অরেল স্টেইন ১৯২৮-এ বেলুচিস্তানের মাকরান উপকূলে সুতকাগেনদরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালান। যদিও এডওয়ার্ড মকলার ১৮৭৭-এ সিন্ধুসভ্যতার এই সাইটটি আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯২৮-এর পরে ১৯৬০-এ আমেরিকার জর্জ এফ ডেলস আরও কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালান। তবে বিস্তারিত খনন সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। অর্থবল ও লোকবল কম ছিল তাঁর। তবে যে কাজের জন্যে তিনি অমর হয়ে থাকবেন, তা হল খননের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লেখেন তিনি। বইটির নাম ‘এক্সপ্লোরেশনস অন দি মাকরান কোস্টস’। এখানে সেই বইটি লেখার পশ্চাৎপট তুলে ধরলাম।
এক্সপ্লোরেশনস অন দি মাকরান কোস্ট, পাকিস্তান : জর্জ ডেলস, কার্ল পি. লিপো
এটি একটি ব্যতিক্রমী বই — সাধারণত যেসব দুই ধরনের কাজ একসঙ্গে কলকে পায় না, তাদেরই এক অনন্য সংমিশ্রণ। একদিকে আছে বালুচিস্তানের মাকরান উপকূল বরাবর একটি ভ্রমণের বিবরণ — সে সময় পাকিস্তান ছিল সদ্য-গঠিত দেশ, আর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগটি সদ্যই ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে উঠছে। অন্যদিকে আছে সুটকাগেনদর-এ করা পরীক্ষামূলক খনন, ট্রেঞ্চ ও অনুসন্ধানের নথি — যা ইরান ও পাকিস্তানের সীমান্তে অবস্থিত, সিন্ধু সভ্যতার পশ্চিমতম পরিচিত প্রাচীন স্থল। বর্ণনায় আরেকটি প্রাচীন সিন্ধু স্থল, সোটকা কোহ-এর আবিষ্কারও আছে। আকারে ও দুর্গপ্রাচীরের অবশেষের দিক থেকে এটি বেলুচিস্তানের ও সিন্ধুর দক্ষিণ-পূর্বে গুজরাটে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আবিষ্কৃত সিন্ধু স্থলগুলোর সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ।

লেখক জর্জ এফ. ডেলস তাঁর স্ত্রী বারবারা ডেলসকে সঙ্গে নিয়ে এই সফর করেছিলেন [চিত্র ২]। গওয়াদার ও পাসনির মতো কম জনবসতিপূর্ণ শহরে তাঁদের যাত্রাপথে বহু আকর্ষণীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ডেলস—হরপ্পা আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চ প্রজেক্ট (HARP)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ড. জোনাথন মার্ক কেনয়ারের পরামর্শদাতা — (একজন প্রাঞ্জল লেখক); তাঁর প্রথম দিকের প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠ-গবেষণা অভিযানে তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। পাকিস্তানি সহকর্মীদের সহায়তায় তাঁর পথ অনেকটাই মসৃণ হয়; তাঁদের মধ্যে ছিলেন তরুণ ও সম্ভাবনাময় ড. রফিক মুঘল। তাঁর বর্ণনা জীবন্ত করে তোলে এক হারিয়ে যাওয়া জগত — প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতির — যখন কয়েকশ পাউন্ডের একটি অনুদানই বড় পার্থক্য গড়ে দিত, সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর যাতায়াত ছিল কঠিন। বইটি পড়তে আনন্দদায়ক—এবং বিনামূল্যে!
ডেলস লেখেন, — “আমার বাজেট ছিল খুবই সীমিত। তাই ‘প্রথম শ্রেণির’ মেট্রোপোল হোটেলের উল্টোদিকে অবস্থিত প্রাচীন সেন্ট্রাল হোটেলে উঠলাম। সেখানেও আমি কেবল সবচেয়ে সস্তা ঘরটিই নিতে পারলাম — যেটি মূল ভবনের পাশে গলির শেষপ্রান্তে আট বাই দশ ফুটের একটি ‘কুঠুরি’। একটি নগ্ন, মাছিতে ভরা বাল্ব ময়লা-দাগে ভরা সাদা-চুনকাম দেয়াল, ছোট খাট ও একটিমাত্র চেয়ারটিকে আলোকিত করত। বৈদ্যুতিক সিলিং ফ্যান মাছি ও মশা উড়িয়ে দিত। ঘরের পাশে ছিল একটি ক্ষুদ্র টয়লেট কক্ষ — সেখানে ছিল সেই ধূর্ত টান-চেইনযুক্ত ব্রিটিশ টয়লেট, যা কেবল তাঁদের পক্ষেই চালানো সম্ভব, যাঁদের বংশধারা অন্তত রানী ভিক্টোরিয়ার সময় পর্যন্ত প্রসারিত। তবু দিনে তিন বেলা খাবারসহ প্রতিদিন মাত্র ৩.৭৮ ডলারের সমমূল্যে একটি ঘর — এ নিয়ে অভিযোগ করার কিছু ছিল না। আমার পকেটে ছিল মাত্র ৩৫ ডলার। সৌভাগ্যবশত, বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের প্রতিশ্রুত ১,০০০ ডলার পরদিন আমেরিকান এক্সপ্রেসে আমার অপেক্ষায় ছিল।”

নবগঠিত একটি দেশের প্রাণবন্ত বর্ণনা আছে — যেমন করাচির শরণার্থী শিবির। বেলুচিস্তান, যেখানে তিনি ও তাঁর দল (যাদের মধ্যে সহলেখক ও মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ কার্ল পি. লিপো এবং মুঘল—পরবর্তীতে খ্যাতনামা পাকিস্তানি প্রত্নতত্ত্ববিদ — অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) কাজ করেন, যেন আরেকটি মহাদেশ। কিছু এলাকা করাচি ও অন্যান্য বন্দর থেকে সাপ্তাহিক জরাজীর্ণ নৌযাত্রা ছাড়া যুক্তই নয়। ওরমারার সক্রিয় কাদা-অগ্ন্যুৎপাত — যেগুলো আজও নিয়মিত হিন্দু তীর্থযাত্রার (মরুতীর্থ হিংলাজ?) স্থান—আজকের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠার বহু আগেই এখানে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে এনওসি পাওয়ার অপেক্ষা, এবং আমলাতান্ত্রিক শিকড়-প্রশাখা যা ৫০০ কিলোমিটার দূরের গওয়াদার বন্দরের মতো স্থানেও পৌঁছে যায় (যেখানে শতাব্দীপ্রাচীন পর্তুগিজ দুর্গ আছে) — এসব পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেয় যে মাঠপর্যায়ের প্রত্নতত্ত্ব আসলে বহু ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে দরকষাকষি, যা স্থানীয় মানুষের গণ্ডির অনেক বাইরে বিস্তৃত। একই সঙ্গে, আজকের গবেষকদের ওপর যে নিরন্তর যোগাযোগের চাপ থাকে, তার অনুপস্থিতিতে ‘আবিষ্কার’-এর কাহিনি পড়তে এক ধরনের সতেজভাব অনুভূত হয়।
বইটি উপকূলীয় ও উপকূল-সংলগ্ন স্থলগুলোর একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ মানচিত্রে দেখায় (যার মধ্যে ছোট শামুকখোলার স্তূপ ও বসতি-ঢিবিও রয়েছে), যা প্রমাণ করে যে আরব সাগরমুখী বেলুচিস্তানের পুরো মাকরান উপকূলই বৃহত্তর সিন্ধু ও সিন্ধু-উত্তর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই উপকূল কোনো বিচ্ছিন্ন পশ্চাদভূমি ছিল না। ডেলস স্থলগুলোর অবস্থানকে প্রাচীন উপকূলরেখা, মোহনা ও নদীমুখের সঙ্গে যুক্ত করে দেখান এবং যুক্তি দেন যে উপকূলরেখার পরিবর্তন ও কঠোর শুষ্ক পরিবেশ হরপ্পা ও পরবর্তী সম্প্রদায়গুলোর মাছ ধরা, শামুক সংগ্রহ ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ডেলসের যাত্রার তাত্ত্বিক অনুসন্ধান ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু সভ্যতার মধ্যে সংযোগ—বিশেষত বাণিজ্যের চিহ্ন — অনুসন্ধান করা।

ডেলস লেখেন, — “১৮৭৭ সালে গওয়াদারের রাজনৈতিক কর্মকর্তা মেজর ই. মকলার সুটকাগেনদর আবিষ্কার করেন। নামটির অর্থ সোটকা কোহ-এর মতোই—পোড়া তেপে/ড্যাম্ব/ঢিবি” (পৃ. ১০২)। ডেলস সুটকাগেনদরকে [চিত্র ৩, ৪] সিন্ধু প্রভাবক্ষেত্রের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একটি দুর্গবেষ্টিত হরপ্পা বসতি হিসেবে নিশ্চিত করেন। তিনি এর পাথরের দুর্গপ্রাচীর, নিম্ননগর, প্রবেশদ্বার [চিত্র ৫ — খেয়াল করুন, প্রবেশমুখে দাঁড়ানো বারবারা ডেলস কতটা ছোট দেখাচ্ছেন] এবং একসময় সামুদ্রিক পথের সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন প্রাচীন উপহ্রদ বা খাড়ির নিকটবর্তী অবস্থান উল্লেখ করেন। প্রায় ১৩০ পৃষ্ঠা ভ্রমণবৃত্তান্তের পর সমপরিমাণ অংশে খননকাজের বিবরণ আছে — মূলত কয়েকটি ট্রেঞ্চ (অনুমতির সীমা অতিক্রম করেই!) ও বিস্তৃত পৃষ্ঠ-সংগ্রহ — সঙ্গে মৃৎপাত্রের উৎকৃষ্ট অঙ্কন, যা সুতকাগেনদরকে সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করে। এই সমৃদ্ধ চিত্রিত অংশটি জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয় যে স্থলটি ইরান হয়ে আরও পশ্চিমে মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।
করাচি ও সুটকাগেনদরের মাঝামাঝি, ডেলস তাঁদের সফরের অন্যতম প্রধান সাফল্যের কথা বলেন — স্থানীয়দের সহায়তায় পাসনির কাছে সোটকা কোহ (সোক্তা কোহ) নামের একটি নতুন হারাপ্পা উপকূলীয় ঘাঁটির সন্ধান:
“আমরা আবার তহসিলদারের বাড়িতে ফিরলাম। তিনি কয়েকজন প্রবীণ স্থানীয় ভদ্রলোককে ডাকলেন। মুঘল তাঁদের বিস্তারিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তাঁদের একজন, মীর আহমদ খান কালমাতি, ছিলেন কালমাতি গোত্রের প্রধান (প্রায় ১,০০০ মানুষ), যারা ওই এলাকার জনসংখ্যায় প্রাধান্য বিস্তার করত। তিনি পাসনির উত্তরে ছয়-সাত মাইলের মধ্যে পাঁচটি স্থানের কথা বললেন। এর একটি—শাদি কউর উপত্যকার ধারে — তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী হরপ্পা যুগের মৃৎপাত্রে আচ্ছাদিত ছিল। স্থলটির একটি স্থানীয় বালুচি নামও ছিল — সোটকা কোহ—যার অর্থ সুটকাগেনদরের মতোই, অর্থাৎ ‘পোড়া তেপে/ড্যাম্ব/ঢিবি’। অন্তত একটি বড় হারাপ্পা স্থল আবিষ্কারের সম্ভাবনায় আমরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাম” (পৃ. ১০২)।

স্থলটি পরিণত হরপ্পা যুগের মৃৎপাত্রে ভরপুর, প্রাকৃতিক গিরিশিরার ওপর যৌগিক প্রাচীর রয়েছে, এবং এটি কোনো বড় নগরকেন্দ্রের চেয়ে উপযোগবাদী বাণিজ্য ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত — এমন প্রমাণ মেলে। এখানে কোনো সিল পাওয়া যায়নি । বিষয়টি আকর্ষণীয় হলেও, উভয় স্থলে ব্যাপক ক্ষয় ও সীমিত খননের কারণে এ তথ্য থেকে অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত টানা কঠিন। সোটকা কোহ-এও সম্ভবত একটি বৃহৎ প্রাচীর ছিল, যা ইঙ্গিত করে যে তৎকালীন ব্যবসায়ীদের মানুষ ও/অথবা জল থেকে সুরক্ষার প্রয়োজন ছিল।
সিন্ধু নগরসমূহ, পারস্য উপসাগর ও ইরানি মালভূমির মধ্যকার অনুমিত উপকূলীয় ও স্থলপথের বরাবর সুটকাগেনদরে ও সোটকা কোহকে স্থাপন করে ডেলস যুক্তি দেন যে মাকরান উপকূল ছিল নৌ ও কারাভান বাণিজ্যের এক কৌশলগত করিডোর। সামগ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি মাকরানকে প্রান্তিক “মরু-সীমান্ত” থেকে পুনর্ব্যাখ্যা করে একটি কাঠামোবদ্ধ সীমান্তাঞ্চল হিসেবে দেখান — যা হরপ্পার অর্থনৈতিক পরিসরকে সম্প্রসারিত করেছিল এবং কচ্ছ-মাকরান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পরবর্তী প্রাগৈতিহাসিক বিকাশকে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে বেলুচিস্তানে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক কাজ হয়েছে, তা এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে — শুধু বাণিজ্যপথ হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব জটিল সংস্কৃতির আবাস হিসেবে, যা সিন্ধু সভ্যতার আগেকার এবং সম্ভবত তার বিকাশে অবদান রেখেছিল, যদিও পরবর্তী সিন্ধু সভ্যতা থেকে স্বতন্ত্র। ডেলস ও লিপোর প্রাণবন্ত বিবরণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও ব্যাখ্যার এই সম্পূর্ণ জগত কীভাবে ধীরে ধীরে গবেষণা ও বিদ্যাচর্চার কাছে উন্মুক্ত হলো — তার এক মানবিক ভূমিকা হিসেবে অসাধারণ।
চিত্রসমূহ
১. বইয়ের প্রচ্ছদ
২. মাকরান উপকূলের কাছে জর্জ ও বারবারা ডেলস, ১৯৬০
৩. সুটকাগেনদোরের নকশা : স্টেইন (১৯৩১) প্রকাশিত মূল নকশা থেকে হালনাগাদ
৪. সুটকাগেনদোর: দুর্গের ভেতর, উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দৃশ্য
৫. সুতকাগেনদর: দুর্গের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের প্রবেশদ্বার; দক্ষিণ প্রাচীর বরাবর পূর্বমুখী দৃশ্য।