ফালগুনী ছিল ভয়ানকভাবে একা। ফলে, ভাবনা-চিন্তার সময় ছিল অফুরন্। বাড়িতে থাকলে, দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, কখনও বি.টি.রোডে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, পকেটে দু’টাকা নিয়ে বিকেলের আগে কলেজ স্ট্রিটে, বাসভাড়া ফাঁকি দেবার সচেষ্ট প্রয়াস, পাতিরামে পত্র-পত্রিকা নাড়াচাড়া। স্টলে দাঁড়িয়ে সে বহু মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় রচনা পাঠ করেছে; তারপর কফিহাউস।কফিহাউসের পরবর্তী অধ্যায় হল নানান ঠেক। ফেরার ভাবনা — পাথেয় সম্পর্কে কোনোরকম চিন্তা ছিল না।
নিঃসঙ্গ থাকার ফলে নিজের মধ্যে ঘোরা-ফেরা, বলা চলে নিজের মধ্যে সেঁদিয়ে যাওয়া ও মগজ-ভ্রমণ — এই প্রবণতা থাকার ফলে তার নিঃসঙ্গতা, বা একাকী থাকাটা তাকে কাতর করেনি তেমন, পরিচিত বা বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা ছিল হাতে-গোনা, তেমন সামাজিকতাও ছিল না তার। পাড়ার ছেলেবেলাকার সঙ্গী, কলেজের সহপাঠী এবং যৌবনের আমরা কয়জন।
সে ছিল ইমসমনিয়ার রোগী। রাত দুটো-তিনটে অব্দি পত্রিকা-বই নিয়ে, মুখে সিগারেট, ধোঁয়া — হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেলে, এরকম দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ত। রাত পেরোলে পরদিন, কিংবা রাত ঘন হচ্ছে দেখে, ‘যচ্ছি-যাচ্ছি’ করে যখন বেরোতো — বাস বন্ধ। গভীর রাত, স্তব্ধ পরিবেশ, জনমানুষহীন পথ, গোনাগুনতি যানবাহন, হৈচৈ নেই, একা-একা ভুতের মত রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে, এ-দৃশ্য অনেকের দেখা। শীতে, কুয়াশা-ঘেরা, লম্বা কোট পরনে, রহস্যময় প্রতিচ্ছায়া নিয়ে ফালগুনী চলেছে। কুকুরের কোরাস-চিৎকার, লরি যাতায়াতের জোরালো আলো ও আওয়াজ, হঠাৎ-হঠাৎ পাগলের/মাতালের আবির্ভাব, সি.পি. লেখা কালো পুলিশি ভ্যানের ছুটে যাওয়া। এমনকি, ৭০-৭১ সালে, বরাহনগর-কাশীপুর যখন সংবাদপত্রের হেডলাইন, ফালগুনীর তখনও একই চলা-ফেরা।
পাটনায় এক অন্য ফালগুনী। পাটনায় তার দিদি ও ছোটবোন থাকতেন। আর ছিলেন ফালগুনীর প্রেমিকা, যাঁর ওই শহরে বিয়ে হয়েছিল। কলকাতায় শরীর যখন ভয়ানক দুর্বল হয়ে পড়ত, মনে গভীর অবসাদ, দিন-যাপন এক ভার-স্বরূপ, তার মা তখন ফালগুনীকে পাঠিয়ে দিতেন দিদি-জামাইবাবুর কাছে, পাটনায়। ফালগুনীর জামাইবাবু মলয়ের কলেজের অধ্যাপক ছিলেন; লোহানিপুরে থাকতেন। পাটনায় ফালগুনী সুস্থ, একা। প্রকৃতপক্ষে একা। কোনও সঙ্গী নেই, সহমর্মী নেই। সমীরদা, মলয় সেখানে থাকলে, ফালগুনী তাদের কাছে থাকত আনন্দে। আমি পাটনায় গেলে সে হাউয়ের হতো আমার ওখানে লোদিপুরে, যে পাড়ার পটভূমি আমার বহু গল্পে। যদ্দিন আমার থাকা, ফালগুনী ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর, মনের কথা, নতুন কবিতা রচনা ও পাঠ।ফণিশ্বর রেণু’র ফ্ল্যাটে যখন তাকে নিয়ে যাই, গরমকাল, কাটগ্লাসে ছাঁকা তাড়ির ওপর ছোটো এলাচ গুঁড়ো দিয়ে ছড়িয়ে আড্ডা। আমার গরহাজিরাতেও হাজির হতো মাঝে মধ্যে, কখনও বা মলয়ের সঙ্গে; রেণুর ফ্ল্যাটে গেলে, গ্রীষ্মকাল বাদে, মল্টেড হুইস্কি।
পাটনায় এগজিবিশান রোডের মোড়ে কফিহাউসে, একটি কোণে বসতেন রেণুজী, যেটি রেণুজ কর্নার নামে প্রসিদ্ধি পেয়েছিল। টেবিল ঘিরে আমরা, সমীরদা, মলয়, অলোক ধনওয়া, রাজকমল চৌধরী ও অন্যান্য হিন্দি লেখক। বিহারের রাজ্যপাল দেবকান্ত বড়ুয়ার ভাই নবকান্ত বড়ুয়া পাটনায় এলে আসতেন রেণুজ কর্ণারে। আমাদের কবিতা পড়তে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। ফালগুনীর কবিতাগুলো স্বভাবতই ছিল অন্য রকম, পাঠভঙ্গীও গতানুগতিক নয়। রেণুজী হিন্দিভাষীদের জন্যে মুখে-মুখে অনুবাদ করে শোনান। রাজ্যপাল-ভবনে হাংরি কবিতাকে কারোরই অশ্লীল মনে হয়নি।নবকান্ত বড়ুয়া এরকম কবিতার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না; ফালগুনীকে তিনি অত্যাধুনিক ও ক্রেজি বলেন।
পাটনায় ফালগুনীর জন্য তার দিদির চিন্তা ছিল, দায়িত্বও। ওর কোনো খবর না পেলে মলয়ের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতেন, বকুনি দিতেন মলয়কে। পাটনায় আমরা ভাঙের পকোড়া হাতে গল্প করতে-করতে কখনও গান্ধী ময়দানে, কখনও মহেন্দ্রুঘাটে, কখনও গোলঘরে, কখনও বা শ্মশানে চরস ও মৃত্যুবোধের খোঁজে।দুজরা শ্মশান ছিল আমাদের বাড়ির কাছে, গঙ্গার ধারে। ফালগুনীর স্বাস্হ্যের কিছুটা উন্নতি হত, অনিয়ম সত্তেও। সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় ছিল ফালগুনীর দরোজাখোলা কথাবার্তা, প্রেমিকার সম্পর্কে, শরিকি বাড়ির খেয়োখেয়ি সম্পর্কে। পাটনায় তবু ফালগুনী কিছুটা দুর্নাম কুড়িয়েছিল।ছোটো শহর, বাঙালিবাবু-সমাজের ছেলে কিনা কংকরবাগ তাড়ির ঠেকে বসে তাড়ি খায়। ছিঃ ছিঃ। পাটনার যত্র-তত্র মলয়ের সঙ্গে যেতো, কিন্তু মলয় সেসব কথা লেখেনি এখনও পর্যন্ত।সম্ভবত ১৯৭৪-এ ফালগুনীর অন্তিম পাটনা বাস, কেননা মলয় তখন হাংরি মকদ্দমাকে কেন্দ্র করে বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতায় বিরক্ত ও দূরত্ব গড়ে ফেলেছে ; পাটনা ছেড়ে মলয় রওনা দিয়েছে লখনউতে থাকার জন্য।
মাঝে-মাঝে ফালগুনী অবশ্য বে-রুটিন হয়ে দিদির বাড়ি থেকে গৃহছাড়া হতো। কখনও গান্ধী ময়দানে, কখনও বা পাটনা রেলওয়ে স্টেশনে, কখনওবা মহেন্দ্রুঘাটের জাহাজি পাটাতনে। কখনও বা ওর শয্যা ফুটপাতের পাথুরে বিছানায়।
হাংরি আন্দোলনের সময়ে আরো কয়েকটি আন্দোলন হয়েছিল ভারতবর্ষের নানা ভাষায়। বাইরেও। প্রতিবেশি নেপালে ঘটেছিল ‘রালফা‘ আন্দোলন।রালফা ও হাংরিদের নিয়ে সমীরদা (রায়চৌধুরী) একটা সংকলন প্রকাশ করেছিলেন, নকশাল নেতা কাঞ্চনকুমারের সহযোগীতায় বেনারস থেকে, হিন্দি কবি নাগার্জুন-এর অভিভাবকত্বে। রালফার নেত্রী ছিলেন পারিজাত, অসামান্যা সুন্দরী, বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। মলয় এই পারিজাতের প্রেমে পড়েছিল, এবং ওর বেশ কিছু কবিতা পারিজাতকে নিয়ে লেখা; পারিজাতও ওর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, কিন্তু সে-গল্প মলয় কোথাও লেখেনি এখনও। কাঠমান্ডুতে আমাদের সদলবলে অভিজান তাঁকে বেশ উৎসাহী ও অনুপ্রাণিত করেছিল। আমরা মহিষের কাঁচা মাংস ‘কাচিলা’ এবং দিশি নেপালি মদ ‘এলা’ খেয়ে পারিজাতের আড্ডায় বহু রাত কাটিয়েছি; আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন নেপালি অ্যাকাডেমির কর্ণধার বাসু শশী। নেপালে আমাদের মাসাধিক থাকার ও যথেচ্ছাচারে কাহিনী নিয়ে একটা পৃথক লেখা হতে পারে। সেই পারিজাত, বিমল রালফাকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে উড়ে এসে হাজির আমার আস্তানায়।ত্রিদিব মিত্র আর আমি তাঁদের তুলে আনি দমদম বিমানবন্দর থেকে — বেলঘরিয়ায়। ত্রিদিব থেকে যায় আমার বাসায়, এবং আশ্চর্যের ব্যাপার সেই রাতে অতি আকস্মিকভাবে ফালগুনী এসে হাজির।
তখন আমার ঘরের ডানদিকে ছিল সবুজ ঘেরা মাঠ, অনেক গাছ-গাছালি, পাখিদের আপিলা-চাপিলা, রাতে ঝিঁঝি, একনাগাড়ে চেয়ে থাকলে চোখ সবুজ হয়ে পড়ে, দূষণমুক্ত বাতাসে বুক ফুলে ওঠে। অথচ মাঝে-মাঝে ঐ ১৯৭১-৭২ সালে, মাঝরাতে, নকশাল আন্দোলন যখন তুঙ্গে, কখনও সন্মিলিত পদশব্দ, দীর্ঘশ্বাস-প্রশ্বাস, চাপা কাতরানি। ঘুম ভেঙে গেলেও কাঠ হয়ে পড়ে থাকতে হতো। ফালগুনীও ছিল তেমন একটি রাতে। পরদিন সকালে সূর্যের আলোয় শুধু মাটির চাড় ছাড়া আর কিছু লক্ষিত হয় না। বছর ছয়-সাত পরে, যখন বাড়ি তৈরির জন্যে ভিত খোঁড়া হচ্ছে, একাধিক কঙ্কাল, শরীরের খাঁচা। হাতে একজনের লোহার বালা ছিল।
ফালগুনী পারিজাতের ইনটারভিউ নিতে শুরু করে। ‘শিরিষ কা ফুল’ উপন্যাসের লেখিকা পারিজাতে পাহাড়ি টোনে উত্তর দিতে থাকেন। তাঁর কন্ঠস্বরে মাদকতা ছিল। ফালগুনী উঠে দাঁড়ায় অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারে। “আসছি, রথতলা থেকে…”। কাঠমান্ডুতে আছে সন্তুলা, জাঁড়; কলকাতায় বাংলা, মা-কালী। ফালগুনী গেল রথতলায়, রথতলায় ছোট্ট গুমটি, যদিও বেআইনি, সেই যে গেল, পরদিন দেখা গেল বরানগরে। ইনটারভিউয়ের কাগজ আর পাওয়া যায়নি। (ক্রমশঃ)