পূর্ব ভারতের ত্রিপুরার পর তৃণমূলের নজর দেশের পশ্চিম-উপকূলের রাজ্য গোয়ার দিকে। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদাজল খেয়ে ময়দানে নেমেছেন ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনে মোদীকে দিল্লির গদি থেকে তারাতে। বাংলা জয়ের পর থেকেই তিনি ঝাঁপিয়েছেন সেই লক্ষ্যে। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তৃণমূলের জাল বিস্তার শুরু হয়েছে। গোয়ায় সংগঠন বিস্তারের জন্যে রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং হাওড়ার সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছেন। দু-জনে গোয়া থেকে ফিরে আসার পরেই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগদান করলেন গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লুইজিনহো ফালেইরো। তাঁর সঙ্গে আরও পাঁচজন কংগ্রেস নেতা-সহ ১০ জন এদিন তৃণমূলে যোগদান করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২৪-এর ভোটের আগে বিরোধী ঐক্য তৈরির জন্য তৎপর। যে কারণে বাংলা জয়ের পরেই দিল্লিতে ছুটে গিয়ে একাধিক অবিজেপি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। মমতার সফরের পরেই মহাপতন ঘটে আসাম কংগ্রেসে। তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন আসামের দাপুটে নেত্রী সুস্মিতা দেব। তাঁর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান উত্তর-পূর্বে কংগ্রেসের সংগঠনে বড় ধাক্কা। সুস্মিতা দেব তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁকেই ত্রিপুরার দায়িত্ব দিয়েছে দল। উত্তর-পূর্বের রাজনীতিতে সুস্মিতা দেবের দক্ষতার উপর নির্ভর করেই ত্রিপুরায় সংগঠন সাজাতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস। আরও একাধিক কংগ্রেস নেতা তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এদিকে গোয়ার দু-বারের মুখ্যমন্ত্রী তথা সাতবারের কংগ্রেস বিধায়ককে যোগদান করিয়ে গোয়ায় নতুন ইনিংসের সূচনা করে দিল তৃণমূল। গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লুইজিনহো ফালেইরোর যোগদানে একদিকে তৃণমূল গোয়ায় নতুন করে পথ চলা শুরু করল, অন্যদিকে সেখানে বিরাট ধাক্কা খেল কংগ্রেস। কংগ্রেস যে গোয়ায় অস্তিত্বের সংকটে পড়ল তা বলাই যায়। যদিও তা জানা যাবে ভবিষ্যতে, তবে একথা ঠিক যে, গোয়ায় বিজেপির ধাক্কায় কংগ্রেস শেষ হতে বসেছিল। বিধানসভা নির্বাচনে গোয়ায় সর্ববৃহৎ দল হওয়ার পরও বিজেপি কংগ্রেস ভেঙে তছনছ করে ক্ষমতায় বিরাজমান। ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৪০ আসন বিশিষ্ট গোয়ায় কংগ্রেস ১৭ আসনে জিতেছিল। বিজেপি জিতেছিল ১৩ আসনে। এখন সেখানে বিজেপি ক্ষমতায়। কংগ্রেসের হাতে রয়েছে মাত্র ৬ জন বিধায়ক। এই অবস্থায় আরও এক বিধায়ক ইস্তফা দিয়ে যোগ দিলেন তৃণমূলে। বাকিরা গিয়েছেন বিজেপিতে।

রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের মতে, এই মুহূর্তে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সবথেকে নির্ভরযোগ্য মুখ। তাঁর হাত ধরেই কংগ্রেস পরিবারকে একত্রিত করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার হবে— এটাই তাদের মত। লক্ষ্যনীয় বাংলার নির্বাচন জিতেই তৃণমূল অন্য রাজ্যে সংগঠন তৈরি করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই লক্ষ্যে তাদের প্রথম টার্গেট ছিল ত্রিপুরা। ত্রিপুরার পর এবার তারা গোয়ায় পথ চলা শুরু করে। গোয়ায় গিয়ে তৃণমূল নেতারা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তারপরই নাটকীয়ভাবে গোয়ার দুবারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সাতবারের কংগ্রেস বিধায়ক ইস্তফা দেন। গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর তৃণমূলে যোগদানের পাশাপাশি বিখ্যাত কোঙ্কনি সাহিত্যিক; সাহিত্য অকাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত কোঙ্কনি সাহিত্যিক এন শিবদাল যোগ দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসে।
তার মানে গোয়ায় কংগ্রেসের বড় ভাঙন ঘটতে চলেছে। সামনেই গোয়ায় বিধানসভা নির্বাচন তার আগেই কংগ্রেসের একের পর এক ধাক্কা। এদিকে গোয়াতে বিজেপিও খুব ভাল অবস্থায় নেই। সৈকত রাজ্য থেকে কালীঘাটের দলে যোগ দিতে ফেলেইরো ছাড়াও গোয়া কংগ্রেসের দুই প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক যতীশ নায়েক ও বিজয় পাই। এ ছাড়াও দুই প্রাক্তন সম্পাদক মারিও পিন্টো ও আনন্দ নায়েক। প্রসঙ্গত, মে মাসে বাংলায় তৃতীয়বার ক্ষমতা দখলের পর তৃণমূল জানিয়েছিল, এ বার লক্ষ্য হবে দেশের অন্যান্য জেলায় দলের শক্তিবৃদ্ধি। কার্যত এ বার গোয়ার কংগ্রেস সংগঠনে ভাঙন ধরাল তৃণমূল।
প্রসঙ্গত, এর আগে গোয়ায় দু-বার সংগঠন গড়ার প্রয়াস নিয়েছিল তৃণমূল। ২০১২ সালে গোয়া কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উইলফ্রেড ডি’সুজাকে যোগদান করানো হয়েছিল তৃণমূলে। ২০১২ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়াই করেছিলেন তিনি ও তাঁর অনুগামীরা। সে যাত্রায় কোনও আসনেই জামানত বাঁচাতে পারেনি মমতার দল। দ্বিতীয় প্রয়াস ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে। লোকসভা ভোটের আগে তৃণমূলে যোগ দেন কংগ্রেসের আরও এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চার্চিল আলেমাও। সেবার লোকসভা ভোটে দক্ষিণ গোয়া আসন থেকে লড়াই করে জামানত হারিয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী আলেমাও। এই নিয়ে গোয়ায় তৃণমূলের তৃতীয়বার ভোটের ময়দানে অবতীর্ণ হবে। এ বিষয়ে ফেলারিও বলেন, ‘আগের থেকে গোয়ার পরিস্থিতি অনেক পাল্টেছে। তাই আগে যা হয়েছে তা এ বার হবে না। ২০১৭ সালে ক্ষমতা দখলের কাছে পৌঁছে দিলেও কংগ্রেস নেতৃত্ব সরকার করতে পারেনি। এটা শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতা। কিন্তু এ বারের ভোটে তৃণমূল সেখানে সরকার গড়বে।’
একে একে কংগ্রেসের ঘর ভাঙছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। একের পর এক নেতার কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান ঘিরে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। যে বিরোধী ঐক্যের বার্তা নিয়ে একুশের ভোটের পরেই দিল্লিতে গিয়েছিলেন মমতা সেটা কতটা সফল হবে তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ এই বিরোধী ঐক্যের জন্য সোনিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার শরদ পাওয়ারের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু একের পর এক কংগ্রেস নেতার তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান ঘিরে কংগ্রেস কিন্তু যথেষ্ট অসন্তুষ্ট। কাজেই বিরোধী ঐক্যের পরিকল্পনা ফের ঠান্ডা ঘরে চলে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।