মোস্তফা কামাল
জেনারেল পীরজাদা হন্তদন্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের রুমে ঢুকলেন। তাকে দেখে বিস্ময়ের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, কী ব্যাপার পীরজাদা!
সরি স্যার, অনুমতি ছাড়াই ঢুকলাম।
ইটস ওকে। কোনও অঘটন!
স্যার, নির্বাচনের খবর শুনছেন?
নির্বাচনের খবর শোনার জন্যই তো আমি অপেক্ষা করছি।
স্যার, আওয়ামি লিগ নাকি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে!
আবার নাকি কেন?
স্যার, আমি খবরটি শুনেই আপনার কাছে এলাম।
প্রেসিডেন্ট সাহেব খেপে গিয়ে বলেন, আধাআধি খবর নিয়ে আমার কাছে কেন আসো!
স্যার, আমার মনে হয় খবর সত্য। আওয়ামি লিগই জিতছে। মুসলিম লিগের ভরাডুবি হয়েছে। ভুট্টোর দলও খুব একটা ভালো করতে পারেনাই।
প্রেসিডেন্ট সাহেব ধমকের সুরে বলেন, এই চুপ করো তো! চুপ করো!
নির্বাচনের ফলাফল শুনে ইয়াহিয়া খান পাগলের মতো আচরণ করছেন। তিনি তাঁর দপ্তরের এ মাথা ও মাথা হাঁটছেন আর বিড় বিড় করে বলেন, না না! এটা কিছুতেই হতে পারে না! আওয়ামি লিগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কী করে পায়! আমার লোকেরা কি তাহলে আমার সঙ্গে বেইমানি করেছে! এটা কী করে সম্ভব!
ইয়াহিয়া খান কলিং বেল চেপে ধরে চিৎকার দিয়ে বলেন, এই কে আছিস!
পিএস সাহেব দৌড়ে এসে বলেন, জি স্যার! বলেন স্যার।
নির্বাচনের রেজাল্ট বলো!
স্যার…
ইয়াহিয়া খান আবার চিৎকার দিয়ে বলেন, আরে নির্বাচনের রেজাল্ট বলো!
পিএস সাহেব কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, স্যার ৩০০ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬২ আসন। এরমধ্যে আওয়ামি লিগ ১৬০টি আসন দখল করেছে। বাকি দুটিতে নির্বাচিত হয়েছেন মুসলিম লিগের নুরুল আমিন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন নির্দলীয় ব্যক্তি। আর পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পেয়েছে আওয়ামি লিগ। আর পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮৩টি আসনে জয়লাভ করেছে জুলফিকার আলি ভুট্টোর পাকিস্তান পিপল্স পার্টি।
ইয়াহিয়া খান ধমকের সুরে বলেন, তোমার রেজাল্ট ঠিক আছে তো! ঠিক না থাকলে কিন্তু তোমাকে আমি গুলি করে মারব!
স্যার, ঠিক আছে স্যার।
না নেই, ঠিক নেই! তোমরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাকে পাগল বানাতে চাচ্ছো! যাও, তুমি বেরিয়ে যাও। ইসহাককে পাঠাও। ইসহাক কোথায়! ইসহাক!
পিএস সাহেব দ্রুত বের হয়ে ইসহাক সাহেবকে প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে পাঠান। ইসহাক সাহেব রুমে ঢুকেই লম্বা করে সালাম দিয়ে বললেন, জি স্যার!
এই, তুমি কোথায় থাকো? তোমাকে কাজের সময় পাওয়া যায় না কেন? পালিয়ে পালিয়ে থাকো তাই না?
সরি স্যার। আমি তো রুমেই স্যার।
রুমে থাকলে আসোনি কেন? আমি কতক্ষণ ধরে কলিং বেল চাপলাম! কানে শোনো না?
সরি স্যার।
আকবর আমাকে ডুবাইছে। ও যদি সঠিক তথ্য দিত তাহলে কি আর আমি নির্বাচন দিতাম! যে কোনও সুতায় নির্বাচন বানচাল করে দিতাম। ওরে যে কী করতে ইচ্ছা করছে! হারামজাদা! কোনও কিছুর খবর রাখে না!
ইসহাক সাহেব বিস্ময়ের দৃষ্টিতে প্রেসিডেন্ট সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন। কী বলবেন তা ঠিক বুঝতে পারেন না। ইয়াহিয়া খানও কিছুক্ষণ বকাবাজি করে চুপ করে আছেন। কিছুক্ষণ পর ইসহাক সাহেব বললেন, স্যার আকবর খানকে কি ডাকব?
ওরে তো ডাকবোই; ওর বাপরেও ডাকো। হারামজাদা, আমার সব স্বপ্ন খান খান করে দিয়েছে! ওর বাপ সুদ্ধ ওরে শুলে চড়াবো। ও এখনও মানুষ চেনেনাই! ও গোপনে শেখ মুজিবের সঙ্গে হাত করেছে কিনা কে জানে! করতেও পারে। এখন আর কোনও মানুষকে বিশ্বাস হয় না।
ইসহাক সাহেব নিজের রুমে এসে আকবর খানকে ফোন করে বলেন, স্যার তাড়াতাড়ি আসেন। প্রেসিডেন্ট স্যার ভয়ানক খেপে আছেন। জেনারেল পীরজাদাকে দেখলাম, ভেজা বেড়ালের মতো স্যারের রুমে বসে আছেন। উনি আপনার বিরুদ্ধে স্যারকে কোনও কানপড়া দিয়েছে কিনা কে জানে!
আকবর খান টেলিফোন রেখেই প্রেসিডেন্ট সাহেবের দপ্তরের উদ্দেশ্যে ছুটে এলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ঢোকার অনুমতি চাইতেই তাঁর সম্মতি পাওয়া গেলো। তিনি রুমে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সাহেব অত্যন্ত কর্কশ স্বরে বললেন, তুমি! তুমিই আমারে ডুবাইছ!
আকবর খান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনও কথা বলছেন না। প্রেসিডেন্ট সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন। তোমাকে আমি বার বার জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি প্রথমে বললা, আওয়ামি লিগ ৪০-৫০টির বেশি আসন পাবে না। কয়েক মাস পর বললা, ৭০-৮০টার বেশি কোনওভাবেই পাবে না। এখন! এখন এত সিট কি করে পেলো! গাজা খেয়ে রিপোর্ট দিয়েছ? তোমার ভুল রিপোর্টের কারণে কত বোড় ক্ষতি হয়ে গেলো!
লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা বললেন, স্যার আইএসআইকে ঢেলে সাজানো দরকার।
এখন আর ঢেলে সাজিয়ে কী করব? শোকেসে রাখব? যত্তসব মূর্খের দল! আমার সব পরিকল্পনা শেষ করে দিয়েছে! এখন উপায় কী হবে!
সরি স্যার। একটা কথা স্বীকার করতেই হবে স্যার। শেখ মুজিব মিরাকল ঘটনা ঘটিয়েছে স্যার!
হুম, এখন মিরাকল ঘটিয়েছে!
সত্যি স্যার। ভেতরে ভেতরে সব মানুষ যে তার পক্ষে চলে গেছে তা বোঝাই যাচ্ছিল না। জরিপে অনেকে অবশ্য মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। তা না হলে জরিপ ভুল হওয়ার কথা না। আকবর খান বললেন।
এখন করণীয় কি সেটা বলো।
স্যার, আপনি দেশের প্রেসিডেন্ট। আপনি দিনকে রাত আবার রাতকে দিন করতে পারেন। আপনার হাতে অসীম ক্ষমতা। আপনি না চাইলে কিছুই হবে না স্যার।
তার মানে!
আপনি ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে মুজিবের কিছু করার আছে?
আন্দোলন করবে!
আরও ২২ বছর আন্দোলন করলেও কিছু করতে পারবে না স্যার।
ওসব কথা রাখো। মুজিবকে সামলানোর উপায় কি সেটা বলো।
পীরজাদা বললেন, স্যার, আমি একটু বলি?
বলো বলো। তাড়াতাড়ি বলো!
স্যার, আপনি ভুট্টো সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। উনি কী বলে দেখেন।
ওহ ইয়াহ! গুড আইডিয়া!
তুমি তাহলে একটা কাজ করো। ভুট্টো সাহেবকে খবর দাও।
জি স্যার। আমি এখনই তাকে ফোন করে ডেকে আনছি।
আকবর, আমি খুব ফেডআপ বুঝলা! তুমি কীভাবে কী করলা কিছুই বুঝলাম না! ঠিক আছে যাও। চোখ কান খোলা রেখো।
জি স্যার।
আকবর খান চলে যান। পীরজাদাও উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, স্যার আমি তাহলে ভুট্টো সাহেবকে ফোন করি।
যাও। তাড়াতাড়ি তাঁকে টেলিফোনে ডাকো।
পীরজাদা প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমে গেলেন। তারপর ভুট্টো সাহেবের বাসার নাম্বারে ফোন দিলেন। নুসরাত ভুট্টো ফোন ধরে বললেন, কে বলছেন?
আমি পীরজাদা বলছি। ভুট্টো সাহেব আছেন?
না তো! উনি ইসলামাবাদ গেছেন।
আপনি মিসেস ভুট্টো বলছেন?
জি বলছি।
ভুট্টো সাহেবকে কীভাবে পেতে পারি? খুব জরুরি দরকার। প্রেসিডেন্ট সাহেব স্বয়ং তাঁকে খুঁজছেন।
আপনাকে আমি ইসলামাবাদের একটা নাম্বার দিচ্ছি। এই নাম্বারে তাঁকে পাবেন।
নাম্বারটা লিখে নেওয়ার পর সালাম দিয়ে পীরজাদা ফোন রাখলেন। পরে তিনি নুসরাত ভুট্টোর দেওয়া নাম্বারে ফোন দিলেন। টেলিফোনের ওপর প্রান্তে ভুট্টো সাহেবের কণ্ঠস্বর শুনেই পীরজাদা বললেন, আমি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা বলছি!
জি জি বলেন!
আপনাকে প্রেসিডেন্ট সাহেব স্মরণ করেছেন। এখনই যদি আসতে পারেন খুব ভালো হয়।
ঠিক আছে। আমি আসছি। প্রেসিডেন্ট সাহেবের দপ্তরে তো!
জি জি।
ঘণ্টা খানিকের মধ্যে আমি চলে আসব।
জি ঠিক আছে।
ভুট্টো সাহেবকে খবরটা দিতে পেরে পীরজাদা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন। তিনি মনে মনে বললেন, ভুট্টো সাহেব এলে তাঁকে নিয়েই তিনি প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ঢুকবেন।
ভুট্টো সাহেব বাইরে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। তিনি দেরি না করে তখনই প্রেসিডেন্ট সাহেবের দপ্তরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।
২.
ধূমপান করে নিজের রুমকে গ্যাস চেম্বারের মতো অবস্থা করেছেন ইয়াহিয়া খান। তিনি রুমে বসে আর শ্বাস টানতে পারছেন না। বার বার কাশি আসছে। বিরক্ত হয়ে তিনি স্টাফদের ডেকে দরজা-জানালা খুলে দিতে বলেছেন। এই কাজে কয়েকজন কর্মচারী নিযুক্ত হলো। তারা দরজা-জানালা খুলে দিয়ে ফ্যান ছেড়ে দিলো। তারপর এয়ার স্প্রে করা হলো। অনেকক্ষণ পর রুমটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরল। দরজা জানালা আবার বন্ধ করা হলো। কিন্তু সিগারেট খাওয়া বন্ধ হলো না। এরমধ্যেই জেনারেল পীরজাদা ভুট্টো সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ঢুকলেন।
রুমে ঢুকেই ভুট্টো সাহেব টিপ্পনি কেটে বললেন, কী ব্যাপার মহামান্য প্রেসিডেন্ট! ঠিক আছেন তো!
কেন, এই কথা বললেন কেন!
আপনার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে, শেখ মুজিব আপনার মাথা খারাপ করে দিয়েছে!
হ্যাঁ, সেরকমই অবস্থা! আপনারা কী রাজনীতি করেন বলেন! শেখ মুজিব মাথা খারাপ করতে পারল আপনি কেন পারলেন না? আপনি পারলে তো আমি খুশিই হতাম!
তারপরও আপনি কিন্তু আমার দলের মতামত ছাড়া কিছু করতে পারবেন না। আর শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দিলে কিন্তু আপনি মহা ভুল করবেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো আওয়ামি লিগ মেজরিটি পার্টি। আওয়ামি লিগ সভাপতি যদি অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানায় তা তো আমায় শুনতে হবে!
না, আপনি শুনবেন না। তাহলে কিন্তু আমি আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করব।
তাহলে আপনি একটা কাজ করেন। আপনি পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে এ কথা বলেন। তাহলে আমার জন্য সুবিধা হয়।
ঠিক আছে। আমি আজই বিবৃতি দিচ্ছি। তবে আবারও বলছি, আমার সঙ্গে কথা বলা ছাড়া আপনি অধিবেশন ডাকবেন না।
আচ্ছা, ঠিক আছে।
আমি তাহলে গেলাম।
আরে আরে কোথায় যাচ্ছেন! বসেন বসেন। চা-নাশতা না খেয়ে কোথায় যাবেন? প্রেসিডেন্টের দপ্তরে এসে কেউ না খেয়ে যায় নাকি!
আর কী খাবো! মনটাই খারাপ হয়ে গেলো! আমি বরং যাই। দ্রুত পত্রিকায় বিবৃতি পাঠাই।
ঠিক আছে, যান। কাল পত্রিকায় জুতসই একটা বিবৃতি আমি দেখতে চাই।
অবশ্যই দেখবেন।
ভুট্টো সাহেব বের হলেন। তিনি পার্টি অফিসে গিয়ে দপ্তর সম্পাদককে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বিবৃতির একটি খসড়া তৈরি করলেন। খসড়ায় তিনি লিখলেন, পাকিস্তান পিপল্স পার্টির সহযোগিতা ছাড়া অন্যদল কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা বা পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করতে পারবে না।
ভুট্টো সাহেবের বিবৃতি পাকিস্তানের উভয় অংশের পত্রিকাগুলো গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে।
পরদিনই অবশ্য আওয়ামি লিগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিবৃতি দেন। তাতে তিনি বলেন, আওয়ামি লিগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। সুতরাং আওয়ামি লিগই কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা ও সংবিধান রচনার ক্ষমতা অধিকাংশ জনগণের নিকট থেকে পেয়েছে।
এ বিষয়ে ভুট্টো সাহেব পাল্টা জবাব না দিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেন।
৩.
৩ জানুয়ারি, ১৯৭১
আওয়ামি লিগ রেসকোর্স ময়দানে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। একশো বিশ ফুট লম্বা নৌকা নির্মাণ করে সভামঞ্চ তৈরি করা হয়। মঞ্চটি তিন ভাগে ভাগ করা হয়। মাঝে শেখ মুজিব, ডান পাশে সংসদ সদস্যদের আসন আর অন্য পাশে প্রাদেশিক সদস্যদের আসন নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া বিদেশী কূটনীতিক, সাংবাদিক ও মহিলাদের জন্য পৃথক আসন নির্ধারণ করা হয়।
নির্ধারিত সময়ের আগেই সবাই সভায় উপস্থিত হন। সেই শপথ অনুষ্ঠান দেখার জন্য বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও উপস্থিত হয়। তারা আওয়ামি লিগের বিজয়ের আনন্দে নানা ধরনের স্লোগান দেয়।
শেখ মুজিব যখন অনুষ্ঠান স্থলে পৌঁছোন তখন রেসকোর্স ময়দান লোকে লোকারণ্য। প্রথমেই তিনি সবাইকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এমপিএ ও এমএনএরা শপথ পাঠ করে বলেন, ‘এমএনএ ও এমপিএরা মহান আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ করছি। আমরা শপথ নিচ্ছি সকল সাহসী শহিদ ও সংগ্রামী জনতার নামে, যাঁরা নিজেদের উৎসর্গ করেছেন এবং নির্যাতিত হয়েছেন, আমাদের বিজয়ের প্রথম পর্বের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সকল মানুষের নামে আমরা শপথ গ্রহণ করছি। বিগত জাতীয় নির্বাচনে দেশের সর্বস্তরের জনগণের ব্যাপক সমর্থন এবং যাঁরা গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন আওয়ামি লিগের কর্মসূচি ও নেতৃত্বের প্রতি। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করব।’
শপথ গ্রহণের পর শেখ মুজিব সমাবেত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, প্রিয় ভাইবোনেরা, নির্বাচনের আগে যে ষড়যন্ত্র চলছিল তা এখনও চলছে। পাবনার নবনির্বাচিত ২৫ বছরের এমপিএ আহম্মদ রফিক ও খুলনার মমতাজের হত্যা যে-ষড়যন্ত্রের প্রমাণ। দাবি আদায়ের সংগ্রামে কাল হয়তো আমি না-ও থাকতে পারি; সেক্ষেত্রে তোমাদের দায়িত্ব হবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। আজ আমরা যারা শপথ নিয়েছি তাদের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে জীবন্ত কবর দেয়া হবে। নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে না। প্রয়োজন হলে পুরুষের ন্যায় সমান অধিকার প্রদানের জন্য আইন প্রণয়ন করা হবে।
শেখ মুজিব বলেন, ছয় দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন এবং ১১ দফা বাস্তবায়নে আমাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করা হবে। আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচির প্রতি অটুট শ্রদ্ধা রেখে একটি শোষণমুক্ত সুখী সমাজ গঠন, মানুষে মানুষে, অঞ্চলে অঞ্চলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং অন্যায় চিরতরে দূর করার জন্য আমরা শপথ গ্রহণ করছি। আমরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাবো। জনগণের জন্য দলের গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে কোনও মহলের অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলব। আপোসহীন সংগ্রামের জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত থাকব। আল্লাহ আমাদের সহায়তা করুন। জয় বাংলা।
শপথ অনুষ্ঠানের খবর প্রত্রিকায় প্রকাশের পর পরই ইয়াহিয়া খান অস্থির হয়ে ওঠেন। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিরাপত্তা বিভাগের সচিব মেজর জেনারেল গোলাম ওমরকে দায়িত্ব দেন শেখ মুজিবকে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে যাওয়ার জন্য। গোলাম ওমর শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাৎ করে রাওয়ালপিন্ডি সফরের আমন্ত্রণ জানান। গোলাম ওমর নিজেই শেখ মুজিবের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। তারপরও শেখ মুজিব রাজি হননি। তাঁর ধারণা, লাওয়ালপিন্ডিতে নিয়ে তাঁকে মেরে ফেলা হবে।
পরে ইয়াহিয়া খান সামরিক সচিবালয়ের বাঙালি ব্রিগেডিয়ার এম.আই. করিমকে শেখ মুজিবের কাছে পাঠান। তিনিও শেখ মুজিবকে রাজি করাতে ব্যর্থ হন। কোনও উপায়ান্ত না পেয়ে ইয়াহিয়া খান ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গভর্নর সৈয়দ মোহাম্মদ আহসানকে তাঁর সফরের ব্যবস্থা করতে বলেন। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও পাকা করতে বললেন।
গভর্নর সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান জরুরিভিত্তিতে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেবের সঙ্গে তার বৈঠকের বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেন। উভয়ের আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত হলো, ১১ ও ১২ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক হবে। বৈঠকে শেখ মুজিব ও তাঁর দলের সিনিয়র নেতারা অংশ নেবেন।
অবশেষে ১১ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান, সাহেবজাদা ইয়াকুব খান এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে ইয়াহিয়া খানকে প্রেসিডেন্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে তিনি কী কী বলবেন তা নিয়ে সারাক্ষণ ভাবেন তিনি। শেখ মুজিবকে কী বলবেন না বলবেন তা তিনি আহসান সাহেবের কাছেও দু-একবার জানতে চেয়েছেন।
সৈয়দ আহসান প্রেসিডেন্ট সাহেবকে যে-পরামর্শ দিয়েছেন তা তাঁর পছন্দ হয়নি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি অন্য কাউকে রাখবেন না। তিনি নিজে শেখ মুজিবের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করবেন। অন্যরা থাকলে সেটা সম্ভব হবে না। ইয়াহিয়া খানের এই বার্তা শেখ মুজিবের কাছেও পৌঁছানো হলো। তিনিও একান্ত বৈঠকের ব্যাপারে কোনও আপত্তি করলেন না।
বিকেলে একান্ত বৈঠক শুরু হলো। বৈঠকের শুরুতেই রেসকোর্স ময়দানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ইয়াহিয়া বললেন, শেখ সাহেব, আপনি এ কী করলেন!
শেখ মুজিব বললেন, মি. প্রেসিডেন্ট; এটা হলো দাবি আদায়ের কৌশল। আপনি জানেন, আমি পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন করেছি। কিন্তু আমি বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। আমি এদেশের মানুষের অধিকার এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবি আদায় করতে চাই।
ইয়াহিয়া খান বললেন, দুঃখের বিষয়, আপনি এমন একটি দলের নেতা হয়েছেন যে দলটি পশ্চিম পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি। সেখানে ভুট্টো সাহেব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। আপনার তাঁর সঙ্গে কথা বলা উচিত।
আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। আমিই সরকার গঠন করব। এ নিয়ে কথা বলার আর কী আছে?
সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে আমি আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। তবে আপনাকে সমগ্র পাকিস্তানের কথা ভাবতে হবে।
অবশ্যই। আমার কাছে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
কিন্তু ভুট্টো সাহেব তো আসেননি!
না। অন্য নেতারা এসেছেন।
আমি বলি কি; আপনি ভুট্টো সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। আপনি যেমন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা; ভুট্টো সাহেবও পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। তাঁকে ইগনোর করলে তো হবে না!
ভুট্টো সাহেবেরও তো আগ্রহ থাকতে হবে। আমার কথা বলতে কোনও আপত্তি নেই।
ভেরি গুড। আপনার কথা শুনে খুশি হলাম।
ধন্যবাদ।
আমরা তাহলে কাল সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকে বসি। সেখানেই আলোচনা চূড়ান্ত হোক!
ঠিক আছে। আমি তাহলে আসি।
ঠিক আছে।
শেখ মুজিব বাইরে বের হয়ে এলেন। তাঁকে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরলেন। জানতে চাইলেন, কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে? তিনি বললেন, জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আলোচনা কি ফলপ্রসু হয়েছে?
শেখ মুজিব বললেন, ফলপ্রসু হয়েছে। তবে কাল আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে।
তারপর শেখ মুজিব বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
৪.
সকালে প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে শেখ মুজিবের সাহায্যকারী হিসেবে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলি ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান। আর ইয়াহিয়া খানের সাহায্যকারী হিসেবে ছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান, পিএসও লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস জি এম এম পীরজাদা, সাহেবজাদা ইয়াকুব খান প্রমুখ।
বৈঠকের শুরুতে কুশল বিনিময় হয় দুই পক্ষের মধ্যে। শেখ মুজিব ও তাঁর দলকে অভিনন্দন জানান ইয়াহিয়া খান। শেখ মুজিবও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্ট সাহেবকে ধন্যবাদ জানান। পরে শেখ মুজিব বলেন, আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। যথা শীঘ্র সম্ভব সংসদ ডাকুন। শাসনতন্ত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নিন। আমি ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সংসদ ডাকার প্রস্তাব করছি।
গভর্নর সৈয়দ আহসান বলেন, আপনি পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু দলের নেতা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে আপনার কোনও আসন নেই। আপনাকে পুরো পাকিস্তানের কথা ভাবতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের অংশগ্রহণ ছাড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়ন সম্ভব নয়।
আমি পশ্চিম পাকিস্তানে কোনও আসন না পেলেও আমিই মেজরিটি দলের নেতা। আমি পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থকে অবজ্ঞা করতে পারি না। আমরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা করব এবং একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হবো।
ইয়াহিয়া বললেন, সেক্ষেত্রে ছয় দফার বিষয়টি আর সামনে আসা উচিত নয়।
সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিব বললেন, এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার মূল কারণ ছয় দফা। মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে সমর্থন জানিয়েছে। ছয় দফা বাদ দিয়ে আলোচনা ফলপ্রসু হবে না।
ভোটে জিতেছেন। এখন তো আপনি সরকার গঠন করবেন। ছয় দফা নিয়ে আবার কেন আলোচনা হবে?
আমরা তো বললামই, সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা করে আমরা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছোবো। শেখ মুজিবের বক্তব্যে ইয়াহিয়া খান সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। সংগত কারণেই ইয়াহিয়া খান সংদদ অধিবেশন ডাকার বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বললেন না। তিনি জানালেন, ইসলামাবাদ ফিরে গিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবেন।
বৈঠক শেষে শেখ মুজিব দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গেলেন। সেখানে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব বললেন, সরকার গঠন এবং সংসদ অধিবেশন ডাকার তারিখ নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেছেন।
ইয়াহিয়া খান পরদিন সকালেই ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ছাড়ার আগে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইয়াহিয়া বললেন, শিগগিরই শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন।
ইসলামবাদ ফিরে গিয়ে ইয়াহিয়া অন্যরূপে আবির্ভূত হলেন। যাঁরা রেসকোর্স ময়দানে শপথ নিলেন তাদের আর সংসদে বসা হলো না। সেই শপথ অনুষ্ঠানের অপমৃত্যু ঘটল।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৮ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত