দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সোনারপুর থানার মালঞ্চ গ্রামের ব্রহ্মচারী বাড়ির শতাব্দী প্রাচীন দুর্গাপুজার কথা অনেক শুনেছি। এই পুজো আরও একটি কারণে বিখ্যাত। এখানে দেবী সপরিবারে নয়, মা এখানে এককভাবে পুজিতা। পরিবারের প্রাচীনতম সদস্য নবতিপর শ্রী সোমনাথ ব্রহ্মচারীর সাক্ষাৎ আর ওনার নিজের মুখে সেই পুরোনো দিনের কথা শুনতে সকাল সকালই পৌঁছে গিয়েছিলেন মালঞ্চে ওনাদের বাড়িতে। পথে মৈত্রদের বাড়ি। সে গল্প আর এক পর্বে হবে। ব্রহ্মচারী বাড়ির একসময়ের বিশাল প্রাঙ্গণ আজ সরিকি অবস্থার চাপে দ্বিধাবিভক্ত। বয়সের ভারে জরাজীর্ণ প্রাচীন পুজামন্ডপ ভেঙে নতুন মন্ডপ তৈরি হয়েছে। মা সেখানে একটু একটু করে মৃম্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে উঠছেন। প্রনাম জানিয়ে পৌঁছে গেলাম সোমনাথ বাবুর কাছে। পায়ের সমস্যার কারণে ওয়াকার নিয়ে চলা ছাড়া আর বিশেষ কোন শারীরিক সমস্যা ওনার নেই।

কুশল প্রশ্ন বিনিময়ের পর তিনি এই বহু প্রাচীন পুজোর সূচনা সম্পর্কে বললেন যে “এই বংশের আদি পুরুষ শ্রদ্ধেয় চানু ব্রহ্মচারী রাজশাহী থেকে এখানে এসে ১৪৮৮ সালে আদিগঙ্গার তীরে বসতি স্থাপন করেন।বানিজ্যে সফলতা তারপর জমিদারী আর তারপর একসময় মায়ের পুজো শুরু। মাঝে কেটে গিয়েছে অন্তত তিন শতক। তিনি জানালেন “ড. অতুল সুর লিখিত ‘৩০০ বছরের পটভূমি ও ইতিকথা’ পুস্তক অনুসারে কলকাতা শহর প্রতিষ্ঠা হবার বহু আগে থেকেই গ্রাম বাংলায় ঘটা করে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হত। আমাদের পরিবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি জানালেন বৃহৎ নন্দিকেশর পুরাণ’ মতেই এই বাড়ির পুজো চলে আসছে।

শুরু থেকেই এ বাড়ীতে মা একা আসেন। অর্থাৎ দেবীর চার সন্তানদের কেউই দেবীর সঙ্গে থাকেন না।” মধ্যযুগের আরও একটি অনার্য সংস্কৃতির দেবতা মা শীতলা’ রহ্মচারী বাড়িতে নিত্য পুজিতা। জন্মাষ্টমীর শুভলগ্নে কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে পূজার শুরু। কাঠামোতে খড়বাঁধা, একমেটে, দোমেটে, খড়ি লাগানো (প্রথম বার সাদা রং লাগানো হয়), পরবর্তী সময়ে রঙের কাজ শেষ করে মহালয়ার দিন চক্ষুদান ইত্যাদির মাধ্যমে মূর্তিগড়া শেষ হয়।তারপর অস্ত্রদান আর সাজসজ্জা।“গোবিন্দপুরের পোটোর মোড়ের মৃৎশিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ঠাকুরের মূর্তি গড়ে আসছেন”।সেরকম মেদিনীপুরের এক ঢাকি, ঢুলি পরিবার বহু যুগ ধরেই পুরুষানুক্রমে আমাদের পূজায় অংশগ্রহণ করছেন।” জানালেন সোমনাথ বাবু। নবপত্রিকার জন্য বিশেষ কিছু সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। আমাদের পরিচিত একজন সূর্যপুরে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সামগ্রী তিনি বিনা পয়সায় পৌঁছে দিয়ে যান। সেরকমই পূজায় ব্যবহারের জন্য কিছু মৃতপাত্রাদির যেমন খুরি, মালসা, ঘট, প্রদীপ ইত্যাদি প্রয়োজন। কোনও একজন দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত বিনিময় মূল্যে সেইসব সামগ্রী বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যান। “বছরের পর বছর ধরে নানা সম্প্রদায়ের লোক এই পুজা উপলক্ষ্যে আমাদের পরিবারের সঙ্গে সংযোগ রেখে চলছেন, অজান্তেই একটা আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে। এ সম্বন্ধ ভোলবার নয়।” জানালেন সোমনাথ বাবু।

শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে বেলগাছ তলায় বোধন ও কল্পারম্ভ। পরিবারের কৌলিক দেবী মা শীতলার প্রাত্যহিক পূজার ভার যে পরিবার গ্রহণ করেন তাঁদেরই কোনও পুত্রবধূর নামে সঙ্কল্প হয়। সপ্তমীতে মহাস্নান। নবপত্রিকার স্নান আজকাল বাড়িতেই সম্পন্ন হয়। নবপত্রিকা প্রতিষ্ঠা, ঘট স্থাপন, প্রাণ প্রতিষ্ঠা, মহাসপ্তমীর পূজা, পুষ্পাঞ্জলী, ভোগ আরতির মধ্যে দিয়ে মহাসপ্তমীর পূজা শেষ হয়। মহাষ্টমীতে মায়ের ষোড়শোপচারে পূজা, পুষ্পাঞ্জলী, ভোগ আরতি ইত্যাদির চলে তারপর মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে ১০৮টি পদ্ম, ১০৮টি বেলপাতা দিয়ে গাঁথা মালা সহযোগে, ভোগ, আরতি পুষ্পাঞ্জলীর মাধ্যমে সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয়। মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় আরতির আগে ১০৮টি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। মহানবমীতে প্রথা মতে মায়ের পূজা, বলি ইত্যাদির মাধ্যমে মায়ের পূজা শেষ হয়। বলিতে চালকুমড়া, আখ ও কলার ব্যবহার হয়। আগে কাদামাটি খেলা, গ্রাম প্রদক্ষিণ করা হত, লোকের অভাবে দীর্ঘদিন তা বন্ধ। সপ্তমী থেকে রোজ হোম ও চণ্ডীপাঠ চলে, নবমীতে আহুতি ও দক্ষিণান্তে এর পরিসমাপ্তি। নবমীর সন্ধ্যায় বাড়ির একটি সুন্দর সঙ্গীত সন্ধ্যার প্রচলন ছিল।

সোমনাথ ব্রহ্মচারী
সোমনাথ বাবু জানালেন ওনাদের বাড়ির ভোগের একটি বিশেষত্ব আছে। ভোগে তেলের ব্যবহার হয় না, সব রান্নাই গাওয়া ঘিয়ে করা হয়। সাধারণ লবণের পরিবর্তে সৈন্ধব লবণের ব্যবহার হয়। আগে পূজার চারদিনে দুটি আড়াই মনি চালের বস্তার সদ্ব্যবহার হত, সঙ্গে ডাল, সবজি ইত্যাদির আনুষাঙ্গিকের আয়োজন। নবমী ও দশমীর দিন আমিষ আহারের ব্যবস্থা থাকতো। দশমীর দিন সাধারণ পূজার পর আগের দিন বেঁধে রাখা পান্ত সাথে কচুর শাকের একটি পদ ভোগ দেওয়া হয়। পতিগৃহে যাওয়ার দীর্ঘ পথ মাকে পার হতে হবে তাই ঠান্ডা ভোগের আয়োজন। আরতি শেষে বাড়ির পুরুষ সদস্যেরা সঙ্গে পুরোহিত ও তন্ত্রধারকসহ বিসর্জনের মন্ত্রোচারণের মাধ্যমে মাতৃমূর্তিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করার শেষে দর্পণ বিসর্জন ও সুতো কাটা দিয়ে পুজোর সমাপ্তি ঘোষণা।

কথা বলতে বলতে সোমনাথ বাবু বার বার আনমনা হয়ে যাচ্ছিলেন হয়তো স্মৃতি ভিড় করে আসছিল। আশ্চর্য লাগে একজন অতিবৃদ্ধ মানুষ কি অনায়াসে স্মৃতিচারণ করছিলেন। একটু থেমে তিনি আবার বললেন সন্ধ্যায় পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠা মহিলারা প্রথমে বরণ করেন তারপর বাড়ির ও এলাকার অন্যান্য মহিলারা অংশগ্রহণ করেন। বরনশেষে সিন্দুর খেলা। পরে কনকাঞ্জলীর মাধ্যমে পূজার সমাপ্তি। সবশেষে মা দুর্গাকে কাঁধে করে এলাকার কিছু নির্দিষ্ট পথ পরিক্রমা করে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। পরে বাড়িতে ফিরে এসে আরতি, শান্তির জল আর বিজয়ার কোলাকুলি ও প্রণাম সারার পর্ব।
কথোপকথনে : সোমনাথ ব্রহ্মচারী
কি সুন্দর স্মৃতি চরণ।
ধন্যবাদ কমলবাবুকে।
সারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে এরকম অনেক হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য তুলে আনছেন উনি।
ওনারা যে ধরে রেখেছেন এটাই অনেক । বহু বাড়ির পুজো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ।সোমনাথ বাবু সুস্থ থাকুন এটাই প্রার্থনা করি।
এই পুজোতে যত দিন যাচ্ছে মানুষের মনের আন্তরিকতা কমে যাচ্ছে,
প্রথম কারন এগুলি বাড়ির পুজো এবং একে মার্কেটিং করার ইচ্ছা ওনাদের নেই। দ্বিতীয়ত এলাকা ভিত্তিক circuit tourism যেটা প্রশাসনের কাজ সেটা নেই বললেই চলে।
একটা ছোট উদাহরণ দিই। লাঙলবেড়িয়া যে অতীতে অতি উচ্চ মেধার মানুষের জন্ম ও লালন করেছেন তা আজ পুরোপুরি বিস্মৃত ।
এই পুজোতে যত দিন যাচ্ছে মানুষের মনের আন্তরিকতা কমে যাচ্ছে
ভীষণ ভালো লাগলো এই প্রতিবেদন । বস্তুত এই পুজোটির সাথে আমার একটু বিশেষ যোগাযোগ আছে । প্রতিবেদনে উল্লিখিত শ্রী সোমনাথ ব্রহ্মচারী আমার নিজের ছোট মামা ।এই পুজো এবং ব্রহ্মচারী বাড়ীর গৃহদেবী মা শীতলা সম্পর্কে বহু কাহিনী আমার স্বর্গতা মায়ের মুখ থেকে শুনেছি ।
এইরকম পারিবারিক পুজো আজও যথাসাধ্য নিষ্ঠাভরে অনুষ্ঠিত করা হয় । তাতে থাকে না কোন জাঁকজমক, থাকে না আলোকসজ্জা । এই পুজোর একটাই থিম – মাতৃ আরাধনা । মনে ভেসে ওঠে, এই আমাদের শাশ্বত ভারত । দেবতা যেখানে ঘরের মেয়ে । তিনিই আবার আমাদের মা ! ধন্যবাদ জানাই প্রতিবেদককে ।
আপনাদের মতামত আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে। সোমনাথ বাবু এখনও এতটাই সাবলীল দেখে আশ্চর্য হতে হয় । পুজো ভালো কাটুক ।
প্রতিবেদনটি অসাধারণ। ব্যক্তিগতভাবে আমি বলতে পারি এই পুজোর আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠা সকলের মনোগ্রাহী হতে বাধ্য। বিজ্ঞাপন সর্বস্ব সমাজে এই ধরনের পুজোগুলিকে প্রতিবেদক যে সামনে তুলে ধরেছেন তা প্রশংসনীয়।