সাম্প্রতিক কালের বাংলা গানে আবার সেই একঘেয়েমির ছত্রাক জন্মলাভ করেছে। সামাজিক সমস্যা, সামাজিক অবক্ষয়, মানুষের মূল্যবোধের পদস্খলন, মানুষের দুর্দশা, সরকারি নীতি ও পলিসিকে তীব্র ভাষায় ব্যঙ্গ ও ভর্ৎসনা করে একক শিল্পীর গান রচনার আবেগটা আজ বিলুপ্ত। বাণিজ্যিক বেড়াজ্বালে আবদ্ধ সুরকার ও গীতিকাররা নীলনদ, আমাজন বা নীলগিরিতে প্রেমালাপে মত্ত নায়ক নায়িকার মধুময় অঙ্গভঙ্গিকে সার্থক রূপ দিতে বেশি আগ্রহী। কেউ কেউ আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান গুলোতে এক ফোটা ব্লুজ, কয়েক ফোটা রক এন্ড রোল এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সিরাপ মিশিয়ে এক অদ্ভুত সংকর সংগীত রচনা করে দর্শক সমাজকে প্রেক্ষাগৃহ বা ওয়েব সিরিজ মুখী করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এই কি ছিল ভবিতব্য! বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সুরকার ও গীতিকারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এক শক্তিশালী অধ্যায় রচনার কাজ শুরু হয়েছিল। সেখানে মন্বন্তর, কৃষক বিদ্রোহ, ধর্মঘট, আইন অমান্য আন্দোলন, দাঙ্গা, শ্রেণী সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক বিষয় গুলি বাংলা গানের লিরিক্সে স্থান পেয়েছিল; সাধারণ মানুষ নিজের অন্ধকারময় জীবনচৰ্চা কে প্রত্যক্ষ করেছিল এবং বিপ্লববাদী চেতনার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল একত্রিত হয়ে।
বাংলা গানে এই নূতন আঙ্গিক প্রদানে যাঁরা মূল ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সলিল চৌধুরী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাণিজ্যিক বেড়াজ্বালে আবদ্ধ থেকেও তিনি সমাজ বাস্তবতা ও শিল্পী হিসাবে নিজের দায়বদ্ধতা কে উপেক্ষা করতে পারেন নি। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা ও নিজের অধিকার সম্পর্কে সমাজের প্রত্যেকটা স্তরের মানুষের মধ্যে সার্বিক জাগরণ ঘটানোই ছিল তাঁর গণ আন্দোলন কেন্দ্রিক গানের মূল আদর্শ।
পঞ্চাশের artificial Famine সমগ্র ভারতের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে যেমন তীব্র ভাবে প্রভাবিত করেছিল, তেমনি সৃষ্টিশীল মননে এক নব দিগন্তের উন্মেষ ঘটিয়েছিল। মন্বন্তরের সেই মর্মান্তিক ও বিষাদময় ছবি সলিল চৌধুরীর “সেই মেয়েটা” গানে ভাষারূপ পেয়েছিল— “ক্লান্ত পায়ে পায়ে যেতে যেতে/কি জানি কি ঝড়ে গেছে বুঝি ঝরে/জীবনের তরু থেকে”।…বিশ্ববরেণ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের “কালো মেয়ে” এখানে উন্মাদগ্রস্ত হয়ে কলকাতার রাস্তায় একটুকু ফ্যানের জন্য ছুটে বেড়োনোর চিত্র অঙ্কনটা তার গানকে অনন্য মাত্রায় উন্নীত করেছিল।
১৯৪৬-এর নৌ বিদ্রোহের সমর্থনে ২৯ জুলাই-এর ধর্মঘটকে সমর্থন জানিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন— “শোষণের চাকা আর ঘুরবেনা/চিমনিতে কালো ধোঁয়া উঠবেনা/কয়লায় চিতা আর জ্বলবে না”।
সেদিন সমগ্র বঙ্গদেশের স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণে উৎসুক সমাজ এই গানের মধ্যে দিয়ে শুধুমাত্র প্রভাবিত হয়নি, পেয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের কফিনে শেষ পেরেক স্থাপনের উৎসাহ।
তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভাগচাষীদের সমর্থনে তাঁর রচনা সমগ্র বঙ্গভূমিকে আন্দোলিত করেছিল। তাঁর গান হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের স্লোগান— “আর দেবোনা, আর দেবোনা, আর দেবোনা ধান মোদের/প্রাণ হো”।
আবার বন্দি মুক্তি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি লিখলেন— “বিচারপতি তোমার বিচার করবে করবে যারা/আজ জেগেছে এই জনতা। তিনি তাঁর গানে জনতার অধিকার, দেশপ্রেম এবং সতস্ফূর্ত আবেগ কে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন।
পরবর্তী কালে তিনি শ্রেণী সংগ্রাম, মালিক শ্রমিক বিরোধ, শিশু শ্রম, সমাজের নীচু তলার মানুষের দারিদ্রতা কে কেন্দ্র করে গান রচনা করেছেন কিন্তু তা নির্দিষ্ট শব্দ সংখ্যায় আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে এই কথা অবশ্যই বলতে হয় যে, তাঁর গানে শুধুমাত্র তদানীন্তন সমাজ, সামাজিক সমস্যা, মানুষের দুর্দশা, দারিদ্রতা, বিপ্লব, দেশপ্রেম প্রকাশ পায়নি; কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে তাঁর সৃষ্ট সুরের রোমান্টিকতা আজও ভারতীয় সংগীতের সম্পদ হিসাবে পরিগণিত হয়। সমগ্র অসুমুদ্রহিমাচল একটি বিষয়ে এক মত হবে যে, ভারতীয় সংগীতের অস্তিত্ব যত দিন থাকবে, সলিল চৌধুরীর নামটা স্বর্ণক্ষরে লিখিত থাকবে ভারতীয় সংগীতের ক্যানভাসে।
তিনি কখনই সমগ্র পৃথিবীতে সংগীত কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্য কে অস্বীকার করেন নি, আবার একজন শিল্পী হিসাবে সমাজ সচেতনতা, সমাজ গঠন ও মানুষের সার্বিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর কাজটাও সুসম্পাদিত করেছেন সাফল্যের সাথে। পরবর্তীকালে তাঁর আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুরেশ বিশ্বাস, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, শুভেন্দু মাইতি, অজিত পান্ডে, সুমন চ্যাটার্জী, নচিকেতা চক্রবর্তী, তপন সিংহ, কাজী কামাল নাসের, অঞ্জন দত্ত, মৌসুমী ভৌমিকদের আবির্ভাব হয়েছে এবং বাংলা গান বিবর্তিত হয়েছে। পরের লেখনী গুলোতে সেই বিবর্তন নিয়ে আলোকপাত করবো।
পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় রইলাম