কন্নড় শব্দ ‘হণ্ডে’ থেকে হাঁড়ি শব্দটি এসেছে।কেউ বলেন ওড়িয়া শব্দ হাণ্ডি, সেখান থেকে বাংলায় হাণ্ডি ও হাঁড়ি। অনেক অভিধান হাঁড়ি শব্দটিকে সংস্কৃত হণ্ডী থেকে জাত বলে দাবি করলেও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখা অভিধান ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ সে দাবি করেননি। হিন্দি, ওড়িয়া, মারাঠি তো বটেই সিন্ধ্রি ভাষা থেকেও হাঁড়ি আসতে পারে বলে লিখেছেন।
তবে চমকে উঠতে হয় যখন দেখি ড. সত্যনারায়ণ দাশ তাঁর ‘বাংলায় দ্রাবিড় শব্দ’ বইয়ে হাঁড়ি শব্দটিকে কন্নড় ‘হণ্ডে’ শব্দ থেকে জাত বলে জানিয়েছেন।
আর্যদের ভারতে প্রবেশের অনেক আগে ভারতে আসে অস্ট্রিক জাতির লোকজন। তারপর দ্রাবিড়রা আসে ভারতে।দক্ষিণ ভারতে ঘাঁটি গাড়লেও তারা উত্তর ভারত পর্যন্ত তাদের প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য কর্ণাটক থেকে হণ্ডে/হাণ্ডি শব্দটি সিন্ধুনদের তীর পর্যন্ত বিস্তারলাভ করেছিল দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মুখেমুখে।
পারস্যদেশের বিরিয়ানির কথা বিশ্ববিশ্রুত। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারতেও বিরিয়ানির খ্যাতি শত শত বছর ধরে। বিরিয়ানি তৈরিতে বিরাট বিরাট হাঁড়ির প্রয়োজন হয়। সৈনিকদের সস্তার খাবার হিসেবে বিরিয়ানি প্রসিদ্ধ হাজার হাজার বছর ধরে। চাল, ঘি, মাংস, আলু, ডিম ও মশলাপাতি দিয়ে তৈরি এই সুখাদ্যটির লোভে রসনায় জল আসে অনেকেরই।
বিরিয়ানির উদ্ভাবনের একটি সুখপ্রদ গল্প আছে। এটি হল, —
“লাল কেল্লা নির্মাণের সময়, দক্ষিণ ও উত্তর ভারত, অন্যান্য দেশ — পারস্য, আরব, আফগানিস্তান, ইরাক থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আনা হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস। এই সব মানুষের জন্য প্রচুর পরিমাণে খাবার রান্না করা ছিল কঠিন কাজ। এছাড়াও,খাদ্যে শর্করা, প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ প্রয়োজনীয় মাত্রায় থাকা দরকার। এটি পরিশ্রমসাধ্য কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করবে। এছাড়াও এটি সুস্বাদু এবং সহজপদ্ধতির রান্না হওয়া উচিত। এটি তাদের খাদ্যাভ্যাস নিরপেক্ষে সমস্ত শ্রমিকদের কাছে গ্রহণীয় হওয়া উচিত।
সমস্ত ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের জন্য দিনে দুবার হাজার হাজার ‘রোটি’, ‘সাবজি’ এবং ভাত তৈরি করা ছিল একটি ক্লান্তিকর কাজ।
একদিন মুঘল ” খানসামা (প্রধান শেফ)” ছুটিতে ছিলেন। তাই তিনি তার নতুন সহকারীর উপর দায়িত্ব ছেড়ে দেন, যিনি আবার তার ‘ভাই’ও ছিলেন। খানসামা তাকে ভাত, সাবজি, রুটি বানানোর নির্দেশ দেন। সহকারী সমস্ত নির্দেশ শুনেছিলেন, কিন্তু অর্ধেক অংশ ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি শুধুমাত্র কিছু উপাদান এবং রান্না করার পদ্ধতির কিছু অংশ মনে রেখেছিলেন। তিনি তরুণ, অনভিজ্ঞ এবং খুব অলস ছিলেন। সকলেই জানেন যে আলস্য থেকেই সৃষ্টি হয় অনেককিছু।
তিনি একটি মাটির পাত্রে মাংস এবং ভাত রান্না করেছিলেন, ঘি, জায়ফল, গোলমরিচ, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা, ধনেপাতা, পুদিনা পাতা, আদা, পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচা মরিচের মতো, যা কিছ তাঁর মনে ছিল, তার সমস্ত উপাদান যোগ করে। এবং রসুন সহযোগে রান্নাটি এমনভাবে সম্পন্ন করলেন, যে খেয়ে সমস্ত শ্রমিকরা ধন্য ধন্য করতে লাগল।সৌভাগ্যবশত সবাই এটা পছন্দ করেছিলেন। এটি সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর হয়েছিল। ‘শ্রমিকের খাবার’, ‘বিরিয়ানি’ খ্যাতি মোগল সম্রাটের কাছে গিয়েছিল। তাঁর এই নতুন রেসিপি খেতে ইচ্ছে হলো। খানসামা এতে ‘কেশর (জাফরান)’ যোগ করে ‘রয়েল বিরিয়ানি’ বানিয়ে দিলেন । এবং এখনও পর্যন্ত বিরিয়ানির সুবাস সারা বিশ্বে যুগ যুগ ধরে ভ্রমণ করছে।”
দো-আঁশলা ভাষায় বর্ণিত এই গল্পটি পড়ে মনে হল, একই রকম গল্প পারস্যদেশেও অন্য ফর্মে চলে। বড় হাঁড়িতে করে চাল, মাংস, ডিম, ঘি, মশলাপাতি একসঙ্গে ধিকিধিকি আঁচে সেদ্ধ করে তৈরি যে খাবারটি সেনাদের অসময়ের ক্ষুন্নিবৃত্তি ছিল, তার প্রচার ও প্রসার যে সর্বযুগেই ঘটবে তাতে আর সন্দেহ কি!
মোগলসম্রাট হুমায়ুন একবার শের শাহের হাতে পরাজিত হয়ে পারস্যে পালিয়ে যান। তিনি সেখান থেকে আবার ফিরে আসবেন কিছু পারসি ও আর্মেনীয় লোককে সঙ্গে নিয়ে। সঙ্গে খানসামাও আনলেন, যারা বিরিয়ানি ও অন্যান্য মোগলাই খানা রান্নায় পটু। রৌপ্যনির্মিত দশাসই হাঁড়িতে লালকাপড়ে মুখ ঢাকা অবস্থায় বিরিয়ানি তৈরি হত। মৃৎপাত্রে রান্না বিরিয়ানির জন্যে সাদা কাপড়।
তবে এসব বিরিয়ানি খেয়ে তো ব্যুৎপত্তিওয়ালাদের পেট ভরবে না। তাদের দরকার রান্নার হাঁড়িটি নিয়ে। হাণ্ডি বা হণ্ডে, যাই বলা হোক না কেন, দক্ষিণের দ্রাবিড় ভাষা থেকে রান্নার এই পাত্রটির কথা সিন্ধু উপত্যকাতেও যে গিয়ে পৌঁছেছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আর্যরা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতকে যখন ভারতে প্রবেশ করেন,তখন বড় বড় মৃৎপাত্র দর্শন করেছিলেন। হন্ডি, হন্ডে বা হান্ডি থেকে পারস্যলিপিতে সমোচ্চারিত শব্দ হিন্দু বা হিদুস চলে আসতেই পারে।
তাহলে শেষ বিচারে কি এটাই আসে না যে, অনার্য দ্রাবিড় জাতির রান্নার পাত্র ‘হণ্ডে’ উত্তরভারত অতিক্রম করে পারস্যদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল, ছড়িয়েছিল সিন্ধু উপত্যকাতেও।
হণ্ডে কন্নড় শব্দ। কুন্ডা আবার তেলুগু শব্দ। মানে একই। হাঁড়িকুড়ি কি তাহলে আদতে ছিল হণ্ডেকুণ্ডা? দ্রাবিড় শব্দ হণ্ডে থেকেই হিন্দু এসেছে কিনা সেটা ভাবতেই হবে।
বাঙালি হিন্দু যে আসলে দ্রাবিড় সভ্যতাসংস্কৃতি বহন করছে, তা কাউকে বলে দিতে হয় না। আদতে আমরা দ্রাবিড়-অস্ট্রিক-আর্য সভ্যতার অঙ্গ।
ড.সত্যনারায়ণ দাশ ‘বাংলায় দ্রাবিড় শব্দ’ বইটির ভূমিকায় একজায়গায় লিখেছেন, ‘দ্রাবিড় শব্দগুলি বাঙালি জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে এবং সর্ব স্তরে ব্যাপ্ত। অনেক শব্দের আর্য প্রতিশব্দ নেই। এই শব্দগুলি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ-সম্পর্কিত, শারীরিক বিকৃতি-বাচক কিংবা মানবপ্রকৃতি সংক্রান্ত। অনেক রোগব্যাধির নাম দ্রাবিড় ভাষায়। বাস্তুনির্মাণ-সংক্রান্ত, বাস্তুউপকরণ সম্বন্ধিত এবং বৃত্তিবিষয়ক বহু শব্দ দ্রাবিড়মূল। সামাজিক ও ব্যক্তিক সম্বন্ধ প্রকাশক কিছু শব্দ দ্রাবিড় ভাষার। কিছুকিছু রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান খাদ্যবস্তু দ্রাবিড় নাম বহন করে চলেছে।’
আরও আছে, উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটিকে কণ্টকিত করতে চাই না। আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ‘Origin and Development of Bengali Literature’ গ্রন্থে এক জায়গায় যা লিখেছেন, তর্জমায় তা দাঁড়াবে, ‘বাংলায় যে সমস্ত দেশী শব্দ প্রচলিত, যাদের ইন্দো য়ুরোপীয় জ্ঞাতিশব্দ নেই তাদের অনেকগুলি দ্রাবিড়ভাষার হতে পারে।’
জানলে অবাক হতে হয়, সংস্কৃতেও অনেক শব্দ দ্রাবিড়ভাষা থেকে গৃহীত হয়েছিল। গুণ্ডার্ট, কল্ডওয়েল ও কিটেল সাহেব এই শব্দগুলি ধরতে পেরেছিলেন গবেষণায়। মোটামুটিভাবে সংস্কৃত ভাষায় দ্রাবিড় থেকে উনিশ-কুড়িটি শব্দ নেওয়া হয়েছিল, বলে তাঁদের অনুমান। এই শব্দগুলিকে ‘সংগৃহীত’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তীকালে অধ্যাপক টি বারো আরও কিছু শব্দের সন্ধান দেন।
বাংলায় বহু শব্দ দ্রাবিড় ভাষা (তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, টুলু ইত্যাদি) থেকে আসার কারণ হল, দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী সরাসরি বাংলায় এসে অস্ট্রিক ভূমিপুত্রদের সঙ্গে মিশে যায়। তার অনেক কাল পরে আর্যরা আসে বঙ্গে।
বিশেষজ্ঞদের মতে বঙ্গদেশ ছিল আর্যদের পক্ষে নিষিদ্ধ অঞ্চল। ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ, বগধ, চেরপাদদের ‘পাখি’ বলে বিদ্রুপ করা হয়েছে। অনুমিত হয়, গুপ্তযুগের আগে পর্যন্ত বাংলা আর্যসংস্কৃতির বাইরেই ছিল। বাংলায় আসার পর এখানকার পুরনো বাসিন্দারা (অস্ট্রিক-দ্রাবিড় মিলনসম্ভূত সংকরজাতি) উত্তরভারতীয় আর্যসংস্কৃতি ধীরেধীরে গ্রহণ করে।তার আগেই অবশ্য উত্তরভারতে বাসকারী দ্রাবিড়দের সঙ্গে তাদের রক্তের মিশ্রণ হয়ে গেছে অংশত। দীর্ঘদিন বাঙালি হিন্দু ছিল দ্বিভাষিক। পরে তারা আর্যভাষা পরোপুরি গ্রহণ করে। এই জন্যে পূর্বমাগধীতেও পাওয়া যায় প্রচুর দ্রাবিড় উপাদান।
ড. সত্যনারায়ণ দাশ প্রায় দু’হাজার বাংলা শব্দের খোঁজ দিয়েছেন, যার মূলে দক্ষিণী তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম শব্দ। কন্নড় ‘হণ্ডে’ শব্দটি সিন্ধু উপত্যকায় পর্যন্ত পৌঁছেছিল দ্রাবিড়দের কল্যাণে। সেই শব্দ থেকেই আর্যরা হিন্দু শব্দের সন্ধান পেল কিনা, ভাবা যেতেই পারে।
প্রসঙ্গত, কর্ণাটকের একটি জায়গার নাম ‘হিন্দুপুর’। খুব প্রাচীন ও সমৃদ্ধিশালী জায়গা, তবে হিন্দু-মুসলমান সকলেরই বাস আছে। সেখানে কিন্তু হাঁড়িকুড়ির বাজার বসে। হণ্ডেপুরই কী তাহলে অপভ্রংশে হিন্দুপুর হয়ে গিয়েছিল?