আলেকজান্ডার কানিংহাম (Alexander Cunningham) ছিলেন নামকরা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাবিদ। তিনি ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত জেমস প্রিন্সেপের (James Prinsep) শিষ্য। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (East India Company) ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ভারতে আসেন ১৮৩৩-য়ে। তিনি ভেবেছিলেন ‘গৌড়’ নামটি এসেছে ‘গুড়’ থেকে।
এখানে আগে নাকি ইক্ষুচাষ হত প্রচণ্ড পরিমাণে। ঘরে ঘরে তৈরি হত গুড়। তাই এই অঞ্চলের নাম হল গৌড়। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই কানিংহামপন্থী। অন্য কিছু ভাবলেন না ।
আমার মতে গৌড় এসেছে গরুড় (Garuda) থেকে।
মহাভারতের আদিপর্ব অনুযায়ী গরুড়ের মা বিনতা নিজের সতীন সর্পমাতা কদ্রুর কাছে পণে পরাজিত হয়ে কদ্রুর দাসীতে পরিণত হন। গরুড় কদ্রুর কাছে মায়ের দাসত্বমুক্তির জন্য বললে, কদ্রু তাকে বলেন যে, যদি সে স্বর্গ থেকে অমৃত নিয়ে আসতে পারে তাহলে বিনতাকে মুক্ত করে দেবেন। মায়ের মুক্তির জন্যে গরুড় অমৃত আনতে স্বর্গে চলে যায়। স্বর্গের সকল দেবতা চেষ্টা করেও গরুড়কে নিবৃত্ত করতে বিফল হন। দেবরাজ ইন্দ্র নিজের বজ্র প্রয়োগ করলে, তাও ব্যর্থ হয়। এভাবে সকল দেবতাকে পরাস্ত করে গরুড় অমৃত হরণ করে নিয়ে আসেন এবং বিমাতা কদ্রুকে সন্তুষ্ট করে মাকে মুক্ত করেন।
হাজার বছর আগে বঙ্গভূমিতে ছিল সাপের ভয়ানক উপদ্রব। চাঁদ সদাগরের কাহিনী তারই সাক্ষী। গরুড় ছিল বিষ্ণুর বাহন এবং সর্পশত্রু। সাপেদের মেরে ফেলত বলে তখন এ-বঙ্গে গরুড়পুজোর রমরমা। মনসাপুজোর বাড়বাড়ন্তের ফলে এখানে গরুড়পুজোর চল ধীরে ধীরে কমে যায়। গরুড়দেশই অপভ্রংশে গউড়দেশ তথা গৌড়দেশ হয়ে গিয়েছিল। সংক্ষেপে গৌড়।

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার হর্তাকর্তা স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম উনিশ শতকের মাঝামাঝি লিখেছিলেন গৌড়-এর নাম গুড় থেকে এসেছে। সেই যে তিনি লিখলেন, বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা সেই তত্ত্ব শিরোধার্য করে রইলেন। দ্বিতীয় কোনও চিন্তা মাথায় এল না, বলা যায়, তাঁদের অখণ্ড সাহেবপ্রীতি সেই চিন্তা করতেই দিল না। গুড় থেকে এসেছে মানে আখকে আনতে হল সামনে। তারপর এই অঞ্চলে আখচাষের রমরমা দেখে, বাঙালি বমকে গেল, প্রশ্নই তুলল না।
আমি যখন বইয়ে লিখলাম, গুড় থেকে নয়, গরুড় থেকে গউড় হয়ে গৌড় নামের উৎপত্তি, বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা এক চোট হাসলেন। কেউ অট্টহাস্য করলেন, কেউ আড়ালে আবডালে। পাগলের প্রলাপও বলা হল।
তবে আমার মনে স্থির বিশ্বাস ছিল, সর্পঅধ্যুষিত স্থানে বিষ্ণুভক্তদের জায়গায় গরুড়ের প্রাসঙ্গিকতা থাকবেই। কারণ গরুড় বিষ্ণুর ভক্ত ও সাপেদের চিরশত্রু। গরুড়মূর্তি দৃশ্যমান প্রত্যেক বিষ্ণুমন্দিরের দ্বারে। কারণ গরুড় ভগবান বিষ্ণুর বাহন। বস্তুতপক্ষে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে মল্লরাজাদের স্থাপিত বিষ্ণুমন্দিরের দ্বারেও গরুড়মূর্তি দেখেছি। স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম নিজে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালিয়ে মালদহ জেলার গৌড়-পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদে (পরিবর্তিত হিন্দুমন্দির?) পদ্মফুল, সূর্য ইত্যাদির মোটিফ দেখেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন, কিন্তু টেরাকোটার কাজে গরুড়মূর্তিগুলির অর্থই বোঝেননি, পুরাণসম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণা না থাকায়।
বুঝলে হয়তো, গরুড় থেকে গউড় হয়ে গৌড় আসার কথা তাঁর মাথাতেও আসত।
যাই হোক, গরুড় থেকে গউড় হয়ে গৌড় আসার কথা লিখলেই তো হল না, পাথুরে প্রমাণ কোথায়? স্থাননামে গরুড় কোথায়? পাণিনির লেখায় গৌড়পুর পাওয়া গেছে। তাই স্থাননামটি গরুড়পুর হলেও চলবে। আমাদের সুজলা সুফলা প্রদেশে হাজার হাজার হরিপুর, বিষ্ণুপুর থাকলেও গরুড়পুরের সন্ধান পাইনি। সম্প্রতি একজনের ব্লগে বীরভূমের কোপাই নদীর তীরবর্তী ‘অক্ষত’ গরুড়পুরের সন্ধান পাই। তার মানে গরুড়পুর নামেও বেশকিছু জনবসতি ছিল এককালে। গরুড়পুর থেকে গৌড়পুর হয়ে সংক্ষেপে গৌড় আসতেই পারে। এবার অন্তত হাসাহাসিটা বন্ধ হোক। আর হ্যাঁ, পরিশেষে জানাই, ‘বৈদ্যক-বৃত্তান্ত’ নামে এক প্রাচীন বইয়ে গরুড়নগরেরও উল্লেখ আছে। গরুড়পুজোর রেওয়াজ বেশি থাকায় বঙ্গের উত্তরপশ্চিম অংশকে গৌড়বঙ্গও বলা হত। মালদাজেলার আদিনা মসজিদ (Adina Masjid) আসলে ছিল হিন্দুমন্দির। পলেস্তারা খসার পর দেখা যাচ্ছে তার গায়ে গরুড়ের শতশত মূর্তি খোদাই করা আছে। গৌড়-পাণ্ডুয়ার এই আদিনা মসজিদই (রূপান্তরিত হিন্দুমন্দির) সাক্ষ্য দিচ্ছে গরুড় থেকে এসেছিল গৌড় শব্দটি।
ড. সত্যনারায়ণ দাশ তাঁর বাংলায় দ্রাবিড় শব্দ বইটিতে লিখেছেন, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে আছে আর্যরা বঙ্গদেশীয়দের পাখি বলে বিদ্রুপ করত। কল্যাণ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত বাংলার লোকসংস্কৃতি বইয়ে লেখা হয়েছে, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে বর্ণিত পক্ষীজাতীয় বঙ্গ ও মগধের অধিবাসীরা আসলে কোনও পক্ষী টোটেমের উপাসক ছিল।

বৈদিক সাহিত্যে বর্ণিত পক্ষী টোটেমগুলির মধ্যে প্রধান ছিল গরুড় ও হংস। পরে ময়ূর ও পেঁচাও এসেছে পৌরাণিক সাহিত্যে। আসলে বঙ্গ ও মগধের ভূমিপুত্ররা গরুড়ের উপাসক ছিল।
সারা বাংলায় প্রচুরসংখ্যক গরুড়স্তম্ভের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিষ্ণুমন্দিরগুলির দরজার পাশে হাঁটু গেড়ে বসা গরুড়মূর্তি দেখা যায়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পাথরপ্রতিমায় টেরাকোটার কাজকরা গরুড়মন্দিরের ছবি দেখেছি। দক্ষিণ ভারতে গরুড়ের মন্দির আছে কর্ণাটক, কেরালা ও তেলেঙ্গনায়। হায়দ্রাবাদের সালার জং মিউজিয়ামে গরুড়ের প্রস্তরমূর্তি রক্ষিত আছে। গৌড়া বলে দক্ষিণী জাতি গরুড়ের উপাসক বলে একটি মত আছে। পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরে প্রবেশের কাছে গরুড়মন্দির সকলেরই নজরে পড়বে। শ্রীচৈতন্যদেব নিজেও গরুড় ভক্ত ছিলেন। শিষ্য মুরারি গুপ্তর বাসভবনে তিনি মুরারিকে গরুড় সাজিয়ে তাঁর উপরে বিষ্ণুরূপে আরোহন করেছিলেন।
তাই গরুড় থেকে গৌড় আসার তত্ত্ব কোনও অলীক কল্পনা নয়।
খুব সুন্দর আলোচনা
অনেক ধন্যবাদ। অনুপ্রাণিত হলাম।