২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে তিনি ধ্যানে বসেছিলেন কি না, আমাদের জানা নেই। ২০১৯ সালের নির্বাচনী প্রচার শেষ করে তিনি চলে গিয়েছিলেন হিমালয়ের গুহায়। বসেছিলেন ধ্যানে। নিজে দেবতার অংশ হয়ে দেবতার ধ্যান করার রীতি আছে আমাদের পুরাণে। দেবাদিদেব মহাদেবকেও ধ্যান করতে দেখা যায়। এবার, ২০২৪-এর শেষ নির্বাচনী প্রচারের পরে তিনি চলে গেলেন কন্যাকুমারী। বিবেকানন্দ শিলায় ধ্যান করবেন ৪৫ ঘণ্টা।
কিন্তু এবারের ধ্যানের মধ্যে বিঘ্ন ঘটবেই। চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসেছেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু মনের চোখে বারবার ভেসে উঠছে টুকরা টুকরা গ্যাঙের ছবি। কখনও রাহুল গান্ধীর ছবি, কখনও কেজরিওয়ালের ছবি, কখনও উদ্ধব ঠাকরের ছবি, কখনও মমতা ব্যানার্জীর ছবি, কখনও তেজস্বী যাদবের ছবি, কখনও অখিলেশ যাদবের ছবি। এঁরা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। কিন্তু আর একটি বছর তিরিশের ছোকরার ছবি ভাসে কেন?
ছোকরার নাম ধ্রুব রাঠী। হরিয়ানার ছেলে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে থেকে গেছে জার্মানিতে। বিয়ে করেছে সেখানকার মেয়েকে। নাগরিকত্ব নিয়েছে। তাই দাঁত কড়মড় করলেও কিছু করার নেই। কিন্তু সে ছোকরার ছবি ভাসে কেন? সে তো রাজনীতির জগতের লোক নয়। তাহলে?
তখনই নরেন্দ্র দামোদর মোদির চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে ইউটিউবের সারি। তাঁকে নিয়ে ইউটিউব করে যাচ্ছে ছোকরা। একের পর এক : কে সত্যি বলছে (who is speaking the truth), ভারত কি বিশ্বগুরু (Is India the Biswaguru), নরেন্দ্র মোদির আসল সত্য (Reality of Narendra Modi), মোদির তানাশাহি (Modi the Dictator), মিথ্যাটা বলছে কে (Who is lying), রামমন্দির : অজানা সত্য (Ram Mandir : the untold truth), টাকা দিয়েছেন মোদি (Paid by Modi), ডংকার বাস্তবতা (Reality of Danka) এমনি আরও অজস্র। সব ইউটিউবের আসল কথাটা হল : রাজা তোর কাপড় কোথায়? ধ্যানমগ্ন মোদির রাগে রি রি করে ওঠে শরীর। এলেমদার ছোকরাটি পেছনে ফেলে দিয়েছে তাঁর সাধের আইটি সেলকে। এমন কি তাঁকেও টপকে যাবে এবার। মোদির ইউটিউবের গ্রাহক ২ কোটি ৩০ লক্ষ। এর মধ্যেই ধ্রুব রাঠির ইউটিউবের গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
ধ্রুব রাঠীর ছবিটা ভাসতেই নরেন্দ্র মোদি আপশোশ করতে করতে ভাবেন, ধরে রাখা গেল না দামাল ছেলেটাকে! ২০১৪ সালেও সে ছিল তাঁর ভক্ত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিলেন মোদিরা। তখনকার শাসক কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল ব্যাপক। কিন্তু এক বছরের মধ্যে মোহভঙ্গ হল রাঠীর। ঘটনাটা কি? আম আদমি পার্টি দুর্নীতিবিরোধী হেল্পলাইন চালু করল। সে চেষ্টাকে সমর্থন করার বদলে মোদিবাবুরা তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা শুরু করলেন। তাহলে তো ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। চোখ খুলে গেল রাঠীর।
রাঠী দেখতে লাগল জুমলার পর জুমলার পর জুমলা চলছে। আর তাতেই মজে যাচ্ছে অন্ধভক্তের দল। মোদিরা মানুষের মগজ ধোলাইএর কৌশলটা জানে ভালো। আছে তাদের আইটি সেল। কালোকে সাদা করার জেদ তাদের। নকলকে আসল। ২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাঠীর প্রথম রাজনৈতিক ভিডিয়ো প্রকাশ পেল। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাবার দরকার হয় নি। একে একে ৬৫০টি ভিডিয়ো বাজারে ছাড়ে রাঠী। না, এগুলো শুধু ভঙ্গি দিয়ে চোখ ভোলায় না। নিখুঁত তথ্যের সঙ্গে পরিবেশনার কৌশল মিলেমিশে একাকার। content আর form-এর হরগৌরী মিলন। আর ভাষার ব্যাপারে সদা সচেতন রাঠী। সহজ সরল হিন্দি। সাধারণ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষা বোঝে। রাঠীর কাছ থেকে রাজনৈতিক নেতাদের ভাষার ব্যবহার ও তার প্রয়োগের শিক্ষা নেওয়া উচিত। যে হোটাসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিজেপির সম্পদ, মগজ ধোলাইএর হাতিয়ার, তাকে টেক্কা দিল ধ্রুব রাঠীর ইউটিউব। না, তাকে দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়াও সম্ভব নয়। কারণ তার ভিডিয়োতে জাতীবতাবাদী সুরটা স্পষ্ট। আগে একা একা ভিডিয়ো করত ধ্রুব। এখন তার বেশ বড় একটা টিম আছে। তাতে আছে গবেষক, স্ক্রিপ্ট রাইটার, এডিটর ইত্যাদি।
ধ্রুবর কথা ভাবতে ভাবতে চমকে উঠলেন নরেন্দ্র মোদি।
মনের চোখে দেখতে পেলেন আধখানা বাঁকা হাসি হেসে ধ্রুব বলছে : এই তো বলার সময় — The time to speak up now.
এবার এদিক-ওদিক করে তিনি যদি জিতেও যান, তবু বুক ফুলিয়ে যা খুশি তাই করার গরিষ্ঠতা থাকবে না বিজেপির। জনমত তৈরি হচ্ছে। দাঁত কামড়ে লেগে আছে ধ্রুবরা। রাজনৈতিক দলের সদস্য নয় বলে তাকে সহজে কড়কে দেওয়া যাবে না।