আমাদের কয়েকটি গোপন ডেন ছিল, যেখানে যাওয়া-আসা হত, খালাসিটোলা বন্ধ হবার পর, নাইট শোয়ে। এখনও চোখ বুজে, খুললেই দেখতে পাই ফালগুনীর তৎপরতা, গেলাস হাতে, বগলে বোতল। খালাসিটোলায়, খেতে-খেতে সময় অতিক্রান্ত হলে কালীদা এসে তাড়া দিত — গেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, উঠে পড়ুন, উঠে পড়ুন। কাউন্টারের সামনে তখন দাঁড়িয়ে কমলকুমার মজুমদার, সঙ্গে কয়েকজন। ঠুমরি নিয়ে আলোচনা। কমলবাবু মলয়কে ওর মকদ্দমায় ১০০টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। খালাসিটোলায় তখন আমাদের ওঠার লক্ষণ নেই দেখে এক-এক করে বাতি নিভিয়ে দেওয়া হতো। শুধু একটি বাতি মাঝখানে। ফালগুনী নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বলে উঠত, “কালীদা, আপনিই তো অন্তর্জলী যাত্রার হিরো। আপনাকে দেখেই তো কমল মজুমদার ঐ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন”। তবুও কালিদার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত না, হুমকি দিয়ে তুলে দিতেন আমাদের, ওনার “বাউন্সাররা” ওনার হুকুমের অপেক্ষা করত।
বেরিয়ে কখনও জ্যোতি সিনেমা হলের পেছনের ডেন-এ। কফিহাউস থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিট-মার্কেটের পেছনে গাব্বুর ঠেকে। গাব্বুর আসল নাম ছিল মোহম্মদ সিরাজ, বিহারের লোক, মলয়ের চেনা। আমাদের সাপ্লাই করত ‘বাংলা’ — একটু বেশি দামে। গরমকালে পাওয়া যেত তাড়ি, টক, অথচ নেশা হতো প্রচণ্ড। আর আমরা খেতাম পরোটা, রুটি, এবং হরেক মাংসের টিকিয়া, চাপ। আমাদের মধ্যে সুভাষ আর শৈলেশ্বর ধর্মের কারণে গরুর মাংস খেত না, ওরা ডিম খেত। মদের সঙ্গে গাঁজা বা সিদ্ধি খেত না ফালগুনী। বড়বাজারে সত্যনারায়ণ পার্কে, সিদ্ধির দোকানে ও ছিল রোজকার খদ্দের। ভাঙের গুলি বা সিদ্ধির সরবৎ ছিল লোভনীয়।
ফালগুনীর বাড়ি ছিল বিশাল, অনেকটা জায়গা নিয়ে, সামনে বিশাল ফটক, ফটকের মাথায় মৃত্তিকা-কেশরী। গেট পার করে অনেকটা হেঁটে প্রথমে মন্দির, পেরিয়ে গাড়িবারান্দা, রেনেসঁসের দিনে ভক্সৌল গাড়ি থাকত, তারপর সদর। কলকাতার প্রাচীন বনেদি বাড়ির মতই তার নকসা, নির্মাণ, কারুকার্য, বড়-বড় থাম-খিলান, মেঝেতে ইটালিয়ান মার্বেলের চৌকোপাথর — খাপচা-খাপচা তোলা। পরে জেনেছিলাম তা থেকে পাথর তুলে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। ভেতরে চারধারে বারান্দা, সামনের ঘর, বন্ধ-কপাট, ভাড়াতেদের দেয়া ও গুদামি হিসেবে ব্যবহৃত। স্যাঁতসেতে অন্ধকার।
বাঁ ধার ঘেঁষে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি, শালকাঠের সিঁড়ি। চওড়া বারান্দায় লোহার ঢালাই-করা রেলিং, বিশাল-বিশাল কক্ষ, মানুষের সমান দেড়গুণ উচ্চতার দরোজা-জানালা। বাঁ ধারে ফালগুনীর মা যে-ঘরে থাকতেন, মাঝখানে ছিল মান্ধাতা আমলের বিশাল পালঙ্ক, পায়া ছিল লম্বা, বিছানা ছিল মেঝে থেকে অনেক উঁচুতে।
দোতলার জলসাঘর ছিল বিশাল আয়তনের। ফালগুনী বলত, এখানে কবিতা-পাঠের একটা মুজরো করা যেতে পারে।ঐ জলসাঘরে অনায়াসে শ-দুয়েক শ্রোতা-দর্শক বসতে পারে। দেয়াল ছিল ম্যাড়মেড়ে, চুনের ছাপ পড়েনি এক শতক, মামড়ি খসার মত দেয়ালের গতর থেকে খসে পড়ছিল চুন। দু-একটা ধুলো-মাখা বিশাল অয়েল-পেইনটিঙ ছিল, যা দেখে সহজে তখনকার জমিদারদের অবস্হা টের পাওয়া যায়।হাংরি আন্দোলনের পেইনটার করুণানিধান মুখোপাধ্যায় বলেছিল, এরকম দেয়াল পেলে সাইকেডেলিক আর্টে ভরে দেয়া যায়। আর আলাস্কার তরুণ বিটনিক লেখক ও শিল্পী ট্রেশম গ্রেগ স্রেফ আওড়াতে থাকে — “ফ্যানটাসটিক. ফ্যানটাসটিক”। ফালগুনী ওকে খোঁচাচ্ছিল, “ডু ইউ নো ওরিয়েন্টাল আর্ট ? নো ওরিয়েন্টাল আর্ট, স্যাম ?” ওর মায়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ফালগুনী — আমরা ছিলাম নিমন্ত্রিতজন।
বেনারস থেকে হাংরি চিত্রকর করুণানিধান, সঙ্গে আলাস্কের ট্রেশম গ্রেগ এসে হাজির এক সকালে বেলঘরিয়ায়। আমি পাটনার ছেলে জেনে ফালগুনীর মা বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেছিলেন। ফালগুনীর সেজদি, যিনি ফালগুনীকে অপরিমিত স্নেহ করতেন, অসুস্হ হলে যিনি চিন্তিত ও বিচলিত হয়ে উঠতেন, বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত জেগে থাকতেন দরোজা খোলার জন্য, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারতেন না, ছটফট করতেন, ফালগুনীর ভালো-মন্দের দিকে তিনি সবিশেষ লক্ষ রাখতেন। এই সেজদির পক্ষপাত ফালগুনীকে উৎসাহী করে তুলত। মনে আছে, আমরা চারজন ফালগুনীর মায়ের ঘরে মেঝের ওপরে বসে খেয়েছিলাম, পরিবেশনায় সেজদি। খাবার শেষে একসময় তিনি ফালগুনীর কবিতা সম্পর্কে জানতে চান। পরে কিছুটা বিষাদ-মাখা কন্ঠে বলেছিলেন, “অনিয়ম করে শরীর নষ্ট হলে লিখবে কি করে ?” বস্তুত তাই ঘটেছিল। শেষের দিকে ফালগুনীর শরীর অশক্ত হয়ে পড়েছিল।
কেন যে দোতলার স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে ছাদের একচিলতে চিলে-কোঠায় আশ্রয় নিয়েছিল, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। নিজের ভেতরে ঢুকে যাওয়া, নিজের মুখোমুখি হওয়ার মত এমন নিরিবিলি জায়গা, বস্তুত ছিল লোভনীয়। সিঁড়ির লাগোয়া অপরিসর চিলে-কোঠা, জানালা পশ্চিম-মুখো, পাল্লাহীন ঘর, চিলতে আলো তখন এসে পড়েছিল। ঐ কোঠাঘরে ছিল একটা ছোট্ট তক্তাপোশ, মাথার ধারে তেলচিটে বালিশ, মুড়ে-রাখা বিছানা, অর্থাৎ চাদর ও সতরঞ্চি, একটা ছোট্ট কাঠের নড়বড়ে টেবিল। আগেকার আমলের লোহার টিনের চাদরও ছিল, আর রাখা ছিল একটা ছোট্ট কুঁজো, এলুমিনিয়াম গেলাস তার ওপর ঢাকা। আগোছালো অপরিষ্কার ছন্নছাড়া, মেঝেময় ধুলো ও ছাই, দেশলাই কাঠি, খাওয়ার পর বিড়ির টুকরো। দেয়াল অপরিচ্ছন্ন। দেয়ালে যিশুর একটা অতি পরিচিত মূর্তি, ফালগুনী তার গায়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে কালো রবারের সাপ। কালো দিব্যতা, যাকে নিয়ে ওর বিখ্যাত কবিতা। একটা তোবড়ানো টিনের সুটকেস, সুটকেসের ভেতরে অবিন্যস্ত কাগজপত্তর, মণিমুক্ত।
ফালগুনীর পূর্বপুরুষরা ছিলেন যশোরের জমিদার। পিতামহ রামরতন রায়, বরানগরে রতনবাবু রোড যাঁর নামে।বরানগরে যে শ্মশানটি রতনবাবু ঘাট সংলগ্ন, কেবলমাত্র রামরতন রায়ের পরিবারের সদস্যদের দাহ করার জন্য যা সংরক্ষিত — ব্যতিক্রম শিশিরকুমার ভাদুড়ী ও শ্রীরামকৃষ্ণ। ফালগুনীর চিতা এখানেই নিভেছিল। ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ফলে তাদের জমিদারি পাকিস্তানে পড়ে; ফলে আয়ের উৎস হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।
অতিরিক্ত ও মাত্রাহীন নেশা-প্রীতি, পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব, এবং সেই সঙ্গে পথ্য ও চিকিৎসার অভাব — তার শরীর ভেঙে পড়ে। ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকে। শেষ দিকে, কবি দীপক মজুমদারের সঙ্গে ফালগুনীর আলাপ হয়, ক্রমশ ঘনিষ্ঠতা। দীপক তাকে দিয়েছিলেন সেই মজার সন্ধান, যা সম্ভবত আমরা দিতে পারিনি, কেননা দীপকের যৌনতা ছিল বাধাবন্ধনহীন,লাগামছাড়া। বিদেশিনীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল দীপকের। তা ফালগুনীকে মাটির আরও কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল।
শেষদিকে একবার সে পাড়ি দিয়েছিল সাগর-যাত্রায়। পাড়ার ছেলেবেলাকার বন্ধু অরুণের সঙ্গে। ফালগুনী তখন পুরোপুরি অসুস্হ। ভালোভাবে উঠতে-বসতে পারে না। ছইয়ের ভেতরে শরীর শায়িত। মোহনার মুখে নৌকা এসে টালমাটাল সাগরের জল ছুঁয়েছে, ওপচানো ঢেউয়ের গর্জন, গম্ভীর ধ্বনি, নৌকোর গায়ে সাগর-জলের ঝাপটানি। বড় বেশি কাতর হয়ে পড়েছিল ফালগুনী। মাথা তুলে, ছইয়ের বাইরে নীলাকাশ, মেঘের খেলা, জলচর পাখি, জলে প্রতিবিম্বিত সূর্য, আলোর ছটা — আরো বেঁচে থাকার আকাঙ্খা ছিল তার: ‘‘বাঁচতে চাই, বাঁচতে চাই, বাঁচতে চাই….”
মুহূর্তে দৃশ্যান্তর। ক্যামেরা প্যান করে দূরে পাহাড়শ্রেণির দিকে, মেঘ, নিবিঢ় আকাশ ছুঁয়ে নীতার মুখমণ্ডল। মেঘে ঢাকা তারায় তার আর্ত গোঙানি, দিগ্বিদিক নিস্তব্ধ পরিবেশকে খান-খান করে ভেঙে ফ্যালে। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার যুগের সমাপ্তি হয়।