যার আশায় বসে থেকে মন আকুল, চাকরি পেয়ে যাওয়ার সুখবর জানানোর আকুতিও তার মারফত। ‘আশায় আশায় বসে আছি ওরে আমার মন… কিংবা ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো’ থেকে আরও অনেক পিছিয়ে গিয়ে ‘জ্বালতে হ্যায় জিসকে লিয়ে, তেরি আঁখোকে দিয়ে’- প্রতিটি গানের প্রেম কিংবা বিরহ, আকুতি কিংবা ব্যাথায় একমাত্র যার স্পষ্ট উপস্থিতি- সে হল টেলিফোন।
গলায় যত জোরই থাকুক বেশি দূরে যে কথা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয় সেটা মানুষ সামান্য জ্ঞানগম্যিতেই বুঝেছিল। দূরের মানুষকে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা তখন থেকেই। শব্দতরঙ্গ যে বাতাসের থেকে অন্য ঘন মাধ্যমে দ্রুত ছোটে, সেই হদিশ পেয়ে একসময় প্রাসাদের ওপর মহল থেকে নীচের মহলে গোপন কথা চালাচালির জন্য ‘কথা বলার নল’ ব্যবহার শুরু হয়েছিল। শেক্সপিয়রের নাটকে মেলে।
এর পর উঁচু টাওয়ারের ওপর বাঁধা মাচা থেকে সঙ্কেত দেখানো। টেলিস্কোপ দিয়ে সেই সঙ্কেত দেখে খবর পাঠানো হত আরও দুরের জনকে। এইভাবে খবর চাউর হত নানা দিকে। তারপর প্যারিস থেকে ১৫০ মাইল দূরে লিলি শহরে বার্তা পাঠানোর ‘সেমাফোর’ পদ্ধতি চালু হয়। পরবর্তীতে এর নাম হয় ‘টেলিগ্রাফ’। কলকাতা থেকে চুনার এবং কলকাতা থেকে সাগরে সেমাফোরের প্রচলন ছিল।
ইতিহাসে যাকে দ্য ফাদার অফ দ্য ডিফ অর্থাৎ বোবাদের জনক বলা হয়, ১৪৫ বছর আগের ঠিক আজকের দিনিটিতে (১০ মার্চ) তিনি এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটালেন। বোস্টনের একটি হোটেলে গবেষণার কাজ চালাচ্ছিলেন তিনি, পাশের ঘরে ছিলেন তাঁর সহকারী ওয়াটসন। না শার্লক হোমসের গল্প নয়। নিজের ঘর থেকে তিনি বললেন, ‘প্লিজ কাম হিয়ার, মিস্টার ওয়াটসন; আই ওয়ান্ট ইউ।’ টেলিফোনের মাধ্যমে কথাটি বলেছিলেন আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল; টেলিফোনের জনক।

বেলকে টেলিফোন আবিস্কারের গবেষণায় যাঁরা সাহায্য করেছিলেন তাদের উৎসাহেই একই বছর আবেদন করে পেটেন্টও মিলে যায়। চুক্তি মাফিক মাত্র ১৮ বছর সেই পেটেন্ট যে পরিমাণ অর্থ রোজগার করেছিল বিশ্বে তার নজির নেই। তারপর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার শুরু।
তবে সেই সময়ে টেলিফোন উদ্ভাবক হিসাবে বেলের গবেষণাকে নিরঙ্কুশ মান্যতা না দেওয়ায় তাত্ত্বিক তর্কাতর্কির পাশাপাশি মামলা–মোকদ্দমাও হয়েছিল প্রচুর। তিরিশ বছর ধরে অন্তত আট হাজার মামলা চলেছিল। বলা হত; বেল টেলিফোন যন্ত্রের পেটেন্ট পেলেও টেলিফোন আবিষ্কারকের দাবিদার অ্যাস্তেনিও মিউচি। তিনি ১৮৫৭ সালে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক টেলিফোন আবিষ্কার করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৬৫ সালে ইটালিয়ান আবিষ্কারক ইনোচেনযো মেনজাডি একটি ইস্পকিং টেলিফোন আবিষ্কার করেন। টেলিফোনকে ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান আবিষ্কারক থিবেদার পুশকাস। কিন্তু তারপরও আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলকেই টেলিফোন আবিস্কারক বলা হয়।
কেবল টেলিফোন উদ্ভাবন নিয়েই নয়, বলা হয়ে থাকে ফোন কানে তুলে যে হ্যালো শব্দটি প্রথম আমরা বলে থাকি তা নাকি উচ্চারিত হয়েছিল আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের মুখেই। মার্গারেট হ্যালো ছিলেন বেলের বান্ধবী। ১৮৭৬ সালের ১০ মার্চ টেলিফোন আবিষ্কারের পর তিনি তার বান্ধবী হ্যালোকেই প্রথম ফোনটি করেছিলেন। তবে এ নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। কারণ বেলের সঙ্গে মার্গারেট হ্যালো নামে কোনও মহিলার সম্পর্কের কথা জানা যায় নি।
অন্যদিকে শ্রুতিশক্তিহীন মাবেলের পক্ষে টেলিফোনের শব্দ শোনা সম্ভব নয়। তবে বেলের হবু স্ত্রী মাবেলের কারণেই বেল টেলিফোন যন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন। মাবেল একদিন বলেছিলেন, অন্যের ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই তিনি কথাবার্তা অনুসরণ করেন। তাঁর এই কথায় বেল বুঝতে পারেন, শব্দ প্রেরণের সময় যদি তড়িৎ প্রবাহের তীব্রতার তারতম্য আনা যায় তাহলেই বৈদ্যুতিক তারের উপর দিয়ে খবর পাঠানো সম্ভব হবে।
তবে এটা ঘটনা যে টেলিফোনের উদ্ভাবক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোনকেই এক উটকো ঝামেলা মনে করতেন। আর সেই জন্য নিজের গবেষণাগার থেকে স্টাডি রুম কিংবা বেড রুমের কোথাও তিনি টেলিফোন রাখতেন না।
আসলে বেল বেশ কয়েক বছর ছিলেন বস্টন স্কুল ফর মিউটস–এর শিক্ষক। পরে ম্যাসাচুসেটস, কানেকটিকাট ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় মূক–বধির স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। তারই এক ছাত্রী ম্যাবেল হুবার্ড জ্বরে ভুগতে ভুগতে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বধির হয়ে যায়। ম্যাবেল যখন বেলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তখন তাঁর বয়স ১৫। বয়সে ১০ বছর বড় হওয়া সত্ত্বেও প্রেম, তারপর বিয়ে।
মূক–বধির স্কুলে শিক্ষকতার সময়েই একটা তারের মধ্যে দিয়ে একাধিক টেলিগ্রাফিক বার্তা পাঠানো নিয়ে গবেষণা চালিয়ে বেল ‘হারমোনিক টেলিগ্রাফ’ তৈরি করে ফেলেছিলেন। তখন বাজার দখলের জন্য জোড় লড়াই করছে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন আর গার্ডিনার হুবার্ডের টেলিগ্রাফ কোম্পানি। বেল টেলিফোন সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করলে হুবার্ড বেলকে অর্থসাহায্য করতে থাকেন।
মূক–বধির স্কুলে কথা বলার সমস্যা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বেল শব্দবিজ্ঞান বা অ্যাকুস্টিক্স ও টেলিগ্রাফিতে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। বধির ছাত্রদের ঠিকভাবে উচ্চারণ শেখানোর কোন যন্ত্র তৈরি করা যায়, সে ব্যাপারে ভাবছিলেন। মাল্টিপল হারমনিক টেলিগ্রাফ নিয়ে কাজ করতে করতেই তাঁর মাথায় টেলিফোনের ভাবনা আসে।
বেল শুধুমাত্র টেলিফোন আবিষ্কারেই থেমে যাননি। সাউন্ড রেকর্ডিং থেকে শব্দ–আলোর যুগলবন্দী ঘটিয়ে স্ক্যানযন্ত্র আবিষ্কারে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন। চালাতেন ‘সায়েন্স’ পত্রিকা। ছিলেন ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
‘হ্যালো’-র নেপথ্যে এত কথা জানা ছিল না, লেখককে ধন্যবাদ।
Excellent writing on the discovery of science, Such writing enriches the mind of the reader. Greetings to Page Four & tapan.
Khub valo laglo tapaner lekha, er ageo or anek lekha porechhi
Tapan da feture chai erakam aro…
দারুণ লেখা, টিএমসি চালিয়ে যাও, এখানে যেন নতুন নতুন ফিচার পড়তে পারি।
তপনদার অন্য লেখার মতোই, তবে রাজনৈতিক লেখাগুলি যত ধারালো বা শ্লেষাত্মক তাকি আর এসব লেখায় করা সম্ভব? তবে যদি এমন ফিচার মাজঘে মধ্যে লেখেন খুবই ভাল হয়।
পড়তে খুব ভাল লাগলো, আরও আবিস্কারের গল্প পেলে খুব ভাল হয়।
লেখাটি পড়ে ভাল লাগল বলেই বলছি; বাঙালি বিজ্ঞানীদের সাধনা নিয় যদি আলোকপাত করেন খুব ভাল হয়। শুভেচ্ছা রইল।
ঘটনাটি অনেকবার শুনেছিলাম; এই প্রথম পড়ে জানলাম। পড়তে বেশ ভাল লাগছিল, এই ধরণের লেখা যত পাওয়া যায়,
ততই পড়ে ফেলা যায়। সত্যি কি অদ্ভুত ঘটনা তেমনি সুন্দর লেখা।