হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে চাতর শব্দের প্রধান অর্থ দেওয়া হয়েছে, চতুষ্পথ, চৌরাস্তা বা চৌমাথা। সংস্কৃত চত্বর থেকে জাত এই চাতর। চাতর-এর গুরুত্ব বোঝাতে প্রয়োগ দেখানো হয়েছে বেশ কয়েকটি। কৃত্তিবাসী রামায়ণ (উত্তরখণ্ড) থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, ‘বুলে চাতরে চাতরে’। বুলে মানে ভ্রমণ করে। ‘গাইল গীত চাতরে চাতরে’। ‘লইয়া বেড়াও চাতরে চাতর’।
কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছেন ‘নগরচাতরে’ কথাটি। কাশীদাসী মহাভারতেও আছে ‘নগরচাতর’ শব্দটি। আছে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলেও। বিজয় পণ্ডিত রচিত মহাভারতেও আছে ‘নগরচাতর’ শব্দটি। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত বঙ্গসাহিত্য-পরিচয়েও আছে নগরচাতর শব্দ।
জামিল চৌধুরী সম্পাদিত ঢাকার বাংলা একাডেমীর আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘চাতর’ শব্দের অর্থ হাট-বাজার।’চাতরে হাঁড়ি ভাঙা’-র কথা আছে শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে। অর্থাৎ চাতর মানে রাস্তার চৌমাথা বা হাট। চাতরে হাঁড়ি ভাঙা অনেকটা হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো। এখন যাকে হাট বলে, আগে তাকে বলত চাতর। রামপ্রসাদের গানেও আছে ‘শেষে চাতরে হাঁড়ি ভাঙলি’।
সুশীলকুমার দে-র বাংলা প্রবাদ বইটিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘ইতরের মরণ কাতরে, ডাইনের মরণ চাতরে’।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালাভাষার অভিধানে চাতর মানে রাস্তার চৌমাথার হাট বা হাটের মধ্যেকার চৌমাথা বলা হয়েছে, এটা সাধারণত জমজমাট জায়গা হয়।
অর্থাৎ চাতর বা চৌরাস্তা বা চৌমাথা ভারতীয় গ্রামীণ ও নগরসভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
চাতর থেকেই এসেছে স্থাননাম চাতরা। চাতরা আছে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে, আছে ও বঙ্গের রংপুরের পীরগঞ্জেও।
হুগলি জেলার অন্তর্গত শ্রীরামপুর মহকুমার মধ্যে মৌজা চাতরা এক সময় একটি অত্যন্ত পুরাতন ও বিখ্যাত গ্রাম ছিল । এখনকার এই জনবসতিপূর্ণ এলাকা একসময় পুরোপুরি জঙ্গলে ভর্তি ছিল এবং এখানে খুব কম লোকের বাস ছিল। প্রায় ৪৭৫বছর আগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমকালীন এবং তাঁর পার্ষদ কাশীশ্বর নামক এক ব্রাহ্মণ সিদ্ধপুরুষ ভাগীরথী নদীর তীরে এই জনপদে বসবাস শুরু করেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুমতিক্রমে তিনি এখানে শ্রীকৃষ্ণ-মূর্তি স্থাপন করেন । তাঁর বংশই চাতরা চৌধুরী পরিবার নামে খ্যাত।

কাশীশ্বর সেকালে গৌড়রাজ সরকারের হুগলি দপ্তর থেকে ১০৮টাকা বার্ষিক হারে চাতরা গ্রামের জমিদারি গ্রহণ করেন ।
মতান্তরে নবাব আলীবর্দী খাঁর হুগলি ফৌজদার কাশীশ্বরকে “দে শিবপুর” নামের গ্রামের অল্প জমি দান করেন। কারণ ঐ ফৌজদার কাশীশ্বরকেকে খুব ভক্তি করতেন।
কাশীশ্বর ১৫৩৩ সালে দোল পূর্ণিমায় চাতরা গ্রামে গৌরাঙ্গ – বিষ্ণুপ্রিয়ার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তা এখন চৌধুরীপাড়া দোলতলা নামে বিখ্যাত। এখানে এখনও কাশীশ্বর পণ্ডিতের জন্মোৎসব পালন করা হয়। দোলতলার পূর্ব নাম ছিল “গৌরাঙ্গপুর” এবং তার আশপাশের এলাকাকে গৌরাঙ্গ দেবের পিতার নাম অনুসারে “বাসুদেবপুর” বলা হতো। চাতরা মূলত একটি বৈষ্ণব তীর্থ।
কাশীশ্বর ১৫৫৬ সালের চৈত্র মাসে বৃন্দাবনে আম বারুনির দিন দেহত্যাগ করেন। কাশীশ্বর ও তাঁর ভাগ্নে রুদ্ররাম অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন এবং তাঁরা রীতিমত সংস্কৃতচর্চা করতেন। সেই কারণে তাঁদের ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বলা হতো। সেই সময়ে চাতরায় রীতিমতো সংস্কৃত বিদ্যানুশীলন হতো।সেই সময়ের কিছু পরে চতু্ষ্পাঠীকেন্দ্রিক সংস্কৃত শিক্ষার প্রসার শুরু হয়। এর কিছু সময় পরে রুদ্ররামপণ্ডিত বল্লভপুরে রাধাবল্লভ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
চাতরায় কাশীশ্বর যখন জঙ্গল কেটে বসবাস শুরু করেন তখন তখন এখানে বাঘের উপদ্রব ছিল। এই সময়ে যে সব স্ত্রীলোকের স্বামী বাঘের শিকারে পরিণত হত, সেইসব বিধবাদের বাঘরাড় বলা হত (স্বর্গীয় উপেন্দ্রনাথ সেনশাস্ত্রী মহাশয়ের লেখা থেকে উদ্ধৃত)।
১৮০০ শতকের প্রথম দিকে দিনেমার সরকার যখন যখন শ্রীরামপুরকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর মাধ্যমে অধিকার করে নেন, তখন থেকেই চাতরার উন্নতি শুরু হয়। চাতরার পাকা রাস্তা ১৮০০ সালে শুরু হলেও ১৯২৯ সালের আগে বৈদ্যুতিক আলো ছিল না।
১৮৭৩ সালে চাতরায় ইংরাজি স্কুলের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৭৯ সালে মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত চাতরা নন্দলাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। স্যার নীলরতন সরকার ছিলেন এই বিদ্যালয়ের একজন বিখ্যাত শিক্ষক ।
চাতরায় বসতি বাড়ার সাথে সাথেই সামগ্রিক উন্নতি শুরু হয়।পাট ও শন চাষে চাতরার খ্যাতি ছিল এবং শনের দড়ি প্রস্তুত করা এবং তার ব্যবসায় এখানে অনেকেই নিযুক্ত ছিলেন। এখানে দড়ির ব্যবসা ব্যাপক উন্নতি লাভ করেছিল বলে এর আর এক নাম ছিল “দড়ে পাড়া”। এরপর কাছি দড়ি এবং ‘লাগালাইন’ দড়ি প্রস্তুত করা শুরু হয়।
জাহাজ ও নৌকা বাঁধার জন্য শক্ত মোটা দড়িকে আলকাতরায় ডুবিয়ে দৃঢ় করা হত বলে একটি ছড়া প্রচলিত ছিল-
“শন, দড়ি , আলকাতরা,/এই তিন নিয়ে চাতরা”।।
চাতরা গ্রাম প্রধানত স্বর্গীয় গোপীকৃষ্ণবাবু, স্বর্গীয় রামনারায়ণ মুখোপাধ্যায় ও চৌধুরীবংশের কিছু সম্পত্তির অংশ নিয়ে গঠিত।
চাতরা অঞ্চলের মূল শিল্প হল সিল্ক প্রিন্টিং। এ তথ্য অনেকেরই জানা নেই যে সিল্ক প্রিন্টিংয়ে শ্রীরামপুর তথা চাতরা ভারতসেরা। বহু বিখ্যাত ডিজাইনার তাঁদের কাজ এখান থেকে করান। বড়বাজারের প্রিয়গোপাল বিষয়ীদেরও এখানে সিল্ক প্রিন্টিংয়ের কারখানা আছে।
এখানে দড়ির ব্যবসা ছাড়া পানের চাষও ছিল, এখনও কিছুকিছু পানের আড়ত আছে। সেই কারণে এখানে বারুজীবীদেরও বসবাস। চাতরা জি টি রোডের ধারে আগে অনেক পানের বরজ ছিল। এখান থেকে পশ্চিম ও উত্তর ভারতে পান চালান হতো, এখনও হয়।
সম্ভবত জিটি রোড ও আড়াআড়ি বৌবাজারের রাস্তার চৌমাথাটিই ছিল চাতর তথা চৌমাথার হাট। চাতরা শীতলাতলা এবং চাতরা দোলতলাতেও আছে চৌমাথা। সেখানেও হাটবাজার বসত, এখনও বসে। এসব থেকেই চাতরা নামের উৎপত্তি হয়। চাতরার অর্থ যে স্থানে চাতর বা চৌমাথার হাট আছে।