এবারে এভারেস্ট! অনেকের স্মরণে আছে বেজিং অলিম্পিক এর সময় চীন ঘোষণা করে যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট এর বেস ক্যাম্প যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত—সেখানে তারা একটি রাস্তা তৈরি করবে। এই রাস্তা তিব্বতের সীমা ছুঁয়ে যাবে। এই রাস্তা ধরেই অলিম্পিক এর মহা ধামাকা এভারেস্টের চুড়া ছোবে! তখন অনেকেই এই মহা-পরিকল্পনায় শিউড়ে উঠেছিলেন—শেষে এভারেস্ট! পরিবেশবিদদের কথা ছেড়ে দিলেও, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এই মহা-পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তায় ছিল। এই চিন্তার কারণ ছিল ভারতের ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা। কারন চীন সরকারের এই রাস্তা নির্মানের পরিকল্পনার কথা নাকি অলিম্পিক কমিটির হোমরাচোমরারাও জানতেন না।
এভারেস্টের উচ্চতা কত? সেই কবে এক বঙ্গসন্তান, রাধানাথ শিকদার ছটি বিভিন্ন অবস্থান থেকে নেওয়া রিডিং বিশ্লেষণ করে ১৮৫২ সালে নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করেন হিমালয় রেঞ্জের ১৫ নম্বর সর্বোচ্চ শৃঙ্গটির উচ্চতা ২৯,০০০ ফুট (২৯,০০২ ফুট)। এবং এটাই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। তখন এভারেস্ট ১৫ নম্বর শৃঙ্গ নামেই পরিচিত ছিল।
এবারে এভারেস্ট। আবার। ভারতের সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই চীন ও নেপাল সম্প্রতি ঘোষণা করেছে—৮৬ সেণ্টিমিটার উচ্চতা বেড়েছে এভারেস্টের। হিমালয় পর্বতশ্রেণী এখনও গঠন প্রক্রিয়ায় আছে, তাই এভারেস্ট এর উচ্চতা বাড়তে পারে এ ব্যাপারে বিতর্ক নেই। কিন্তু যেভাবে ভারতকে অন্ধকারে রেখে চীন ও নেপাল এই ঘোষণা করেছে তা ভারতের উদ্বেগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্মানের প্রশ্নকেও সামনে এনে ফেলেছে। সে কারনে ভারত সরকার এখনও এভারেস্টের উচ্চতা বৃদ্ধির ঘোষণায় সরকারি স্বীকৃতি দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ এ কারনেই ঘোষণা করেছে যে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ৮৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে সরকারিভাবে ঘোষিত হলেই তা ছাত্রছাত্রীদের জানোনো হবে।
১৯৫৪ সালে সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এভারেস্টের উচ্চতা সম্পর্কে এক সার্ভে করে অভিমত দেয় যে বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গের উচ্চতা ৮.৮৪৮ মিটার বা ২৯,০২৮ ফুট। নেপাল এই পরিমাপকে মান্যতা দেয়। তবে ২০১৫-র ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নেপাল বলেছিল এভারেস্টের উচ্চতা আরো খানিকটা বেড়েছে। অন্যদিকে ১৯৭৫-এ চীন এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাপ করে বলেছিল এর উচ্চতা ৮.৮৪৪ মিটার ১৩ সেন্টিমিটার। ২০০৫ সালে চীন দাবি করে এভারেস্টের উচ্চতা ৮.৮৪৪ মিটার ৪৩ সেন্টিমিটার। এই উচ্চতা মাপার মাপকাঠি কি? সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাকে শূন্য ধরে এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাপ করা হয়েছে। নেপালের জরিপকারী দল বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠকে শূন্য ধরে এবং চীনের জরিপকারীরা পীতসাগরের পৃষ্ঠকে শূন্য ধরে এই পরিমাপ করে।
এতদিন পর্যন্ত হিমালয়ের বিভিন্ন পর্বতশৃঙ্গ এবং সেসবের উচ্চতা নিয়ে অন্তত তেমন কোন মতদ্বৈধতা ছিলনা। নেপাল অবশ্য কিছুদিন আগে পর্যন্ত অভিযোগ করতো চীন এভারেস্টের উচ্চতা সম্পর্কে তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নেপালের উপর চাপ দিচ্ছে! এখন হাওয়া ঘুরেছে। নেপালের মত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও ভারতকে লেজে খেলানোর কথা ভাবে। কারণ বিগ ব্রাদার চীন এখন তার দোসর। তাই চীন ও নেপাল ভারতের তোয়াক্কা না করেই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রগুলিতে এভারেস্ট এর উচ্চতা সম্পর্কে নিজেদের মতকেই প্রতিষ্ঠা দিতে চাইছে। অথচ ভারতের উত্তর ও উত্তর পূর্বের এক বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে রয়েছে হিমালয় পর্বতশ্রেণী। ভারতের নিরাপত্তা ও অখন্ডতা বিঘ্নিত হওয়া ছাড়াও এভারেস্ট সম্পর্কে মতামত দেওয়ার নৈতিক ও বাস্তব অধিকার ভারতের আছে, সেই সত্য অস্বীকার করতে চাইছে চীন। তাই চাপ বাড়ছে এভারেস্টের উপর, হিমালয়ের দেবশৃঙ্গ হয়ে উঠছে ভারত-চীন দ্বন্দ্বের এক নতুন ফ্রন্ট।