একদম আন টাটকা, লোকের আক্ষেপ আর হাই হুতাশের গুষ্টি ঠেঙিয়ে, — দেহভর্তি গোস্ত নিয়ে কবরে গেল ভরসা!
খবর ছড়াল যত — পাড়া পড়শী আপন পর — ভেঙে এল —; তাকে চোখের দেখাটুকু দেখতে! রাতজুড়ে ভেঙেছিল বাদলা, ঘেনা দুবলা পরপর কটা ঘর — কেঁঠালগাছ নারকোল গাছ আর কলাগাছের তলায় মরাঘুম ঘুমিয়েছিল…
উঠোনে কাদা —ঘরও ভিজে, সকালও গড়াল,
ভরসাকে তারই চার চারটে ভাইপো ও নাতি, চেগা কোলা করে, বাইরে আনতে হাপিয়ে গেল, টাল খেল পায়ে পায়ে।
শিউরে উঠল নেতানো চুবানো যত মানুষ, কাঁদতে বসে যারা হাঁপিয়ে গিয়েছিল, তারাও ধর ধর করে চিল্লে উঠল একযোগে, পেছল কাদায় উঠোন যেন ওৎ পেতেই আছে, মরা দেখতে আসা লোকজন হেই হেই করে উঠল চারধার থেকে!
রাতে কখন মরেছে ভরসা এই কটাবাড়ির কেউ জানে না।
সকালে বৃষ্টি আবার এল বলে মুরগী কটাকে নিয়ে বড় সেকস্তই পড়েছিল হারুনের বউ, সে গিয়েছিল ভরসার ঘর থেকে মাচায় তোলা বড় ঝুড়িটা আনতে, আর টের পায় চৌকির এক কোনা ঘেষে মেঝেই কেমন সিঁটকে রয়েছে ভরসা! ঘুমাচ্ছে।
তবে ঘুমের ছিরিছাদ দেখে বৌটার মনটা চমকে যায়, কু গায়!
পাড়া চরে খাওয়া — খাওনতে মানুষ — ভরসা, মাঝে মধ্যেই পেট বুক ফুলে ঢোল হয়, আইঢাই করে তার শরীর, ঘরের মেঝে ঠান্ডা — তার ওপর ঘুমিয়ে পড়ে সে বহুরাত।
বকাঝকা করলেও শোনে না, বলে গরমে মরি, মেঝেতে খালি গায় শুলি ঘুমডা একটু হয়…!
পেটের তলা থেকে দুটো পা-ই — ভরসার — প্রায় মায়ের পেট থেকে পড়া তকই — নুলো, এখন
কাপড়ও নেই, মানুষটা যেমনই হোক, এমন বে আক্কেলে ঘুমের মানুষ তো মানুষটা না, খোড়া ভেঙড়ো মানুষ তাতে চোখেও একটু কমা বলে রাত বিরেতে বাইরে ওঠে না ভরসা, ক্ষমা ঘিন্নার মাথা খেয়ে ঘরেই হেগে মুতে ছড়িয়ে রাখে সে, আর সেইসব গু মুত প্রায় একলা হাতে ধোয়া পাকলা করে এই হারুনের বউ, শরিকের মানুষ ভরসা, ফলে হারুনের বউ মাস বাবদ কিছু পায় শরিকি বাবদ, যতই হোক, পাকা মানুষের গু মুত আর খিজালোত টাকা পেলেও বা সয় কেডা!
হারুনের বউ ভরসার গায়ে একটু ঠেলা মেরে ডাকে!
— ও চাচা! এ তোমার কি আক্কেলে ঘুম, চাচা!
ভরসা জমে অঠাঁই… ঠান্ডা… হারুনের বৌর হাত কেমন কনকন করে উঠল নিমেষে!
মা নেই বাপ নেই, খোড়া আর অকম্মা বলে বিয়ে থা কিছু হল না, লোকের লাথি ঝাঁটা খেয়েও মুখের হাসিটা যার কমে না, কমত না, হারুনের বৌর ভরসার ওপর মায়াও একটু ছিল।
ফলে সবার চোখের আড়ালে — চৌকি থেকে পড়ে বা না পড়ে,— আল্লাই মালোম, — ঘরের মেঝের ঠান্ডায় সিঁটিয়ে টুনকো হয়ে শক্ত হয়ে গেল—; পড়ে থাকল মেঝেতে, কেউ মুখে একটু পানি দিবার পারল না, পানি চাইলও না কারো কাছে; — জাহানটুকু নিকেশ হবার আগে কতই না দগ্ধেছে মানুষটা, — হারুনের বউ চিল্লে ওঠে জোরে, আর তার সেই চিল্লানি ফাড়ানি শুনে মিয়া বাড়ির ঘুম সবার মট করে ভেঙে যায়।
হাগা নয় মোতা নয় চৌকি থেকে পড়েই মরণ :—
শরিকি ভরসার শরিকি ভাইপোরা আর ভাইপো বৌরা — দুঃখ পাওয়ার চে বেয়াকুব হল যেন বেশী!
মেজ আর সেজ ভাইপো মিলে ভরসাকে চিৎ করে শুইয়ে দিল খুব কষ্টে, দেখা গেল পেটের কাছে লম্বা করে একটা জায়গা ছড়ে শাদা মাস বেরিয়ে গেছে, জিভ টা বেরিয়ে গেছে প্রায় দু আঙুল।
মানুষের পাঁচ কথার ভয়ে,জিভটা ঠেলে গালে ডাবিয়ে দিতে গিয়ে, রফিকুলের আঙুলে লেগে গেল রক্ত, সামান্য, হয়ত মাড়ির!
আর পিল পিল করে আসতে শুরু করল পাড়া ও প্রতিবেশীরা।
মসজিদের মাইকে ঘোষণা শুনে, কেউ বা সকালে বাজার ও মাঠে যাওয়া রদ করে,— চলে আসতে লাগল একের পর এক, গেল বিকালে গেলকাল দুপুরে এমনকি তার আগের দিন সন্ধ্যায় — টিপটিপে জলে — পাড়ার তেমাথায় যাকে ডাঁহা জ্যান্ত মানুষ হিসাবে দেখা গিয়েছিল, কথা বলেছিল, কথা শুনেছিল, সে কিনা নেই….!
হারুনের ঘর লাগোয়া কল আর গোয়াল আর মানুষের গাদা, মুদ্দাকে ধোয়াতে হয় দুবার দাফন করার আগে, প্রথমবার ঘরের মানুষের হাতে — পরেরবার পরমানুষের হাতে….!
গোয়াল ঘেসে চৌকি একটা পাতা হয়েছে!
ভরসাকে ঘর থেকে আস্তে করে নামাতে গিয়ে পা পিছলে গেল তার ভাইপোদের দুজনের,— শব্দ হল থপাস করে— পা নেই পুষ্যি নেই — শুধু ঠুঁটো একটা শরীর —
উঠোনের জটলার ভেতর একজন হয়ে বসে ছিল রোবেকাঠুর ছেলে স্বপনকাঠু।
বয়সে সে যেমনই হোক ভরসার সে বন্ধুগোছের মানুষ, ভরসা যে মাসকাবারে বৃদ্ধভাতা পায় তার জন্য যা হাঁটা পড়া লাগে— সব নাকি এই স্বপনের করা।
কে কখন কান ভাঙচি দিয়ে, ভড়কি দিয়ে, বেহাত করে টাকা পয়সা, ভয়ে ভাবনায় ব্যাঙ্কের বই আধার ভোটার কার্ড সব নাকি ঐ স্বপন কাঠুর হেপাজতে রেখেছিল ভরসা।
লাশ নিয়ে ভাইপোদের টাল খাওয়া দেখে স্বপন এখন খেঁকিয়ে উঠল।
… ভরসা ভাই বলত আমি কাঠ নয় শরীরে গোস্ত নিয়েই কবরে যাব স্বপন!
ভরসাভাই গোস্ত নিয়েই মরলে। তোমরা এখন হাঁপালি হবে কেন বাপ? চারভাই মিলে আমাদের একটা মাত্র খোড়া ভাইডারে কোলে নিয়েছ, তাও হাঁপাচ্ছ?
স্বপনের কথায় জটলার লোকজন সব নড়ে চড়ে উঠল! স্বপনের কথাটার হাল ও হেতেল বুঝতে মুখ চুলকে নিল কেউ কেউ!
বাপকেলে জমি ভিটে আগান বাগান বাবদ ভরসা যা পেয়েছিল — সব এই ভাইপোদের নামে আগাম দলিল করে দিয়েছিল সে সমানে সমান। গাঁয়ের পাঁচ রকম মানুষ কথাও তাদের পাঁচ রকম!
…হাতের পাঁচ কেউ ছাড়ে? ভাইপোদের দুয়োর ঘুরে এবার মরো ভরসা! মজা কত, তলায় না ওপরে, টের পাবা এবার!
… ভাইপোগুনু আমি বন বাদাড় থেকে পাইনি।
বলতে বা মুখ শুনিয়ে দিতে ভরসাও ছাড়েনি কখনো! কটকট করে গলা বাজিয়ে বলেছে — ওদের বাপ আমার বড়ভাই হয়, খোড়া বলে কোনদিন ওদের কোলে নোব পারিনি!
কাঁধে বসিয়ে স্নান করিয়ে আনব পুকুরতে, পারিনি।
এখন আমার মাঠের জমিটুকু, ভিটের এই ভাগটুকু ওদের আমি ভাগে ভাগে দিয়ে গেলাম, এই আমার কোল এই আমার বুক!
কথায় বলে ছয়ে ঋতু। আমার ভাইপোও ছয়টা। ওদের পাত কুড়োলিও ভাতের গাদা, ও আল্লা আমি কত খাবো, একা!
তবে ভাত নাকি কুড়িয়েই খেতে হত ভরসার।
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরঘুর করা অভ্যাস বলে বেলার খাবার বেলায় এসে খাওয়ার সে সময় পেত না, দেরি হত রোজ, তাতে ছয় ছয়টা হেঁসেল, একেক হেঁসেলের থালা বাসন আরেক হেঁসেলে আলাদা, ফলে বৌমাদের কাছে মুখ শোনা ছিল তার বাধা, পাড়ায় তার সাক্ষীও দুয়েকজন আছে, বিশেষ করে রফিকুল কিম্বা হারুনদের প্রায় এক উঠোনের মানুষ ঐ রামের মা আর জিতেনের বৌ,তারা তো ভরসার বডি আগলে বসে আছে সেই সকাল থেকে,— অনাবেত্তক চোখের জল ফেলছে এই এক কথায়, আর নানান বৌর নানান খিত্যেপ গাচ্ছে লোকজনের সামনেই!
ফলে স্বপনের কথায় ময়ুত বাড়িতে আসা নানা কিসিমের লোকজন উসকে উঠে ভরসার ভাইপোদের নামে নানা কিসিমের দুঃখের কথা এখন পাড়তে লাগল, —!
শুনলে মনে হবে ফারাক্কার বাঁধ বাঁধা হয়েছিল —
ভরসার ভাইপোদের কারণেই এবং ওপার বাংলার মানুষেরও যত দুঃখ ও কষ্ট, তার কারণ এই ভাইপোরা।
এমনকি এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এত নছল্লা এত দুর্নীতিবাজী চালিয়েও বহাল তবিয়তে আছে, তাও এই ভরসার ভাইপোদের কারণেই।
স্বপন গেরস্তর ছেলে নিজেও গেরস্ত।
কাঠুপাড়ার এই মানুষটা শরীরে একদম ঘেনা, ছোট থেকে যারা তাকে দেখেছে, জানে— স্বপন কাঠু কোনদিন যুবক হয় নি, এদিকে মাথার চুল গোঁপ দাড়ি কবে কবে যেন পেকে কাকের ঠ্যাঙ বকের ঠ্যাঙ হয়ে গেছে!
হাতে একটা পাচুন, হয়ত গোয়াল থেকে খবর শুনেই চলে এসেছে সে মিয়া বাড়ি, চৌকি ঘেষে দাঁড়িয়ে ভরসার স্নান করানো দেখে সে গয়া কম্বলে মুখ মুড়ে!
ভরসাকে নাড়া, নেড়ে মুখ শোনা যে স্বপনের অভ্যাস, সে এখন ভাইপোদের হাতে অসাড়— ঢেবা— ভরসার শরীরে জল তোলা ফেলা দেখে!
— এ ভরসা ভাই! সাদা থানে মুড়োবি বলে মরলি নাকিরে?
একটু হাগলি নে, পাদলি নে, এ তোর কি মরারে ভরসাভাই?
খোড়া ভেঙড়ো মানুষ হিসাবে ভালো জামা কাপড়, এক ইদের দিন ছাড়া, ভরসা কোনদিন পরে দেখেনি। পেলেও পরেনি। না পেলেও পরেনি।
সে ছিল তিন আনির মানুষ, পেট থেকে পড়া খোড়া, বাপের নাম ইছাহক মিয়া, মায়ের নাম কি শোনার দরকার পড়েনি কারো, কানেও আসেনি কখনো। বাড়ি ছিল মথুরগাছী, সত্তর সালের রাইটে মথুরগাছী গ্রাম গ্রামশুদ্ধু চলে গেল যশোর মধুপুরে— ওপার বাংলায়!
আর মধুপুরের ঘোষেরা গ্রামধরে, বিনিময় করে চলে এল এই মথুরগাছী গ্রামে।
ইছাহক মিয়া রাইটের কদিন ঢেক নিয়েছিল এই কাঠুপাড়ার নিতাই পালের গোয়ালে, নিতাউ পাল ছিল কমল পাল— নির্মল পাল — তারপর ধরো বুড়ো পাল— ; ওদের বাপ! ইছাহক মিয়ার গোনা গুন্তিতে মোট তিনমেয়ে আর চারটে ছেলে,— মেয়ে তিনটে বড়, —ছেলেরা সব ছোট তবে পিঠোপিঠি।
রাইটের প্রথম দুটো রাত ভিটে বাড়ি গরু ছাগল আঁকড়ে মথুরগাছীই পড়ে ছিল ইছাহক, তে রাতে আর বাগ মানল না কিছুই।
খেদাইতলার লোকজন কাঠুপাড়ার লোকজন যারা দিনরাত জেগে পাহারায় ছিল মথুরগাছী গ্রামের,— তাদের লাশ পড়তে লাগলে— মথুরগাছীর মানুষেরা খালি করে দিয়েছিল গ্রাম, ইছাহক মিয়াও সেই পৌষ মাসের রাতে সোনাকুড়ি মাঠ পেরিয়ে পালিয়েছিল এই কাঠুপাড়ার দিকে!
কমল পালের বাপ নিতাই পাল, বাতে কাবু একটা লোক, ইছাহক মিয়াকে গুছিয়ে পুকুর আর বাঁশবাগানের বনজংলা ভেঙে — নিয়ে গিয়েছিল নিজের বাড়ি, তুলেছিল গরুর গোয়ালে!
গরু ছিল তার গোয়াল ভরা, লাঙল বইত মোট তিনটে, তাছাড়া গাই আর বাছুরে কত গরু,— তা মদন দুলের মা — হালি বুড়িই— জানত!
কেননা হালি বুড়ি ছিল অই পাল বাড়ির পেট ভাতের বাঁধি কাজের লোক — ; থাকতও পালের গোয়ালে—; ঘর তুলে!
হালি বুড়ি লম্ফ জ্বেলে দিলে ইছাহক মিয়া নিজের পারিবারিক সেই দলটায় বড় আর মেজ মেয়ে দুটোকে খুঁজেছিল মাথার পাকা চুল খোঁজার মত,— হলে হবে কি রাইট থামথামা হলে জানা গিয়েছিল মেয়ে দুটোকে কুকুর শেয়াল ছেঁড়া করে — ছড়িয়ে রেখে গেছে — কুঠির মাঠের নাবালে আর এই ভরসা পড়ে আছে নোনাকুয়োর হাবড়ে এক গর্তে, তবে প্রাণে সে বেঁচে আছে।
মাথা ছিল কাঁধ ছিল, বুক পেট ছিল সবচে জাবদা, হাতও ছিল দুটো। কিন্তু কোমরের নীচে দুটো পা-ই ছিল তার জনমের শত্রু, দাবনাও মোটা, কিন্তু হাঁটু বলে বা তার নীচে যা যা থাকে মানুষের, তা ভরসার ছিল না।
ফলে সে গর্ত উজিয়ে নোনাকুয়োর উঁচু পাড় উজিয়ে কাঠুপাড়ার দিকে আসবে, মুরোদ তার হয়নি।
রাইট ফোরালে ইছাহক মিয়া ফেরেনি আর মথুরগাছী গ্রামে, চলেও যায় নি আর আর মথুরগাছী নিবাসীদের মত ওপার বাংলায়— যশুরে মধুপুরে।
মথুরগাছী আর কাঠুপাড়ার মাঝখানে সোনাকুড়ি আর বেলেমাঠ, দুই মাঠের ভেতর দিয়ে কাঁচা উলঙ্গ রাস্তা, ঘোড়াবটতলা, তারপর বিষ্ণুপুর দখিন ও নেউলের বিল।
এই নেউলে বিলের কান্দায় আশু ঠাকুরের মস্ত বাঁশবাগান, একবাগে প্রাচীন এক অশথগাছ আরেক বাগে বহুদূর বিল— আর দুলেপাড়া।
মাঠের জমির বন্দোবস্তে এক কানি ভিটেজমি দিয়েছিল আশু ঠাকুর, সেখানেই ঘর তুলেছিল ইছাহক মিয়া এবং ওড়া পোড়ার পর মাঠে ও দখলে যা ছিল তার সবটুকু প্রায় এই ভরসার নামে কাগজ ও বকলম করে দিয়েছিল সে, দলিলে পরচায় দাগে ভরসার নামটা স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেইদিন টিপসই সহ!
কিন্তু এড়ানো ছড়ানো হয়ে মানুষ হওয়া তার বন্ধ হয়নি, মানুষের পেছনপড়া হয়ে মানুষ হওয়া তার বন্ধ হল না!
প্রথম প্রথম তাকে এপাড়া ওগ্রাম থেকে কুড়িয়ে আনত ইছাহকের আর ছেলেরা। কালে কাল গেল, কুড়িয়ে আনা ফুরাল যেভাবে ফুরায় বিল খালের জল আকালে।
পা না থাক পাছাটা ছিল ভরসার ষোলো আনা।
দুটোহাতকে পায়ের মত আগুপিছু করে, পাছা দুমড়ে ও মুচড়ে, এদিক ওদিক ঘুরঘুর করায় সে ছিল অকুলান।
গলায় ঝোলানো থাকত একটা পেতলের ঘটি। আর পরনে টায়ারের হাফ প্যান্ট, দুপুর ঠাঠা পড়তে শুরু করলে সে ঘুমিয়ে পড়ত কোনদিন খেদাইতলার মজুমদারদের মন্দিরে, কোন কোন দিন তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যেত ঝমঝমা বৃষ্টি আর সে জলে ও কাদায় ভূতের মত নিজের বুকে মাথা গুঁজে পড়ে থাকত হয় রাস্তার এধারে নয় কোন না কোন গেরস্ত বাড়ির আনাচে কানাচে।
কেউ যে তাকে নামিয়ে দিত বারান্দা থেকে কিম্বা আয় ভরসা ওপরে উঠে বোস বলত,— তাও না।
দুলেপাড়া মথুরগাছী খেদাইতলা হাঁড়িপুকুর বিশ্বাসপাড়া নেউলে গ্রামে ও পাড়ায় ভরসা ছিল সবচে বেখেয়ালে সবচে জবুথবু— হাতের নয় পাতের নয় এক কুড়ুনে মানুষ — ভিকিরিও না আবার ঘরামীও না — ; সোতে পড়া পানা— ঘাট থেকে ঘাটে মাথা ঠুকে ভেসে যাওয়া যেন আদিম এক ঠুঁটো বিরিক্ষি!
আসপাশে মুসলমানদের ঘর গেরস্থী প্রায় নেই বললেই চলে, খেদাইতলা হল ফেনি নোয়াখালি ভোলা থেকে আসা মানুষে ভরা একটা গ্রাম,— হাঁড়িপুকুর তেমন সবটাই প্রায় যশোর, — আবার নেউলে পাড়া ভরা হল ফরিদপুর কুষ্ঠিয়ার মানুষে!
স্থানীয় বলতে কাঠুপাড়ার ষাট সত্তর ঘর চাষা ঘোষ আর এক দেড়শ ঘর বিশ্বাসপাড়ার চাষা ধোপারা, তেমনি মথুরগাছী হল পুরোটাই যশোর মধুপুর— চাপটে গয়লা ঘোষেদের গ্রাম, তবে বসতি হিসাবে কিছুঘর মুসলমান এখনো আছে, তারা সব কোমরভাঙা চাষা আর জন খেটো মানুষ!
থাকল এই বিষ্ণুপুর দক্ষিণ, চারঘর বাওন — তাও শুধু আশু ঠাকুরের নাতিপুতিরা,— সাত আট ঘর কায়স্থ দে আর পাল আর বারো তেরো ঘর ভরসা আর তার ভাইপোরা আর মসলেম মিঞা আর মছুমিয়া আর গোলাম মিয়ার ছেলে আইজেল…!
তবে এসব মানুষে, কার কি আচার বিচার, কার কি মনের জ্বালা, ভিটে মাটি হারিয়ে এসে কার কতটা মাথায় আগুন, কে হরিবোল আর কে সৎসঙ্গী, কে গোলটুপি আর কেই বা লম্বা টুপির মুরশুল্লি,— জানতে যেন বয়েই যেত ভরসার।
চোর ছ্যাঁচোড় দাদি নানি মাসি পিসির কাছে হাত না পেতে— কাঁধে ঝোলা না ঝুলিয়েও— কিভাবে বাগিয়ে খেতে হয়,— এ ছিল তার সাক্ষাৎ পেটের বিদ্যে!
মথুরগাছীর হারুঘোষ রামপাটির মাইক ফোকা তাগড়া টাইপের এক লোক, দেখা গেল ভরসা খুব আনাগোনা করছে হাওয়া বাতাস হয়ে, বুগবুগিয়ে, তারই বাড়ি।
… চাইলাম কডা টেকা,দিলে না?
ও হারুদা, আমার তাহলি চলবে কেনো বলো?
জাতে ধর্মে খুব শুচিবেয়ে লোক হারু ঘোষ,হালে মন্ত্র নিয়েছে ইসকনে গিয়ে,বাড়িতে নিত্য প্রভুসেবা হয়!
সকাল গেল দুপুর গেল, স্নান খাওয়া দাওয়া সেরে দাওয়ায় এসে বসবে হারুঘোষ, দেখে কি ভরসাকে কলাপাতায় ভাত আর এঁচোড় দিচ্ছে ঘোষ গিন্নি—; তাও বড় হাতা করে আর আস্নানে আগায়ে গপ গপ করে সেই ভাত খাচ্ছে নুলোর নুলো ভরসা।
চোখাচোখি হতে ভরসার আবার সেই এক বোল এক কিরে।
… তেল কিনতে হয়; সাবান সোডা কিনতে হয়; — জিনিস পত্তরের যা দাম, আমি তাহলি পারি কি করে বলো? টেকা কডা তুমি দেও হারুদা!
তার যে পুব আছে পশ্চিম আছে, ছয় ছয়টা ভাইপো আছে, মাঠে দিন আর ঘরে রাত আছে, হারু ঘোষের তা জানা, কিন্তু ভরসার মুখের গুতোই ‘রা’ কাড়বে — এমন মানুষ আছেই বা কে, — এলাকায়!
মহালয় গেল। ভরসাও অমনি ঘাই ঘাই গিয়ে হাজির হল স্বরূপ বিশ্বাসের বাড়ি।
স্বরূপ বাড়ি আছে কি নেই, কাপড়ে আছে না কাজে আছে — চেত নেয়া নেই, ঐ বাড়ীর সিড়ির ধাপে গিয়ে— পাছায় থুবো হয়ে বসে— ভরসা শুরু করল তার কেতাব গাওয়া।
… এ জেঠা। ঐ দ্যাখ পুজো আসছে।বোনাস বাবদ কডা টেকা এবার ধরে দিবা কিন্তু।
স্বরূপ কি স্বরূপের বউ ঝাঁকা নাকা একটু করল বটে, বৃদ্ধভাতা পাওয়া নিয়ে, ভাইপোদের রমরমা বেগুন চাষ ও উঠতি পড়তি অবস্থা নিয়ে, —খোঁটা হয়ত একটু দিল, কিন্তু ভরসার যেন জনমকেলে প্রাপ্য এসব, রদ হয় না কখনো!
আকাশ আবার ভরে এল মেঘে। মসজিদে— বারে শুক্র—, জামাতের নামাজও শেষ হল।
ইমাম সাহেব তদারক করে কাফনকার্য গুছিয়ে রেখেই জামাতে গিয়েছিলেন, আকাশের ভাব ভাল নয়— দেখে ত্বরা করে মুদ্দার দোয়া দরুদসহ জানেজা সারা করলেন রফিকুলের উঠোনভরা কাদায়, জ্ঞাত অজ্ঞাতসারে ভরসার করে যাওয়া ঋণ ও কথা খেলাপি থাকলে নগদে তা পরিশোধ করবে তার ছয়জন ভাইপো, কথা উঠল, কথা পড়লও।
খানিকটা যেন তন্দ্রা নামল জামাতে, রাস্তায় আনাচে কানাচে দাঁড়িয়ে থাকা
ভিনধর্মী ভিনগেঁয়ে মানুষজনও একটু উলসে উঠল, হারু ঘোষ জপ থলেতে আঙুল বুড়িয়ে নাম জপা অব্যাহত রেখে ধেই করে উঠল — খোড়া নুলো মানুষ ভরসা, তার আবার ঋণ কি? থাকলিই বা জানবে কিডা?
অগত্যা মসজিদ থেকে আগত মুরশুল্লি-নামাজিরা ও বাহির থেকে আসা ভরসার আত্মীয় কুটুম্বরা সাবেক ইছাহক মিয়ার ভিটের নাবো দিয়ে,বাঁশবাগান— তার তলায় গোরস্থান, পায়ে পায়ে লটকে যেতে লাগল আকাশ আর ভরসার সহায় সম্বল বিষয়ে দোয়ারকি দিতে দিতে!
মানুষজন ভাঙল যেন অনেকটা করে।
জিতেনের বাড়ির এদিকে ওদের ভিটের সীমানায়— মুলিবাঁশের বেড়া;— তার আলে বসে রঞ্জন আর বাসু আর বয়সে খুব বড় একজন নড়বড়ে লোক — কাদা আর ছপছপে জলে — আরো কজন ভিনগেঁয়ে লোকজনের সঙ্গে এতক্ষণ ঘুটঘুট করছিল, লোকজন গোরস্তানের পথে হাঁটা দিলে ওরা একটু ধগনে পড়ে গেল যেন!
বাসু এসেছে সোনাকুড়ি মাঠ হয়ে — রঞ্জনও তাই! সম্পর্কে দুজনে দুভাই, ভরসার একটা ব্যাপারে বুকটা খুব আছড়া পিছড়ি করছিল বলে — মন খারাপ করে বাসু চুদুর মত বসেছিল এতক্ষণ— রঞ্জনের ঠিক পেছনে!
বিষ্ণুপুর বাজারে — গেল হাটের দিন— বাজার মহড়া করে— ভরসা তাদের ধরেছিল খুব— দুভাইকেই।
হাটে বেগুন তুলেছিল বাসুরা ঐদিন কানায় কানায় তিন মন।হলে হবে কি — বাজার ছিল মরা— দরে কমা! তাতে কানাবেগুনও ৫০ কেজি—! দলা কচড়া মেরে গিয়েছিল মন আর মেজাজ; দুভাইয়েরই। আর তখনই লেগেছিল ভরসা নুলোর ফেউ!
…ও রঞ্জন, ২০ ডা টেকা দে বাপ। নাপিত পাবে। আজ টেকাডা দিয়ে তাই বাড়ি যাবো, মনস্তাপ করিছি রে!
বাসু একটু ট্যাকখোরে লোক।এসব অসৈলে তার সয় কম।
এমনিতে পঞ্চাশ কেজি কানাবেগুন হাটে বিকালো কিনা একশ টাকায়, আর ভরসা কিনা থাওকো ঐ কুড়ি টাকাই চেয়ে বসল! রাগে উত্তেজনায় বাসুর মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে দপ করে।
তার কানায় পড়ে রঞ্জন ঐ কটা টাকা ভরসাকে দেয়ওনি। বলা ভাল বাসুই দিতে দেয়নি!
মাঝে মাত্র দুটো দিন, সেই ভরসা কিনা চৌকি থেকে পড়ে মরেই গেল!
সম্পর্কে একজন ভরসার নাতি বাকি তিনজন তার ভাইপো।
কাফনে ঢাকা ভরসার খাটিয়া তুলে নিল কাঁধে, বাসুকে ফেলে বুড়ো মত মানুষটাকে ফেলে রঞ্জন তাড়া করে গিয়ে কাঁধে নিল খাটিয়ার একটা কোনা…!
রফিকল মিয়া পেছল একটু, উপস্থিত মুশুল্লিরা দরুদ পড়তে লাগল জোরে…! গুনতিতে তিন ভাইপো আর রঞ্জনের কাঁধে চেপে ভরসা চলল গোরস্তানের পথে!
ইছাহক মিয়া এখন কয়েকটি ঘরে ভাগ, ঘরে ঘরে কোরান তেলাওয়াত চলছিল, ঘর ভরা ঘরের কুটুম, হঠাৎ বাসুকে প্রায় উপড়ে বুড়ো মত লোকটাও উঠে দাঁড়াল কাদা পায়ে।
…. তুমি কবর দোবা? বাসু বিরক্ত ও নাজেহাল হয়ে শোধালে বুড়োটা একটু দাবড়ানি দিল বাসুকে।
এবং সটান পায়ে রাস্তা ধরে বলল
… কবর দেচ্ছে কার লোমবায়—হি?!
ভরসার কবরে মাটি দোব কমুঠি;— বুজিছো!
— তোমারে দিতি দেচ্ছে কেডা?
— ক্যান? আচমকা বুড়ো ঘুরে দাঁড়াল বাসুর কথায়! তারপর পুব দিকজুড়ে হাত মেলে কিছু একটা বাসুকে দেখিয়ে বলল, — দ্যাশে থাকতি মুজিবর মিয়ার কবরে মাটি দিছি, খোকন দফাদাররে দিছি, আমার এক বৈন ছিল সেখের বিটি,—তারেও এই হাতে কবর দিছি, বোজছো!
বাসু মুখ ভোঁতা করে লোকটার কথা শোনে আর হাঁটে, ভরসার খাটিয়ার পিছনে লম্বা লাইন, — যত লম্বা লাইন — বুড়ো মত লোকটা কোমরে তত বাঁকা!
পা দুটো কেমন কাদায় আছাড় খেয়ে খেয়ে গোরস্তানের দিকে এগোয় মানুষটা, হাতে রসুইয়ে নড়ি নড়বড় করে, বাসু আরো পেছনে আসতে আসতে বুড়োর খেল দেখে।
এটুকু সে জানে, লোকটার হাঁড়িপুকুর গ্রামের স্কুল যাবার যে রাস্তা, তার ঠিক মাথায় — বাড়ি।একবার দুবার তিনবার সে গিয়েছে। দেখা হয়েছে— কখনো হয়নি, তবে মুখটা চেনা। কানে কানে এও তার জানা লোকটা জন্মের খারাপ, লুটপাট করত এককালে, দাড়ি মুখে টুপি মাথায় লোক দেখলে টুপি কেড়ে নিত, দাঁড়িও নাকি ছিঁড়ে নিত কারো কারো—!
ভরসার কবরে মাটি দেবার জন্য সেই লোকটার এখন এই মরিয়া ভাবে বাসুর কেমন চেলকো লাগে।
ইছাহক মিয়া মরে কবে সাফ হয়েছে বাসু তা জানে না!
তাতে যে পাড়ার মানুষ এই লোকটা— ইছাহক মিয়া কিম্বা ভরসা— কারোর সঙ্গেই তার ধহরম মহরম গড়ে ওঠারও কথা নয়।
বোল চাল চেহারা সবই ত খাটাশ। কালে খাওয়া।
ভরসার খাটিয়া আকতার মিয়ার উঠোন দিয়ে সোজা পেছনে চলে গেল,— সামনে বাঁশবাগান,— তলায় পরপর কতগুলো ভাঙা ধ্বসা কবর,— একেবারে পুবে ত্রিপল টাঙিয়ে কবর খোড়া হয়েছে ভরসার,— খাটিয়ার মাথা উত্তর মুখি করে নামান হল ত্রিপলের ঠিক নীচে!
— মানুষ আকতারের পেছল উঠোনের চারদিক দিয়ে— নামতে লাগল বাঁশতলায়!
বুড়ো অনেকটা পিছনে, আগে পৌঁছতে না পারলে ভরসার কবরে মাটি দেয়া যেন তার পৌনে হবে।
…. আছাড় খেয়ে মরবা? বাসু একটু হড়কায়।
তাছাড়া কবরের আগ মাটি তোমারে দিতে দেচ্ছে কিডা কও?!
সব যেন জানে বুড়ো মত লোকটা।
পরনের কাপড় একদিকে তার ঝুলে গেছে তাড়ায়, তাতে কাদা, তাছাড়া কবরটা আর তার সামনে— এখন প্রায় শ দুয়েক মুরশুল্লি — মাথায় টুপি!
বুড়োটা মাথায় গামছা ফেলে এখন ভিড় কাটায়, — আর চোখে মুখে হাঁপিয়ে বাসুকে মিনতি করে :
— আমি একলা মোডে পারতেছি নে যে, পেছন তে আমারে এটটু ঠেল দেও বাজান!
জানাজা না জানলেও বাসু এই বিষ্ণুপুর দখিন পাড়া জানে! রফিকুল হারুন মছুমিয়া ফজরালী আর কেলে মশলেমদের জানে।
জানে — মাটি আগে দাও আর পরে দাও— বড় কথা নয়— জানেজার শরিক হওয়াই বড় কথা, তাছাড়া মসজিদ আর কুটুম গোছের লোকেরা ভরসার কবর ঘিরে আছে এখন, সেখানে পৌঁছন চাট্টি খানিক কথা নয়, অগত্যা সে এই বাতিকে বুড়োর পেছন ছাড়ে, বসে পড়ে পথটার পাশে, সামনে বাঁশবাগান, যেমন ঘোর তেমন প্যাচপেচে কাদা আর মশা।
….মিনহা খালাক নাকুম — ওয়া ফিহা নুঈদুকুম— ওয়া মিনহা নুখরিজুকুন— তারা তান উখরা;— বোল ঝাড়ে ইমাম সাহেব!
আর ভরসার কবরে ছড় ছড় করে মাটি পড়ে, লোকজনের গালে ও গলায় শব্দ হয় থেমে থেমে, তার মানে কবরে ভরসাকে নামানো সারা,বাঁশের চটা দিয়ে কবর ঢাকা সারা!
আরো আজগুবি ও আজব কিছু শব্দ এখন গোরস্থান ও বাঁশবাগানে বুগবুগ করে উঠলে বুড়ো বাসুর হাতটা ধরে টানে। চিল্লায়!
— আগোয়ে চলোদি বাজান, আমারে এটটু নেও!
… কেন? ভিড় আর ভিড়ের চাপে আর কাদায় আর ভ্যাপসা গরমে থগবগে হয়ে বাসু এবার জোরসে, যেন ফাঁস করে দেবে বুড়োর ধান্দা, খ্যাক করে উঠল প্রায় পাল্লা দিয়ে!
— এত বেগ ক্যান তুমার? তুমি না হিন্দু মানুষ?
… জানি বাপ!
… তাহলি?
…. শোনবা? বুড়ো এবার বাসুর ঘাড়ের নিকটে উপুড় হয়ে একটু যেন বসল, পাছাটা থেবড়ে গেল কাদা ও জংলায়। তারপর ধরা — নিশিগলায় ডুবে, হাতে পায়ে খেই হারিয়ে, আঙুল ঘুরিয়ে এবং দুচোখ বুজিয়ে তড়বড় করে বুড়ো বলল,
… সত্তর সালের রাইট, বুয়েছ, গ্রামটা মথুরগাছী, সেদিন ঘরে ঘরে আগুন, জ্বলতেছে… দাউ দাউ করে—! বোজছো!
চারধার তে দা সড়কি ঢালি হাতে লোক ঝাঁপে পড়তেছে…!
লুটপাট চলতেছে।
সোনা দানা পেতল কাঁসা ধান চাল খাট আলমারী, —কেউ গরু নেচ্ছে —, কেউ কাঁচা বয়সের মাগী, …!
বাসু এসব কথায় কোন মজা পায় না। দুঃখও পায় না। ঐ তো মথুরগাছী গ্রাম, তাদের আবার সোনা দানা তাদের আবার খাট আলমারী, তাছাড়া
রাইট হল কবে আর আবার হবে কবে, তা নিয়েও তার মাথায় কোন টেনশনও নেই, তবে বুড়োর গাল বড় খেলুড়ে। দাঁত তো নেই, আছে তুবড়ানো আর পাতলা মাংসে হলবলে একটা মুখ, ভেতরে লাল, টোপা কুলের মত একটা জিভ, বা সু হা করে দেখছিল সেই জিভটা, একবার কথা বলছে একবার কথা গুছিয়ে নিচ্ছে।
সবচে বড় কথা ভরসার কবর দিতে এসে এমন এক আপদের সামনে পড়তে হবে, জানলে সে এমুখোই হত না।
রঞ্জন তার দাদা, সে বাতেলা শোনার মানুষই না, খুলে নিয়েছে। বুড়ো আবার শুরু করে তার প্যাঁচাল পাড়া!
… বুঝলে বাপ, অহন যিডা আম্পাঘোষের বাড়ি কিম্বা ধরো অবনীঘোষের পুকুর— ঐ সব তহন এই মিয়ার, মানে ইছাহক মিয়ার, পাশে বড়ো রাস্তা!
মথুরগাছীর মানষিরা পরান নিয়ে তহন পলাচ্ছে,
যে যেরম পারে খুলে নেচ্ছে, প্রাণের ভয়ে মিয়ারা ভয়ে কেউ কাঁদতেছেও না। ছোটো ছোটো যারা দুধু খায়, তাগের গলা টিপে ধরেছিল মা চেঁচানোর ভয়ে, মরে গেছে বুদা কহন, মা বিটি তা জানেও না, বুজলে!
ঘরে আগুন। মিয়ারা পালাচ্ছে। এতেও বাসুর রা কিছু জোটে না। সে চোখ দুটো একটু বিকট করে নিয়ে গোসা দেখালে বুড়ো চেতে ওঠে আরো।
… আমরা তহন হি যুবাক বয়স, হি— হাতে দাও, হাতে সড়কি, সরকার অডার দেছে ধরপাকড় হবে না, শোনা যাচ্ছে পদ্মবিলির মিয়ারা হাঁড়িপুকুরির দিকি আসতেছে, আমরা মথুরগাছী থেকে বারোলাম। বারোয়ে রাস্তায় সবে উঠিছি, ঘরে ঘরে আগুন, তার হলকায় সামনে মাঠ একদম ফকফকা, কডা পোকা মরল— তাও যেন টেরা পাওয়া যাচ্ছে!
হঠাৎ দেখি কি, পুকুরপাড় ধরে কিডা যেন পোঙা ঘষতি ঘষতি— হি— রাস্তায় আসে ওঠলো, হাত দুটো মোটা, তবে পা নাই পাছা নাই। বয়াস আট কি দশ— হামার খামার করে ধরা করল আমাগের!
বাসু তলে যেন জল পেল একটু, তাতে পা পড়ল তার দুটোই এবং ছ্যাৎ করে উঠল যেন ঠান্ডায়!
সে যেন জুড়ে গেল বুড়োর কথায় এতক্ষণ বাদে!
— আমরা তখন একদল, মিয়ারা যাতে পলাতি না পারে, পাহারা দিচ্ছি রাস্তায়।
মাথারও ঠিক নাই, মিয়া পালি এক কোপে কাটব — এমন জ্বলতিছি!
আমাগের দ্যাশ গেছে, আমরা কারো দ্যাশ থাকতি দোব- কেবা করে কও—?!
বুড়ো আড়া মোড়া ভেঙে মাথাটাকে এবার নিজের দুহাঁটুর ভেতর চালান করে দিল খানিকক্ষণ, শ্বাস নিল, মুখ মুছল, চোখ ডলে নিল, তারপর হুশ করে ডাঙায় ওঠার মত করে মুরসুল্লি টপকে দেখে নিল গোরস্থানটা!
বলল,
…..ছোড়া করল কি, আমাগের সামনে এসে,— আমার কাছে এসে— কান্দে পড়ল।
কাঁপতেছে ছোড়া!
গা দিয়ে গন্ধ বারোচ্ছে — গু গু গন্ধ—!
ডরে হেগে ফেলালো কিনা কবে কিডা!
মাঠের দিকি হাত বাগিয়ে ভরসা বলল,
… আমারে ফেলে আমার আব্বা আর মা ঐ দ্যাখো চলে যাচ্ছে — !
নোনাকুয়ো আছে ওধারে— চলে যাচ্ছে।
ও চাচা, আমারে এটটু কোলে করে নিয়ে আমার আব্বার কাছে আমার মার কাছে আমারে এটটু দিয়ে আসো।
নাহলি আমারেও মেরে ফেলবে তানারা! কেটে ফেলাবে!
বাসু ভরসা সম্পর্কে বহুকথা জানে, জানতে না চেয়েও জানে।
ঘোষপাড়া নেউলেপাড়া কিম্বা এমন এই বিষ্ণুপুর দখিনপাড়া, তার মত অপ্চ ফেলা মানুষ আর আছেই বা কে।
কিন্তু বুড়ো মতন মানুষটাকে এখন বাসু মুখ চোখ লুকিয়ে পরখ করে!
হাঁপ ও কাশ মানুষটার শরীরে ভরা, শরীরে মাংস যেন চেটে খেয়েছে কাল।
বাসু টের পেল, সেই ভরসা আজ কবরে গেল, যে ভরসাকে এক কোপে দুভাগ করার কথা ছিল, সরকারি অর্ডারও ছিল বেমালুম!
বুড়ো মুখ খুলে ফেলল এবার। বলল,
— ভরসা সেখের পো, তয় তার কথা শুনে আমিও কেমবাই বিগড়ে গ্যালাম, কবে কিডা!
দল বাঁকে বসলো, তাতে আমার বাল ছেঁড়া, নেলাম ভরসারে ডানা ধরে তুলে,— পেছনে আগুন — মাঠ ফকফকা, পলালাম …!
নোনাকুয়ো ধরা হলি টের পালাম ওধারে
কারা ঝ্যান পাহারায় আছে, আর এগোলি কোপাবে!
ভরসারে নামায়ে দিলাম ঐ কুয়োয়..!
আর আজ তানি নিজেই নামে যাচ্ছে কবরে,
বাজান আমারে এটটু নেও!
ঐ দ্যাহো তানি কবরে নামে গেল, আমারে একটু আগোয়ে নেও বাজান, দুমুঠ মাটি আমি ভরসারে দে আসিগে,
মনডা আমার কানতেছে! বুকটা আমার ছিঁড়তেছে বাজান!
বুড়োর কথায় থমকালো বাসু, গায়ে লোমে জবজবে বৃষ্টিতে কাদায় আর বাঁশবাগানের নিতল ঘোরে এখন সে তাকিয়ে থাকল হা করে!
কথা বললে মানুষ এত দেখার বস্তু হয়, এ তার জানা ছিল না।
লোকটা তো এখন হকে নেই, ধকেও নেই, ভাল করে দেখলে বুড়োটাকে একবার ভূত লাগে, আরেকবার মানুষ বলে ঠাহর হয়— এইটুকুই! — মাত্র কুড়িটা টাকা — নিজেও সে সেদিন ভরসাকে দিতেও দেয়নি জেদের বশে!
এখন বাসু ভেজে, — একটু মনে একটু বুকে!
পিল পিল করে মানুষ, সাড়ে তিন হাত কবরের লক্ষ হাত লাইন, সামনে! মানুষ মরলে কি মানুষের কথাও মরে, বাঁচা মরে? বাসু চোখে ডেবে যায়!
বুকের খচখচানি আর বুড়োর ঝোঁক এক করে বাসু এবার এক হেঁচকায় বুড়োকে— বোল ও ভাষ্যির সুযোগ না দিয়ে— তুলে নিল কোলে।
তাতে বুড়োর ডেনা একটা ঝুলে থাকল মাটির দিকে, কাদায় নেতড়েও গেল অনেকটা!
কিন্তু বাসু বেখেয়াল, লোকজন সরাতে সরাতে সে — জল ফেল করা শ্যালো মেশিনের মত হড়কা গলায় হাঁক পাড়তে লাগল
— আমাগের আগে একটু যাতি দেও।
আমাগের আগে একটু যাতি দাও গো নামাজীরা!
ভিড় নড়ে যত; —আঁটো হয়ে আসে আরো জোরে।
তবে ত্রিপলের তলায় ভরসার কবরটাকে এখন চোখের নাগালে পায় তারা দুজনই।
পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত