অধিকাংশ ঐতিহাসিকই ৫৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে গৌতম বুদ্ধের জীবনকাল হিসেবে নিরূপণ করেন। হিমালয় পাদদেশে তরাই অঞ্চলে কপিলাবস্তু নগরে লুম্বিনীর শালবনে বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে শাক্য রাজপরিবারে এক দিব্য শিশুর জন্ম হয়। ছোটবেলায় যার নাম ছিল সিদ্ধার্থ। পরে তিনি হয়েছিলেন মহামানব গৌতম বুদ্ধ।
প্রাচীণ ষোড়শ জনপদে কিন্তু এই শাক্য রাজ্যের কোন উন্মেষ নেই কারণ তা ছিল কোশল রাজ্যের অধীন। এরা মূলত ছিলেন কৃষিজীবী। শুদ্ধোধন ছিলেন এদেরই নির্বাচিত দলনেতা। কপিলাবস্তু ছিল এই তথাকথিত শাক্য রাজ্যের প্রধাননগর। ত্রিপিটক থেকে জানা যায় তখন সব গ্রাম বা নগরের প্রধানদের রাজা বলার নীতি ছিলো।রাজা শুদ্ধোদন ও মায়াদেবীর সন্তান সিদ্ধার্থ।বুদ্ধের জন্মের সপ্তম দিনে মায়াদেবীর জীবনাবসন হয় এবং তিনি বিমাতা গৌতমী কর্তৃক লালিত-পালিত হন।
বুদ্ধের বয়স যখন মাত্র ৫ দিন রাজা আটজন জ্ঞানী ব্যক্তিকে শিশুর নামকরণ ও ভবিষ্যৎ বলার জন্য আমন্ত্রণ করেন। তাদেরই মধ্যে এক গণৎকার বললেন জরাজীর্ণ বৃদ্ধ, রোগ শীর্ণ মানুষ, মৃতদেহ ও ভিক্ষারত সন্ন্যাসী দেখে এই শিশু যৌবনে সংসার ত্যাগ করবে। হয়েছিলও তাই। তবে সেসব আরো অনেক পরের কথা।
প্রায় তিন হাজার বছর আগে হিন্দুকুশ পর্বতে গিরিবর্তের মধ্যে দিয়ে গান্ধার হয়ে আর্যরা ইরান থেকে এসে পৌঁছলেন পাঞ্জাবে। চাষবাস শিখে সিন্ধু নদের আশপাশে তারা বসবাস করতে শুরু করেন। সম্ভবত শাক্যরা ছিলেন এদেরই কোন জন গোষ্ঠী। তাঁরা নিজেদের আর্য বলে দাবি করত।
সিদ্ধার্থর বিবাহ সম্বন্ধে দু-ধরণের মত প্রচলিত আছে। প্রথম মত অনুসারে, অশোক ভান্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে (শাক্যবংশের রীতি অনুসারে পুরুষদের স্বয়ম্বরসভা) উপস্থিত পাণিপ্রার্থীদের মধ্যে তিনি ‘গোপা’কে মনোনীত করেছিলেন যিনি ছিলেন মাতুল দন্ডপানির কন্যা। মাত্র উনিশ বছর বয়সে সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। এর দশ বছর পরে পুত্র রাহুলের জন্ম। অন্য একটি মত অনুসারে ২৮ বছর বয়সে সংসারী করার জন্য পিতামাতা তাঁকে রাজকন্যা যশোদারার সাথে বিবাহ দেন।
যাই হোক ২৯ বছর বয়সে পুত্র রাহুলের জন্মের সপ্তম দিনে গৃহত্যাগ করলেন সিদ্ধার্থ। শান্তিপূর্ন পরিপার্শ্ব, রূপে গুনে অতুলনীয় যুবতী স্ত্রী, বিলাস ব্যসনের অপরিমিত আয়োজন — এরই মধ্যে যুবক সিদ্ধার্থ সন্ধানী হলেন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের মূল সমস্যার। জীবনের স্তরে স্তরে রোগ, শোক, জ্বরা মৃত্যুর যে দুঃখ, সেই দুঃখের সত্যরূপ তিনি দেখতে চাইলেন। মনে হলো সেই দুঃখই সত্য, সুখ ক্ষণিকের। আত্মবিস্তৃতি মানুষের দুঃখ নিবারণের এক দুর্জয় সংকল্প নিয়ে সংসার ত্যাগ করে তিনি হলেন তপস্বী।

ছ-বছর কঠোর তপস্যা করেন। কঠিন তপস্যার ফলে তিনি ভয় লোভ লালসাকে অতিক্রম করে নিজ মনের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেন। কিন্তু কঠোর সাধনার ফলে তার শরীর ভেঙে যায়। সহসা তিনি বুঝতে পারেন এইভাবে কৃচ্ছসাধন করা যাবে না। সুজাতা নামক এক নারীর কাছ থেকে তিনি একপাত্র পরমান্ন আহার করলেন। অতঃপর নদিতে স্নান করে পুনরায় গয়ার নৈরঞ্জনা নদীর তীরে এক অশ্বত্থ গাছের নিচে এক বৈশাখী পূর্ণিমায় ধ্যানে সিদ্ধার্থ শেষ পর্যন্ত বুদ্ধত্ব লাভ করলেন।
অমৃত বিতরণ করতে পথে নামলেন পরম পথের সন্ধানী পথিক মহামানব বুদ্ধ ।বোধি বা সম্বোধির অর্থ হলো জ্ঞান। বুদ্ধত্ব লাভ করার অর্থ হলো মহাজ্ঞান লাভ করা।
তিনি যে জ্ঞানলাভ করেন তাকে বলা হয় ‘চার আর্য সত্য’ও ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ’। নির্বাণ হলো সকল প্রকার কামনা-বাসনার বন্ধন থেকে মুক্তি– এটিই হলো সাধনার চরম পরিণতি বা পরম প্রাপ্তি। এই সম্বন্ধে বুদ্ধের উপদেশকে ( Four Noble Truths) চারআর্যসত্য বা চতুরার্য সত্য নামে পরিচিত।
মূলত তিনি ছিলেন ধর্ম সংস্কারক। অতিরিক্ত ভোগবিলাসও নয়, কঠিন কৃচ্ছসাধনও নয়। এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানকেই তিনি বলেছেন মধ্যপাথ। নৈতিক চরিত্রের উন্নতি না হলে শুধুমাত্র মানুষকে ধর্ম কথা শুনিয়ে লাভ নেই তাই তিনি প্রবর্তন করেন পঞ্চশীল নীতির যা এখন ভারতীয় দণ্ডবিধির অন্তর্ভুক্ত।
জন্মান্তর নয়, তিনি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করতেন। তৃষ্ণাই পুনর্জন্মের একমাত্র কারণ। তিনি অদৃষ্টকে মানতেন না কিন্তু কর্মফল মানতেন। বুদ্ধ পরকাল নিয়েও অনেক কিছু বলে গেছেন। পরকাল নির্ভর করে ইহ জন্মে কর্মের উপর। মৃত্যুর পর মানুষের ৩১ লোকভূমিতে গমনের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
সুদীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে বুদ্ধদেব গাঙ্গেয় উপত্যকায় পরিভ্রমন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম প্রচার করেন। মানবতার বাণী ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে পরিব্যপ্ত হয়েছিল সারা পৃথিবীতে। মানবজাতির উদ্ধারই ছেলে তার লক্ষ্য।
মহাপরিনির্বাণ সূত্র থেকে জানা যায় বয়স যখন তাঁর আশি, পিতা পালিকা মা গৌতমী, পুত্র রাহুল, রাজা প্রসেনজিৎ, বিম্বিসার…সবাই চলে গেছে একের পর এক, এবার অশীতিপর বুদ্ধও যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। আজ থেকে ২৫৬৭ বছর আগে এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে নির্বাপিত হল জীবনদ্বীপ। জ্বালিয়ে গেলেন অহিংসা, মৈত্রীর ধ্রুবতারা। মানুষের দুঃখমোচনের সংকল্প নিয়েই তার সাধনা। যে শাশ্বত জ্ঞান তিনি লাভ করেছিলেন তা মানুষের সাধ্যায়ত্ব।
বুদ্ধির জীবনের অনেক অংশই সংসারী মানুষের পক্ষে নিদর্শন তুল্য। বুদ্ধ যে জন্মের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন সে সবই হল জাতকের কথা।(জাতক হল ভগবান শাক্যমুনি বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনির সঙ্কলন) তিনি সব মানুষের সমস্যা মোকাবিলা করার এবং তার উত্তরণের পথ দেখিয়ে গেছেন। ধর্ম যদি একটি সংঘবদ্ধ রূপ নেয় তার পরিণতি কি হতে পারে বুদ্ধ তা দেখিয়েছেন। তার জন্মটাই বিশ্বের ইতিহাসে একটি চমকপ্রদ ঘটনা। তিনি ছিলেন সাম্যবাদের জনক। স্বামী বিবেকানন্দের কথায়, ‘এত বড় নির্ভীক নীতি তত্ত্বের প্রচারক এর আগে জগৎ দেখিনি। কর্মযোগীদের মধ্যে বুদ্ধই শ্রেষ্ঠ।’
বৈশাখী পূর্ণিমার সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব গভীর। ৩৫ বছর বয়সেই এই পৃথিবীতেই তার বোধিত্বলাভ আবার তার ৮০ বছর বয়সে এই তিথির রাত্রিতে তাহার তিনি মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন অর্থাৎ নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছিলেন। সে কারণে গৌতম বুদ্ধের জীবনে বৈশাখী পূর্ণিমা খুবই প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। আজকে লেখার উদ্দেশ্য, বুদ্ধ পূর্ণিমার পূণ্য লগ্নে হিংসা উন্মত্ত পৃথিবীতে তার শাশ্বত বাণী স্মরণ করা।
তিনি বলেছিলেন অক্রোধের দ্বারা ক্রোধকে জয় করতে হবে। যুদ্ধে কোন এক পক্ষের জয় হলে তা হয় বাহুবলের জয়। কিন্তু বাহুবাল মানুষের চরম বল নয়। সে কারণে যুদ্ধের এই জয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকে নতুন যুদ্ধের বীজ। মানুষের আসল শক্তি যে অক্রোধে, ক্ষমায় আর ভালোবাসায়।
আজকের আত্মসর্বস্ব, বৈশ্য বুদ্ধির নির্মম, নিঃসীম লুব্ধতার দিনে স্মরণ করি সেই মহামানব বুদ্ধকে, যিনি নিজের মধ্যে বিশ্ব মানবের সত্য রূপ প্রকাশ করে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল।
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি
ধম্মং শরণং গচ্ছামি
সংঘং শরণং গচ্ছামি ।।