ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবর নিয়ে গবেষণা করছেন ডেভিড অস্টিন, সিনান আরল। কি বলছেন তাঁরা? বলছেন ফেক নিউজ ছুটে চলে ঝড়ের গতিতে। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের এই বিপুল সমৃদ্ধি ফেক নিউজকে দিয়েছে অবাধ গতি। সত্য খবরের সেই গতি নেই। সেই ঝড়ের গতি। সিনান আরল বলছেন, ‘We found that falsehood diffuses significantly farther, faster, deeper and more broadly than the truth, in all categories of information, and in many cases by an order of magnitude.’ এই ভুয়ো খবর মানুষকে তাতায়, মাতায়, হুজ্জতি করতে প্রেরণা দেয়, কখনও বাধিয়ে দেয় দাঙ্গা, কখনও যুদ্ধ। ইতিহাসে নজির আছে তার।
এই যেমন আর জি কর হাসপাতালের সেই মর্মান্তিক ঘটনা। একটি মহিলা ডাক্তারের ধর্ষণ ও খুন। যথাযথ তদন্তের আগেই আমরা পেয়ে গেলাম তদন্তের রিপোর্ট। একটি ভিডিয়োয় দেখানো হল কেমন করে কিভাবে ঘটেছিল ঘটনা। যিনি এই ভিডিয়ো করেছেন, তিনি তো আগেভাগে তদন্তকারীদের জানাতে পারতেন যে তিনি সমস্তটাই জানেন, এই যে তার প্রমাণ। আবার একটি অডিয়ো ভাইরাল। বলে যাচ্ছেন একটি নারীকণ্ঠ। ভেতরের খবর জানেন তিনি। বাজারে অডিয়ো ছেড়ে দেবার আগে তিনিও তো বলতে পারতেন তদন্তকারীদের কাছে। রাজ্য পুলিশে আপনার আস্থা নেই? ভালো কথা, বলতে পারতেন সিবিআইকে। বললেন না তো!
খবর রটে গেল ধর্ষিতা নারীর শরীরে ১৫০ গ্রাম বীর্য পাওয়া গেছে। তার মানে একাধিক পুরুষের অত্যাচার। কি সাংঘাতিক! নেট সার্চ করে দেখা গেল একবার যৌন মিলনে একজন পুরুষের যৌনাঙ্গ থেকে বীর্য নির্গত হতে পারে ২-৫ মিলিগ্রাম। কি বলছে? মিলিগ্রাম? গ্রাম নয়? তাহলে ১৫০ গ্রাম বীর্য পেতে হলে ১০০-এর বেশি পুরুষের দরকার। আবার বলা হল নিহত নারীর পেলভিক বোন, কলার বোন ভেঙে গেছে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ পেতে দেখা গেল ভেঙেছে কার্টিলেজ, কলার বোন বা পেলভিক বোন নয়। খবর রটে গেল, এর সঙ্গে জড়িত রাজ্যের এক মন্ত্রীর ছেলে। পরে জানা গেল এক নামের দুইজনকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। আর জি করের ইন্টার্ন শুভদীপের বাবা মন্ত্রী নন, তিনি প্রাথমিক স্কুলের সামান্য শিক্ষক।
এই রকম আরও কত খবর। আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সব খবর।
কিন্তু কেন এই ফেক খবর ছড়ানো হয়? স্রেফ মজা করার জন্য কিংবা জনপ্রিয়তা বাড়াবার জন্য কিংবা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। না মশাই এখানেই শেষ নয়। এহ বাহ্য আগে কহ আর। রাজনৈতিক কারণও আছে। প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করার জন্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি করার জন্য, নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দলের ক্ষমতালাভের পথ প্রস্তুত করার জন্য।
আগে, মানে অনেকদিন আগেও ছিল ফেক নিউজ। চলুন যাই সেই সুদূর অতীতে। রোম সাম্রাজ্যে। জুলিয়াস সিজারের পালিত পুত্র অক্টোভিয়ানের সঙ্গে মার্ক অ্যান্টনির যুদ্ধ লাগতে যাচ্ছে। অক্টোভিয়ান ছড়িয়ে দিলেন ভুয়ো খবর। কি, না ক্লিওপেত্রার সঙ্গে প্রেমে হাবুডুবু মার্ক অ্যান্টনি রোমের মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য মানেন না। ব্যস . সঙ্গে সঙ্গে জনমত ঘুরে গেল ‘রোমান মবে’র। রোমের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল সেদিনকার একটা কথা। বিজেপির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হল যে অখিলেশ যাদব তাঁরা পিতা মুলায়েম সিং যাদবকে কষে থাপ্পড় মেরেছেন। নির্বাচনে অখিলেশ কুপোকাৎ। অনেক দিন পরে বিজেপির এক সদস্য অমিত শাহের কাছে জানতে চেয়েছিলেন ব্যাপারটার সত্যতা। অমিত শাহ নাকি বলেছিলেন, যেদিন চড় মারার কথা প্রচার করা হয়েছিল সেদিন অখিলেশ বাপের থেকে ৬০০ মাইল দূরে ছিলেন। মজার মানুষ অমিত শাহ। তাঁদের শক্তিশালী আইটি সেল ফেক নিউজ ছেড়ে দেবার পরে তিনি কখনও কখনও সত্যিটা বলে ফেলেন। যেমন নরেন্দ্র মোদির সেই ফেক ঘোষণা — সকলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে যাবার কথা। অমিতজি বলে দিলেন, ওসব তো জুমলা।
পঞ্চদশ শতকে মুদ্রাযন্ত্রের আবিষ্কার। মানব প্রগতির দৃষ্টান্ত। কিন্তু প্রত্যেকটি প্রগতি কিছু না কিছু সমস্যা নিয়ে আসে। মুদ্রাযন্ত্রের প্রচলন ফেক নিউজের গতিকে বাড়িয়ে দিল। ১৮৩৫ সালে ‘দ্য নিউইয়র্ক সান’ পত্রিকায় একগুচ্ছ প্রবন্ধ প্রকাশিত হল। যাতে বলা হল চাঁদে বাস করে কিছু অদ্ভুত প্রাণী, যেমন ইউনিকর্ন, উড়ুক্কু বাদুড় এইসব। রাজনৈতিক লাভের জন্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ছড়ানো হয় ফেক নিউজ। ১৮৯৮ সাল। কিউবার কাছে ডুবে গেল এক আমেরিকান যুদ্ধ জাহাজ। ভুয়ো খবর ছড়িয়ে দেওয়া হল এর জন্য দায়ী স্পেন। লেগে গেল যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এ রকম একটা ফেক নিউজ ছড়ানো হল। কি, না জার্মানরা মৃতদেহ থেকে মেদ-মজ্জা তুলে সাবান ও মার্গারিন তৈরি করে। এই খবর ছড়িয়েছিল কোন ব্রিটিশ সংস্থা।
বিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বান ডাকল ফেক নিউজের।
এটাও প্রগতির সমস্যা। জনসংযোগের জন্য যে সব যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে এই সময়ে তার একটা তালিকা মেলে ধরা যাক। ১৯৬০ — উন্নতমানের টিভি, ১৯৭০ — কেবল, ১৯৭২ — মোবাইল ফোন, ১৯৭৩ — প্রথম সেল ফোন, ১৯৮০ — সিআর, ১৯৮৪ — পোর্টেবল মোবাইল, ১৯৯২ — স্মার্টফোন, ১৯৯৩ — সর্বসাধারণের জন্য ইন্টারনেট, ১৯৯৪ — স্মার্টফোন অ্যাপস, ১৯৯৭ — মোবাইল গেমিং, ২০০০ — ক্যামেরা ফোন, ২০০১—সেল ফোনের সঙ্গে ইন্টারনেট যোগ, ২০০৪ — ফেসবুক, ২০০৫ — ইউটিউব, ২০০৬ — টুইটার, ২০০৭ — অ্যাপেলের আবির্ভাব, ২০০৮ — অ্যানড্রয়েড স্মার্টফোন, ২০১০ — ইন্সট্রাগ্রাম, ২০১৪ — হোটাসঅ্যাপ, ২০২০ — আধুনিক স্মার্টফোন। এইসব আবিষ্কার। দূরকে করেছ নিকট বন্ধু। এত নিকট হয়েছে যে স্নানঘরের ছবিও দেখা যায়। এত নিকট হয়েছে যে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলেও মানুষকে ভড়কে দেও্য়া যায়। এত নিকট হয়েছে যে ‘এই আছে এই নেই আছে এই দূরে কাছে ঘুরে নাচে’।
বিশ শকের শেষে এবং এই একুশ শতকে সারা বিশ্বে ফেক নিউজ কিভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তার বিবরণ অফুরন্ত। বিশ্বকে পাশ কাটিয়ে আসুন আমাদের দেশে। মোদি সরকারের আগেও ফেক নিউজ ছিল, কিন্তু তারে এমন দাপট ও বিস্তার ছিল না। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা বলছেন, ‘A giant chunk of the disinformation is created and highlighted by an ecosystem close to the ruling Bharatiya Janta Party, the Narendra Modi government, and their supporters, Unsurprisingly, many of these fake claims serve their political interests.’ কোভিড-১৯ নিয়ে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে, নির্বাচন (২০১৯) নিয়ে, পাকিস্তান নিয়ে, কাশ্মীর নিয়ে, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘর্ষ নিয়ে ছড়ানো হয়েছে অজস্র ফেক নিউজ। বিজেপিকে যতই গালাগাল করুন, বিজেপি মুখে যতই বিজ্ঞানকে কাঁচকলা দেখাক, তাদের আইটি সেলের শক্তি বিরাট। আমি আমার ‘ব্র্যাণ্ড ফকিরের জুমলাবাজি’ বইতে বিজেপির আইটি সেলের দক্ষতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছিলাম। তার মানে এই নয় যে বিজেপি-বিরোধী দলগুলি ফেক নিউজকে বিষবৎ মনে করে। আসল কথা হল ক্ষমতা। তার জন্য ছল-বল-কৌশলের চাণক্যনীতি গ্রহণ করতে হবেই। ইউনেস্কো তাঁদের ‘হ্যাণ্ডবুক ফর জার্নালিজম এডুকেশন অ্যাণ্ড ট্রেনিং’ বইতে দু-রকমের ফেক নিউজের কথা বলেছেন। একটা হল ‘misinformation’ ; এখানে ভুল-ভাল তথ্য পরিবেশন করা হয় ; তাতে মানুষের খুব একটা ক্ষতি হয় না। আর একটা হল ‘disinformation’ ; এখানে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই বিকৃত তথ্য পরিবেশন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে ভারতে এখন দ্বিতীয় ধারাটি বলবৎ — ‘In India, fake news is predominantly disseminated by homegrown political disinformation campaign .’
আর জি কর কাণ্ডে এই ‘disinformation’ প্রাধান্য পেয়েছে।
Extremely Informative ????
দারুন বলেছেন
সম্পূর্ণ সহমত
ফেক নিউজ, ভুয়ো বা মিথ্যা বা বানানো খবর চিরকালই দেশে দেশে, সমাজে,সংসারে প্রচলিত। আগে মুখে মুখে এমন খবর ছড়াত।বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে, ফলে তার গতি অতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। এই ফেক নিউজ, ভুয়ো খবর বড় ভয়ংকর, অনেক কিছুর স্থিতাবস্থা নষ্ট করতে পারে,সমাজে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করে,মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবরের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সকল সচেতন মানুষ ওয়াকিবহাল।
সত্য খবর গোপন করলে এই ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবর প্রচারিত হবার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। যখন সামাজিক বা রাষ্ট্রিক ভাবে কোন ঘটনার সত্যতা স্বীকার না করে, সত্য খবর প্রকাশ না করে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য খবর গোপন করে বা সত্য ঘটনাকে অন্য কোন মিথ্যার রঙে রাঙিয়ে ( এটা ও ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবর) প্রচারিত করা হয়, তখন যুক্তি পরম্পরার অভাব দেখে আরও অনেক ফেক খবর, ভুয়ো খবর, মিথ্যা খবর ছড়াতে থাকে।
বর্তমানে সমাজে নানা অন্যায়, অবিচার, অনৈতিক ঘটনা ঘটে চলেছে আর যে কোন রাজ্য বা কেন্দ্রীয় শাসকরা তাকে গোপন করার উদ্দেশ্যে সত্য ঘটনাকে চাপা দিয়ে ঘটনার গতিপথ অন্য দিকে চালিত করে। তখনই ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবর দ্রুত থেকে দ্রুততর গতিতে ছড়ায়। বর্তমানে আমার রাজ্যেও সেই ঘটনা ঘটছে না কি?