১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট মধ্যরাত্রিতে দেশের স্বাধীনতা লাভের কথায় আবেগমথিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, যখন বিশ্ব ঘুমিয়ে, তখন ভারত জীবনে ও স্বাধীনতায় জেগে উঠবে। এই জেগে ওঠার মূলে যে মুক্তির আনন্দ ও স্বাধীনতার স্বাদ, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্ত যা সেদিন অনুমান করা যায়নি, তা হল, সেই দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতায় অসংখ্য মানুষ পরাধীনতাবোধে স্বদেশে পরবাসী হয়ে বিনিদ্রায় জেগেছিল। দেশের পূর্ব-পশ্চিম সীমান্তে বিচ্ছিন্ন দেশান্তরে অসংখ্য মানুষের উদ্বাস্তু জীবনে দেশ খুঁজে চলা আজও শেষ হয়নি। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার চব্বিশ বছর পরে আবার শরণার্থীর ঢেউ আছড়ে পড়ে। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও দেশের সকলের কাছে তা স্বাধীনতা হয়ে ওঠেনি, বরং অসংখ্য মানুষের পরাধীনতাকে সুনিশ্চিত করে তোলে। আবারও স্বদেশে পরবাসী হওয়া, ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবনে শরণার্থীর দেশ খুঁজে চলা, অন্তহীন পথচলা।
অথচ দেশ মানে তো শুধু সাকিন ঠিকানা নয়, মানুষের অস্তিত্বের আধার, প্রকাশের মুক্ত আকাশ, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মুক্ত জীবনানন্দ। তার ভূমিষ্ট হয়ে বেড়ে ওঠা, গড়ে তোলা জীবনের শৈশব-বাল্য-কৈশোরের আনন্দনিকেতন, যৌবনের স্বপ্নরঙিন হাতছানি, প্রৌঢ়ের মান্যতা, বৃদ্ধের অভিভাবকত্ব, প্রবৃদ্ধের শ্রদ্ধাবোধ সবই তাতে মজুত থাকে। এজন্য দেশভাগে মানুষ ভাগ হয়, তার মনেও ভাগের রঙ এসে পড়ে, কিন্তু মানুষ কখনোই দেশত্যাগ করতে পারে না। তার মনে দেশই যে আলো হয়ে রয়ে যায়। যেখানে সে যায়, দেশও তার সঙ্গে চলে। লীলা মজুমদার তাঁর ‘ডোরাকের গল্প’-এ যথার্থই বলেছেন, ‘বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না।’ মানুষের মনেই যে তার দেশের বাস। অথচ দেশভাগের শিকার হয়ে স্বদেশে পরবাসীর মনের স্বদেশের নামটি উচ্চারণের ভয়ই তাকে গ্রাস করে। সেই দেশের স্মৃতিকে বিস্মৃতিতে রেখেই তাকে নতুন করে দেশের পরিচয় লাভ করতে হয়। অতীতকে ভুলে বর্তমানের স্বস্তিবোধে বিস্মৃতিতে শান্তি লাভের আশায় স্বদেশ ক্রমশ বিদেশ হয়ে ওঠে, পরদেশ আপনার মনে হয়। অথচ তারপরেও জীবনের ট্রাজিক পরিণতি একান্তে ভেসে ওঠে, সংবেদী মানুষের লেখনীতে উঠে আসে, নাটক-সিনেমায় প্রকাশিত হয়।

সেদিক থেকে আধুনিক বিশ্বে দেশের স্বাধীনতালাভের উচ্ছ্বাস যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তার চেয়ে স্বদেশে পরাধীনতার শিকার হয়ে উদ্বাস্তু জীবনে দেশ খুঁজে চলার মর্মান্তিক পরিণতি আরও বেশি ভাবিয়ে তোলে। করোনাকালে আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের ছুটে চলা বা অন্যদেশে বন্দি হওয়ার খবরও বন্ধ হয়নি। শরণার্থীদের আশ্রয়ে এত বড় পৃথিবীও ছোট হয়ে পড়েছে। সেখানে মানুষের মানবিক মুখেও উগ্র দেশপ্রেমের নির্মম প্রত্যাখ্যান আমাদের সচকিতও করে না। সেদিক থেকে কারো স্বাধীনতাই কারোর পরাধীনতার কারণ, ছিন্নমূল মানুষের দেশ খুঁজে চলার শরিক করে তোলার জন্য দায়ী। সেখানে আধুনিক বিশ্বে দেশের স্বাধীনতার চেয়ে মানুষের স্বাধীনতাই সবচেয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। স্বাধীনতা যেখানে স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হয়, সেখানে মানুষের মানবিক অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে ওঠে। একুশ শতকেও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ। ২০২১-এর ১৫ আগস্ট ভারত যখন তার স্বাধীনতার গৌরবময় ৭৫ বছর পালনে সামিল হয়েছে, সেদিনই তার প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানে তালিবানের অধীনে চলে আসে। শুরু হয় স্বাধীনতার পাশাপাশি পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার মরীয়া প্রয়াস, দেশান্তরি হয়ে বাঁচার আপ্রাণ আহ্বান।
তালিবানের উগ্র ধর্মান্ধতায় আফগানিস্তানের ভয়ঙ্কর পরিণতি নিয়ে ইতিমধ্যে শোরগোল পড়ে গেছে। তাতে স্বাভাবিক ভাবে তালিবানের পক্ষে কী করে আশি হাজার সৈন্য নিয়ে সরকারি তিন লক্ষ সৈন্যকে প্রায় বিনা যুদ্ধে কাবুল দখল করা সম্ভব হল, তা নিয়ে চর্চা হচ্ছে। সেখানে আফগানিস্তানের অধিবাসীদের সমর্থন ব্যতীত তা যে সম্ভব হয়নি, তাও অনুমেয়। উঠে এসেছে আফগানিস্তানের সরকারের দুর্নীতি বা সৈন্যদের ঠিক মতো বেতন না পাওয়ার কথা, রাষ্ট্রপতির স্বদেশের প্রতি টানের অভাব। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সেদেশ থেকে সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়া। যেন সে-দেশেরই সব দায় সে দেশকে তালিবানমুক্ত রাখা। অন্যদিকে পাকিস্তানের সমর্থন, চীনের হাতছানি ও ভারতের অসহায়তাবোধ নিয়ে চর্চার বহুমাত্রিক প্রকাশে গণমাধ্যমও সরব। সেখানে ভারতীয়দের স্বদেশে ফিরিয়ে আনা বা ভারতে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়াও রয়েছে। তালিবান বিরোধী অবস্থানে মুসলিমদের নীরবতাবোধে অমুসলিমদের মেরুকরণও উঠে এসেছে। যে সাম্প্রদায়িকতায় ভারত ভাগ হয়েছিল, তার পরিচয়ও এখানে মেলে। উঠে আসে রাষ্ট্রসংঘের নীরবতা নিয়েও নানা কথা। ইউসুফ মালালাও প্রাসঙ্গিকতায় ফিরে আসেন। বিশেষ করে তালিবানি শাসনে নারীদের উপরে ভয়ঙ্কর বর্বরোচিত অত্যাচারের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। সেক্ষেত্রে যেভাবে তালিবানদের ক্ষমতায়ন নিয়ে চর্চার পরিসর জমে উঠেছে, সেভাবে স্বদেশে পরবাসীদের নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই।

মার্কিন রাষ্ট্রপতিও নিজের দেশের নাগরিককেই আঘাত করলে সর্বশক্তি দিয়ে তার প্রত্যাঘাতের হুমকি দিয়েছেন। অথচ কোনো রাষ্ট্রই সে দেশের স্বদেশে পরবাসীদের জীবনরক্ষায় এগিয়ে আসা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। যেখানে আধুনিক বিশ্বে শক্তিশালী দেশের অভাব নেই, অথচ সেখানেই ধর্মান্ধ অমানবিক গোষ্ঠীর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ শক্তির বড় অভাব। আসলে ক্ষমতাই যেখানে শেষ কথা, সেখানে অক্ষমদের কথা কে ভাবে! স্বাধীনতা তো পালনের নয়, লালনের; উদযাপনে নয়, যাপনের; মান্যতায় নয়, মননের। চেতনাহীনের কাছে গোলামী করে সুখে থাকাও স্বাধীনতা মনে হয়। সেই যাপনের স্বাধীনতাকে আপন করার জন্যই তো মানুষ দেশকে বুকে নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণ হাতে নিয়ে অচেনা পথেই চলতে শুরু করে। সে পথ যত দূরেরই হোক, যত দুর্গমই হয়ে উঠুক, তবু তা হাতছানি দেয় শরণার্থীকে। সেখানে যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার স্বাধীনতা থাকে। সেই স্বদেশে পরবাসী স্বাধীনতাকামীদের কথা যে আধুনিক বিশ্ব এখনও ভেবে উঠতে পারেনি, তা তালিবানদের উত্থানে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।