ফালগুনী রায়। সে হতে চেয়েছিল ফালগুনী রায়। কবি ফালগুনী রায়। নিজের আইডেনটিটিকে জোরদার করার প্রথম ধাপ: নাম। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর এই পৃথিবীর ধুলো, রোদ, বৃষ্টি, বায়ু-দূষণময় এই জগতে নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিল সে। মৃত্যু ৩১ মে ১৯৮১। বয়স পঁয়ত্রিশ বছর বেঁচে থাকা বাস্তবিকই কঠিন। জীবিত থাকলে ফালগুনীর বয়স আমাদের সমান হতো। হয়তো রেখে যেত আরো কিছু কবিতা/গদ্য/প্রবন্ধ। হয়তো এই কারণে যে পরবর্তী সময়ে মেধা ও অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতা-জাত বোধ তাকে কোথায় ঠেলে নিয়ে যেত জানা নেই। কবি হিসাবে তার পরিণতি, মৃত্যু সময়াবধি, যা দেখেছি, অস্বাভাবিক ছিল না।
শহিদ নয়; আত্মহনন ছিল তার অভীপ্সা। জেব্রা দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রথম কবিতা প্রকাশের কালানুক্রমে, তার কবি জীবন মাত্র ১৩ বছর। এই ১৩ বছরে সে রেখে গেছে কিছু কবিতা, চিত্রনাট্য, গল্প, সমালোচনা — যা থেকে বাছাই করে প্রকাশ করা হয়েছিলনষ্ট আত্মার টেলিভিশন, বাসুদেব দাশগুপ্তের প্রকাশনায় — ছোট, সাজসজ্জাহীন, আটপৌরে, ১৬ পৃষ্ঠা, হাফ ক্রাউনে, চটি — এই কবিতা-পুস্তক। ১৫ই আগস্ট ১৯৭৩ সনে প্রকাশিত।
১৯৬৪-৬৫এর ভয়ঙ্কর অবস্হায়। হাংরি জেনারেশানের মামলা কোর্টে — কেসের ডেট, অ্যডজোর্ন, অ্যাপিল, হীয়ারিং, সাক্ষি-ফরিয়াদি, দালাল-ফড়ে, পুলিশ-ফেউ, উকিল-পেঙ্গুইন, সোয়াল-জবাব, কাঠগড়া-আসামী-সরকারপক্ষ — এসব মুদ্রার এক পিঠ; অপর পিঠে সাহিত্যিক ও সাহিত্য-নির্ণায়কদের ভ্রুকুটি, তৎপরতা, খুরপি হাতে সমূলে উপড়ে ফেলার সদিচ্ছা।
আমরা তখন দিন-রাত ধিকৃত ও নিন্দিত। উপহাস, অবহেলা, উপেক্ষা, ব্যঙ্গোক্তি, অপমান, কটুক্তির কালো পালক আমাদের মাথায় গজিয়ে উঠছে। এইরকম অবস্হায়, প্রতিকূল পরিবেশ, তেল বা ঘামের ব্যবহার ছাড়া, হঠাৎ বল্গাহীন, উন্মত্ত, মেঘকৃষ্ণ আকাশের তলে, বেমক্কা ফসফরাসের মত জ্বলে উঠেছিল জেব্রা। মলয় আর আমি গোপনে ছাপিয়ে আনতাম বহরমপুর থেকে, এই কারণে যে, কলকাতার প্রেসে-প্রেসে টাউটদের উঁকি-ঝুঁকি ও ভ্রুকুটি বেড়ে গিয়েছিল। জেব্রা প্রথম সংখ্যা বার হবার পর, একদিন, তখন বিকেল, ফালগুনী এসে হাজির আমার আস্তানায় যেহেতু যোগাযোগের ঠিকানা ঐ। আস্তানা বলতে ১০ বাই ১০ চৌকো ঘর, দোকান বাইরের দিকে বলে, প্রবেশ-প্রস্হানের সুবিধে ছিল বাধাহীন — যা ছিল আমার জ্যাঠামশায়ের।রাতের আশ্রয় ব্যতীত অন্য সব দরকারি-অপ্রয়োজনীয় সারতে হতো বাইরে।
ফাল্গুনী ১৯, শীর্ণ, মাঝখানে সিঁথি-কাটা ঘন কেশ, ভাঙা গাল, গাল জুড়ে ঘন শ্মশ্রু, উপচে বেরুনো কন্ঠা, কোর্স ধুতি এবং গলাবন্ধ লম্বা কালো মিস-ফিট গরম কোট। কোটটি, নিঃসন্দেহে ফালগুনীর নিজস্ব নয়, অন্তত কোটটির ঝুল ও ব্রেস্ট-সাইজ দেখে তর্ক করার অবসর ছিল না। পুরানো ও ব্যবহৃত, নিশ্চিত তার দাদার বা কারোর। প্রথম দর্শনে যা বিদ্ধ করেছিল, ভয়ঙ্কর, তা হলো ফাল্গুনীর চক্ষুদ্বয়। বস্তুত তা ছিল আয়ত — উজ্জ্বল ও ভাষাময়, আমর্ম আবেগচঞ্চল করে তোলার মত প্রাণবন্ত, একগাদা স্বপ্নের প্রতিফলন। সবে সে প্রেম পেতে শুরু করেছিল, তারি ছটা ছিল মুখশ্রীতে, দৃষ্টিতে, হাবভাবে, চাল-চলনে। পরবর্তীকালে, ফালগুনী দাড়ি বাদ দিয়েছিল, চুলের সিঁথি পরিবর্তিত হয়েছিল, আরও পরে, চোখের দৃষ্টিও হয়েছিল পোড়খাওয়া। প্রেম সাফল্য অর্জন করেনি, ব্যর্থতা ঘিরে ধরেছিল, সাময়িক। সেই প্রেমিকা, গ্রহণ করেছিল এমন একজনকে, যার পটভূমি ছিল সুখী জীবন। অর্থাৎ আমৃত্যু নিরাপত্তা, প্রচুর অর্থ, স্বচ্ছলতা, বিলাস, জীবন উপভোগের আরো, আরও অনেক উপকরণ। ফালগুনীর পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না কোনোটাই, একমাত্র পূর্বপুরুষদের আভিজাত্য, বংশমর্যাদা ছাড়া। নারীর রহস্যময়তা ও ব্যবহার, ফালগুনীকে একেবারে ধ্বস্ত করে ফেলেছিল। শুরু হয় নিজের মধ্যে খেলা, আইডেনটিটির উন্মোচন, নেশা, গাঁজা, ভাঙ। পরবর্তীকালে নেশা করাটা ফালগুনীর রক্তে মিশে গিয়েছিল। নিজের ‘ইগো’ ঝালিয়ে নেবার জন্য, ইমোশানকে সতেজ করার জন্য, নেশা একান্ত প্রয়োজন, ফালগুনীর এইরূপ বিশ্বাস ছিল।
জেব্রা প্রথম সংখ্যা এবং হাংরি জেনারেশানের লিফলেটগুলি ফালগুনীকে টেনে এনেছিল আমার কাছে। মনে পড়ে, সেদিন ফালগুনীকে নিয়ে শেয়ালদা স্টেশানে বসে অনেকক্ষণ গল্প করি। ফালগুনী সদ্য পাঠ-সমাপ্ত কবিতার গোছা থেকে একটি কবিতা দেয়, মাত্র একটি। জেব্রা দ্বিতীয় সংখ্যার প্রস্তুতি চলছিল, এবং ঐ কবিতা ছাপা হয়। পরে আমাদের অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ফালগুনীর অন্য কোনো পত্রিকার প্রয়োজন পড়েনি। হাংরি বা হাংরি মনোভাবাপন্ন পত্রিকায় তার কবিতা, চিত্রনাট্য, রিভিউ বেরিয়েছিল। গল্প-কবিতা, কৃত্তিবাস-এও ২/১টা।
ফালগুনীর দাদা তুষার রায়, কবি হিসাবে ছিলেন তখন প্রচারিত। তুষারের ঘোরাফেরা ছিল পঞ্চাশের কবিদের মাঝে, কৃত্তিবাস, দেশ-আনন্দবাজার, কবি-লেখকদের সঙ্গে হৃদ্যতা ছিল, ফলে প্রশ্রয় ও তোল্লাই দুটোই পেয়েছিলেন অপর্যাপ্ত। ফালগুনী ও তুষারের মাঝে চরিত্রগত ব্যবধান ছিল পাতাল-আকাশ, দুজনেই নেশা-প্রিয়, নেশার পর তুষার হয়ে উঠতেন এক্সট্রোভার্ট; ফালগুনী যেত নিজের খোলসে সেঁধিয়ে। এমনিতে স্বল্পবাক সে, প্রথম সারিতে হুড়মুড় করে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা ছিল না বা গলা উঁচু করে চ্যাঁচানো। আকন্ঠ মদ গিলেও মাতলামো ছিল না। বস্তুত সে ছিল প্রাসাদ-প্রতিম অভিমানী; অবহেলা অবজ্ঞা সে হজম করে নিয়েছে নিরবে, কখনও বা তাকে গ্রাস করেছে সাময়িক বিষণ্ণতা। তখন সে একা, নিঃসঙ্গ, মৌনগভীর।
তুষার ফালগুনীকে সহ্য করতে পারতেন না। পটভূমি অজ্ঞাত। আপাত দৃশ্যে পারিবারিক হিসেবনিকেশ থাকতেও পারে। একবার আমি আর ফালগুনী কফিহাউস থেকে বেরিয়ে নিচে ফুটপাতে এসে দাঁড়িয়েছি, উল্টোদিকের ফুটপাতে তুষার। হঠাৎ সিটি মারার শব্দ; তুষার ছুটে এসে ফালগুনীকে — “কে সিটি মেরেছে? অ্যাঁ? কে সিটি মেরেছে?” ওঁর ওই মারকুটে মুখ দেখে ফালগুনী চুপ, আমিই বললুম অগত্যা — “জানি না। ওদিকে হয়তো বা”। “ও, হ্যাঁ।” তুষার ফিরে যান। এ-ধরণের অযথা, অনাবশ্যক, নানান ব্যাপারে ফালগুনীকে হেনস্হা হতে হতো। ফালগুনী ও তুষারের কাব্যভাবনা আলাদা ছিল। যদিও নেশা, যথেচ্ছাচার দুজনকেই মৃত্যুর দিকে নিয়ে গিয়েছিল। প্রেম, ভালোবাসা, অভিলাষ ও আকাঙ্খার প্রতি অক্ষমতা, যা ফালগুনীর কবিতায় হাহাকার তুলত, যা মূলত অপুরণের অক্ষমতা — দ্বিধা ছিল কতদূর নিয়ে যাবে তাকে। ফালগুনী তখন কবিতা নির্মাণের ব্যাপারে সিরিয়াস। পরবর্তী সময়ে নেশা এবং অসুখ তাকে বিছানাশায়ী করে ফ্যালে। এই সব ছাপিয়ে কবিতা নির্মাণের ব্যাপারটা সে, বলাবাহুল্য, অবহেলা করে গেল একরকম। ব্যক্তিগত সুখ ও তৃপ্তির অভাব তাকে চাতালহীন ধরার ওপর নাচিয়ে ছেড়েছে; যন্ত্রের, ভোগহীনতার দুঃখ, নিজেকে পাপ-পূণ্যের দাঁড়িপাল্লায় তোলা, অপাংক্তেয় ও ফালতু ভাবা।
মুদ্রার অপর পিঠ আড়াল করে রাখা হয়। সুজলাং সুফলাং মলয়জ শিতলাং– অথচ এই কলকাতার বাস্তব রাস্তায় রেশন ও কেরোসিনের জন্য দীর্ঘ লাইন, ফুটপাথে হাজার-হাজার পাথুরে বিছানা, রেল-লাইনের ধারে-ধারে ঝুপড়ি ও চুল্লুর ঠেক, স্পল্যানেডে সন্ধের সময় দালাল ও ছিনতাইবাজ, হাইরাইজ বিল্ডিঙের গোপন কক্ষে মৌ-মক্ষিকার চাক-জমাট মধু, প্রকাশ্য দিবালোকে খুন ও বোমাবাজি, বিজ্ঞানসন্মত রিগিং, ঘুষ ও কালোবাজারি, বধুমাতা ও যৌনকর্মীর সদৃশ আচার, ভিখিরির মিছিল ও চাঁদা আদায়কারী — রেশানালিজম ও রোমান্টিসিজম, বহুদিন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল বাংলা সাহিত্যকে। এইসব আচ্ছন্নতা, চটচটে ব্যাপার গোড়ালি থেকে তুলে ফেলার কৃতিত্ব ফালগুনীর। ভাষা এবং তেজ বাদ দিয়ে পোস্টমডার্ন সাহিত্য হয় না। (ক্রমশঃ)