুকের ভেতরটা যন্ত্রণা করে উঠলো। আর দাঁড়ালাম না।

পায়ে পায়ে অনাদি মাস্টারের বাড়ি গেলাম। তখন অনাদি মাস্টার রিটায়ার করেছে। প্রণাম করে বলেছি, স্যার, আমি কাল কলকাতা চলে যাচ্ছি।

স্যার আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। আরও বড়ো হও। গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করো।

একবার ইচ্ছে হলো স্যারকে আয়েশার কথা জিজ্ঞাসা করি, পারলাম না।

বাড়ি ফিরেছি। ভেবেছিলাম কাকাকে জিজ্ঞাসা করি, তা-ও পারিনি।

কলকাতায় এসেছি।

ইদ বছর বছর ঘুরে এসেছে। যেখানে যে অবস্থাতে থেকেছি, গভীর রাতে ইদের চাঁদকে দেখতে চেয়েছি, আমার এই পোড়া চোখে ইদের চাঁদ আর ধরা পড়েনি।

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৯ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “ইদের চাঁদ : ছোটগল্প লিখছেন জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়”

  1. তপন মল্লিক চৌধুরী says:

    চমৎকার

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev