কেউ ভাবেনি তাই হলো। টুম্পা বিএ পরীক্ষায় পাশ করল। টুম্পা? বাবা খুশি হয়ে বলল, তুই আরও পড় আমি তোকে পড়াব।
টুম্পা বলল, আমি আর পড়ব না।
বাবা জিজ্ঞাসা করল, কেন?
পড়াশুনো করতে আমার ভালো লাগে না।
তাহলে কী করবি?
টুম্পা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
টুম্পার পাশে টুম্পার মা ছিল। মা জিজ্ঞেস করল, কথা বলছিস না কেন? কিছু বল। কী করতে চাস?
টুম্পা তবুও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বাবা-মা পড়ে গেল মুশকিলে। তারাও কী বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। শেষে মা বিরক্ত হয়ে বলল, পড়াশুনো যখন তোর ভালো লাগে না, তাহলে বিয়ে কর। করবি?
টুম্পা এবার লজ্জা কাটিয়ে বলল, করব।
মা তা শুনে টুম্পার বাবাকে বলল, তাহলে আর দেরি করে লাভ নেই। তুমি খবরের কাগজে ‘পাত্রী চাই’ বলে বিজ্ঞাপন দাও।
টুম্পা এ কথায় রেগে গিয়ে বলল, কোনো বিজ্ঞাপন দিতে হবে না, পাত্র আমি ঠিক করে ফেলেছি।
বাবা-মা দু-জনেই এ কথায় চমকে উঠল, তাদের অাদরের মেয়ে তলে তলে পাত্র ঠিক করে ফেলেছে! অথচ বাবা-মা হয়ে তারা কিছুই জানে না। মনে মনে তারা মেয়ের উপর বিরক্ত হলো। অসন্তুষ্ট হলো। কিছু বলার নেই। বলতে গেলে অশান্তি হবে। তাই মেয়ের কথা তারা নীরবে হজম করে নিলো শান্ত মনে। কিন্তু মা তার কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, পাত্রটি কে?
টুম্পা এবার সহজ গলায় বলল, পাত্র তোমাদের চেনা।
মা জানতে চাইল, চেনা তো বুঝলাম। কিন্তু কে সে?
নিখিলবাবু।
বাবা এ কথা শুনে চমকে উঠল, নিখিলবাবু! উনি তোকে বিয়ে করবেন?
টুম্পা বলল, করবে কিনা জানি না। তবে বিয়ে করতে হলে নিখিলবাবুকেই করব।
কিন্তু নিখিলবাবু তো ব্রাহ্মণ। তোকে বিয়ে করবে কেন? তা ছাড়া তুই ওনার ছাত্রী। এ বিয়ে লোকে ভালো মনে নেবে না।
টুম্পা বিরক্ত হয়ে বলল, ইয়ে করব আমি। লোকে এ নিয়ে কী ভাবল তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।
বাবা জানে টুম্পা অসম্ভব জেদি। যা বলবে তাই করবে। তাই সে এখন কী করে নিখিলবাবুর কাছে যাবে? কী করে বলবে আমার মেয়ে আপনাকে ভালোবাসে। আপনি তাকে বিয়ে করে আমাকে চিন্তামুক্ত করুন। সম্ভব নয়। এ কথা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার চেয়ে টুম্পা যা পারে করুক। এরমধ্যে তার নাক না গলানোই ভালো। তবে টুম্পাকে কথাটা বলা দরকার। তাই টুম্পার বাবা গম্ভীর গলায় বলল, তুমি নিখিলবাবুকে বিয়ে করতে পারো আমার তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু আমি নিখিলবাবুর কাছে গিয়ে হাতজোড় করে বলতে পারব না, আপনি আমার মেয়েকে গ্রহণ করুন। যা করার তোকেই করতে হবে। তুই এতে রাজি আছিস?
টুম্পা স্বাভাবিক গলায় বলল, রাজি।
টুম্পার বাবা তা শুনে বলল, কিন্তু নিখিলবাবু যদি এ বিয়েতে রাজি না হয় আমি কিছু করতে পারব না।
টুম্পা বলল, তোমাকে কিছু করতে হবে না, যা করার আমিই করব।
২.
একদিন সকালে টুম্পা নিখিলের কাছে গিয়ে হাজির হলো। নিখিল তখন সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। টুম্পাকে দেখে নিখিল খবরের কাগজ নামিয়ে রাখল। জিজ্ঞেস করল, তুমি!
টুম্পা নিখিলের সামনে এসে বলল, দরকারে এলাম।
নিখিল কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী দরকার?
—আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আপনার নিশ্চই এতে আপত্তি নেই?
—আছে, আপত্তি আছে।
—আপত্তি কীসের?
প্রথম কথা, তুমি আমার ছাত্রী। কোনো শিক্ষকের উচিত নয় তার ছাত্রীকে বিয়ে করা। এটা অনৈতিক কাজ। দ্বিতীয়ত তোমার কোনো বুদ্ধিসুদ্ধি নেই। তুমি খুব বোকা। আমি কোনো বোকা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি নয়।
টুম্পা এবার ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলো, শিক্ষক তার ছাত্রীকে বিয়ে করতে পারবে না এমন কোনো আইন পৃথিবীর কোথাও নেই। সুতরাং এ বিয়ে হতেই পারে। আর আজকাল এমন বিয়ে হামেশাই হচ্ছে। এটা নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয়ত আমি বোকা হতে পারি, কিন্তু খুব কাজের। আপনি এই ফ্ল্যাটে একা থাকেন। আপনার মা-বাবা নেই, ভাই নেই, বোন নেই, আপনি অসুখে পড়লে আপনাকে সেবা করব।
নিখিল বিরক্ত হয়ে বলল, আমি সেবাদাসী চাই না, তুমি এখন আসতে পারো।
টুম্পা রেগে গিয়ে বলল, আমি যাব না। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আপনাকে করতে হবে। আমি কোন ওজর-আপত্তি শুনব না।
নিখিল এবার বলল, কিন্তু আমি তোমাকে বিয়ে করব কেন? কী গুণ আছে তোমার?
—আমি নানা রকমের রান্না করতে জানি। আমি ভালো ভালো রান্না করে আপনাকে খাওয়াব।
—আমার রান্নার লোক চাই না। আমি রান্না করতে পারি।
—আমি বাসন মেজে দেবো। ঘর পরিষ্কার করে দেবো।
—তার জন্য আমার লোক আছে।
—আমি তাহলে আপনাকে কাপড় কেচে দেবো।
—তার দরকার নেই। আমার কাপড় কাচার মেসিন আছে।
—তাহলে আমি আপনার সন্তানের জননী হবো।
—বাবা হওয়ার ইচ্ছে আমার নেই।
—কিন্তু আমার তো মা হওয়ার ইচ্ছে আছে।
—তুমি তার জন্য অন্য পাত্র দেখো।
টুম্পা এর উত্তরে কিছু না বলে চুপ করে রইল। তারপর ধমকের সুরে বলল, আপনি এমন কথা আমাকে বলতে পারলেন? আপনি কি জানেন এর ফল কী হতে পারে? আমি আপনাকে….
নিখিল এবার কৌতুক করে বলল, কী করবে তুমি? থানায় গিয়ে আমার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করবে। এর বেশি তো কিছু নয়। তা না হয় তোমার দৌলতে ৫ দিন হাজত বাস করে আসব। একটা অভিজ্ঞতা হবে। ভবিষ্যতে এটা কাজে লাগতে পারে।
টুম্পা বলল, আপনার এত দম্ভ!
—হ্যাঁ। এত দম্ভ। আমি কাউকে ভয় পাই না। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে ভয় পাই না। প্রধানমন্ত্রীকে ভয় পাই না। তবে হ্যাঁ, আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে ভয় পাই। যখন-তখন রেগে গিয়ে আমাদের ওপর বোমা ফেলতে পারে।
টুম্পা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যাক একটা উপায় হলো। আমি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকেই ধরব।
নিখিল বলল, তুমি সেই চেষ্টাই করো। তুমি যদি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে দিয়ে আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারো তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করব।
টুম্পা এবার উঠে পড়ল। বলল, আমি তাই করব।
৩.
নিখিল মনে মনে হাসল। নিখিল জানে টুম্পা বোকা। এত বোকা যে তার কথা টুম্পা বিশ্বাস করল। টুম্পা জানে না আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। সারা জীবন ধরে চেষ্টা করলেও টুম্পা কিছু করতে পারবে না। অতএব নিখিল নিশ্চিন্ত।
কিন্তু টুম্পার কাছে কাজটা খুব একটা কঠিন নয়, সে ঠিক করল আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে একটা চিঠি লিখবে। টুম্পা জানে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নানা দেশের নানা সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছেন। সুতরাং আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষে তার সমস্যার সমাধান করা অসম্ভব নয়। খুব সহজেই তিনি এটা করে দিতে পারবেন। তাই অনেক ভেবেচিন্তে টুম্পা ইংরেজিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে একটা চিঠি লিখল চিঠিটা বাংলায় তর্জমা করলে এইরকম দাঁড়ায়:
মাননীয় প্রেসিডেন্ট
হোয়াইট হাউস
ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা
সবিনয় নিবেদন,
আমি একজন সাধারণ বঙ্গনারী। আমি ২৯ গড়পার রোড, কল-৭০০০০৯-তে থাকি। আমার শিক্ষক নিখিল রায় ১৩ গড়পার রোড-এ থাকেন। আমি তাঁকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু তিনি আমাকে বিয়ে করতে চান না। তিনি বলেছেন একমাত্র আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যদি তাকে বিয়ে করতে চাপ দেন তাহলে তিনি আমাকে বিয়ে করবেন। নাহলে করবেন না। আমার বিনীত আবেদন আপনি আমার শিক্ষককে আদেশ করুন তিনি যেন আমাকে বিয়ে করেন। আপনি যদি এটা করতে পারেন তাহলে আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
বিনীত
টুম্পা মিত্র
কলকাতা
৩/১/২০১২
আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে নানা দেশ থেকে নানা রকমের চিঠি আসে। তিনি সব চিঠির উত্তর দেন না। কোনো কোনো চিঠির উত্তর দেন। টুম্পার চিঠি পেয়ে তিনি অসম্ভব কৌতূহলী হয়ে পড়লেন। ঠিক করলেন মেয়েটিকে সাহায্য করা দরকার। তিনি সঙ্গে সঙ্গে টুম্পাকে একটা চিঠি লিখলেন। চিঠি ইংরেজিতে লেখা হলো। এই চিঠির বাংলা তর্জমা করলে এইরকম দাঁড়ায়।
টুম্পা মিত্র
২৯ গড়পার রোড
কল-৭০০০০৯
সুচরিতাসু,
আপনার পত্র পেয়ে খুবই আনন্দিত হলাম। আমার ওপর অর্থাৎ আমেরিকার ওপর আপনার যে প্রবল আস্থা আছে তা জেনে আমি গর্বিত। আপনার সমস্যা আজ শুধু আপনার সমস্যা নয় এ সমস্যা সমগ্রনারী জাতির। একমাত্র পুরুষেরা নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ছিল। তখন পুরুষেরা যা বলত নারীরা তাই মেনে চলত। এখন যুগ বদলেছে। এখন নারীরা যা বলবে পুরুষদের তা মনে চলতে হবে। একটি মেয়ে এখন যাকে বিয়ে করতে চাইবে তার কোনো আপত্তি গ্রাহ্য হবে না। সেই পুরুষকে ওই মেয়েটির প্রস্তাবে সম্মত হতে হবে। পুরুষটির কোনো আপত্তি গ্রাহ্য হবে না। আমরা জানি মেয়েরা অসম্ভব খামখেয়ালি। তারা যুক্তির ধার ধারে না। আমরা এও জানি তারা শরীর ও মনে দুর্বল। তারা এখনও পুরুষদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। সেই কারনে পুরুষদের উচিত তাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করা। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমি আপনার পাশে আছি। নিখিল রায়কে আপনার হাতে তুলে দেবোই। আপনি আমার প্রীতি ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
প্রেসিডেন্ট
হোয়াইট হাউস
ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা
ওয়াশিংটন ডিসি
২০/১/২০১২
৪.
নিখিল কিছুই জানত না। টুম্পাকে প্রত্যাখ্যান করে মনের আনন্দেই ছিল। কিন্তু একদিন আমেরিকার রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে একটা চিঠি এলো। চিঠিটার বাংলা তর্জমা করলে এইরকম দাঁড়ায়:
ওয়াশিংটন ডিসি
২৭/০২/২০১২
নিখিল রায়
১৩ গড়পার রোড
কল : ৭০০০০৯
সুচরিতেষু,
টুম্পা মিত্র-র মতো একটা অবলা নারীকে বিয়ে করতে অসম্মত হয়েছেন জেনে আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছি। আপনার সীমাহীন ঔদ্ধত্য ক্ষমার অযোগ্য। আপনাকে পনেরো দিন সময় দিলাম। এই সময়ের মধ্যে আপনি যদি টুম্পা মিত্রকে বিয়ে করেন তাহলে আমার আশীর্বাদ লাভ করবেন। শুধু তাই নয়, আমি আপনাকে জীবনযুদ্ধে জয়লাভের জন্য সবরকমের সাহায্য করব। আর আপনি টুম্পা মিত্রকে যদি বিয়ে না করেন তাহলে আপনার সমূহ সর্বনাশ। আপনাকে মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশিয়ে দেবো। সুতরাং আমার অবাধ্য হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ভগবান আপনার মঙ্গল করুণ।
আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী
প্রেসিডেন্ট
হোয়াইট হাউস
ইউনাই়টেড স্টেটস অব আমেরিকা
নিখিল চিঠিটা পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। টুম্পা যে এতদূর যেতে পারে তা সে কল্পনা করতে পারেনি। আর আমেরিকার প্রেসিডেন্টই বা কীরকম! ওনার খেয়েদেয়ে কাজ নেই! কোথাকার কে টুম্পা তার জন্যে তিনি আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হবে? পৃথিবীতে এই মুহূর্তে এমন কেউ নেই যে আমেরিকার রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং এই অশুভ বিয়ে সে কি মেনে নেবে? মেনে নেওয়া উচিত হবে? কয়েক রাত দুশ্চিন্তায় সে ঘুমোতে পারল না। বুঝে পেল না এখন কী করণীয়। শেষে অনেক ভাবনাচিন্তা করে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে একটা চিঠি লিখল। চিঠিটির বাংলা তর্জমা এইরকম।
মাননীয় রাষ্ট্রপতি
হোয়াইট হাউস
ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা
সবিনয় নিবেদন,
আপনার ভয় জাগানো চিঠি পেয়ে আমার হাড় হিম হয়ে গেল। আপনি টুম্পাকে বিয়ে করার জন্য আমাকে যে হুমকি দিয়েছেন তা আপনার মতো মহানুভবের কাছ থেকে আশা করিনি। প্রথম কথা টুম্পা আমার ছাত্রী। তার প্রতি আমার কোনো ভালোবাসা নেই। সে আমার স্নেহের পাত্রী। সুতরাং আমার পক্ষে একজন স্নেহের পাত্রীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আপনি আমার অবস্থাটা বিবেচনা করে আমাকে ক্ষমা করুন। বিনীত—
নিখিল রায়
১৩এ গড়পার রোড
কলকাতা-৭০০০০৯
২৯/০৩/২০১২
৫.
প্রায় একমাস পরে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে একটা চিঠি এলো। চিঠিটা বাংলা তর্জমা এইরকম:
নিখিল রায়
১৩এ গড়পার রোড
কলকাতা-৭০০০০৯
সুচরিতেষু,
আপনি আপনার চিঠিতে যে সীমাহীন ঔদ্ধত্যের পরিচয় দিয়েছেন তাতে আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছি। টুম্পা আপনার ছাত্রী হতে পারে। আপনি তাকে না-ও ভালোবাসতে পারেন। বড়ো কথা হলো টুম্পা আপনাকে ভালোবাসে। টুম্পা আপনাকে বিয়ে করতে চায়। আর শেষ কথা আমি আপনাকে বলেছি টুম্পাকে বিয়ে করতে। এটা আমার হুকুম। আমার হুকুম অমান্য করার ক্ষমতা কারও নেই। আর আপনি একটা কীটাণুকীট হয়ে আমার হুকুম অমান্য করতে চাইছেন! এর উপযুক্ত শাস্তি পাবেন। এক মাসের মধ্যে আমি শুভ দিন দেখে আপনাদের বিয়ের ব্যবস্থা করছি। এ বিয়ে রোধ করার ক্ষমতা কারও নেই।
রাষ্ট্রপতি
হোয়াইট হাউস
ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা
২৮/০৮/২০১২
এই চিঠি পেয়ে নিখিল স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। তারপর সাহায্যলাভের আশায় অনেক ছোটাছুটি করল। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গেল। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেল, রাষ্ট্রপতির কাছে গেল। কিন্তু কেউ কোনো সাহায্যের আশ্বাস দিতে পারল না। সকলেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে ভয় পায়। কেউ তাঁর বিরুদ্ধে যেতে চায় না। যাওয়ার ক্ষমতা নেই।
৬.
তাহলে? হতাশায় ভেঙে পড়ল নিখিল। প্রেসিডেন্টের হাত থেকে বাঁচার কি কোন উপায় নেই? একটা উপায় আছে। দেশ ছেড়ে পালানো। কিন্তু কোন দেশে যাবে সে? যেখানেই যাক প্রেসিডেন্ট তাকে ঠিক খুঁজে বের করবেই। করুক। তবু পালানোর চেষ্টা তাকে করতেই হবে। সুন্দরবনের জঙ্গলে মাস খানেক লুকিয়ে থাকতে পারলে নিশ্চিন্ত। প্রেসিডেন্টের পুলিশ তাকে খুঁজে না পেলে ফিরে যাবে। তাই সে একদিন যখন সুন্দরবনে পালাবে বলে তৈরি হচ্ছে ঠিক সেই সময় তিন জন আমেরিকান সৈন্য তার ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই ইংরেজিতে তারা নিখিলের সঙ্গে কথাবার্তা চালালো। সেই কথাবার্তাগুলো বাংলায় এইরকম।
—আপনি নিখিল রায়?
—হ্যাঁ, কিন্তু আপনাদের তো চিনতে পারলাম না।
—আমরা আমেরিকা থেকে আসছি। প্রেসিডেন্ট আমাদের পাঠিয়েছেন।
—কেন?
—আপনাকে ধরে নিয়ে যেতে।
—কোথায় ধরে নিয়ে যাবেন?
—গেলেই বুঝতে পারবেন।
—কিন্তু…কিন্তু…এটা আমার একদম ভালো লাগছে না।
—না লাগতেই পারে। এখন আর কথা না বাড়িয়ে আমাদের সঙ্গে চলুন।
নিখিল না করতে পারল না। তাদের সঙ্গে লিফটে করে নীচে নেমে এলো। রাস্তায় একটা বড়ো আমেরিকান গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। নিখিল সৈনিকদের সঙ্গে সেই গাড়িতে গিয়ে উঠল।
একটু পরে একটা বিশাল বিয়েবাড়ির সামনে এসে গাড়িটা দাঁড়ালো।
নিখিল একজন সৈনিককে ইংরেজিতে যা জিজ্ঞাস করল তার বাংলা এইরকম, এখানে কেন?
সৈনিকটি ইংরেজিতে উত্তরে যা বলল, যার বাংলা হল, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ।
—কীসের নির্দেশ?
—আপনাকে বিয়ে করতে হবে।
—কাকে?
—টুম্পা মিত্রকে।
এটা নিখিল আগেই অনুমান করেছিল। করলেও তার এখন করার কিছুই নেই। সে অসহায় হয়ে সৈনিকদের সঙ্গে বিয়েবাড়ির ভিতরে ঢুকল। সারা বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে। সেই আলোয় রানি হয়ে বসে আছে টুম্পা। টুম্পার চারপাশে আমেরিকান সৈন্য। টুম্পা নিখিলকে দেখে মিটিমিটি হাসতে লাগল। সেই হাসি দেখে নিখিলের গা জ্বলে গেল।
৭.
বিয়ের পর শান্তিতে ছ-মাস কাটল। টুম্পার ওপর নিখিলের আর রাগ নেই। টুম্পাকে সে রীতিমতো ভালোবাসতে শুরু করল। টুম্পাও নিখিলকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আনন্দে দিন কাটাতে লাগল। কিন্তু ছ-মাস পরে তাদের মধ্যে অশান্তি শুরু হয়ে গেল। নিখিল যা বলে টুম্পা তা শোনে না। আবার টুম্পা যা বলে নিখিল তা শোনে না। এইভাবে চলতে চলতে দু-জনের মধ্যে বিরোধ চরমে উঠল। শুধু তাই নয় এই অশান্তির খবর আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কানে গেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে লোক মারফত দু-জনের হাতে দুটো আমেরিকান রিভালবার তুলে দিলেন। সেই সঙ্গে দু-জনকে চিঠিতে জানালেন: আপনাদের জীবনযুদ্ধের খবর পেয়েছি। তাই দু-জনের হাতে রিভলবার তুলে দিলাম। আশা করি, শান্তিস্থাপনে রিভলবার কাজে লাগবে।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৬ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত