‘ওই হারামির পুত, তোর ডেলি ইনকাম কত, ক?’
‘কী বললে?’
‘বলতাছি, পিজা বেচি বেচি দিনে ক টেকা কামাচ?’
‘গালি দিলে কেন?’
‘গালি না দিয়া বুকে টাইন্যা চুম্মা খামো? গালির দেখছস কী।’
‘এত বড় সাহস তোর। আমার সঙ্গে বেয়াদবি করিস।’
‘বিয়াদবির দেখছস কী! এখনো তো কাপড় তুইল্যা দেহাই নাই।’
‘দুই টাকার ভিক্ষুনি, দুর্ব্যবহার করিস আমার সঙ্গে!’
‘দুই টাকার…! হি হি হি। হেই জন্যই তো জিগাই ডেলি ক টেকা ইনকাম তোর?’
‘আরে, সামান্য ভিক্ষুনি হয়ে আমার সঙ্গে টেক্কা দিতে আসছ? ডেইলি হাজার টাকা লাভ থাকে আমার।’
‘থুঃ। হাজার টেকা আবার টাকা হইল নি? আমার আইজকা কুনো ইনকাম অয় নাই। তার পরও দ্যাখ কয় টেকা কামাইছি আইজ আমি।’ কোঁচড় থেকে, ছেঁড়া ঝোলা থেকে মুঠি মুঠি পাঁচ দশ পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে হামিদের ক্যাশ বাক্সের ওপর ধপধপ করে ফেলল মাহমুদা বেওয়া। বলল, ‘গুইন্যা দ্যাখ, দেড় হাজার টাকা ওইখানে। আইজকের ইনকাম। বেশি যেদিন হয়, তিন হাজারও ছাড়াইয়া যায়। তুই বেডা আমারে দেখাস হাজার টেকা।’
হামিদের চোখ-মুখ চুপসে গেল। পলকহীন চোখে মাহমুদার দিকে তাকিয়ে থাকল।
‘তাকাইয়া রইছচ ক্যা বাঘডাসের মতো। গন গন। গইন্যা দেখ মিছা কইলাম নি কুনো।’ বলে কিছুক্ষণ কড়া চোখে তাকিয়ে থাকল মাহমুদা। তারপর অনেকটা আপন মনে বলতে লাগল, ‘কহন থেইক্যা একটা পিডা চাইতাছি তোর কাছে। দেওয়া ত দূরের কথা, আমার দিকে একটু ফিইরাও তাকালি না। জিগাই খিদা কি শুধু বড় লোকের লাগে, গরিবের খিদা পায় না।’
মাহমুদার কথা শুনে হামিদের মনটা বড় ভারি হয়ে গেল। সত্যি তো, কত আগে থেকে একটা পিঠার জন্য মহিলাটি ঘ্যানর ঘ্যানর করছিল। একটু তফাতে দাঁড়িয়েই অবশ্য সে পিঠা চাইছিল। কাস্টমারের ভিড় আর তার অবহেলার কারণে মাহমুদার কথায় কান দেয়নি হামিদ।
জাতীয় জাদুঘরের সামনের জায়গাটিতে পিঠা বেচে হামিদ। পাটিসাপটা, ভাপা, চিতই-এসব। বড় কম্পিটিশন এখানে। ওই তো পাশে কাউছার ভাজাভুজি বেচে, একটু দূরে রফিক নুডুলস। ওপাশে সন্তোষ বেচে ফুচকা। সন্তোষের ভ্যানগাড়ির সামনে কাস্টমারের ভিড় লেগেই থাকে। তার পুর নাকি অসাধারণ টেস্টি। কী মিশায় কে জানে ওই পুরে সন্তোষ্যা। সামনের পাঁচ-সাতটা চেয়ার সব সময় ঠাসা থাকে। হামিদ কখনো খেয়ে দেখেনি সন্তোষের ফুচকা। সন্তোষকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিভাবে পুর তৈয়ার করো সন্তোষ? কী মেশাও পুরের সঙ্গে?’
সন্তোষ দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে বলেছিল, ‘ওপরওয়ালা জানেরে ভাই। ফুচকার খোলগুলো দোকান থেকে কিনি। বউটা রোজ পুরটা বানিয়ে দেয়। আলু, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ এই সব দিয়েই তো বানায়।’ ‘ভাই, বললেই হলো। ওই তো তোমার ডান দিকে মোক্তার ফুচকা বেচে। তার দোকানে তো এত ভিড় নেই।’ হামিদ বলেছিল। ‘ভগবান জানে। গাঁয়ের আনপড় মাইয়া। বয়সকালে বিয়া করাই দিল মা-বাপে। খাওয়াতে পারি না, পরাতে পারি না। মা-বাপকে ছোট ভাইদের হাতে গছিয়ে দিয়ে ঢাকার ট্রেনে উঠে পড়লাম জামাই-বউয়ে। তারপর কত ঘাডের জল খাওয়া। কোথায় থাকি, কী খাই? বাংলা একাডেমির পেছনের টিন শেইডের একটা ফুডাফাডা ঘরে ঠাঁই হলো দুজনের। কত কাজ যে করলাম। রাস্তা খোঁড়া, রিকশা টানা। শরীর তো দেখতাছ। কুলাইয়া উঠতে পারলাম না। বউ এখানে-ওখানে রান্ধন-বাড়নের কাজ করল, মেসে মেসে আর কী! কিন্তু সে কাজে টিকল না সন্ধ্যারানী। শুধু ওর দিকে হাত বাড়ায়, খারাপ নজরে দেখে। একদিন নাকি গতরে হাত দিল এক বেড়ায়। ধুত্তুরি বলে কাজটাই ছেড়ে দিল। ভিক্ষাও করেছিলাম কিছু দিন, দুজনে। আমি আন্ধা, সন্ধ্যা আন্ধি। কিন্তু ফাঁকিজুকি ভালা লাগল না। একদিন এক বেডা, লেখক বলে তাইনে, কী কামাল যেন নামডা, সাহায্য কইল্য, টেকা দিল। এই দোকান নিয়া বসলাম। মা লক্ষ্মী দয়া কইল্য। এখন ভালা আছি। লালবাগ কেল্লার দিকে বাসা নিয়েছি।’ এতগুলো কথা একনাগাড়ে বলে থামল সন্তোষ। এমনিতে শুধু বাংলায় কথা বলে। আবেগের তাড়নায় দেশের ভাষা মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো।
হামিদের ব্যথাও কম কিসের? ভৈরবে বাড়ি। মেঘনার কোল ঘেঁষে বাড়িটা ছিল। বেদম ঝড়-বৃষ্টি হলো সে বছর। ছোটবেলায় মা মারা গেছে। বাপের তখন জোয়ানকি। কী আশ্চর্য, বাপ আর বিয়েই করল না। ছোট্ট হামিদকে নিয়ে দিন কাটাতে লাগল। সামান্য ফসলি জমি ছিল। অল্পস্বল্প ধান হতো। সুদিনে লাউ, ঢেঁরস, বরবটি, বেগুন। ভৈরব কলেজে ইন্টার পড়ছিল হামিদ। স্বপ্ন ছিল বিএ-এমএ পাস করে ঢাকা শহরে মস্ত বড় অফিসার হবে। সে রাতে তার স্বপ্নটা আর বাপটাকে কেড়ে নিল খোদাতাল্লা। বাড়ির দিকে নদী ভাঙতে শুরু করেছিল। তবে ভাঙনটা ছিল খুব ধীরে। বাবা বলল, ‘মেঘনার ক্ষুধা মিটলে আপনাতেই থেমে যাবে।’ নিশ্চিন্তে বাপে-বেটায় ঘুমিয়ে পড়েছিল সে রাতে। সন্ধ্যা থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। গভীর রাতে ধুম বৃষ্টি। ঝড়ও ছিল। আধেক রাতে বাপকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী বুঝ বাবাজান?’ বাবা ওপাশ ফিরে বলেছিল, ‘চিন্তা করিস না বাপ। কিচ্ছু হবে না। ঘুমাইয়া পড়।’ সেই ঘুম ছিল কালঘুম। তার গায়ে বৃষ্টির ঝাপটা পড়লে ঘুম ভেঙেছিল তার। তখন ঘরের চালটা, গোটা বাড়িটা, বাপটা মেঘনার ভোগে চলে গেছে। কোনো রকমে জীবনটা বেঁচেছিল সে রাতে। তারপর মেঘনার পারে পারে কত দিন আকুল হয়ে কেঁদে কেঁদে পাগলের মতো ঘুরে বেরিয়েছে। যদি বাপটাকে পাওয়া যায়। বাপের মৃতদেহটাও পায়নি হামিদ। করালগ্রাসী মেঘনা কত কিছু যে খায়! তারপর সন্তোষের মতো এই ঢাকায়। কত কিল-গুঁতা খেয়েছে সে। এ রাস্তার ফুটপাতে, ওই মার্কেটের সিঁড়ির ধারে রাত কাটিয়েছে। পুলিশের লাঠি, দারোয়ানের চড়-থাপ্পড় নিত্যরাত কপালে জুটেছে। ওই যে পেছনে থানাটি, ওই থানার গারদেই তো কয়েক রাত কেটেছে তার। ব্যাংকের নিচের ফুটপাতেই শুয়ে ছিল সেরাতে। সে রাতেই ব্যাংক লুট করতে এসেছিল সাত-আটজন। তালাতোলাও ভেঙেছিল কয়েকটা। হঠাৎ পুলিশ ভ্যানের ফ্যাঁ-ফুঁ আওয়াজ শুনেই পালাল লুটেরারা। হামিদ ফাঁদে পড়ে গেল! ও তো খিদের পেট নিয়ে ঘুমাচ্ছিল। পুলিশ এসে ধরল ওকে। বমাল নিয়ে এলো থানায়। বমাল মানে ভাঙা তালাসহ। অনেক চড়-থাপ্পড়, লাথিলুথা দেওয়ার পরও মুখ থেকে কিছু বের হলো না হামিদের। বের হবে কী করে? ও তো কিছুই জানে না। ব্যাংকওয়ালাকে বলা হলো হামিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে। ম্যানেজার ইন্টারেস্টেড হলো না। হামিদকে দেখে বলল, ‘এই ছেলে ব্যাংক লুট করতে এসেছিল? এখনো ঠিকঠাক মতো দাড়ি-মোচ গজায়নি। ভালো করে দেখেন-গায়ে-মুখে গ্রাম্য গ্রাম্য ভাব।’
হাউমাউ করে কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল হামিদ। কাঁদতে কাঁদতে জীবনের টুকরাটাকরা বলে গিয়েছিল। ম্যানেজার বলেছিল, ‘ছেড়ে দিন ওসি সাহেব। আমাদের তো কিছু খোয়া যায়নি। দু-চারটা তালা ভেঙেছে, এই যা। ওকে ইনোসেন্ট বলে মনে হচ্ছে। শুধু শুধু একটা কচি ছেলেকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী?’
ওই থানার এক্তিয়ারাধীন এরিয়াটা এমনিতেই গোলমালের। ইউনিভার্সিটিটা কাছে। রমনা থানায় নানা সমাজবিরোধীদের কাজ কারবার। তাই এসব ঝুটঝামেলা এড়িয়ে চলতে চান ওসি। এসআইকে ডেকে বললেন, ‘ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাটির ইতি টানুন।’
তার পরও থানা থেকে বেরোতে বেরোতে দিন তিনেক লেগেছিল। কী সব লেখালেখি, সইসাবুদ। তারপর রেহাই। এতে অবশ্য শেষ পর্যন্ত লাভ হয়ে গিয়েছিল হামিদের। যে সকালে ছাড়া পেয়ে আঙিনায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বড় করে শ্বাস টানল। কনস্টেবল খালেক এসে সামনে দাঁড়াল, ‘কী রে বেটা, কোনানে যাবি? মা-বাপ আছে নি? কিয়ল্লাই আইছস দ্যাশ ছাড়ি? যা যা, বাড়িত যা।’ কাঁচাপাকা দাড়ি খালেকের মুখে। এইট পাস খালেক কুড়ি বছর আগে পুলিশে ঢুকেছিল। বিদ্যা ও বুদ্ধি দুটোরই ঘাটতি আছে বলে কনস্টেবল থেকে এক ধাপও ওপরে উঠতে পারেনি। এই ক বছরে হাতে অবশ্য লাঠির বদলে গাদা বন্দুক উঠেছে। খুব বেশি ঘুষঘাষ খাওয়া শেখেনি খালেক। তার নাকি বুক কাঁপে। যেদিন এসআই সঙ্গে থাকে, হাজার-বারো শ জোটে। এসআইদের কত ইনকাম! আঁধার সন্ধ্যায় চৌমুহনীতে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। পাশে আট শ সিসির হোন্ডা। সঙ্গে পাঁচ-ছয়জন কনস্টেবল। ওরাই ট্রাকটা, কারটা, স্কুটারটা থামায়। লাইসেন্স কোথায়, গাড়িতে রং নেই কেন, দেখতে তো মাস্তানের মতো লাগছে, ট্রাকে বোঝাই করে কী নিয়েছ, চোরাই মাল নয় তো-এ রকম বলে, ধমকিয়ে টাকা নেয়। অন্যরা সুড় সুড় করে টাকা বের করে দিলেও ট্রাক ড্রাইভাররা ভারি খচ্চর। টাকা দিতে চায় না। জোরে ধমক দিলে ট্রাকটাকে পাথারি করে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। ওপর থেকে এসআইয়ের ওপর ধাক্কা আসে-এসব কী? তাড়াতাড়ি জানজট ছোটাও। তাই ট্রাকওয়ালাকে তেমন ঘাঁটায় না এসআইরা। ভালো কিসিমের এসআই হলে নিচুদের হাতে হাজার দেড় হাজার গুঁজে দেয়। বাকিগুলো পকেটে ঢুকায়।
তো ওই মেদামারা ধরনের খালেক কনস্টেবল আবার শুধায়, ‘বাড়িত যাওনের টেকা আছে নি? থাকইব কেমনে? সব তো কাইড়াকুইড়া লইছে।’ যে কটা রাত হামিদ গারদে ছিল, রুটি-পানি দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল খালেকের ওপর। বড় মায়া জমেছিল ছেলেটির ওপর। নিজের কোনো সন্তানটন্তান ছিল না বলে মায়াটা একটু গাঢ় হয়েছিল।
খালেকের কথা শুনে সেই সকালে হামিদ ডানে-বাঁয়ে মাথা নেড়েছিল। মুখ ফুটে বলেছিল, ‘বাড়িতে যাব না। কেউ নেই। এইখানেই থাকব।’
তারপর হামিদের জীবনে বহুত ইতিহাস। তার সবটুকু এখানে বলা বাহুল্য। কোনোবেলা খেয়ে, কোনোবেলা না খেয়ে কেটেছে। এই শাহবাগেই কত দিন ভিখারির মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে। হাঁচিরাম পিঠা বেচত তখন এখানে। মাঝেমধ্যে দয়া হলে ভাঙাচোরা দু-একটা পিঠা এগিয়ে ধরত তার দিকে। কোনো কোনো ভাইয়া, যেদিন বগলদাবা করে প্রেমিকা নিয়ে আসত এইখানে, সেদিন তার মন ভালো থাকত নিশ্চয়ই। নইলে কেন আস্ত ফুচকার প্লেট এগিয়ে ধরত তার দিকে। বলত, ‘খা খা, বেটা। আজকে আমার ভালো দিন।’
হামিদের মন তখন আনন্দে ভরপুর। খেতে খেতে নরম স্বরে বলত, ‘দিন না স্যার, এখন সন্ধ্যা।’
‘ওরে বেটা, তোর তো বেশ রসজ্ঞান আছেরে।’ বলতে বলতে ভাইয়াটি প্রেমিকার গায়ে ঢলে পড়ত। খিল খিল করে হাসতে থাকত আপাটি। দুজনের কী আনন্দ? খাওয়াদাওয়া শেষে আঁধারের দিকে এগিয়ে যেত ওরা।
একদিন দুপুরে আর্ট কলেজের গেটের সামনে খালেকের সঙ্গে দেখা, ‘কিরে বেটা, অহনো ভাদাইম্যার মতো ঢাকা শহরে ঘুইরা বেড়াস নি? কিছু করছটরছ না?’
ভাদাইম্যা হামিদ অভ্যাসমতো ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ে। ‘চল বেটা তোরে একখান কাম দি।’ বলে হাঁটা শুরু করল খালেক। পিছু পিছু হামিদ। পিজি মার্কেটের একটা দোকানে নিয়ে গেল হামিদকে। একটা বড় ফ্ল্যাক্স, একটা বয়াম, চারটা কাপ, দুটো চামচ কিনে দিল। হাতে দুই শটি টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, ‘কাল থেকে চা বেচবি। দোয়েল চত্বর থেকে এই শাহবাগ মোড় পর্যন্ত হাঁইট্যা হ্যাঁইট্যা বেচবি। বিস্কিট কিনে বয়ামে ভরবি। এক কাপ তিন টাকা। বুঝছস নি? ও, গরম পানি পাবি কই। এক কাম করিছ, ওই যে টিনের লম্বা ছাউনিটা দেখতাচস, কনস্টেবলরা থাকে ওখানে। আমিও থাকি। গরম পানি ওখানে পাবি। বাবুর্চিকে বইল্যা দিমু আমি। তারে মাঝেমইধ্যে চা-চু খাওয়াইছ।’
এইভাবে ঢাকাইয়া জীবন শুরু হামিদের। গোটা দিন এধার-ওধার চা বেচে সন্ধ্যার দিকে হাঁচিরামের কাছে এসে বসত। হাঁচিরামের পিঠার দোকানে তখন ধুম বেচা। পিঠা খাওয়ার পর কেউ কেউ চা খেতে চাইত। হাঁচিরাম হামিদকে দেখিয়ে দিত। হাঁচিরামের ঘরের পাশে একটা ইয়াচালাতে থাকতে শুরু করেছিল হামিদ। মালিককে অনুরোধ করে হাঁচিরামই থাকার ব্যবস্থা করেছিল। কখন চা বেচা ছেড়ে দিয়ে হাঁচিরামের অ্যাসিস্টেন হয়ে গিয়েছিল মনে নেই হামিদের। হাঁচিরাম একা পারছিল না তখন, একজন সাহায্যকারীর দরকার হয়ে পড়েছিল। হামিদকেই কাছে টেনে নিয়েছিল। রাত জেগে দুজনে চিতই পিঠার কাই তৈরি করে, চাল পিষিয়ে ভাপা পিঠার গুঁড়া তৈরি করে। সকাল দশটার দিকে শাহবাগের উদ্দেশে ভ্যানগাড়িটা নিয়ে রওনা দেয় দুজনে।
বহু দিন দেখেনি কনস্টেবল চাচাকে। কাজের চাপে চাচাকে অনেকটা ভুলেই গিয়েছিল হামিদ। দুই গালে মনে মনে চড় খেয়ে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়েছিল, ‘আল্লা, গুনাহ মাফ করে দিও। কী অকৃতজ্ঞ আমি! চাচার কথা ভুলে বসে আছি।’ ছুটে গিয়েছিল থানায়। থানার অনেকে হামিদকে চেনে, চা আর পিঠা বেচার কারণে। ওরা তো মাঝেমধ্যে চা-পিঠা খেতে আসে। এসআই শমসের বলেছিল, ‘কিরে হামিদ, কী জন্য এসেছিস? কোনো কেইসেটেইসে জড়ালি নাকি?’
‘না স্যার। একজন মানুষের খোঁজে আসছি।’ তখন হামিদের মুখে শুদ্ধ বাংলা। চা-পিঠা বেচতে বেচতে ভার্সিটি-পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে শুদ্ধ বাংলাটা রপ্ত করে নিয়েছে। তো ওই ভঙ্গিতেই বলল হামিদ, ‘আমি এসেছিলাম স্যার খালেক চাচার খোঁজে। বহুদিন দেখি না তাঁকে?’
‘তুই জানস না কিছু?’ ব্যথামাখা গলায় জিজ্ঞেস করে শমসের এসআই।
‘না তো স্যার। কী হয়েছে স্যার?’ উদগ্রীব কণ্ঠ হামিদের। ‘ও তো তিন মাস আগে মারা গেছে। সন্ত্রাসীদের গুলি খেয়ে মরেছে। পিজির পেছনের গলিতে ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়েছিল। এক খানকির পোলা গুলি কইরা দিল।’ হঠাৎ জিহ্বা বের করল শমসের। ‘কিছু মনে করিস না। গালি বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে।’
হামিদ কী বলবে? তখন সে বয়রা, তখন সে অন্ধ, তখন সে নিথর। বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছিল সে। শমসের চলে গিয়েছিল কখন। কাঁদতে কাঁদতে ফিরেছিল হামিদ। হাঁচিরাম কাকার কাছে সেবেলা ছুটি চেয়ে নিয়েছিল। রমনার লেকের পাড়ে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছিল সেই বিকেলে।
তার পর তো হাঁচিরাম কাকা মারা গেল একরাতে। এজমার টান ছিল খুব। শীতও পড়ছিল বেশ সেই মাঘে। শেষের দিকে একঘরে থাকা শুরু করেছিল ওরা। নিজের কথা কিছুই বলত না হাঁচিরাম কাকা। কত দিন পীড়াপীড়ি করেছে। কাকার এক কথা, ‘আমার কোনো গাঁ-গেরাম নাইরে হামিদ। মা-বাবাও নাই। কেউ নাই, কিচ্ছু নাই। এর বেশি কিছু জানতে চাস না আমার কাছে।’
বহু বছর পরে, শরীরে যখন ভাঙন ধরেছে কাকার, এক রাতে, জ্বরের ঘোরে বলেছিল, ‘বউ ছিল আমার। থাকল না আমার হয়ে। ঢাকা এসেছিলাম অন্ন জোগানোর জন্য। পাশের বাড়ির অন্নচরণকে নিয়ে পালিয়েছিল বউটি।’ এরপর অনেক অনুনয়-বিনয়েও মুখ খোলেনি কাকা। এই ছিল তার জীবনের প্রথম ইতিহাস, এই ছিল শেষ ইতিহাস।
চাচা মারা যাওয়ার পরে এক মন চাইল সব ছেড়েছুড়ে দিতে, অন্য মন বলল, এ কেমন কথা হামিদ! তুমি না হাঁচিরাম কাকার কাছে ঋণী? তুমি না কত বেলা খেয়ে না-খেয়ে কাটিয়েছ? এই কাকাই তো তোমাকে বুকে টেনে নিয়েছিল। এই ভ্যানটার সঙ্গে, এই ডেকচি-পাতিল-চামচ-গ্লাস-প্লেটের সঙ্গে কাকার ছোঁয়াটা আছে না? একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তো। ছাড়িস না, ছাড়িস না। চালিয়ে যা, চালিয়ে যা। ওপর থেকে দেখে হাঁচিরাম কাকা তোর ওপর খুব খুশি হবে।
তো সেই থেকে হাঁচিরাম কাকার ব্যবসাটা হামিদ চালিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হতো কাকা সব সময় তার পাশে পাশে আছে। কাকা বলত, কোনো অবস্থাতেই মাথা গরম করিস না হামিদ। ভালো ব্যবহার ব্যবসার অর্ধেক মূলধন। তা ছাড়া তোর ব্যবহারের সঙ্গে তো তোর মা-বাবা জড়িয়ে আছে। মনে রাখবি, ব্যবহারে বংশের পরিচয়।’ কাকার কথাগুলো মনে মনে অবিরাম জপত-কখনো কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। কিছুতেই না।
কিন্তু আজ, আজ যে কী করল? ভিখারিনীটির সঙ্গে কী ব্যবহার করল সে? তুই-তোকারি করল? সে কি অহংকারী হয়ে উঠেছে? তওবা তওবা, অহংকারী হবে কেন? সে তো তার অতীতকে ভোলেনি! না ভুললে এ কী ব্যবহার নারীটির সঙ্গে! হঠাৎ একটি কথা তার মস্তিষ্কে ঝাপটা মারল-গরিবের খিদা পায় না? সম্বিত ফিরল হামিদের। মাফ চাইতে হবে তার কাছে। আল্লাহ, আমার গুনাহ লিখো না। সামনের দিকে ভালো করে তাকাল হামিদ। দেখল-মাহমুদা নেই। দেখল ইউনিভার্সিটির পূর্ব গেট ছাড়িয়ে টিএসসির দিকে বহু দূরে এগিয়ে গেছে মাহমুদা। তার গতি দ্রুত।
সূত্র : কালের কণ্ঠ, ঈদ সংখ্যা, বুধবার ২২ জুলাই ২০১৫, ৭ শ্রাবণ ১৪২২