“ভাঁজো লো কলকলানি মাটির লো সরা। ভাঁজোর গলায় দেবো আমরা পঞ্চফুলের মালা।।
এক কলসি গঙ্গাজলে এক কলসি ঘি।
বৎসরান্তর একবার ভাঁজো নাচবো নাত কি?
পূর্ণিমার চাঁদ দেখে তেঁতুল হলেন বঙ্ক।
গড়ের গুগলি বলেন আমি হব শঙ্খ।।
ওগো ভাঁজো তুমি কিসের গরব কর। আইবুড়ো বেটাছেলের বিয়ে দিতে নারো?
ভাঁজো। এই পথে যেও ।
বেনা গাছে কড়ি আছে দুধ কিনে খেও।।”
আমাদের বাংলায় কোনায় কোনায় ছড়িয়ে আছে কতনা ব্রত উৎসব। নারীকেন্দ্রিক এইসব ব্রত উৎসবের অনুষ্ঠানগুলিতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্তঃসলিলা নদীর মতো বয়ে চলেছে এক গভীর সমাজবিজ্ঞান। ব্রত পালনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় নারীর অন্তরে গভীরে লুকিয়ে থাকা মনের আর্তি, স্বামী সন্তানাদি থেকে পরিবারের সকলের মঙ্গল কামনা। এখানে উপাস্য দেবদেবীকে সে যেন নিজের ঘরের মা, ছেলে মেয়ের মত করে দেখে। তাই ছড়া কেটে শ্লোক বলে দেবদেবীকে সে জানায় তার মনের কথা। বাংলার এরকমই একটি লৌকিক আচারের নাম ভাঁজো ব্রত।

সম্ভবত ছোটনাগপুরের মানভূম ও সিংভূমের আদিবাসীদের মধ্যে এই ব্রত প্রথম প্রচলন হয়। পরে রাঢ়বঙ্গের বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ জেলার অন্ত্যজ শ্রেণীর মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। মূলত শস্যবীজের মান পরীক্ষার জন্য এই উৎসবের সূচনা। কৃষিক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও এই উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা, গুরুত্ব ক্রমশ হারিয়ে যায়। তবুও আজ শস্য কামনায় মহাসমারোহে নারীরা পালন করেন এই লৌকিক আচার।
বর্ধমান অঞ্চলের মেয়েদের মধ্যে এই ভাঁজো বা শস পাতার ব্রত ভাদ্র মাসের মন্থন ষষ্ঠী থেকে আরম্ভ করে পরবর্তী শুক্লা দ্বাদশীতে শেষ হয়। শস বলতে বোঝায় শস্যকে আর পাতা অর্থে বিছানো। ব্রতিরা আপন আপন পাত্রে শস্য বিছিয়ে ‘শসপাতার ব্রত’ পালন করে।
মন্থন ষষ্ঠীর পূর্ব দিন পঞ্চমী তিথিতে পাঁচ রকমের শস্য–মটর, মুগ, অড়হর, কলাই, ছোলা একটি নতুন সরাতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পরের দিন ষষ্ঠী পূজায় এগুলি নৈবেদ্য দিয়ে বাকি শস্য সরষে এবং ইঁদুর-তোলা মাটি বা দুর্গামন্ডপের মাটির সঙ্গে মেখে একটি নতুন সরাতে রাখতে হয়।
দ্বাদশী পর্যন্ত মেয়েরা স্নান করে প্রতিদিন এই সরাতে অল্প অল্প করে জল দিয়ে চলে। ৪-৫ দিন পরে এসব শস্য যখন অঙ্কুরিত হতে থাকে, তখন জানা যায় এ বছরে প্রচুর শস্য হবে এবং তখন আনন্দের সঙ্গে ঘরের মেয়েরা শস্য উৎসবের আয়োজন করে। ইন্দ্রাদ্বাদশীর চাঁদের আলোতে এই উৎসব।
উঠোনের মাঝখানে নিকোনো বেদীর উপর ইন্দ্রের বজ্র চিহ্ন দেওয়া আলপনা; কোথাও মাটির ইন্দ্র মূর্তিও থাকে। অনেক জায়গায় ভাজর খোলা প্রতিষ্ঠা করে। খোলাটাই তাদের কাছে ঠাকুর। তবে বীরভূমের অজয় তীরবর্তী কোন কোন গ্রামে ভাঁজোর অপরূপ নৃত্যরতা মানবী মূর্তিও দেখা যায়। তাঁর কাছেই অন্য একটি সিংহাসনে আছেন এক অনিন্দ্যকান্তি সুপুরুষ। পুরুষটি ইন্দ্র, নারীটি অপ্সরা। আবার কোথাও মূর্তির বদলে মাছ ধরার ‘পোলুই’, বাঁশের বাতা, কাপড়, ফুল দিয়ে সাজিয়ে উপাস্য দেবতার রূপ দেওয়া হয়।

সধবা বিধবা বৃদ্ধা বলে বাছবিচার নেই, সব বয়সের মেয়েরাই ভাঁজোর উপাসিকা। ভাঁজো প্রধানত মেয়েলি উৎসব হলেও মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ-এর পুরুষেরাও ভাঁজো পালন করে। হাঁড়ি, বাগদী ডোম, লোহার, ভূমিজ ইত্যাদি উপজাতির পুরুষেরা মেয়েদের মতোই খোলা পাতে, ঢোল বাজিয়ে নাচে।
ছোট মেয়েদের উদযাপিত ভাঁজোকে বলে ‘ছোটো ভাঁজুই’ আর বিবাহিত মহিলাদের উদযাপিত ভাঁজোকে বলে ‘বড়ো ভাঁজুই’।
ইন্দ্র দ্বাদশীর সন্ধ্যায় শুরু করে টানা ৮ দিন ধরে পুজো চলে। প্রতি সন্ধ্যায় শঙ্খ বাজিয়ে, প্রদীপ ধূপ জ্বালিয়ে ফলমূল মিষ্টি চিঁড়ে গুড় দুধের নৈবেদ্য সাজিয়ে মেয়েরা বসে আরম্ভ করে অভিনব সুরে কত রকমের গান। মেয়েরা হাত ধরাধরি করে বাদ্যের তালে তালে বেদির চারিদিক ঘিরে নাচগান শুরু করে। ব্রতে কোন বাঁধাধরা নিয়মনীতি নেই, লাগে না পুরোহিতও। তবে এখন অনেকেই পুরোহিত এনে পূজা করান। তিনি এসে পুজো করেন চন্ডী বা জয়দুর্গার ধ্যানে।
ভাঁজোর অষ্টম রাতে হয় জাগরণ। সেদিন মেয়েরা উপোস করে কোথাও কোথাও পুকুর ঘাট থেকে ঘট নিয়ে আসা হয়। জাগরণের পুজো বলে নৈবেদ্যের ছড়াছড়ি। বিসর্জনের দিন পাড়া ঘোরানো হয়। সেই সময় গাইতে থাকে মেয়েরা —
‘ধুপের ধোঁয়া খাওরে ভাঁজো ধূপের ধোঁয়া খাও ।
ক্ষীর ছাউনি নাওরে ভাঁজো ক্ষীর খাওনি নাও।
একুলে কদমের ফুল, সদাই ফেলে মারি।
কি আরে ভাঁজো রানী ঘরকে আলো করি।’
বিসর্জনের আগের দিন কোন বৃদ্ধা পূজারিনী ভালো করে তেল মেখে ও অন্যান্য বৃদ্ধারা ভাঁজোকে কোলে রেখে, তেল মাখানোর গান করেন।—
‘তেল মাখে চুল আঁচড়ায় ভাঁজোই সুন্দরী।
কিলবিলিয়ে উকুন মরে হেসে হেসে মরি।।
এক নিমেষে উকুন গেল চুল তো পরিষ্কার।
চোখ জুড়ানো সাজ সেজেছে যে ভাঁজোই আমার।।’

গানটির অর্থ হল — ভাঁজোর খোলায় যে শস্যদানা দেওয়া হয় তা ক্রমশ অঙ্কুরিত হয়। শস্যের কালো খোসাগুলিকে বলে উকুন। কোন বৃদ্ধা নারী সেটিকে ছাড়িয়ে দিলে তাকে বলা হয় উকুন মারা। শস্যবীজের যে অঙ্কুরদগোম হয়, তা হলো চুল। আর কোথাও কোথাও পাতলা পাট দিয়ে সেই অঙ্কুর করা হয়, একে বলে চুল-বাঁধা।
ভাঁজো হলেন শস্যের দেবতা। তাঁর কৃপায় শস্য ও ধন পাই। অনেকেই বলেন ভাঁজো বৈদিক ইন্দ্র। লোকশ্রুতি আছে, কুমারী মেয়েরা ভোলানাথকে পূজা করেন কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র পুজো পাননা। তাঁর খুব সাধ হলো পুজো পাবার। তাই তিনি ভঞ্জাবতী নামের অপ্সরাকে মর্ত্যে পাঠালেন তার পুজো শুরু করার জন্য। এই ভঞ্জাবতীই অন্ত্যজ শ্রেনীর মধ্যে এই ব্রত প্রচার করেন। তাঁর নাম অনুসারে এই ভাঁজো ব্রত।
অনেকেই ভাদু আর ভাঁজো এক মনে করেন, কেননা দুজনেই ফসলের দেবী। কিছু গবেষক মনে করেন ভাঁজো শব্দটি এসেছে ভাদ্র মাস থেকে। আবার অনেকে বলেন, কুমারী মেয়েরা কোমর বাঁকিয়ে ভাঁজ করে নাচে সেই থেকে। বৃষ্টি তথা কৃষির দেবতা ইন্দ্রকে তুষ্ট করার জন্যই ভাঁজো নাচের আয়োজন।
আদি মানব সমাজে ফসল উৎসবের সঙ্গে নৃত্যের ছিল অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। নৃত্য উর্বরতার প্রতীক। তাই ভাঁজো ব্রত অনুষ্ঠানে ক্রিয়া থেকে ব্রতের শুরু এবং নৃত্যগীতে তার পরিসমাপ্তি ঘটে। ব্রতের উদ্দেশ্যকে বাস্তবে পালন করার জন্যই বাংলার নারীরা ব্রত-নৃত্য করে থাকেন। ব্রতনৃত্যের মাধ্যমে দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক কামনা ও আকাঙ্ক্ষার তাত্ত্বিকভাব প্রকাশ পায়।
শস্যের সঙ্গে নারীর সম্পর্কটি আদি মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন। জমি যেমন ফসলের জন্ম দেয় তেমনি নারীরাও সন্তানের জন্ম দেয়। যে পরিবারে লেখাপড়ার চল এখনো হয়নি, কুমারী মেয়েরা কর্মরত নয়, যৌবনের সন্ধিক্ষণে ভাঁজোর ছড়াগুলি এই নিরক্ষর কুমারী মেয়েদের লোকশিক্ষার কাজ করে। এক সময় গ্রামবাংলা ভাঁজোর গানে মুখরিত হলেও, প্রযুক্তির যুগে তা বিলুপ্তির পথে। তবুও অন্ত্যজ শ্রেনীর মানুষের নিরাসক্ত জীবনে কিঞ্চিত আনন্দের ছোঁয়া দিতেই প্রাচীন এই লোকসংস্কৃতি আজও টিকে আছে।
সমস্ত ব্রত উৎসবগুলিই নারী কেন্দ্রীক কারন নারী
মূলত প্রকৃতির অন্যতম প্রতিনিধি এবং সৃষ্টি সুখের প্রতীক।সমস্ত ব্রত উদযাপন নারীদের দ্বারা
পরিচালিত ও পরিভাষিত।এই উৎসবগুলি আজ
লুপ্তপ্রায় কারণ বোধহয় ব্যক্তি জীবনে নতুন নতুন
আবিষ্কার ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে নুতন ভাব
ভাবনার উপস্থিতি।
আপনি জাগিয়ে দিয়ে জানিয়ে দিলেন প্রথা ও
উৎসবের প্রয়োজনীয়তার তাৎপর্য।ধন্যবাদ।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয়।