‘ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত। / নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হল মাৎ। ‘…কাজী নজরুল ইসলাম।
মাসটি অগ্রহায়ণ। হেমন্ত ঋতুর দ্বিতীয় মাস— বঙ্গে যাকে বলা হয় ‘আঘন’ বা ‘মার্গশীর্ষ’ মাস। ঋতুচক্রের পরিক্রমায় উত্তরের হিমেল বাতাস আর ভোরের কুয়াশা জানান দেয় প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে। কবির উপমায়, এই ঋতু যেন মমতাময়ী নারীর সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতাকে বর্ণনা করে। হেমন্ত লক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টিতে ধরাধামে কৃষকের গোলা ভরে যায় নতুন ধানে।
‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ অর্থাৎ ‘আগে’ ও ‘বছর’। আভিধানিক অর্থে যে সময় বছরের শ্রেষ্ঠ ধান প্রচুর উৎপন্ন হয়। তাই হয়তো সম্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা তোলার মাস হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ফসল তোলার পরই বাংলার ঘরে ঘরে পালন করা হয় নতুন চালের পায়েস, পিঠে-পুলি প্রভৃতি খাওয়ার পার্বন-বিশেষ ‘নবান্ন’।
অবশ্যি হেমন্তের খানিকটা দুর্নাম আছে শুরুর দিকের অভাব–অনটনের জন্য তবে হেমন্তের শেষ অংশ সমৃদ্ধির। আবহমানকাল থেকেই অগ্রহায়ণ মানেই কৃষকের মুখে অনাবিল হাসি, পরিতৃপ্তির ব্যস্ততা। মাসটি বিবাহের জন্যও বিশেষ শুভ।

পশ্চিমবঙ্গের লোকসমাজে তাই অগ্রহায়ণকে বলা হয় ‘লক্ষীমাস’। ধান কাটার পর ঝাড়াই মাড়াই করে চিটে-সহ ধান ঘরে তোলার পর মাঠে পড়ে থাকা ধানগাছের সমগ্র অবশিষ্টই খড় হিসাবে চিহ্নিত। যা বহুবিধ ব্যবহারের উপযোগী। গবাদি পশুর খাবার ও শয্যাপকরণ থেকে শুরু করে ঘর ছাউনি, জাজিম ইত্যাদি তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান। জৈবজ্বালানি হিসাবেও খড়ের ব্যবহার উল্লেখ যোগ্য। এই প্রসঙ্গে, নারায়ণ সান্যালের লেখা ‘পঞ্চাশোর্ধে’ কৃষ্ণনগরের ডাক্তার কালিচরণ লাহিড়ীর একটি কাহিনী বলি।
তিনি সম্পর্কে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কাকা হলেও রোগীদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘খড়ের ডাক্তার’ হিসাবে। সে যুগের ধন্বন্তরি ডাক্তার। শেষরাতে শয্যা ত্যাগ করে পুজাপাঠ করে যখন বেরোতেন তখন কৃষ্ণনগর শুধু নয় স্বয়ং সূর্য্যদেবও শয্যা ছাড়েননি।
পরনে ধুতি, গায়ে উত্তরীয়, পায়ে খড়ম, গলায় স্টেথো, হাতে ডাক্তারী ব্যাগ নিয়ে পালকিতে চেপে রোগীর বাড়ীর তালিকায় টিক দিতে দিতে শান্তিপুর, নবদ্বীপ, ফুলিয়া এক এক দিন এক এক দিকে চলে যেতেন। রোগীর বাড়ীর লোকেরা তাঁর গোয়াড়ী কৃষ্ণনগরের ঔষধগারে আসতো ওষুধ নিতে। প্রেসক্রিপশন হতো দু-ধরনের। প্রেসক্রিপশনের মাথায় ঢেড়া চিহ্ন দেওয়া থাকলে কম্পাউন্ডার বুঝতে পারতেন, রোগী গরীব—ওষুধের দাম নেওয়া চলবে না। সেটি যাবে দাতব্য চিকিৎসার নথিতে।
একদিন কম্পাউন্ডারের হাতে এলো একটা ঢেড়া চিহ্ন দেওয়া প্রেসক্রিপশন। বাংলায় লেখা ছয়টি অক্ষর। কম্পাউন্ডার চশমার কাঁচ মুছে, প্রেসক্রিপশন সামনে, দূরে নিয়ে গিয়েও উদ্ধার করতে পারলে না ওষুধের নাম। অপরিচিত নাম। ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। যথারীতি সন্ধ্যালগ্নে পালকি চেপে ফিরলেন কালিচরণ।

চাষীটিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন— কী রে তুই এখনো বসে?
‘কী করবো ডাক্তার বাবু? আপনার কম্পাউন্ডার তো ওষুধের নামই পড়তি পারছে না!
কম্পাউন্ডার তাড়াতাড়ি প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কী লিখেছেন বুঝতে পারছি না।’
ডাক্তারবাবু : ‘বাংলাতেই লিখেছি। এক গাড়ী খড়।’
চাষী আর কম্পাউন্ডার দুইই অবাক। ওষুধ নিতে এসে খড়!!!
‘শোন, ওর বাপের নিউমোনিয়া হয়েছে। গিয়ে দেখলাম, ঘরের ছাদ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। আগে ছাদটা মেরামত করতে হবে। তাই এক গাড়ী খড় ওদের বাড়ী পাঠিয়ে দাও। খরচটা আমার খাতে লিখে রাখ।’
নানা কারণবশত সর্বত্র অগ্রহায়ণ-এর প্রত্যক্ষ উপলব্ধি হয়না, প্রচ্ছন্ন অনুভূতি হয়। সময়টা ন্যাপথলিনের গন্ধে মুড়ে চাদর, সোয়েটার, কম্বল আস্তানা ছেড়ে বেরোনোর। ঈষৎ উষ্ণ, শীতল অদ্ভুত এক অনুভূতি। সে যেন ‘আধেক ঘুমে নয়ন চুমে’ ব্যাপার।

এখন টমেটো সেঞ্চুরি হাঁকালেও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সবুজ করাইশুঁটি, ধবধবে ফুলকপি, পিঁয়াজকলি, শীষ পালং, সিম, মূলো কতকিছু।
রিক্ততার মধ্যে সৌন্দর্য্যতা, ত্যাগের মধ্যে মুক্তির আস্বাদন এই বিপরীতধর্মী ছবি লুকিয়ে আছে অগ্রহায়ণ মাসের ক্যানভাসে। পরদুঃখ হরনেচ্ছায় শান্তির পরশ লাগুক কৃষকের জীবনে। অগ্রহায়ণে পায়েশের শুভ্রতায় প্রাণ ফিরে পায় জীর্ণতা। নবান্নের সুঘ্রানে ভরে উঠুক সকলের জীবন। সর্ষেফুলের হলুদ গালিচায় মোড়া প্রকৃতি সেজে ওঠে নব সাজে।
এতো সুন্দর করে ভাবার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ
থ্যাংক ইউ????