পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া সাব ডিভিসনে দাইহাট আজ এক ব্যস্ত মফস্বল শহর। শহর থেকে একটু দুড়েই চান্দুলী গ্রাম। এই গ্রামের জমিদার মিত্র বাড়ীর পুজো প্রায় তিন শতাব্দী পার করলো। নিয়ম, নিষ্ঠা আর জনশ্রুতির মোড়কে আজও এ বাড়ীর পুজো এলাকার অন্যতম সেরা বনেদী বাড়ীর পুজো হিসাবে সীকৃত। এখানে মা দ্বিভুজা রুপে আবির্ভুতা। বাবু রঘুনাথ মিত্রের সময় থেকে মিত্র বাড়ীর আর্থিক এবং সামাজিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধিলাভ করে। খুব সম্ভবত তিনিই আমাদের বাড়ীর এই দুর্গাপূজার সূচনা করেন। জানালেন নিত্যাননদ মিত্র।
জমিদারীর সে জৌলুস আজ আর নেই। পরিবাকর আজ বিভিন্ন শাখাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ সদস্যই ছড়িয়ে পরেছে দেশ ও বিদেশের নানা যায়গাতে। পুজোর সময় ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে পুজামন্ডপ শুনসান। “সত্যি কথা বলতে কি এই বিশাল দেহ-রক্ষা করা এই প্রজন্মের কারোর পক্ষেই হয়তো আর সম্ভব নয়”। বললেন অলক কুমার মিত্র, পরিবারের আর এক বয়স্ক সদস্য।
চান্ডুলী গ্রামের আর এক কৃতি সন্তান প্রমথনাথ মুখার্জি যার কর্ম জীবন শুরু হয়েছিল ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনের একজন অধ্যাপক হিসেবে। তার সহকর্মী ছিলেন শ্রী অরবিন্দ। পরবতী সময়ে তিনি রিপন কলেজে যোগ দেন যেখানে তিনি সহকর্মী হিসাবে পেয়েছিলেন রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী মহাশয়কে। মিত্রদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল সে নিয়ে বিশেষ তথ্য নেই। পারিবারিক সুত্র অনুযায়ী এরা এসেছিলেন বেহালার বড়িষা থেকে। সম্ভবত রঘুনাথ মিত্রের সময় থেকেই ঠাকুর দালানে পুজোর শুরু। এক সময় বারো মাসে তেরো পার্বন লেগেই থাকতো এই মিত্র বাড়ীতে। পরিবারের সদস্য , চাকর, দারোয়ান , কোচোয়ান মিলিয়ে এক জমজমাট পরিবার। এখন সুধু পুজোর কদিন ফিরে পাওয়া যায় সেই পুরনো সুবাস। বর্ধমান রাজার কামানের শব্দে শুরু হতো এ পরিবারের সন্ধি পুজো। পুজোর পাঁচ দিনই চলতো খাওয়া দাওয়া, দরিদ্র নারায়ন সেবা। বাড়ীর সামনে মেলা বসতো। ছিল পালাগান আর যাত্রার আসর। পুজোর।পাত পড়তো, দু তিন হাজার লোকের। আজও এই বাড়ি থেকে কেউ বিনা আতিথেয়তায় বাড়ী ফেরে না। রথের দিন ঠাকুরের কাঠামো প্রতিষ্ঠা থেকে মহালয়ার দিন চক্ষু সম্প্রদান সবটাই বাড়ীতে কুমোর পরিবার পুরুষাক্রমে চালিয়ে আসছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে ভক্তি ও শিল্প সত্তার এক মেলবন্ধন।
বয়সের ভাবে জীর্ন ঠাকুরদালান বার বার সংস্কার হয়েছে , তৈরী হয়েছে পাকা দালান। মাটির মেজে আর খড়ের চালের শিল্প সুষমা আজ অন্তর্হিত। তবে ঠাকুরের বেদীর অবস্থানের একটুও নড়চড় হয়নি। সে নিয়েও এক কাহিনী আছে। বললেন দেবিকা মিত্র। “ সেবার পুজোর আগে আমাদের পারিবারিক মিটিং বসেছে। আলোচনায় অন্যান্য বিষয়ের সাথে মায়ের বেদী একটু সরিয়ে করার কথাও উঠল। অধিকাংশ সদস্য এ বিষয়ে একমত। আলোচনা শেষে সবাই বাইরে এসে দেখেন এক সাদা রঙের ষাড় বেদীর উপর বশে আছে। শিবের বাহনের এই আকস্মিক আগমন কি কোন ইঙ্গিত বহন করছে? বেদি আর সরানো হলো না। “এ রকম নানা জনশ্রুতিতে মোড়া মিত্র বাড়ীর পুজো। মাকে হাতে সোনা বাঁধানো লোহা পরানো হয় বলে পরিবারের মহিলারা হাতে শুধুই লোহা পড়েন। জানালেন গার্র্গী মিত্র। পরিবারের আঠাশ তম প্রজন্ম এখন পুজো পরিচালনা করছে। অন্য সব বাড়ীর মতন এখানে বোধন ষষ্ঠীতে হয় না। হয় মহাপঞ্চমীর দিন। এখানে দেবী শাক্ত মতে পুজিত আর বলিদান সব কদিনই হয়। “বাড়ীর ছেলেরা বলিদান অনুষ্টানে কোন অংশ গ্রহন করেনা। আর প্রতিটি বলিদানের জন্য আলাদা আলাদা খাঁড়া আছে” জানালেন পরিবারেরর আর এক সদস্য। পরিবারের একজন মহিলা সদস্য মুল পুজোয় অংশ গ্রহন করেন। সেই সময়ের জন্য তিনি কেবলমাত্র হবিষ্যান্ন গ্রহন করেন। মিত্র বাড়ীর পুজোয় বিলেতী সবজি বর্জনীয়। এমনকি বেলপাতা গাঁথতেও সুচের ব্যবহার নিষিদ্ধ। অষ্টমীর দিন বাড়ীর সব মহিলারা মায়ের কাছে পান , সুপারী, গোলা সিঁদুর , কলা আর মিষ্টি দিয়ে পুজো দেয়। পুজা শেষে মহিলারা একে অনেকে সিন্দুক পরিয়ে দেন। মিত্র বাড়ীতে দশমীর দিন আলাদা করে সিন্দুর খেলার প্রচলন নেই। সেই রকমই এ বাড়িতে রান্না ভোগ দেওয়া হয় না। সবকিছুই অখন্ড উৎসর্গ করা হয়। বিসর্জনের দিন বাড়ীর সব সদস্য বেলপাতাতে রক্ত চন্দন দিয়ে নাম লিখে মায়ের পায়ে নিবেদন করেন। সেই সঙ্গে হয় অপরাজিতা পুজা। বিসর্জনের সময় সারা গ্রাম ঘুড়ে এসে মা মন্ডপের সামনে দাঁড়ান। সেখানে মিষ্টি ও জল নিবেদনের পর মাকে ব্রাক্ষনী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। সবশেষে শান্তি মন্ত্র ও জল সিঞ্চনের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি।