হদল এবং নারায়ণপুর, বাঁকুড়া জেলার পাত্রসায়র থানায় পাশাপাশি দুটি গ্রাম। এই গ্রাম দুটি আলাদা মৌজায় হলেও, পাশাপাশি থাকার কারনে তারা যৌথ নামেই পরিচিত। বাঁকুড়া জেলার দামোদরের শাখানদী বোদাই এর দক্ষিণ তীরে হদল এবং নারায়ণপুর গ্রামের অবস্থান। এখানকার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দেবী পালযুগের পঞ্চকুণ্ডাগ্নিমধ্যস্থা পার্বতী । তবে স্থানীয় ভাবে তিনি ব্রহ্মানী দেবী রূপে পুজিতা। এখন থেকে পঞ্চান্ন বছর আগে এখানে ক্ষেত্র সমীক্ষা করতে এসে এই মন্দির দেখে পুরাতত্ত্বিক প্রাবন্ধিক অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন “গ্রামে ঢুকতেই, পথের বাঁ পাশে যে পরিত্যক্ত পঞ্চরত্ন মন্দির ও ব্রহ্মানী দেবীর দালান-মন্দিরটি দেখা যায়, তাদের সঙ্গে অবশ্য মণ্ডল পরিবারের কোন প্রত্যক্ষ যোগ নেই। ব্রহ্মানী দেবীর পুবমুখী আধুনিক দালান-মন্দিরটিও স্থাপত্যের দিক থেকে অকিঞ্চিৎকর কিন্তু এ বিগ্রহের মত বৃহৎ ও সুন্দর হিন্দু পৌরাণিক ভাস্কর্য বাঁকুড়া জেলায় আর আছে কিনা সন্দেহ। অগ্নিভয়হারিণীজ্ঞানে উপাসিতা, কষ্টিপাথরের পাল-ভাস্কর্যটির উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি ও প্রস্থ ২ ফুট ১১ ইঞ্চি। মূর্তিটির পাদপীঠে, দুই পাশে ও পিছনের ত্রি-পত্রাকৃতি খিলানের গায়ে পাঁচটি প্রজ্জলিত অগ্নিকুণ্ডের অনুকৃতি থেকে তাঁকে ‘পঞ্চকুণ্ডাগ্নিমধ্যস্থা’ পার্বতী বলে সনাক্ত করা চলে”।
তিনি আরও লিখেছেন “এ মন্দিরে রক্ষিত ৯ ইঞ্চি উচ্চতার ও ৫ ইঞ্চি প্রস্থের, পাথরের যক্ষ-যক্ষিনী মূর্তিটির কারিগরিও মন্দ নয়। এই মূল্যবান পুরাবস্তুগুলির পূর্ব-ইতিহাস সম্পর্কে স্থানীয় জনশ্রুতির উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। কিংবদন্তী অনুসারে, এ গ্রামের প্রথম বাসিন্দা জনৈক ‘মুড়োকাটা’ চক্রবর্তী। অরণ্যাবৃত এ অঞ্চলে গাছের ‘মুড়ো’ কেটে তিনি বসতি স্থাপন করেন বলে তাঁর এই নাম। স্বপ্নাদেশে তাঁর বিধবা কন্যা অদূরবর্তী দামোদরের এক গভীর দহ থেকে এই মূর্তিটি আবিষ্কার করেন। উদ্ধারকালে দহের গভীর জল নাকি হাঁটুজলে পরিণত হয় ও সাতটি কুমারী মেয়ে অবলীলাক্রমে মূর্তিটি বহন ক’রে আনে। পরে, মন্দিরের জন্য নির্বাচিত স্থানে বিগ্রহটি স্থানান্তরিত করবার বিফল চেষ্টা হলে পুনরায় স্বপ্নাদেশে জানা যায় যে সেখানেই মাটির নীচে দেবীর ভৈরব অনাদিলিঙ্গ নারায়ণেশ্বর শিব শায়িত আছেন। এই শিবের নামেই নারায়ণপুর গ্রামের নাম”।
আমার সাথে ছিলেন লগ্নউষা পত্রিকার প্রবীন সম্পাদক গৌর কারাক মহাশয়। তিনি জানালেন “গ্রামের মানুষের কাছে প্রাচীন কাল থেকেই এই দেবী মূর্তি ব্রহ্মানী দেবী বলে পরিচিত। যদিও দেবী ব্রহ্মানী আদ্যাশক্তির অষ্ট মাতৃকারূপের প্রথম রূপ। শ্রীচন্ডী মতে তিনি ব্রহ্মার শক্তি। তাঁর আকার, ভূষণ ও বাহন শ্রী ব্রহ্মার মতোই। তিনি দেবী কৌশিকী দুর্গা কে যুদ্ধে সাহায্য করেছিলেন আর কমন্ডলু থেকে মন্ত্রপুত জল ছিটিয়ে অসুরদের যুদ্ধ করার ইচ্ছা বিনাশ করেছিলেন। কিন্তু এই মূর্তিটিতে দেবীর হাতে একটি ত্রিশূল রয়েছে। চন্ডীতে বর্ণিত দেবী ব্রহ্মানীর রূপের সাথে এই মূর্তির কোনও মিল নেই। এত অমিল থাকা সত্বেও এই দেবী মূর্তি কেন ব্রহ্মানী মূর্তি বলে পরিচিত হল তা রহস্যবৃত। মূর্তিটির গঠনশৈলী থেকে ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে এটি গুপ্ত পরবর্তী যুগের”।
বাংলার গ্রামে-গঞ্জে চন্ডী, দুর্গা, কালী, মনসা প্রভৃতি দেবীর বিভিন্ন রূপের মন্দির সহজলভ্য হলেও, ব্রহ্মানী দেবীর মন্দির একেবারেই বিরল। জেলা তথা বাংলার এটি অন্যতম পুরাকীর্তি।