প্রখ্যাত পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের দ্বারা চলচ্চিত্রে রূপায়িত পিটার বেনচলির একটি উত্তেজনাময় শিহরণ জাগানো উপন্যাস “Jaws” (জজ অর্থাৎ চোয়াল), চলচ্চিত্রে রূপায়িত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোরন তুলেছিল মহাসমুদ্রের শ্বেত হাঙ্গর। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলেন মৎস্য দুনিয়াতে অন্যতম বিশালাকার মাংসাশী শিকারি সাদা হাঙ্গর (genus Carcharodon), উগ্রতা এবং রক্তলোলুপতায় হাতুড়িমুখো হাঙ্গর (Hammer Headed shark), বাঘা হাঙর (tiger shark) এবং তিমি হাঙরের (Whale shark) থেকেও বেশি ভীতিকর।
গ্রেট হোয়াইট শার্ক এরা বৃহত্তর lamniform হাঙরের একটি প্রজাতি যেটিকে সমস্ত প্রধান মহাসাগরের উপকূলবর্তী পৃষ্ঠ জলের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। গ্রেট হোয়াইট শার্ক (Great White Shark) প্রধানত এর আকার জন্য পরিচিত হয়, একটি প্রাপ্তবয়স্ক গ্রেট হোয়াইটের দৈর্ঘ্য ৬.১ মিটার (২০ ফুট) হয় এবং ওজনের দিক দিয়ে ২,২৬৪ কেজি (৫,০০০ পাউণ্ড) হয়, এই হাঙর ১৫ বছর বয়সে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং সাধারণত ৩০ বছর বাঁচে।

হাঙ্গররা সাধারণত এন্ডোথার্মিক (Endothermic) অর্থাৎ তারা দেহের ভিতরে তাপমাত্রা বাড়াতে পারে। ফলে হিমশীতল বরফ গলা জলে সাঁতরে এক জায়গা থেকে চলে যেতে কোন অসুবিধা হয় না। সিল, কডমাছ ও অন্যান্য শিকার ধরার জন্য এরা শত শত মাইল পাড়ি দিতে পারে। এদের খাদ্যনালীর চারপাশে যে তাপপ্রবাহ চালু থাকে তার ফলে বরফগলা জলে অনেকটা দূরত্ব অতিক্রম করলেও বিভিন্ন প্রাণীর মাংস হজম করতে এদের অসুবিধা হয় না। সাদা হাঙরের মগজের চারপাশ দিয়ে এবং চোখের পিছন দিয়ে উষ্ণ রক্ত স্রোত সবসময় প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে গভীর সমুদ্র তলে যথেষ্ট স্বচ্ছ দৃষ্টি শক্তি নিয়ে শিকার সন্ধান করে। অনেক সময় ডুবুরি মানুষও রেহাই পায় না এদের সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে। মস্তিষ্কে গরম রক্ত সাদা হাঙ্গরের দেহের দুদিকে থাকা লাল মাংসপেশি অঞ্চল থেকে প্রবাহিত হয়। আশেপাশের জলের তাপমাত্রা যাই থাকুক না কেন সাদা হাঙ্গরের দেহের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার (Metabolism) সামঞ্জস্য থাকার জন্য দেহের তাপমাত্রা সব সময় ৭৯° ফারেনহাইট থাকে।
ব্লকবাস্টার সিনেমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামিটি দ্বীপের সমুদ্রসৈকতে আতঙ্কের রক্তাক্ত আবহ গড়ে তুলেছিল সিনেমার খলনায়ক ‘দ্য গ্রেট হোয়াইট শার্ক’ প্রজাতির একটি নির্মম হাঙ্গর। কিন্ত বাস্তবে মানুষ এদের প্রথাগত শিকারের বাইরে তাই মানুষ শিকারের উপর এরা বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেনা মানুষের উপর আক্রমণে যে ঘটনা গুলি ঘটেছে, তার বেশিরভাগই ছিল সিনেমাকে আকর্ষণীয় করার ট্রিকস। গবেষকরা মনে করেন, অনেক সময় কৌতূহলবশত এবং শিকারের অভাবে এরা মানুষের উপর আক্রমণ করে।

বর্তমানে পরিবেশ দূষণ এবং সমুদ্রবিহারী চোরাশিকারীদের দৌরাত্ম্যে মহাসমুদ্রের এই ভয়ংকর সুন্দর সাদা হাঙ্গরের অস্তিত্ব, বিপদসীমা আর অবলুপ্তির লাল সংকেত দেখার জন্য অসহায়ের মতো প্রতীক্ষা করে রয়েছে। সাধারণত এরা দলবেঁধে শিকার করে না, ফলে এদের একমাত্র দুশমন ডলফিনদের সহজ শিকার হয় সাদা হাঙ্গররা। স্বয়ংক্রিয় ট্রলার আর হারপুন বর্শার মাধ্যমে মানুষও সাদা হাঙ্গরকে নির্বিচারে শিকার করছে। বিক্রি করছে তাদের কন্টকাকীর্ণ চামড়া, হাড় ও মাংস। এদের দাঁত অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এদের পাখনাগুলি দুর্মূল্য। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য শিল্পউন্নত দেশগুলি আইন প্রণয়ন করে হাঙ্গরের পাখনার শিকার নিষিদ্ধ করেছে।
এদের নিধন হওয়ার বড় একটি কারণ হলো প্রতিবছর একই জায়গাতে এবং একই সমুদ্রস্রোতের মধ্যে তাদের ফিরে আসা এর ফলে সমুদ্রের শ্বেত শয়তানরা সহজেই শঠ শিকারীদের সহজ নিশানা হয়ে পড়ে। দেখা যায় গ্রীষ্মের মরশুমে ক্যালিফোর্নিয়ার কাছাকাছি আটলান্টিক সমুদ্রে খাদ্য হিসেবে শীল মাছেদের ঝাঁকের উপর হামলা করার পর সমুদ্রের অতলান্ত গভীরে প্রজননের জন্য চলে যায় সাদা হাঙররা। চোরা শিকারীদের হারপুনে অনেক স্ত্রী সাদা হাঙ্গর নিহত হচ্ছে। তাই প্রজননের সংখ্যাও এদের ক্রমশ কমে আসছে। সাদা হাঙ্গর পাখনা থেকে মহা চীনের রেস্তোরা আর অভিজাত রসনার বিপণিগুলিতে তৈরি হচ্ছে উপাদেয় স্যুপ, ফলে নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে ‘jaws’-এর খলনায়ক।

বিশ্বের বৃহত্তম মাছ তিমি, হাঙরের দুর্দশার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক তিমি হাঙর দিবস (International Whale Shark Day) পালিত হয়। মনে করা হয় যে সাগরে প্রায় ১২৮,০০০ থেকে ২০০,০০০ পরিপক্ক তিমি হাঙর অবশিষ্ট রয়েছে।
আন্তর্জাতিক তিমি হাঙর দিবসটি ২০০৮ সালে ইসলা হলবক্সে আন্তর্জাতিক তিমি হাঙর সম্মেলনে (International Whale Shark Conference on Isla Holbox) প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ৪০ জন সমুদ্র বিশেষজ্ঞ, অ্যাক্টিভিস্ট এবং বিজ্ঞানী প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা তিমি হাঙরের ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। যদিও বলা হয়েছে যে হাঙ্গরগুলি ২৪০ থেকে ২৬০ মিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় ধরে রয়েছে। ১৮২০ তে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে তিমি হাঙ্গর প্রথম আবিষ্কৃত হয়। ড. অ্যান্ড্রু স্মিথ সঠিকভাবে মাছটিকে পৃথিবীতে বিদ্যমান বৃহত্তম হাঙ্গর হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাদের বিশাল আকার থাকা সত্ত্বেও, তিমি হাঙ্গরগুলি মৃদু আচরণের জন্য পরিচিত।
জন্মের সময়, তারা ১৬ থেকে ২৪ ইঞ্চির বেশি বড় হয় না, কিন্তু তারা যখন ২৫-এ পৌঁছায়, তারা ৪৬ থেকে ৬০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তাদের ৩০০০ দাঁতের ৩০০ সারি আছে, যা মাত্র ০.২ ইঞ্চি লম্বা! প্রায় ১২ টন ওজনের, তিমি হাঙ্গরগুলি ফিল্টার-ফিডার, বেশিরভাগই প্লাঙ্কটন, স্কুইড এবং মাছ খায়। তাদের আকারের মতো তারা প্রচুর খেতে পারে, প্রায় প্রতিদিন

৪৪ পাউন্ড খাবার খেতে পারে। হাঙ্গরগুলি খুব গভীর নয় এমন উষ্ণ জলে সাঁতার কাটে। প্রতি বসন্তে, তিমি হাঙর অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম মহাদেশীয় শেলফে চলে যায় এবং এলাকার নিঙ্গালু রিফের প্রবাল মাছকে প্রচুর পরিমাণে প্ল্যাঙ্কটন সরবরাহ করে।
সাম্প্রতিক জুরাসিক এবং ক্রিটেসিয়াস সময়কাল থেকে থাকা তিমি হাঙরকে বিশ্বের প্রজাতির বিপন্ন তালিকায় রাখা হয়েছে। তারা ক্রমাগত মাংস, পাখনা এবং শুধু খাঁটি মজার জন্য শিকার করা হয়। ফিলিপাইনের মতো এশিয়ার কিছু অংশ তিমি হাঙরের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তিমি হাঙরদের বাঁচানো না গেলে তা আমাদের মহাসাগরেও প্রভাব ফেলবে। অত্যধিক প্ল্যাঙ্কটন শৈবাল বৃদ্ধিকে উন্নীত করবে যা ফলস্বরূপ অন্যান্য মাছের প্রজাতি, পরিবেশ এবং মানুষের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধের যুদ্ধেও হাঙ্গরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কেননা তারা সেইসব ছোট ছোট প্রাণী শিকার করে থাকে যারা অধিক পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপাদন করে।
আন্তর্জাতিক তিমি হাঙর দিবস পালন করা হয় এই আশ্চর্যজনক সমুদ্রে বসবাসকারী প্রাণীদের সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য। তাদের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করা আমাদের উপর নির্ভর করে। তিমি হাঙ্গরকে রক্ষা ও সংরক্ষণ করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।