১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন ড. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। ২০২৫ সালে আরএসএস শতবর্ষে পা দেবে। ২০২৪ সাল থেকেই শতবর্ষ উদযাপনের লগ্ন শুরু হবে। তার আগে আসমুদ্র হিমাচল গেরুয়া পতাকায় মোড়া ভারতবর্ষকেই যে আরএসএস দেখতে চাইবে তা বলাই বাহুল্য। এই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের গুরুত্ব বিজেপি-র কাছে অপরিসীম। এই কারনেই নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ-র বাজী এবার পশ্চিমবঙ্গ।
আরএসএস মনে করে বঙ্গ সন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-এর জন্যই পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি। তাঁরা বলে থাকেন, সুজলা-সুফলা বাংলার মাটি থেকেই সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রবাদের জন্ম। তাঁরা দাবি করেন, স্বাধীনতার আগে দেশ ভাগের সময় শ্যামাপ্রসাদই বলেছিলেন, হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হলে তবেই মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ বাংলায় হিন্দুদের রক্ষা করা যাবে। আরএসএস-এর গর্ভ থেকে প্রথম যে রাজনৈতিক দলের জন্ম সেই হিন্দু মহাসভারও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। হিন্দু মহাসভা থেকেই জনসংঘ হয়ে বিজেপির জন্ম। ইতিমধ্যেই কলকাতা বন্দরের নাম বদল করে শ্যামাপ্রসাদের নামে করেছে বিজেপি সরকার। আরএসএস-এর শতবর্ষের আবহে সেই শ্যামাপ্রসাদের জন্মভূমিতে যদি কমল না ফোটে তা হলে তার স্বার্থকতা কোথায়? তাই বিজেপির প্রথম পুরুষ হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শ্যামাপ্রসাদের বাংলা দখলে তারা এতটা মরিয়া। অন্যভাবে দেখলে বাংলার মসনদ দখল আরএসএস-এর সামনে বিজেপির বড় পরীক্ষা।
২০২৫ সালের আগে দেশ জুড়ে পদ্মচাষে বিজেপির পথে বড়ো কাঁটা দাক্ষিণাত্য এবং বাংলা। ২০১৪ এবং ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণভারতে তেমন দাঁত ফোটাতে পারেনি বিজেপি। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, হিমাচল, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীশগড় এবং বিহার। হিন্দু বলয়ের এই তালুকগুলি বিজেপিকে দেশের শাসন ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু দক্ষিণে কর্ণাটকের পরেই গেরুয়া পথে পাঁচিল উঠেছে। তেলেঙ্গানা, হায়দরাবাদে সম্প্রতি কিছুটা ভালো ফল হলেও রাজ্য অধিকার এখনও অনেক দূরের বস্তু। কেরলে কয়েক দশক ধরে সিপিআইএম-এর সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘর্ষে টক্কর দিলেও গোটা রাজ্যে বিজেপির অস্তিত্ব দূরবীনে খুঁজতে হবে। সাম্প্রতিক পুরোভোটের ফলও তাই বলছে। তামিলনাডুতে এআইএডিএমকে জুনিয়ার পার্টনার হওয়ার পথ খোলা ছাড়া বলার মতো কিছু নেই। আর অন্ধ্রপ্রদেশে তাদের ভোট এক শতাংশ ছাড়ায়নি।
এই অবস্থায় কেন বাংলা বিজেপির কাছে এল ডোরাডো তা পরিষ্কার বোঝা যায়। অন্য আর একটি দিক থেকে বাংলার গুরুত্ব বেড়েছে। দেশে মুসলিম জনসংখ্যার আধিক্যের অনুপাতে প্রথম রাজ্য জন্মু-কাশ্মীর। তারপরেই রয়েছে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। আরএসএস-এর বর্তমান সংঘ চালক মোহন ভাগবত একাধিক বার বলেছেন, হিন্দু ভারত গঠন দেশের মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে হতে পারে না। এই লক্ষ্যেই ২০১৫ সালে আরএসএস-এর অন্যতম শীর্ষমুখ রামমাধব জন্মু-কাশ্মীরে মুসলিম সম্প্রদায়ের দল ইডিপির সঙ্গে বিজেপির সমঝোতার নীল নক্সা তৈরি করেন। তবে ৩ বছরের মধ্যে ২০১৮ সালের ১৯ জুন এই পদক্ষেপ এতটাই আকস্মিক ছিল যে রামমাধব সাংবাদিক সম্মেলন করে গাঁটছড়া খোলার কথা ঘোষণা করার মাত্র কয়েক মিনিট আগে রাজ্যপাল এমএন ভোড়া মুখ্যমন্ত্রী মেহেবুবা মুফতিকে বিজেপির সিদ্ধান্তের কথা জানান। জন্মু-কাশ্মীরে ক্ষমতা দখলের এই পরীক্ষা ব্যর্থ হলেও ২০১৯-এ ৫ আগস্ট ৩৭০ ধারা বিলোপ করে জন্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আর অসমে গত বিধানসভা নির্বাচনে জিতে বিজেপি সরকার গড়েছে। এবার পালা পশ্চিমবঙ্গের।
২০১৪ সালে দেশজুড়ে বিজেপির পালে প্রবল বাতাস লাগলেও পশ্চিমবঙ্গে তারা পেয়েছিল ১৭ শতাংশ ভোট। ২০১৯-এর লোকসভা নর্বাচনে বাংলার ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে অধিকাংশ বুথে প্রার্থী দিতে পারেনি বিজেপি। তা সত্বেও তাদের ঝোলায় এসেছে ১৮টি লোকসভা আসন, তাদের প্রাপ্ত ভোট ৪০ শতাংশ। এই সাফল্যের রসায়ণ কি? বিজেপির এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের আগ্রাসী রাজনীতি। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে এই আগ্রাসনের যে ছবি দেখা গিয়েছিল তাতে আমার মনে হয়েছিল তৃণমূলের নন্দীগ্রাম হয়ে গেল এই পঞ্চায়েত ভোট। তাই ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিরোধী দলগুলির নীচু তলায় অলিখিত জোট তৈরি হয়েছিল। সবারই শত্রু একা তৃণমূল। রাজ্যে পালাবদলের পরেও বামেদের যেটুকু ভোট রয়েছে তার অভিমুখ হয়ে যায় আগে রাম পরে বাম। এই কারণে বর্ধমান, আসানসোল, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামে লোকসভা আসনে জেতে বিজেপি। এই সমস্ত অঞ্চলে সিপিআইএম মরনপন করে বুথ আগলে ছিল। আর মানুষ নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পেরে তৃণমূলকে শিক্ষা দিতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল। এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ হলো পূর্ব বর্ধমান লোকসভা কেন্দ্র। লোকসভা নির্বাচনের ১৬ দিন আগে এই কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা করে বিজেপি তার প্রায় ৭ দিন পরে বিজেপি প্রার্থী সুরিন্দর সিং অহলুওয়ালিয়া নিজের কেন্দ্রে যান। অথচ ফল বেরোতে দেখা গেল তিনি জিতেছেন।
বিজেপি জানে ২০১৯-এ লোকসভা ভোটে দক্ষিণবঙ্গে এই পথ ধরে কিছু আসনে জেতা গিয়েছে, বাকি আসন নাগরিকত্ব আসায় মতুয়া ও নমশুদ্রদের ভোটে ভর দিয়ে গোলায় উঠেছে। আর উত্তরবঙ্গের নিরঙ্কুশ জয় তো আরএসএস-এর অবদান। নয়-এর দশক থেকেই উত্তরবঙ্গে চা বাগান, আদিবাসী ও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় বামেদের মাটি আলগা হতে থাকে। ১৯৯৮ সাল থেকে এই মানব জমিনে বীজ ছড়াতে শুরু করে আরএসএস। এই অঞ্চলে আরএসএস-এর হাতিয়ার বিদ্যালয়। এই সময় থেকেই উত্তরবঙ্গে ধীরে ধীরে আরএসএস পরিচালিত বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর পড়ুয়াদের যোগসূত্রে তাদের পরিবারে প্রবেশ করে সংঘ। এর কৃতিত্ব আরএসএস-এর ৩৬টি শাখা সংগঠনের মধ্যে শিক্ষকদের সংগঠন, রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ এবং শিক্ষা বিস্তারের সংগঠন বিদ্যাভারতীর। ২০১৬-তে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের ফল সংঘের এই পরিশ্রমের ফসল। সেই নির্বাচনে বামেদের জামানত জব্দ হয়। আর বিজেপির ভোট বেড়ে ২৮ শতাংশ হয়। প্রথম স্থান তৃণমূলের আর দ্বিতীয় স্থান বিজেপির। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন বামেদের ভোট বিজেপিতে চলে গিয়েছে। কিন্তু গভীরে গিয়ে কারণ খোঁজেন নি। উত্তরবঙ্গের রাভা, মেচ ও টোটো সম্প্রদায়ের মধ্যে শাঁখা সিঁদুরের চলও অনেকের নজর এড়িয়ে গিয়েছে। সংঘের আবাদের ফলে এবারও উত্তরবঙ্গে বিজেপির ভালো ফল হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার গদি দখল করতে দক্ষিণবঙ্গে আধিপত্যের প্রয়োজন। কিন্তু তা কি হবে? এই প্রশ্নই বিজেপিকে মরিয়া করেছে।
পরীক্ষায় পাশ করতে বিজেপির যে কতটা মরিয়া তার নমুনাও পাওয়া যাচ্ছে। বাংলায় শুধু ঘন ঘন অমিত শাহ, জেপি নাড্ডারা আসছেন তা নয়। ভারত সরকার আর বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যের মন্ত্রীরাও আসছেন। দেশের ৫ রাজ্য থেকে দলীয় সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত ৫ সাধারন সম্পাদককে এ রাজ্যে পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যের ৮ মন্ত্রীকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা রাজ্য জুড়ে প্রচার চালাবেন। এদের প্রত্যেককেই বলা হয়েছে বাংলা শেখার চেষ্টা করতে হবে। বাঙালির খাদ্যাভ্যাসও শিখতে হবে। এর থেকেই বোঝা যায় বাংলার মন জয়ে কি প্রবল তাগিদ। আর হবে নাই বা কেন? গডফাদার আরএসএস-এর সামনে বিজেপিকে এই পরীক্ষায় যে করেই হোক পাশ করতে হবে।