বছরের শেষদিনে শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। সূর্য সিমেন্টের চীফ জেনারেল ম্যানেজার মিঃ মাথুর তাঁর হাতঘড়িতে দেখলেন ১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
বাংলোর লনের রোদ্দুরে চা খেতে খেতে স্ত্রী মালাকে চোখ টিপে বললেন, “আজকের পার্টি জমে যাবে মনে হচ্ছে! তবে রাত বেশি করলে চলবেনা। একটার মধ্যে শেষ করতেই হবে। না হলেই ঐ অজুহাতে কাল সকালে সবাই ডিউটি যেতে দেরী করবে।
প্রোডাকশান আর সেলসের যথেষ্ট চাপ এখন। মুশকিল হয় ঐ চৌবে আর যোসেফকে নিয়ে। ঐ শালাদুটো এক্কেবারে পিপে। একবার গিলতে শুরু করলে আর থামতে চায় না।”
মালা মাথুর স্বামীর যোগ্য সহধর্মিনী। তিনি জানেন, বর্ষার আগে প্রোডাকশান আর সেলসের কাজ মিটিয়ে নিতে না পারলে এদের সমস্ত পরিশ্রম ভিজে যাওয়া সিমেন্টের মতই বিফলে যাবে। তবু কপট রাগ দেখিয়ে বরকে বললেন, “আহা নিজে যেন সাধু পুরুষ! এক আধ পেগেই সন্তুষ্ট! কেই বা কম যায় ক্লাবে?”
মাথুর হাসলেন। সত্যিই বছর শেষের পার্টিতে সবাই বাঁধনছাড়া হয়ে যায়। এটা যেন সূর্য সিমেন্ট কলোনীর অফিসারদের বার্ষিক উৎসব। তাই সাজো সাজো রব। এই গতেবাঁধা কলোনীর জীবনযাত্রায় বিনোদন বলতে সেরকম কিছু নেই। তাই সবাই বছরের শেষ রাতের পার্টীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
এবছর প্রোডাকশান ভালোই হচ্ছে। তাই সি. জি .এম বিপিন মাথুরের খুশ মেজাজ। উদার হস্তে একত্রিশের ফাংশানের বাজেট বাড়িয়ে দিয়েছেন। মিটিং হয়েছে বেশ কয়েকবার। আলাপ আলোচনাও জোরদার চলেছে। কেটারিং, ডেকোরেশন, দারু, গেমের প্রাইজ কিছুতেই কার্পণ্য করা হবে না এবার।
পার্সোনালের বাসুটা ফচকে।
তার ইচ্ছে, এবার অর্কেস্ট্রার সঙ্গে ডান্সার আসুক। সে প্রস্তাবে অনেকেই বেশ নড়েচড়ে উৎসাহ দেখালো। ফাইন্যান্সের মধ্যবয়স্ক দেববাবু সঙ্গে সঙ্গে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন, “না না, ওরা বড় অশ্লীল নাচে। মেয়েগুলোর পোশাক আশাক একদম ভদ্রসভ্য নয়। মহিলা, বাচ্ছাদের সামনে ওসব ঠিক হবে না।” তিনি এ কোম্পানির পুরনো লোক। তাই তাঁর কথা মেনে নেওয়া হল।
কেটারিঙের ভারটা অবশ্য প্রতিবছরের মত দেববাবুকেই দেওয়া হল। উনি এ ব্যাপারটা ভালোই সামলান। মাথুর বললেন, “মিঃ দেব, ম্যাডামের সঙ্গে বসে মেনুটা ফাইনাল করে নেবেন। তবে ক্রিস্পী চিকেন ফ্রাইটা কিন্ত অবশ্যই স্ন্যাক্সে রাখবেন।” সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল উঠল। স্তাবকেরা হেঁ হেঁ করল।
যোসেফকে দেওয়া হল দারু সিলেক্ট করার ভার। ব্যাচেলার যোসেফের মত দারুবিলাসী এ কলোনীতে আর কেউ নেই।
মিঃ মাথুর ম্যানেজার পান্ডের দিকেও একবার তাকালেন। যতই তাদের মধ্যে মন কষাকষি চলুক না কেন, ওর মতটাও নেওয়া দরকার। মিটিংয়ে সবাই যেখানে পার্টি নিয়ে উত্তেজিত, পান্ডে সেখানে অত্যন্ত নিরুত্তাপ। “আমি তো যা বলার বলেছি স্যর। পার্টিতে আমার থাকা আর না থাকায় কার কি আসে যায়?”
কেউ আর পান্ডেকে ঘাঁটাল না। সূর্য সিমেন্টের বড় কর্তার সঙ্গে তার একেবারেই বনে না। তাদের মত বিরোধ এক এক সময় প্রকাশ্যে চলে আসে। মাথুরের দুর্নীতি নিয়ে অন্য কারো কথা বলার ক্ষমতা নেই। পান্ডে প্রতিবাদ করে। তাই সে সি জি এমের চক্ষুশূল।
পান্ডে একলাই থাকে কোয়ার্টারে। তার বৌয়ের নিজের চাকরি আর ছেলেকে পড়ানোর অজুহাতে অন্যত্র বসবাস। স্বামীর কাছে আসে খুবই কম। পান্ডেসাহেব কারোর সঙ্গে মেলামেশা তো দূরের কথা, কথাবার্তা পর্যন্ত বলেন না। নির্জন, নির্বান্ধব মানুষটা কিভাবে সময় কাটায়, সে নিয়ে কারোর মাথাব্যথা নেই। লোকটাকে আজ পর্যন্ত কেউ বুঝেই উঠতে পারে নি। একমাত্র সি. জি. এমের সঙ্গে ঝগড়ার সময় খানিকটা উত্তেজিত হয়ে চেঁচামেচি করে ফেলে। একত্রিশের পার্টিতে খরচের বহর, দামি মদ নিয়ে সে যথেষ্ট আপত্তি করেছিল। প্রশ্ন তুলেছিল মাথুরের কাছে, “কেন স্যর একরাতের ফূর্তিতে এত টাকা খরচ না করে আমাদের লেবারদের ওয়েলফেয়ারেও কিছু টাকা খরচ করা যেতে পারে।” বলাবাহুল্য, কেউ তাকে সমর্থন করেনি।
ম্যানেজার পান্ডে ছাড়া এই ছোট টাউনশিপের অফিসার্স কলোনীতে সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে। একে অন্যের বাড়ি যাওয়া আসা করে। বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কূটকচালি, সমালোচনা অবশ্য এরই সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে। একটুআধটু পরকীয়ার রসালো গল্পও কখনো কখনো বাতাসে ভেসে আবার মিলিয়ে যায়।
এছাড়াও অনেকেই ক্লাবে গিয়ে ব্যাডমিন্টন, ক্যারাম খেলে সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসে। এছাড়া আর উপায়ই বা কি! তিরিশ কিলোমিটার দূরের শহরে রোজ রোজ কেইবা যায়, জঙ্গল পেরিয়ে? এখানকার কলেজ পড়া ছেলেমেয়েরা সবাই বাড়িছাড়া। কাছাকাছি তেমন কোনো ভালো কলেজ নেই। ছেলেমেয়েদের হস্টেলে পাঠিয়ে সংসারে মায়েদের বিশেষ কাজও নেই।
অফিসারদের স্ত্রীরা তাই নিজেদের মত করে সময় কাটায়। বাগান করে। লেডিসক্লাব খুলেছে। বাড়িতে কিটি পার্টি, ছোটদের জন্মদিন, পুজো আর্চা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
বছর শেষের পার্টিতে ছেলেদের, মহিলাদের, ছোটদের নানারকম গেম করানো নিয়ে মহিলামহল যথেষ্ট উত্তেজিত। মিসেস মাথুর বললেন, “বাচ্ছাদের জন্যে ফ্যান্সি ড্রেসটাই থাক। তবে কেউ নিজের ছেলেমেয়েকে ভিখারী, পাগল, কুষ্ঠরোগী, মাতাল একেবারে সাজাবে না কিন্তু। মোটেই ভালো দেখায় না।” সব মায়েরাই এ’কথায় সায় দিলেন।
মিসেস সিং বললেন, “আচ্ছা ভাবী এবার একটা কাপল গেম রাখলে হয় না? মিস্টাররা একবার ড্রিঙ্কস্ রুমে ঢুকলে আর বেরোতে চায় না। কাপল গেমে কিছুক্ষণ অন্তত তাদের আটকানো যাবে।”
“কি গেম রাখবে? দুজনের পেটে বেলুন রেখে ফাটানো?” মিসেস চৌধুরীর কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল। তার নিজের পেট যে শরীরের আগে আগে চলে!
হিলহিলে, ছম্মকছল্লু সঙ্গীতা গতবছর কোমর ঘুরিয়ে নাগিন ড্যান্স করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। “এবছর নতুন কি চমক দেখাবে সঙ্গীতা? মিসেস শর্মা ফুট কাটল। দুই প্রতিবেশিনীর একসময়ের গলায় গলায় ভাব। ইদানিং মন কষাকষি। সে কথা জানতেও এই ছোট কলোনীর কারোর বাকি নেই।
পার্টির রাতের সাজসজ্জার প্রস্তুতিও আগে থেকে শুরু হয়ে গেছে। পুরুষদের স্যুট মেশিনধোলাই হয়ে নতুনের মতই কড়কড়ে। অতি উৎসাহে নতুন ব্লেজার কেউ কেউ কিনে ফেলেছে। বাড়ন্ত বাচ্ছাদের গরম পোশাক প্রতিবছর ছোটো হয়ে যায়, তাই নতুন কিনতেই হয়। মহিলারাও সেদিন ‘বিজলী গিরাবেন।’ তাই চুল সেট করা, ফেসিয়ালের সঙ্গে সঙ্গে জমকালো শাড়ি অথবা ড্রেসের সঙ্গে মানানসই গয়না সবটাই রেডি।
জি.এমের প্রাইভেট সেক্রেটারি করণের আজ সকাল থেকে নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। বেতলপুর থেকে অর্কেস্ট্রা পার্টিরা সকাল বেলাতেই পৌঁছে গেছে। করণ তাদের গেস্ট হাউসে রাখার ব্যবস্থা করেই দেবসাহেবের সঙ্গে একবার ক্লাবের কিচেনে ঢুঁ মারল। কেটারিঙের লোকজন রান্নাবান্নার আয়োজন শুরু করে দিয়েছে। কাটাকাটি, বাটাবাটি চলছে। আইসক্রীমের গাড়িও পৌঁছল বলে।
বাচ্চার মায়েরাও সকাল থেকে বড় টেনশনে। রোবটের লাইট জ্বলছে না।
পোকেমন শেষ পর্যন্ত বেঁকে বসেছে। ছোটা ভীম তার গদা আগে থেকেই ভেঙে বসে আছে। পরীর ডানার অবস্থা তথৈবচ। স্পাইডারম্যান যেভাবে আগে থেকেই লাফালাফি করছে, সন্ধ্যে হতেই না ঘুমে ঢুলে পড়ে!
বছর শেষ দিনের সূর্য অস্ত যেতে যেতে না যেতেই ক্লাবহাউস রঙিন আলোর মালায় সেজে উঠল। অর্কেস্ট্রা পার্টিও ততক্ষণে ফাংশানের মুড তৈরি করতে ব্যস্ত। তাদের বাজনার মাদকতায় সবারই “তন দোলে মেরা মন দোলে”র পুলক। ক্লাবের কিচেন থেকে সুখাদ্যের আঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা কলোনীতে।
কেবলমাত্র বারো নম্বর বাংলোয় শীতের বিষণ্ণ কুয়াশা জড়িয়ে আছে পাকে পাকে। সেই কোয়ার্টারে থাকা দুর্ভাগা পান্ডের নতুন বছর আসার কোনো আনন্দ নেই। মদ ছাড়া সাথী নেই। ছোটো থেকেই সে একটু ব্যতিক্রমী, তাই কি সে এমন একলা? অথচ স্কুল কলেজের উজ্জ্বল ছাত্রটির জীবন এমনটা হবার তো কথা ছিল না।
পার্টির উত্তেজনার পারদ যখন ক্রমশঃ চড়তে শুরু করেছে, তখন বছর শেষের সবথেকে বড় চমকটা অবশ্য ম্যানেজার পান্ডের কাছ থেকেই এল।
বিকেলে ম্যানেজারের বাংলোর গার্ডের শিফট বদল হয়। সিকিউরিটি গার্ড রামশরণ ডিউটিতে এসে গেটের বাগানের আলো জ্বালিয়ে দেখে সাহাবের ঘর অন্ধকার। দরজার ঘন্টি বাজিয়েই সে কোনো সাড়া পেল না। খটকা লাগল তার। বাংলোর পেছনে বাগানের ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে গিয়ে শোবার ঘরের জানলায় উঁকি দিতেই তার চক্ষু চড়কগাছ। “হায় সিয়ারাম! সাহাব তো সীলিং ফ্যান থেকে লটকে আছে!”
অসময়ে কালবৈশাখীর মত এই খবর যেন আছড়ে পড়ল গোটা কলোনীতে। সি. জি. এমের বাংলোয় তখন বিউটি স্লিপ দিয়ে কর্তাগিন্নী দুজনেই সদ্য উঠেছেন। আচমকা এই খবরে মাথুর একেবারে হতভম্ব। চটকা ভাঙতেই দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “শালা আর দিন পেল না! আমাকে জব্দ করার জন্যে পুরো পার্টিটাই বরবাদ করে দিল!” পাশ থেকে বুদ্ধিমতী স্ত্রী মালা বলে উঠলেন, “পার্টির কথা ছাড়ো তো এখন। শিগগির খবর নাও, সুইসাইড নোটে আবার তোমার বিরুদ্ধে কিছু লিখে গেছে কি না!”
কনকনে ঠান্ডাতেও মাথুরের কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। সেক্রেটারি করণের কাছে তড়িঘড়ি নির্দেশ এল, “জলদি আ যাও করণ! পান্ডের কোয়ার্টারে যেতে হবে। সাল কা আখিরী দিন মে পান্ডে নে ক্যয়া খেল দিখায়া!!!”
ami bhablam first chapter!
ধন্যবাদ। এর পরেও গল্প থাকে,তবে সেটা পরের। বছরের শেষদিনের নয়।