প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে ভারতে নানা আঙ্গিকে নানা রূপে শক্তিপুজো হয়ে আসছে। বৈচিত্র্য থাকলেও দূর্গাপূজার বিস্তার এতোটাই, এ উৎসব সবার। বঙ্গে দূর্গা পুজোর ইতিহাস বেশ পুরোনো। আজকের প্রতিবেদনে বহমান স্রোতের মতো বছরের পর বছর ধরে অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখা হুগলি জেলার চুঁচুড়ার কিছু পারিবারিক ব্যতিক্রমী বৈচিত্র্যময়ী দূর্গা প্রতিমা, পুজানুষ্ঠান আর ফেলে আসা দিনগুলির কিছু কথা আবার নব আঙ্গিকে তুলে ধরার প্রয়াস করা হলো।
প্রথমে বলি ষন্ডেশ্বর তলার সাগর দত্তের দূর্গাপুজো প্রসঙ্গে। আজ থেকে প্রায় ১৭৮ বছর আগেকার কথা। কোন এক সর্বত্যাগী নির্লিপ্ত সন্ন্যাসী একটি অষ্টধাতুর দেবী দূর্গার বিগ্রহ দিয়েছিলেন ভক্তিমান সাগর দত্তের পরিবারকে। আজো সেই বিগ্রহ সাগর দত্তের ঠাকুর বাড়িতে নিত্যপুজা পেয়ে আসছেন।
ব্যবসার প্রয়োজনে সাগরলাল দত্ত কলকাতায় থাকতেন অনেক সময়। সেখানেও তাঁর বাড়ি ঘর ছিল। ওঁনার স্ত্রী জহরমনি দাসী চুঁচুড়ায় থাকতেন। শোনা যায়, একবার দত্ত বাড়িতে এক সন্ন্যাসী এসেছিলেন। জহরমনি তাঁকে খুব সেবা-যত্ন করেন। চলে যাওয়ার সময় সন্ন্যাসী সাগরলালের স্ত্রীকে একটি অষ্টধাতুর অভয়া মূর্তি দিয়ে যান। সেই মূর্তি দিয়ে চুঁচুড়া দত্ত বাড়িতে নিত্য পুজো শুরু হয়। অষ্টধাতুর অভয়া মূর্তি পুজো করতে করতেই সাগর লালের স্ত্রী একদিন স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে অভয়া রূপে মাটির প্রতিমা গড়ে পুজো করতে নির্দেশ দেন। তারপরেই ১৮৬২ সাল থেকে দত্ত বাড়িতে অভয়া রূপে মাদুর্গার পুজোর প্রচলন শুরু হয়।

চুঁচুড়ার কামারপাড়া আঢ্য বাড়ির দুর্গাপুজো।
কথিত আছে, পুজো করার পরেই সাগর দত্তের নীল ও পাটের ব্যবসা শ্রী বৃদ্ধি ঘটে। প্রচুর সম্পত্তির মালিক হন তিনি। মায়ের কৃপায় তিনি এতটাই অর্থবান হয়ে ওঠেন যে একটা সময় তাঁর কাছ থেকে ব্রিটিশ সরকারও ঋণ নিত। সাগর দত্ত নামে কামারহাটিতে হাসপাতাল রয়েছে। সাগর দত্তের নামে ট্রাস্টি থেকে এখন দত্ত বাড়ির পুজো এবং বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ হয়। ভাটপাড়ায় গঙ্গার ঘাট সংস্কার, চুঁচুড়ায় ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠা, হুগলী কলেজের কাছে দত্তঘাট তাঁর জনহিতকর কাজের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
দেবী এখানে ‘অভয়া দূর্গা’ নামেই বংশের কুলদেবী। দত্ত বাড়িতে প্রতিবছর এই বিগ্রহের অনুকরণে নির্মিত হয় মৃন্ময়ী মূর্তি। দেবী দূর্গার দু হাতের কথা উল্লিখিত হয়েছে চণ্ডীতে। এখানে দেবী দ্বিভূজা।
ব্যতিক্রমী এই বিগ্রহের ডান দিকে কার্তিক ও সরস্বতীর অবস্থান। বাঁ দিকে সিদ্ধিদাতা গণেশ আর লক্ষ্মী। মহিষাসুর অনুপস্থিত। প্রতিমার দুটি হাতে বরাভয় মুদ্রা। বসে আছেন প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর। হলুদ রঙে রঙ্গায়িত দেবী অঙ্গ। বিগ্রহের পিছনে চালচিত্রে আঁকা থাকে চণ্ডীর কিছু কাহিনী।
১২৬৫ বঙ্গাব্দে এই দুর্গাপুজোর খরচ ছিলো প্রায় ১৩ টাকা ১১আনা।
“ধুনো পোড়ানো” এ বাড়ীর বিশেষ অনুষ্ঠান। মহা অষ্টমীতে বাড়ীর সধবা বিধবারা ধুনুচিতে এবং মাটির সরাতে ধুনো জ্বালিয়ে কুমারী বর্ণিত অনুষ্ঠান করেন। পুজোর অনুষ্ঠান সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় বৃহন্নদীকেশ্বর পুরাণের রীতিতে, বৈষ্ণবাচারে।
২৮৮ বছরের পুরনো চুঁচুড়ার কামারপাড়া আঢ্য বাড়ির পুজো। আঢ্য পরিবার সুবর্ণ বণিক। এঁদের পূর্বপুরুষ থাকতেন বর্ধমানের হিরণ্যপুর গ্রামে সেখানে ৯৫ বছর পুজো হয়েছিলো। বর্গী হাঙ্গামার সময় চুঁচুড়ায় চলে আসেন আনুমানিক ৩০০ বছর আগে। মা দূর্গা এখানে আসেন অন্যরূপে। মহাদেবের কোলে দেবী দূর্গা অর্থাৎ শিবদূর্গা।

চুঁচুড়ার মল্লিক পরিবারের দুর্গাপুজো
আঢ্য বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। তবে কুমারীপুজো, যজ্ঞ এবং চণ্ডীপাঠ পালন করা হয় শাক্ত মতে। লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ একচালার মধ্যে গোটা পরিবার। শোলা ও রাংতার ডাকের সাজে এবং পারিবারিক সোনা ও রুপোর গয়নায় সেজে ওঠেন দেবী। পুজোর চালচিত্রের মাঝখানে দেখা যায়, মহিষাসুরমর্দিনীর পটচিত্র।
প্রতিপদে ঘট স্থাপন করা হয়। মহালয়া পরিবারের কেউ আমিষ খায়না। দশমীর দিন মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পুজো শেষ হলে বাড়ির বিবাহিত মহিলারা দর্পনে মায়ের প্রতিবিম্ব দেখার পর (কৈলাশ দর্শন) মাছ-ভাত খাওয়ার নিয়ম। অষ্টমী তে কুমারী পুজো করা হয় এই বংশেরই কন্যাকে। সন্ধি পুজোতে কাঠের বারকোষে এক মণ আতপ চাল নৈবেদ্য দেওয়া হত। ফলমূলাদি, মিষ্টি দেয়া হতো লটকান নামক বিশাল কাঠের তেপায়া-তে করে। চালের নৈবেদ্য ছাড়া দেওয়া হয় নানান ময়দার তৈরি ভোগ। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রকমের নাড়ু (নারকেল, মুগ, সুজি, বোঁদে)। এ ছাড়াও ভোগের থালায় শোভা পায় লুচি, ফুলুরি, হালুয়া, পাঁপড়, বেগুনভাজা, পটলভাজা। পিঠে, জিবে গজা, পদ্ম নিমকি, পেরাকি, চ্যাঙারি ইত্যাদি যা তৈরি হত ঠাকুরবাড়ির ভিতরের ভিয়ান বাড়িতে।
চুঁচুড়ার মল্লিক পরিবারের দূর্গাপুজা প্রায় ৩৮০ বছরের পুরোনো। দূর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় জন্মাষ্টমীর পরের দিন নন্দোৎসবে খুঁটিপুজো দিয়ে।
আনুমানিক ১৬৪২ সালে পুজোর সূত্রপাত। মল্লিকবাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। প্রথমে পুজো হত ঘটে। ১৮৫৫ সালে কলকাতার দরবারী দত্ত-রাই পরিবার শিব-দুর্গা রূপে পুজো চালু করার পর মল্লিকবাড়িতেও মা আসেন সপরিবারে, সাল ১৮৯০। একচালা মাটির প্রতিমা, শিবের কোলে দুর্গা। সাথে লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী। আর আছে দুই সখী জয়া ও বিজয়া।

দেবী এখানে অভয়ামূর্তি, শান্তির প্রতীক। এই বাড়িতে কোনোদিন মহিষাসুরমর্দিনী রূপে পুজো হত না। যদিও চালচিত্রের মধ্যভাগে মা দূর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি জলরঙ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। চালচিত্রটি বিসর্জন দেওয়া হয়না। ধুনো পোড়ানোর রীতি রয়েছে কেবলমাত্র সধবাদের মধ্যে।
এছাড়া তামলী পাড়ার মল্লিক বাড়ী ও দাস বাড়ীর পুজো প্রায় ৩০০ বছরের বেশি। চুঁচুড়া মন্ডল পরিবারের ১৮২ বছরের পুরোনো দুর্গা পুজো হয়।
ষন্ডেশ্বর তলার সেবক রাম পালের বাড়ীর পুজো বিধি অন্যরকম। এদের গৃহদেবতা শ্রী শ্রী মদন গোপাল জিউ। দুর্গা পুজার দিনগুলোতে শ্রীরাধা মূর্তিকে শক্তিরূপিনী দূর্গারূপে বৈষ্ণব মতে আরাধনা করা হয়। মল্লিক কাসেম হাটের চৌধুরী বাড়ীর পুজো, অতি প্রাচীন। পাঠক পাড়ার হালদার বাড়ীর পুজো ২৩৫ বছরের। বুড়ো শিব তলার চ্যাটার্জী বাড়ীর পুজো প্রায় তিনশ বছর। কনক শালীর নন্দী বাড়ীর পুজো প্রাচীণ।
চুঁচুড়ার দূর্গা পূজা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পলাশী যুদ্ধের পর। বঙ্গ সমাজে বস্তুত উচ্চবিত্ত ও নব্য জমিদার শ্রেণীর বৈভব প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিলো দূর্গাপুজা। তবে পুজোর সঙ্গে উদ্দেশ্য কিন্ত পরিবার কে একসাথে এক ছাদের নিচে বেঁধে রাখাও।
তথ্যঋণ: হুগলী চুঁচুড়ার ইতিহাস – সংগ্রাম মল্লিক, শ্যামল কুমার সিংহ, ডঃ অক্ষয় কুমার আঢ্য এবং অন্যান্য মিডিয়া মাধ্যম।।
*ওঁ নমচন্ডীকায়ৈ – জয় মা!*
*ইন্দ্রিয়ানামধিষ্ঠাত্রী ভূতানাং চাখিলেষু ইয়া – ভূতেষু সততং তসৈ ব্যাপ্তৈ দেব্যৈ নমো নমঃ।* দেবীর এক স্তুতির এই ছোট্ট অংশটির অর্থ সুবিশাল এখানে বলা হচ্ছে আমাদের সকল ইন্দ্রিয় এবং সেই ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিচিত পঞ্চভুতময় এই জগৎ সবটাই দেবী নিজেই – আমাদের নিদ্রা, লজ্জা, শক্তি, দয়া, ভ্রান্তি, ক্ষুধা সবই দেবীর আত্মপ্রকাশ -তাই তার এই স্থানান্তরের শুভেচ্ছা জানাই
*ঠাকুরদালান ছেড়ে হৃদয়াসনে সর্বমঙ্গলা কে স্বাগত*
*প্রণাম ও ভালবাসা সহ শুভ বিজয়া* —মৌড়ি কুন্ডু চৌধুরী পরিবার। হাওড়া।
আমাদের ঠাকুরের ছবি দিতে চাইলাম, কিন্তু এখানে ছবি কিভাবে দেব বুঝতে পারলাম না।