পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে পরিবেশ বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে এমন সংগঠনগুলির মধ্যে ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’ একটি পরিচিত নাম। পরিবেশ পত্রিকা ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’ সহ একাধিক পত্র-পত্রিকায় ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’-র পরিবেশ কর্মসূচিগুলির কথা ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশ বন্ধুদের প্লাস্টিক বিরোধী আন্দোলনের কথা সেখানে বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই নিবন্ধে ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’-র প্লাস্টিক বিরোধী আন্দোলন ও তাদের পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচিগুলির কথা লিপিবদ্ধ করা হল। পাশাপাশি ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’-র সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, তাদের বিগত কর্মসূচি এবং আগামীর কিছু পরিকল্পনা সম্পর্কেও বলা হল।

‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’-র বয়স পাঁচ বছর অতিক্রমের পথে। ২০১৮ সালে ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’ সংগঠনটির জন্ম হয়। প্লাস্টিক দূষণমুক্ত কৃষ্ণনগর শহর গড়ে তোলার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই কৃষ্ণনগরের কয়েকজন পরিবেশ সচেতন বন্ধুরা একত্রিত হয়েছিলেন। ঘরোয়া আলোচনাতেই দলের নাম ঠিক হয় ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’। সেই থেকেই পথ চলা শুরু। দেখতে দেখতে কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর চতুর্থ বর্ষে পদার্পণ। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধুমাত্র প্লাস্টিক বিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হলেও, ক্রমান্বয়ে কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়। ধীরে ধীরে সংগঠনের শক্তিও বৃদ্ধি পায়। কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর নেতৃত্বে কৃষ্ণনগর পৌর এলাকায় সংগঠিত প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ও থার্মোকল বিরোধী আন্দোলনের কথা এখন কমবেশি আমাদের রাজ্যব্যাপী মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে— এ কথা বলাই যায়।
‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’ প্রথম থেকেই সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ক্যারিব্যগ এবং থার্মোকল সামগ্রী ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। তবে প্লাস্টিক বর্জন কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’-র সদস্যরা বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’ কর্তৃক যেসব কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে :—
এইভাবে ‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’-র সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে শহরকে দূষণমুক্ত এবং জনগণকে পরিবেশ সচেতন করে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিগত তিন-সাড়ে তিন বছর ধরে আমরা বাজার অভিযানের সময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে কমবেশি এই অভিযোগগুলি শুনে আসছি— ১) প্রথমে কারখানা বন্ধ করুন। ২) বাজারে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ পাওয়া না গেলে আমরাও নেব না। ৩) আমাদের ধরে লাভ নেই, সরকারকে বন্ধ করতে বলুন।
এমনকি সরকারি ঘোষণার পরেও, এখনো দোকান বাজার অভিযানের সময় পৌরকর্মী এবং কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর যৌথ দলকে এই ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতেই হয়। এসবের মধ্যে দিয়েই কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ বিরোধী অভিযান চলছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধান, পৌর প্রশাসনের সচেষ্টা, সংবাদ মাধ্যমের খবর পরিবেশন, কিছু সচেতন নাগরিকের সহযোগিতা এবং কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলস্বরূপ ২০১৯ সালের শেষার্ধে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ও থার্মোকল সামগ্রী বর্জন করে কৃষ্ণনগর শহর সমগ্র জেলা তথা রাজ্যের কাছে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছিল।
সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান কৃষ্ণনগরের পরিবেশকে সুস্থ সুন্দর নির্মল করে তোলার কাজে নেমেছিলেন বহু মানুষ। সব্জি বাজার, মাছ-মাংস-মিষ্টির দোকানের চেহারাটাও অনেকখানি বদলে গিয়েছিল। বেশিরভাগ মুদিখানার দোকানগুলিতে আবার ফিরে এসেছিল কাগজের ঠোঙা। চায়ের দোকানগুলোতে পাওয়া যাচ্ছিল মাটির ভাঁড়। যদিও পুজোমন্ডপ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে থার্মোকল, ফ্লেক্স, প্লাস্টিকের ফুল। কিন্তু তারপর করোনা আবহে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যায়। এই দৃশ্য হতাশ করলেও, আশাবাদী ছিলাম আমরা। প্রসঙ্গত একটি বিষয় বলতে হয় যে, কৃষ্ণনগরের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ও থার্মোকলের বেশ কিছু সামগ্রী যেমন প্লাস্টিকের চায়ের কাপ, জলের গ্লাস, থার্মোকলের থালা-বাটি প্রভৃতির ব্যবহার শহর এলাকায় প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে, সেগুলি আর সেভাবে ফিরে আসেনি।

যাইহোক, পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে কৃষ্ণনগরের পরিবেশ কর্মীরা পুনরায় সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করেন। প্রশাসনিক সহযোগিতা কিছুটা হলেও আদায় করা যায়। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বারংবার অভিযান সত্বেও প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ খুব সামান্যই করা যায়। প্রকাশ্যেই প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের ব্যবহার চলতে থাকে। অতঃপর কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর ধারাবাহিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষ্ণনগর পৌরসভার জারি করা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ এবং থার্মোকলের থালা বাটি বর্জনের পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা ২০ নভেম্বর, ২০২১ থেকে পুনরায় কঠোরভাবে কার্যকরী করা হয়। কৃষ্ণনগর পৌরসভার নতুন বিজ্ঞপ্তিতে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ এবং প্লাস্টিকের কাপ, গ্লাস, কন্টেনার ব্যবহার বন্ধ করতে এবং থার্মোকলের থালা, বাটি বর্জন করতে বলা হয়।
পৌর প্রশাসনের এই বিজ্ঞপ্তির পরেও চোর-পুলিশের খেলা চলতে থাকে। কৃষ্ণনগরের দোকান বাজারে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু আন্দোলন চালিয়ে যায়। জেলা প্রশাসনের কাছে কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু ১২ দফা দাবি নিয়ে হাজির হয় —
কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর ধারাবাহিক সমাজকল্যাণমূলক কাজের জন্য জেলা প্রশাসন কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর প্রশংসা করেছেন, যা আমাদের প্রাণিত করে। কৃষ্ণনগর পৌরসভা এবং জেলার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর সদস্যদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছেন এবং কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু তাদের দ্বারা সংবর্ধিত হয়েছে। অতিসম্প্রতি রাজ্যসরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আহ্বানে কৃষ্ণনগরের রবীন্দ্রভবনে কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর পক্ষ থেকে পরিবেশ কর্মশালার উপস্থাপনা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর বছরভর কর্মসূচির মধ্যে ৫ জুন পরিবেশ দিবস, ১২ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তী, ২৩ জানুয়ারি নেতাজির জন্মজয়ন্তী, রাখীবন্ধন প্রভৃতি কথা বলতে হয়। বছরের এই বিশেষ দিনগুলিতে পরিবেশ বন্ধুর সদস্যরা জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা প্রচার করে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর বাৎসরিক পিকনিক মিলনমেলার পরিণত হয়।
আমরা আজ খুবই খুশি কেন্দ্রীয় সরকার একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন করার জন্য বিশেষ বিধি ঘোষণা করেছে। ২০২২ সালের মধ্যে ভারত সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক মুক্ত হবে — একথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন কয়েক বছর আগে। এবার ঘোষিত হল ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধি, ২০২১’। কেন্দ্রীয় সরকারের এই বিধি আগামী দিনে নির্মল, স্বচ্ছ ভারতবর্ষ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নেবে বলেই মনে হয়। অতি সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে আরেকটি বড় ঘোষণা করা হয়। ১ জুলাই ২০২২ থেকে রাজ্যে ৭৫ মাইক্রোনের নিচে প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। এই নির্দেশিকা দ্বারা সরকার প্লাস্টিক ও থার্মোকলের বহু সামগ্রী আমদানি, বন্টন, মজুত, ব্যবহার, বিক্রি নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। কৃষ্ণনগর পৌর এলাকায় যৌথ নজরদারি টিমের নিয়মিত অভিযানের ফলে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ব্যবহারে অনেকটাই রাশ টানা যায়। তবে এখনো কৃষ্ণনগর শহর পুরোপুরি প্লাস্টিক মুক্ত— একথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। অনেকেই সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে প্লাস্টিকের দেওয়া নেওয়া করছেন। আর সেজন্যই যৌথ নজরদারি অভিযানও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কৃষ্ণনগর পুরসভার কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সপ্তাহে তিন দিন মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর সদস্যরা নজরদারি অভিযানে বার হচ্ছিলেন, এখন আবার যা অনিয়মিত হচ্ছে। প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ বর্জন বিষয়ে কৃষ্ণনগরে বর্তমানে সামগ্রিক জনসচেতনতার অভাব বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিগত এক বছরে কৃষ্ণনগর এবং শহর লাগোয়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর পক্ষ থেকে পরিবেশ সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানে যাওয়া শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত পরিবেশ বন্ধুরা ৯টি স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে পেরেছেন। নিম্নে সেই তালিকাটি দেওয়া হল—

এর পাশাপাশি প্রত্যেক রবিবার কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পলিথিন দূষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার বার্তা দিচ্ছেন। দুর্গাপুজোর সময়ও তারা পুজো মণ্ডপে গিয়ে প্লাস্টিক বিরোধী সচেতনতামূলক প্রচার কর্মসূচি চালান। শহরের মণ্ডপগুলিতে ‘একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণরূপে বর্জন করুন’ —এই আবেদন জানিয়ে কিছু পোস্টার লাগানো হয়। পুজো দেখতে আসা দর্শনার্থীদের কাছে এইভাবে প্লাস্টিক বর্জনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। ৮ এপ্রিল ২০২৩ (শনিবার) জেলার অন্যতম বড় মেলা কৃষ্ণনগরের বারোদোল মেলায় গিয়েও প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ বিরোধী প্রচার চালানো হয়েছে। এ পর্যন্ত কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর শেষ কর্মসূচিটি হয়েছে ১১ এপ্রিল ২০২৩ (মঙ্গলবার)। এই দিন কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরীর মাঠে চৈত্র সেলের জমায়েতে কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধুর পক্ষ থেকে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ক্যারিব্যগ বিরোধী সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়।
‘কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু’-র আবেদন—
চলুন আমরা সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, কৃষ্ণনগর শহরকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তুলব এবং ‘সিঙ্গল ইউজ’ প্লাস্টিক পুরোপুরি বর্জন করব।
লেখক : পরিবেশ বন্ধু ও আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
Khub bhalo kaj, carry on
ধন্যবাদ। পাশে থাকবেন।
পরিবেশে ‘প্লাস্টিক বর্জন ‘ নিয়ে আপনি এত পরিশ্রম করছেন দেখে বেশ ভালো লাগলো, স্যার! আর আমিও অনেক সচেতন হলাম। ????
ধন্যবাদ। কৃষ্ণনগর পরিবেশ বন্ধু এবং একাধিক সংগঠন এভাবেই পরিবেশ সচেতনতামূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পড়লাম বেশ মন দিয়ে। আমরাও পরিবেশ বন্ধু বসিরহাট,একশো ভাগ সহমত পোষন করে পাশে আছি বন্ধু।বসিরহাট মিউনিসিপালিটিতে একই ভাবে কাজ করার চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। অভিজ্ঞতা প্রায় একই ধরনের।প্রচারের সময় অনেক তিক্ততা সৃষ্টি হয়।গাল মন্দও শুনতে হয়।তবু্ও চেষ্টা ছাড়ি না।প্রশাসনের চোর পুলিশ খেলা অনেক সময় আমাদের বিভ্রান্ত করে, বিমর্ষ করে। তবু আশায় আশায় বুক বাঁধি।এক সময় মিউনিসিপালিটি মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছিল।কিন্তু ক্ষনিকের উত্তেজনার আগুন কবেই নিভে গেছে।
লেখাটি পড়ার জন্য এবং আপনাদের (পরিবেশ বন্ধু বসিরহাট) কাজ করার অভিজ্ঞতা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।