এ বছর পুজোতে পাহাড় সমুদ্র বাদ রেখে নতুন জায়গার সন্ধানে মধ্যপ্রদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করি আমরা। আমাদের প্রথম গন্তব্য… কানহা ন্যাশনাল পার্ক। ট্রেনে গেলে সবচেয়ে নিকটবর্তী রেল স্টেশন ‘গন্ডিয়া’। সপ্তমীর দিন সন্ধ্যা ৭.৫০ এর বম্বে মেল ধরে পরের দিন দুপুর ১২ টা নাগাদ নির্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু শুরুতেই সমস্যার শুরু, বিলাসপুরে রেল লাইনে কাজ চলার কারণে ট্রেন ছাড়তে দেরি করলো তারপর পথে যেতে যেতে সাকুল্যে ৫ ঘন্টা মত লেট। অবশেষে বিকেল ৫ টায় প্রায় বিধ্বস্ত অবস্থায় গন্ডিয়া স্টেশনে নামা। তারপর শুরু কানহা জঙ্গলের দিকে যাত্রা। সাতপুরা পর্বতের মাঝে অবস্থিত এই রিজার্ভ ফরেস্ট প্রায় ২,০০০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে হাত-পা ছড়িয়ে রয়েছে।।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার জন্য এই যাত্রাপথ আরও নির্জন সুনসান। গন্ডিয়া স্টেশন থেকে প্রায় ১৪৫ কিমি দূরে, আমাদের নির্দিষ্টকৃত থাকার জায়গায় পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা সময় লাগলো। পুজোর সময়ে বাইরে থাকলেও পথে যেতে যেতে নবরাত্রি উপলক্ষে দেবীর দর্শন মিললো। গ্রাম্য পরিবেশে মধ্যপ্রদেশের পুজো প্যান্ডেল আড়ম্বরহীন হলেও খুব আন্তরিকতার ছোঁয়া চোখে পড়লো। গ্রামের মানুষেরা সবাই একজায়গায় বসে গল্প করছে। আর তার সাথে ওখানের দেবীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ, মাথার ওড়নার কি সুন্দর কারুকাজ, আর দেবীর মুখের হাসি অন্যরকম। ওখানের মায়ের মূর্তি কেমন পাশের বাড়ির মেয়ে-বৌদের মত, সবার সঙ্গে বসে গল্প করছেন যেন সদাহাস্যজ্বল দেবী মা।

যাই হোক, সময় যত এগোতে থাকে পথের দুই ধার কেমন যেন নিস্তব্ধ হতে থাকে। আমাদের মনে হচ্ছিল যে, ড্রাইভার ভদ্রলোক আমাদের কোনো গহীন জঙ্গলে ছেড়ে দিচ্ছেন না তো! অবশ্যই মজা করে ভাবনাটা এলো… কিন্তু জঙ্গলের ঘ্রাণ নাকে আসছিল। ঘন্টা দুয়েক পরে পথে ‘মক্কি গেট (Mukki gate)’ এলো, এটি অন্যতম প্রবেশপথের একটি কানহা জঙ্গলে ঢোকার। আমরা অন্ধকারে আরও অনেক পথ এগোতে লাগলাম, জন মানবহীন সে পথে রাস্তার আলোও কম। এক জায়গায় এসে কিছু হোটেল রিসোর্টের বিজ্ঞাপন চোখে পরতে বুঝলাম যে আমাদের গন্তব্য দূরে নয়। তবে দুপাশে জঙ্গলের মাঝে গাড়ি চলছে। একসময় গাড়ির গতি কমিয়ে ড্রাইভার দাদা জঙ্গলের ডানদিকে আলো ফেললেন। অবাক চোখে দেখলাম একপাল হরিণ প্রায় রাস্তার পাশে বসে আছে। মনে হলো যেন ওদের সন্ধ্যার আসর বসেছে। সে সময় পাশ থেকে একটা জিপ গাড়ি যেতে দেখলাম, তাতে গাইড এবং সঙ্গের লোকেরা টর্চ হাতে জঙ্গলের দিকে চেয়ে আছে। শুনলাম যে এখানে রাতেও ‘নাইট সাফারি’ হয়। বাফার এরিয়া ঘুরে দেখানো হয়। আমরা প্রায় রাত ৮ টা নাগাদ কানহা গেটের সবচেয়ে কাছের থাকার জায়গা ‘মোটেল চন্দন’-এ এসে উপস্থিত হলাম। মালিক সহ বাকি স্টাফরা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছে দিলেন। এখানের চারপাশে জঙ্গলের পরিমন্ডল, পাশেই কানহা গেট… তাই গাছপালা ঘেরা এ জায়গায় হনুমানদের উপস্থিতি তখনই নজরে এলো। পূর্বেই আমাদের সব জঙ্গল সাফারির ব্যবস্থা হোটেল থেকে করে রেখেছিল। শুধু ওরিজিনাল পরিচয়পত্র ওদের কাছে রাখা হল, যাতে পরের দিন ভোরবেলা বেড়োনোর সময় কোন সমস্যা না হয়। রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে পরের দিন ভোর ৫ টায় ওঠার জন্য ঘুমের দেশে যাওয়া গেল।
দুই
জঙ্গলে তীব্র কড়া রঙের পোশাক পরে না যাওয়াই উচিত। তাই হালকা পোশাকে সকাল ৫.৩০ টায় হোটেলের সামনে উপস্থিত হলাম। আমাদের হাতে একটা খাবারের বাস্কেট ধরিয়ে দেওয়া হলো, ওনারা বললেন যে… ব্রেকফাস্ট খেয়ে যা কিছু বর্জিত জিনিস তা এই বাস্কেটে করেই নিয়ে আসবেন, জঙ্গলে ফেলবেন না। দুই পা এগোতেই দেখলাম, সামনে জিপসি গাড়ির মেলা আর সাথে খাকি পোশাক পরিহিত ড্রাইভার গাইডেরা। গেটের সামনে বুকিং কাউন্টারে সব কাগজ জমা দিয়ে আমাদের হোটেল থেকে নির্দিষ্ট এক ব্যক্তি, গাড়ি নং-সহ গাইডকে পরিচয় করান। সকালে হালকা শীত, তাই হালকা শীতপোষাকে কম বেশি সব গাড়িতে বাচ্চা বুড়ো সবাই বেশ উৎসুক হয়ে গেট খোলার অপেক্ষায় ছিলাম। ঠিক সকাল ৬ টায় আমাদের যাত্রা শুরু হলো।

কানহা রিজার্ভ ফরেস্টকে চারটি জোনে ভাগ করে দৈনিক সেই অনুযায়ী গাড়ি ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়। কানহা, কিসলি, মক্কি, সারহা… এই চারটি জোনে পর্যটকরা ঘুরতে পারেন। আমরা যে গেট দিয়ে ঢুকলাম, সেই কানহা গেট থেকে কানহা এবং কিসলি জোন দেখা যায়। একটু যাওয়ার পরেই আমাদের সকালের জিপসিগুলো দুই ভাগে ভাগ হলো। শুনলাম যে, আমরা কানহা জোনে ঢুকছি… এদিকেই গাড়ির পার্মিট বেশি, ৩৫-৩৬ টা মত। কিসলিতে ১৫ টা মত গাড়ি যায়।

আমার মত মানুষের কাছে জঙ্গল বলতে ডুয়ার্স, কিন্তু এ জঙ্গল দেখার পরে বিস্ময়ের ঘোর আর কাটে নি। জঙ্গলের প্রধান গাছ হলো… শাল। বড় বড় শালে ঘেরা জঙ্গলের শুরু থেকেই হরিণ আর হরিণ। এমন সুন্দর সোনার হরিণ… দুই একটা নজরে পড়লেই মন পুলকিত হয়। আর এখানে তো যত এগোচ্ছি শুধু হরিণের মেলা। সেই সাথে জুড়ছে সম্বর। একসময় গাইড দাদা দেখালেন কৃষ্ণসার হরিণ। জঙ্গল জুড়ে ওদের অবাধ বিচরণ। আমাদের জিপের সামনে থেকে এক ঝাঁক হরিণ রাস্তা পার হয় আবার দু-একটা মুখ ফিরিয়ে তাকায়। সে এক অবাক জগৎ। আমরা ওদের থাকার জায়গায় এসেছি… তাই ওদের হাবভাব এমন যে, আমাদের একটু ফিরে দেখো, আমরা কেমনতর জীব!! পরবর্তীতে গাইড দাদার মুখে শুনলাম, ৩ মাস পরে সদ্য জঙ্গল খুলেছে পর্যটকদের জন্য। তাই ওরা একটু অবাক চোখে ফিরে দেখছে গাড়ির আওয়াজ পেলে। এরপর ওরা অভ্যস্ত হয়ে পড়লে আর ফিরেও তাকাবে না। যাই হোক, জঙ্গল জুড়ে অনেক রকমের হরিণ দেখার অভিজ্ঞতা সারাজীবনে ভোলার নয়।
এরসাথে যে জিনিস নজরে আসে প্রথম থেকে তা হলো, উইপোকার ঢিপি। গাছের উচ্চতা সমান বড় বড় উইঢিপিতে জঙ্গল ভরা। আর সেসবের ফাঁকে ময়ূরের দেখা মিললো অনেক। এদের মাঝে জঙ্গল জুড়ে সাদা হনুমানের সারি। ঠিক ছবির মত দেখতে এই কালো মুখওয়ালা লেঙ্গুরের পাল তাদের বাচ্চা-সহ বসে আছে রাস্তায়। এর ফাঁকে চোখে পড়লো দুটো হাতির পিঠে চেপে বনদপ্তর থেকে জঙ্গল পেট্রোলিং এ বেড়োচ্ছে।

আমরা এ জঙ্গলের অপরূপ সজীব রূপ দেখে আর হরিণ-সহ বাকি পশুদের চেহারার চাকচিক্য দেখেই মুগ্ধ। কিন্তু ড্রাইভার এবং গাইডদাদা কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। জঙ্গলের নানা জায়গায় বিভিন্ন ভাবে ঘুরতেই থাকছে আর কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করছে। সেই সাথে এর জিপের সাথে অন্য জিপের সাংকেতিক কথা চলতে লাগলো। বুঝলাম যে, এ জঙ্গলে বাঘ-ই হলো প্রকৃত রাজা। তাই তার দর্শন করানোই আসল উদ্দেশ্য এদের। একসময় বড় বড় ঘাসের জঙ্গলের পাশে গাড়ি থামিয়ে গাইড দাদা দেখালেন বাঘের পায়ের ছাপ। মাটির উপরে বেশ স্পষ্ট সে দাগ। ওনাদের অভিজ্ঞতা থেকে বললেন যে, কিছু আগেই হয়ত এ পথ দিয়ে গেছে সে। আশেপাশে কোথাও আছে। তাই সর্তক দৃষ্টি দিয়ে চারপাশ দেখতে লাগলেন। সাধারণত ভোর কিংবা সন্ধ্যার দিকেই এদের দেখা মেলে। এক জায়গায় অনেক সময় অপেক্ষার পরে আমরা একটা খোলামেলা সাজানো জায়গায় এলাম। একটা মিউজিয়াম আছে কানহা জঙ্গল নিয়ে। সেখানেই খাবার জায়গা। সব পর্যটক, তাদের সাথে আনা বাস্কেট থেকে খাবার বের করে খাচ্ছেন। কারোর ইচ্ছে হলে ওখান থেকেও কিছু কিনে খেতে পারে। ২০ মিনিট মত কাটিয়ে আবার জিপসি করে বেড়িয়ে পড়লাম জঙ্গল দেখতে। এক জায়গায় বেশ কয়েকটা জিপ দাঁড়ানো, শুনলাম যে কিছু আগে একটা ছোট বাঘের বাচ্চা রাস্তা পার করেছে। তাই ওরা নিশ্চিত যে মা বাঘও তার পিছনে আসবে। একসময় একটা অদ্ভুত পাখির আওয়াজ কানে এলো। ওরা বললো যে, এটা একরকম সিগনাল… বাঘ আসার আগে আগাম জানিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ দাঁড়ানোর পরে একসময় সে আওয়াজ থেমে যায়। গাড়িগুলোও ফেরার পথ নেয়। ফেরার রাস্তায় হঠাৎ জিপ দাঁড়ালো, সামনে একটা ছোট মরা কাঠের টুকরো মত, পরে বুঝলাম সেটা নড়াচড়া করছে। ‘Vine snake’ নামের এই বিষাক্ত সাপ এমনই মরাকাঠের মত। কিন্তু এটিও বেশ বিরল। যাই হোক, এ যাত্রার গাইড ড্রাইভাররা বেশ আশাহত, আমাদের বাঘ দেখাতে না পেরে। কিন্তু আমরা এমন টানা পাঁচ ঘন্টা ধরে জঙ্গল ঘুরে মন প্রাণ ভরে নিয়েছিলাম। বাকি প্রাণীদের দেখে মন খুশি ছিল। আমার এতক্ষণ ধরে এমন ঘন বনের ভিতরে ঘোরার অভিজ্ঞতা প্রথম… তাই এ সাফারি খুব স্মৃতিমধুর।
সকাল ১১ টায় ফিরে এলাম। তবু জঙ্গলের ঘোর কাটতেই চায় না। এরপর আবার স্নান খাওয়া সেরে দুপুরে বেড়োনোর পালা।
তিন
এবার আমরা কিসলি জোন দেখবো বিকেলের সাফারিতে। এই জোনে খুব কম গাড়ি বিকেলে ঢোকে… ১০ টা মত। বিকেল তিনটের সময় গেট খুলতেই আমরা সকালের মত গাইড-সহ কিসলি জোনে প্রবেশ করলাম। এবারের গাইড দাদা প্রথমেই বললেন যে, এদিকে এবার এখনো বাঘের দেখা মেলে নি, তাই আমরা কিন্তু বাঘ নাও দেখতে পারি। আমরা বললাম যে, আমরা কোনরকম আশা নিয়েই ঘুরতে আসি নি যে বাঘ দেখবো। এটা চিরিয়াখানা নয়, সেটা আমরা ভালো জানি। এটা পশুপাখিদের জগত, এখানে আমরা বাইরের লোক। আমরা শুধু মাত্র জঙ্গলের শোভা দেখতে এসেছি।

এদিকের জঙ্গল অনেক বেশি ঘন, একটু চড়াই-উৎরাই। সাথে অনেক জঙ্গলি খালের জল। পাশে ছোট পাহাড়ের টিলা মত। ছোট ছোট বাঁশবনে ঘেরা এ জঙ্গল। দেখে কিন্তু বেশ রোমহর্ষক অনুভূতি হচ্ছিল। ‘জঙ্গল বুক’-এর মত এক এক জায়গায় উপলব্ধি হচ্ছিল। কোন জলা জমি যেখানে হরিণ, বুনো শূকর, মুরগী ঘুরছে। আবার নীলকন্ঠ পাখির মত বেশ কিছু আলাদা পাখির দর্শন মিললো। পথে সম্বর হরিণ দেখা গেল অনেক, স্বভাবে এরা শান্ত এবং খুব বেশি দলে থাকতে ভালবাসে না। তাই একা একাই ঘোরে। তারপর এক বড় জলাধারের পাশে ও জলের মধ্যে দেখা পেলাম এ জঙ্গলের আরেক বিস্ময়ের… বারাশিঙা হরিণ (Swamp deer)। কানহার জঙ্গলে এদের দেখা মেলে। দুর্লভ হরিণদের মধ্যে এগুলো পড়ে। এদের প্রতিটা শিং এর শাখা প্রায় ১২ বা তার বেশি, তাই এদের এমন নামকরণ। গাইড দাদা বললেন যে, এই হরিণদের শিং এর রঙ বদল হয়। এখন এদের রঙ রক্তাভ। কারণ সদ্য শিং গুলো গজাচ্ছে। একটু আঘাতে এখান থেকে রক্তক্ষরণ হয়। আমরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে এমন অনির্বচনীয় শোভা দেখতে লাগলাম। ওরা কি নিশ্চিন্তে জল খাচ্ছে। তারপর জঙ্গলের আরও গভীরে ঘুরতে ঘুরতে কেমন নিস্তব্ধতার প্রেমে পড়লাম। মাঝে মধ্যে কিছু ময়ূরের আওয়াজ আর পাখিদের বাড়ি ফেরা, সাথে হরিণের পালের ঘোরাঘুরি দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এই পথে আমাদের জিপটাই শুধু ছিল। কিছু পরে পথে আরেকটা জিপে দুইজন বিদেশিকে দেখলাম। সেই গাড়ি থেকে শুনলাম যে, তারা সদ্য একটি বাঘকে দেখেছে বাম দিক থেকে ডানদিকে রাস্তা পার করতে। তারপর আরেকটা জিপেও বলাবলি করতে শুনলাম যে, জুনিয়র এবং বলবিন্দর নামের দুটো বাঘ নাকি আজ ঘোরাফেরা করছে। এসব এখানের স্থানীয় গাইড ড্রাইভার দের দেওয়া নাম। আমাদের ড্রাইভার দাদা কিছু ভাবনা চিন্তা করে গাড়ি সামনের দিকে নিয়ে একটু ফাঁকা ঘাসের জমির পাশে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। তারপর আরেকটা জিপের সাথে মুখোমুখি কথা চলতে চলতেই ড্রাইভার দাদা চিৎকার করলেন… টাইগার টাইগার। মূহুর্তে কেমন বোকা হয়ে গেলাম। ডানদিক থেকে এক সুবিশাল চেহারার রাজা এসে আমাদের জিপের সামনে থেকে রাস্তা পার করে পাশের জঙ্গলে ঢুকছেন। ডোরাকাটা ওইরকম নিখুঁত দাগ সারা গায়ে, সেই সাথে কালো লেজ নাড়ানো। সে সব দেখে কি করবো, বুঝতেই পারছিলাম না কেউ। ছবি তুলতে গিয়েও হাত কেঁপে গেছে আমার সঙ্গীর। সামান্য ছোট কোন প্রাণী বা পোকা সামনে এলেও কেমন চিৎকার করে ভয় পাই। কিন্তু জঙ্গলের মহারাজকে দেখে সে অনুভবও হলো না৷ একেই মনে হয় বলে বাকরুদ্ধ অবস্থা। একবার তো আমার মনে হলো যে, কোন বহুরূপী বাঘ সেজে সামনে এসে দাঁড়ালো আর আমাদের দিকে ফিরে তাকালো।
বেশ কিছুক্ষণ জিপের উপরে উঠে তার কাজকর্ম দেখলাম। নিজের খেয়ালে গাছপালা মুখ থেকে সরাতে সরাতে পিছন ফিরে সামনে গিয়ে নানা ভঙ্গিমায় সে জঙ্গলের ভিতরে আড়ালে চলে গেল। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে এমন করে তার নিজস্ব বাসভূমিতে চাক্ষুষ দেখা… নবমীর রাতে এও এক দেবী দর্শনের মত। ড্রাইভার গাইড দাদা খুব খুশি আমাদের দেখাতে পেরে এবং ওরা বারে বারে বলছেন যে, কত লোক আসে, আমাদের বলে… টাকা দেবো আলাদা অনেক, শুধু বাঘ দেখিয়ে দাও। আপনারা এমন বায়না করেন নি, শুধু জঙ্গল ভালবেসে উপভোগ করছিলেন, তাই তিনি দর্শন দিলেন। একথা বলতে বলতে ফেরার পথে আরেকটু যেতেই দেখলাম ৩-৪ টে জিপ দাঁড়ানো। আর ঠিক তার পাশেই আরেকজন বাঘ মামা জঙ্গলের পথে যাত্রা করছেন। আমরা সত্যি আপ্লূত… এক যাত্রায় এমন করে দুই দুটো বাঘের দেখা মিললো।

কানহার জঙ্গলে দুটো সাফারি করেই একসাথে এত এত প্রাণী-সহ বাঘের দেখা পাওয়া… জীবনের চরম প্রাপ্তির একটা বলেই মনে করি। বিকেলের সাফারি ঘন্টা তিনেক মত হয়। সন্ধ্যা ৬ টায় প্রায় গেটের মুখে হরিণদের দু-পাশের মাঠ জুড়ে আসর বসানো দেখে আরও মন ভরে গেল। এ এক বিচিত্র জগৎ। এখানে আমরা বহিরাগত। ওরা নিজের মত করে জীবনযাপন করে, সেখানে আমরা যতটা সম্ভব চুপ থেকে উপভোগ করতে পারি।

সন্ধ্যার অন্ধকারে কানহার গেট পেরিয়ে আসার সময়ে মনে এক প্রবল প্রশান্তি নিয়ে এলাম। ঈশ্বরের বসবাস তো এমনই প্রকৃতির মাঝে, জীবজন্তুর মধ্যে। কোন নির্দিষ্ট জোনে প্রথম যে গাড়ি বাঘের দেখা পায়, তার টুরিস্টকে সরকারি খাতায় সে সম্পর্কে লিখিত দিতে হয়, যাতে ড্রাইভার গাইডের কথার সত্যতা থাকে। আমরাও যেহেতু ঐ বাঘের দেখা পেয়েছি, কাগজ কলমে কাজ সম্পন্ন করে হোটেলে ফিরলাম প্রসন্ন চিত্তে। আমাদের থেকে বাঘের ছবি নিতে বেশ কয়েকজন গাইড আসে। সেগুলো আদান প্রদান করে, মনে মনে গেটের ওদিকের পশুরাজের রাজত্বকে সেলাম জানিয়ে পরের দিন অন্যত্র যাত্রা শুরু করেছিলাম। শুধু নিজের কাছে নিজে প্রতিশ্রুতি দিলাম… আবার আসবো ফিরে, বাঘ দেখতে নয়। এমন সবুজ সুন্দর জঙ্গলের মধ্যে বুনো ঘাসের গন্ধ নিতে, পশুপাখিদের প্রকৃত বসবাসকে চাক্ষুষ করতে, প্রাণীদের নিজস্ব জীবনযাপনের অনুভূতি নিতে।
Oshadharon akta lekha..
Valo laglo onek o jabar ichhe jaglo.
Onek dhanyobad ato sundor akti lekhar janyo.