ভক্তদের প্রাণের ঠাকুর জগন্নাথ। সূতসংহিতা বলে বামনরূপী জগন্নাথকে রথে অবস্থানের সময় দর্শন করলে তার আর পুনর্জন্ম হয় না, ‘রথে তু বামনাং দৃষ্টা, পুনর্জন্ম ন বিদতে’। শ্রীক্ষেত্রের রথযাত্রায় তাই সমুদ্রের অনন্ত জলরাশির বাষ্প আর ভক্তগণের জনজোয়ার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রথযাত্রার দিন জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের রথের দড়ির মঙ্গল স্পর্শে মানুষের জীবনের গতি এক অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে। ত্রয়ী আধারের বিমূর্ত দর্শনে মানবকূলের উন্নতি, গতি, সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের আলেখ্যে পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়।
এখন রথযাত্রা বলতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা বোঝালেও প্রাচীন ভারতবর্ষে অন্যান্য দেবদেবীর উৎসবের সঙ্গে এটি যুক্ত ছিল। কূর্ম, ভবিষ্য, বরাহ প্রভৃতি পুরানে বিভিন্ন দেবতার রথযাত্রার উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতেও রথের ব্যবহার দেখা যায়।
এমনকি বৌদ্ধ ও জৈন সম্প্রদায়ের মধ্যে রথযাত্রার প্রচলন ছিল মনে করা হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন বুদ্ধদেবকে কেন্দ্র করে এই রথযাত্রার শুরু। চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েনের ভ্রমণ কাহিনীতে বুদ্ধদেবের জন্মোৎসব উপলক্ষে আয়োজিত রথের বর্ণনা পাওয়া যায়। এর থেকে ধারণা হয় বুদ্ধদেবের রথযাত্রাই পরবর্তীকালে জগন্নাথের রথে রূপান্তরিত হয়েছে। অনেকের ধারণা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরটিও আগে বুদ্ধমন্দির ছিল। জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরাম আসলে বৌদ্ধ ধর্মের ত্রিরত্ন — বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ। পরিবর্তিত কবে হয়েছে তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে, তবে বৌদ্ধ ধর্মের উপর হিন্দুধর্ম তথা বৈষ্ণব ধর্মের আধিপত্য স্থাপনের যে এটি একটি নিদর্শন তা বলা যেতে পারে। অনেকের মতে জগন্নাথ জৈনদের আরাধ্য দেবতা — ঋষভ দেব।
সূচনা যেভাবেই হোক না কেন, এটাই সত্য যে এই বিজ্ঞানের যুগেও ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ জগন্নাথের আকর্ষণে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়াতে রথযাত্রায় সামিল হন।
পৌরাণিক মতে কোন এক সময় দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে বৃত্তাসুরের ভয়ানক যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ইন্দ্র তার বজ্রের আঘাতে বৃত্তাসুরের দেহ চার ভাগ করে মেরে ফেলেন এবং এই ভাগগুলির প্রথম ভাগটি দিয়েই রথ তৈরি হয়। কথিত আছে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা একদিনের মধ্যে তিনটি রথ তৈরি করে দিয়েছিলেন।
পুরীধামে রথের প্রস্তুতি শুরু হয় বৈশাখ মাসে। রথ তৈরির জন্য দশপল্লার জঙ্গল থেকে কাঠ আনা হয়। মন্দির কমিটি আগে থেকেই বনবিভাগের কর্মকর্তাদের থেকে অনুমতি পত্র নিয়ে নেয়। এরপর জগন্নাথের মূর্তির পায়ে স্পর্ষ করানো সোনার কুড়াল নিয়ে নির্দিষ্ট গাছ কাটা হয়। জগন্নাথের রথ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় নিম ও হাঁসি গাছের কাঠ। অরণ্যে মন্ত্রচ্চারণ, আগুন প্রজ্বলন, আহুতি বৃক্ষমূলে ঘৃতধারা প্রদানের পর গাছ কাটা হয়। সেই গাছের কাঠ দিয়ে তিনটি রথ গড়ে ওঠে।
রথ প্রতিষ্ঠার নিয়ম অনুযায়ী রথের ঈশান কোণে নির্মল গৃহ নির্মাণ করার বিধি রয়েছে। সেই গৃহের মধ্যে বেদি ও মণ্ডল প্রস্তুত করতে হয়। বেদি চার হাত চওড়া এক হাত উঁচু চারচৌকো। রথ প্রতিষ্ঠানের আগের দিন শেষ রাতে শুভ মুহূর্তে দেবতাদের পূজা করতে হয়। ভোরবেলা এই বেদির মধ্যে ‘সর্বতোভদ্র মন্ডল’ বা পদ্ম নির্মাণ করে দিব্য তন্ডুল স্থাপন করতে হয়।
শ্রী বলরামের রথের নাম তালধ্বজ বা হলধ্বজ। বলরাম বা বলভদ্র স্বয়ং শেষনাগ। বলরামের বেদির নীচে আছে একটি দর্পণ যার মধ্যে দিয়ে তিনি সমগ্র বিশ্বকে দেখেন। দর্পণটি হল জ্ঞানের প্রতীক। দর্পণটি যেহেতু তলদেশে থাকে তাই একে তাল বলা হয়। হয়তো সেই নাম থেকেই তাঁর রথের নাম তালধ্বজ। আরেকটি কাহিনী বলে, বলভদ্র তালবনে ত্রিনাবর্তাসুরকে বধ করেছিলেন। সেই বিজয়ের প্রতিক হিসেবে তার রথে তাল বৃক্ষের চিহ্ন শোভা পায়। সেই জন্যই তার রথের নাম তালধ্বজ।
৭৬৩টি ছোট বড় কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে নির্মিত এই রথের উচ্চতা ১৩.২ মিটার। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ৩৩’ x ৩৩”। চাকার সংখ্যা ১৪টি যা চতুর্দশ ভুবনের প্রতীক। প্রতিটি চাকার চোদ্দটি করে অক্ষ থাকে, যা ব্রহ্মার জীবনকালের সূচক।
রথের ধ্বজার নাম উন্মনী এবং রশির নাম বাসুকী নাগ। ন’জন পার্শ্বদেবতা হলেন — গণেশ, কার্তিক, সর্বমঙ্গলা, প্রলম্ব, হলায়ুধ, মৃত্যুঞ্জয়, নাটেশ্বর, মহেশ্বর ও শেষদেব, দ্বারপাল রুদ্র ও সাত্যকি। সারথি মাতলি এবং রক্ষক বাসুদেব। রথের শ্বেতবর্ণের চারটি ঘোড়ার নাম তীব্র, ঘোর, শ্রম (স্বর্ণনাভ) ও দীর্ঘ (দীর্ঘশর্মা)। সুদর্শন চক্রের পাশে দুটি পাখির (কাকাতুয়া) নাম স্বধা ও বিশ্বাস। রক্ত লাল ও সবুজ কাপড়ে মোড়া রথের শীর্ষে অনন্তনাগ রয়েছেন।
দেবী সুভদ্রার রথের নাম দেবদলন বা দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ। দেবী সুভদ্রা লক্ষ্মী স্বরূপ — ধন সমৃদ্ধি ও শ্রীর প্রতীক। তাই তার রথে থাকে পদ্ম চিহ্ন। ৫৯৩টি কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি রথের উচ্চতা ১২.৯ মিটার এবং দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ৩১’৬” x ৩১’৬” পথের উচ্চতা প্রায় ৩১ হাত। চাকার সংখ্যা ১২ যা বারো মাসকে নির্দেশ করে। ধ্বজার বা পতাকার নাম নাদম্বিক। রথের কাপড়ের রং লাল-কালো। রশির নাম স্বর্ণচূড় নাগ। ধ্বজার পাশের পাখি দুটির নাম শ্রুতি ও স্মৃতি। ন’জন পার্শ্বদেবী হলেন — চন্ডী, চামুণ্ডা, মঙ্গলা, উগ্রতারা, বনদুর্গা, শুলিদুর্গা, শ্যামাকালী, বিমলা ও বরাহি। সারথি অর্জুন আর রক্ষক জয়দুর্গা। লাল রঙের ঘোড়া চারটির নাম প্রজ্ঞা, অনুজ্ঞা, ঘোরা ও অঘোরা। রথের দ্বারপালিকা গঙ্গা এবং যমুনা। সুভদ্রার রথে সুদর্শন বিরাজ করেন।
শ্রীজগন্নাথ দেবের রথের নাম নন্দীঘোষ। লাল ও হলুদ কাপড় আচ্ছাদিত রথটি ষোড়শচক্রযুক্ত। চন্দ্রের ষোল কলা জগন্নাথের রথের চাকায় সংখ্যাতত্ত্বে মিশে আছে।
এই রথটি দেবরাজ ইন্দ্র শ্রীজগন্নাথদেবকে প্রদান করেন। ৮৩২টি কাঠের টুকরো দ্বারা তৈরি রথের উচ্চতা ৩১ হাত। রথের ১৬টি চাকা যা চন্দ্র দেবের ষোল কলার প্রতিক। হলুদ রঙের চাকার উচ্চতা ৭ ফুট, চওড়া ৭ ইঞ্চি। রথের রক্ষক হচ্ছেন গরুড়। মা বিমলা ও মা বিরজা নন্দীঘোষের শক্তি। রথের ধ্বজায় হুনুমান বিরাজিত। রথের রজ্জুর নাম শঙ্খচূড়। রথের নেত্রের নাম ত্রৈলক্য-মোহিনী। রথে ৯ জন দেবতা অধিষ্ঠিত — হনুমান, রাম, লক্ষণ, কৃষ্ণ, গোবর্ধনধারী, নারায়ণ, চিন্তামণি, রাঘব ও নৃসিংহ। রথের ৪টি অশ্ব তাদের নাম — বরাহ, শঙ্খ, শ্বেত ও হরিদাস। রথের সারথির নাম দ্বারুক/ মাতালি। রথের দ্বারপাল জয়, বিজয়। রথের মুখ হল নন্দীমুখ, দেবী যোগমায়া। রথের অধীশ্বর প্রভু জগন্নাথ।
পুরাকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যে নির্দেশে রথযাত্রা সম্পন্ন করেছিলেন সেই ঈশ্বর প্রেরিত নির্দেশই এখনো রথযাত্রা নিয়ম। রথ প্রতিষ্ঠা হলে গায়ত্রী মন্ত্র, শ্রী সুক্তম, শ্রীবিষ্ণুমন্ত্র উচ্চারণে, জগন্নাথের জয়ধ্বনিতে, মঙ্গলবাদ্যের মূর্ছনায় দেবতাদের রথে তোলা হয়।
আত্মানং রথিনং বিদ্ধি
শরীরং রথমেব তু।
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি
মনঃ প্রগ্রহমেব চ।।
রথ হলো জীবের শরীরের প্রতীক। জীবাত্মা রথস্বামী। বুদ্ধি রথের চালক আর মন সেই রথে লাগাম। রথের অশ্ব হলো জীবের ইন্দ্রিয় সমূহ আর ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়গুলো হলো রথের পথ। রথের ১৬টি চাকা পাঁচটি জ্ঞানেনন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় এবং ছয়টি রিপুর প্রতীক। চিরন্তন গতির প্রতীক এই রথ। অবিরাম গতিশক্তিতে বিশ্বব্রহ্মান্ড আবর্তিত। দুর্নিবার গতিতে এগিয়ে চলার নাম জীবন। রথের রথী তিনি অন্তর্যামী, নির্লিপ্ত। তাঁর উপর ভরসা রেখে জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত পথে চালিত করলে সহজেই পথ চলা যায়, মেলে মুক্তির ঠিকানা। আমাদের একান্ত আপন, প্রাণের ঠাকুর শ্রী জগন্নাথ। তাঁর বাণীতে, দর্শনে বিশ্বাস রেখে জীবন রথ চলুক নির্বিঘ্নে। জয় জগন্নাথ।
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥
ওঁ নীলাচল নিবাসায় নিত্যায় পরমাত্মনে। বলভদ্র সুভদ্রাভ্যাং জগন্নাথায় তো নমোহস্তুতে।।????????????????????️????????????
জয় জগন্নাথ ????