ভুয়ো খবর বা ফেক-নিউজ ছড়ানোর অভিযোগে বিশিষ্ট সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাই-সহ একাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হল বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যের বিভিন্ন থানায়। কৃষক আন্দোলনে অশান্তি সৃষ্টিতে যুক্ত রাজনৈতিক ‘দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করেছেন’ এই দাবি করে কয়েকটি ভিডিও রিপোর্ট প্রকাশ করার পর গ্রেফতার করা হয়েছে মনদীপ পুনিয়া নামে ক্যারাভান পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিককে। শুধু বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই ধরনের এফআইআর দায়ের হওয়ায় কেউ সন্দেহ করতেই পারেন, যে এর পিছনে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির সরকারের সায় আছে। রাজদীপের ক্ষেত্রে আরও বড় ঘটনা হল, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সেই প্রতিষ্ঠানও তাঁকে শাস্তি দিয়েছে বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রাজদীপ এবং অন্য অভিযুক্ত সাংবাদিকরা প্রজাতন্ত্রদিবসের দিন টুইটারে লিখেছিলেন, পুলিশের গুলিতে ট্র্যাকটর মিছিলে হাজির থাকা একজন কৃষক মারা গিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেক নিউজ প্রচার করেছেন উত্তেজনা ছড়াতে। রাজদীপের মতো সুপরিচিত, অভিজ্ঞ, সম্মানীয় সাংবাদিক ফেক-নিউজ প্রচার করবেন এমন অভিযোগ শুধু অবিশ্বাস্য নয়, সন্দেহ হয় এই ধরনের অভিযোগ আনার আড়ালে অন্য কোনও ভাবনা কাজ করেছে। সন্দেহ নেই রাজদীপ ভুল খবর পোস্ট করেছিলেন, তার পর ভুল বুঝতে পেরে তা ডিলিট করে দেন। ঠিকই করেছেন। গত প্রায় ৪০ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সম্ভবত এমন কোনও সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি জীবনে কখনও ভুল খবর লেখেননি এবং পরে সেই ভ্রম সংশোধন করেননি। রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষমতায় এসে গদিমিডিয়ার বাইরের সাংবাদিকদের সম্পর্কে যদি এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশ করেন, সমাজ এবং সাংবাদিক কমিউনিটি যদি নীরব থাকে এই নিয়ে, গণতন্ত্রের পক্ষে তা খুবই অশুভ ইঙ্গিত। রাজদীপদের বিরুদ্ধে কোন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে? আইপিসির ১২৪এ, ২৯৫এ, ৫০৪, ৫০৬, ৩৪, ১২০বি ধারায় মামলা করা হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহিতা ছাড়াও ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করা, হিংসা ছড়ানোর চেষ্টা, ভয় দেখানো, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করা হয়েছে ওই সব ধারায়। আইটি আইনের বিভিন্ন ধারাতেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
ফেক নিউজের বাংলা গুজব। গুজব নানা ভাবে ছড়ানো যায়। যুদ্ধের ময়দানে দ্রোণাচার্যকে বিভ্রান্ত করতে যুধিষ্ঠির চেঁচিয়ে বললেন, ‘অশ্বথামা হত’, তার পর মৃদু গলায় বললেন, ‘ইতি গজ’। এর ফলে দ্রোণাচার্য ভেঙে পড়লেন যুদ্ধের ময়দানে। এটাই সম্ভবত সব থেকে প্রাচীন ফেক নিউজ।
১৮৩৫ সালে ‘নিউইয়র্ক সান’ পত্রিকা একটা সিরিজ ছেপেছিল। সেখানে ছবিতে দেখানো হল, চাঁদে এক দল বাদুড়ের মতো মানুষ, নীল রঙের ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার পাশেই নীলকান্তমণি (sapphire) দিয়ে তৈরি প্রাসাদ। বলা হল, ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন হারসেল (John Herschel) দক্ষিণ আফ্রিকার একটি অবজারভেটরি থেকে একটি জোরালো টেলিস্কোপ দিয়ে চাঁদের এই ছবিগুলি তুলেছেন। এরা সব চাঁদের প্রাণী। কয়েক দিনের মধ্যেই নিউইয়র্ক সান-এর বিক্রি ৮হাজার থেকে বেড়ে হয়ে গিয়েছিল ১৯ হাজার। কম্মটি করেছিলেন সান-এর সম্পাদক রিচার্ড অ্যাডামস লক। ঘটনা হল, সত্যিই ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন হারসেল দক্ষিণ আফ্রিকার একটি অবজারভেটরিতে গবেষণা করছিলেন টেলিস্কোপ নিয়ে। কিন্তু ছবি বা ওই রিপোর্ট কোনওটাই তিনি পাঠাননি। সবটাই সান-এর অফিসে বসে বানানো হয়েছিল কাগজের বিক্রি বাড়াতে। সানের সম্পাদক জানতেন, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে চিঠি ছাড়া যোগাযোগ করা সম্ভব নয়, ফলে সত্য প্রকাশ হতে হতে মাস পেরিয়ে যাবে। তত দিনে তাঁর ব্যবসা অনেকটা এগিয়ে যাবে।
এতক্ষণ যা বলা হল, তা সামান্যই। দৃষ্টান্তের শেষ নেই। এসব হল ফেক নিউজের অতীতের কথা। অতীতের এই ঘটনাগুলো ছিল অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। কিন্তু বর্তমানের ফেক নিউজ, বিশেষ করে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ফেক নিউজের আড়ালে একটি রাজনৈতিক-সাংগঠনিক শক্তিকে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। ইন্টারনেট এবং হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ইত্যাদি ব্যবহার করে আজকের ফেক নিউজ অনেক বেশি ক্ষতিকারক লক্ষ্যে কাজ করছে। আমাদের দেশে ২০১৪-র লোকসভা ভোটে প্রথম দেখা গেল সোস্যাল মিডিয়ার দাপট। শুধু তাই নয় সোস্যাল মিডিয়াকে চালিত করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশেষ সেল তৈরি করল এই সময়েই। একটি বিদেশি সংবাদ মাধ্যম ভারতের ফেক নিউজ নিয়ে খুব বড় মাপের সমীক্ষা এবং গবেষণা চালায়। তাতে যা উঠে এল, সেটা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেশ মিলে যায়। সেই গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতে ফেক নিউজের বেশির ভাগটাই শাসকদলের পক্ষে।
২০১৭ সালে রাজস্থানের কোটায় সোস্যাল মিডিয়া ভলান্টিয়ারদের এক সভায় বিজেপি নেতা অমিত শাহ (দৈনিক ভাস্কর এবং দ্য ওয়্যার-এর রিপোর্ট) বলেন, ‘সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই আমরা রাজ্যে, কেন্দ্রে সরকার গড়ব, আপনারা শুধু মেসেজ ছড়িয়ে দিন প্রতিদিন যা ভাইরাল হবে’। কী ধরনের মেসেজ? অমিত শাহ বলছেন, ‘আমাদের ৩২ লাখের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ আছে। এক জন সোস্যাল মিডিয়ার কর্মী সেখানে লিখে দিয়েছিল অখিলেশ মুলায়মকে চড় মেড়েছে। বাস্তবে এমন কিছু ঘটেইনি। কিন্তু খবরটা ভাইরাল হয়ে গেল। এই ধরনের কাজ করা উচিত নয়। কিন্তু আবার এটাও ঠিক, ওই মেসেজ একটা ‘মহল’ তৈরি করতে পেরেছিল। যেটা আমরা করতে চাই। কিন্তু এমন কাজ কখনও করবেনা’। উপস্থিত কর্মীরা সবাই হেসে উঠলেন। অমিত শাহ আবার বললেন, ‘আমি কী বলছি আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন’। পশ্চিমবঙ্গে যে কয়েকটি ছোট-খাট সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে, সেখানে দেখা গিয়েছে এই ধরনের ফেক নিউজের প্রচার। একটি ভাইরাল ভিডিও তে দেখা গেল, এক দল লোক প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানী করছে এক মহিলার, যা আসলে ভোজপুরি সিনেমার ক্লিপিং, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বলা হয়েছিল, হিন্দু মহিলার উপর অত্যাচারের ছবি। উত্তরপ্রদেশের একটি সংঘর্ষের বাড়ি ঘর জ্বালানোর ছবিও এই রাজ্যের বলে চালানো হয়েছিল সেই সময়ে। এই ধরনের ফেক নিউজ নিয়ে শাসকদলের হাতে থাকা রাজ্যসরকারগুলি খুব যে চিন্তিত তা মনে হয় না। অন্যদিকে রাজদীপ সারদেশাইয়ের মতো বিশিয্ট সাংবাদিকের একটা ভুলকে (যা তিনি স্বীকার করে নিয়ে ডিলিট করে দিয়েছিলেন) ধরে আনা হচ্ছে দেশদ্রোহিতা অভিযোগ।
যাঁরা চান সাংবাদিকরা ভয় পাক, শুধু তারাই খুশি হবেন এই ধরনের ঘটনায়। গদি মিডিয়া তো তৈরি হয়েই গিয়েছে। কিন্তু তাতেও সবটা হচ্ছে না। তার পরও কেউ কেউ চান, তুলোর দস্তানা পরতে বাধ্য করা হোক বাকি অবাধ্য সাংবাদিকদের।
দারুণ দাদা। ????